আমি লন্ডনবাসী, আমার মায়ের জন্মশহরে ছোটবেলা থেকে এ পর্যন্ত কাজের সুবাদে বহুবার এসেছি। ২০১২ সালের ভারি ও ঘর্মাক্ত এক রাতে আমার মায়ের কাজিনের সঙ্গে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে আসি। পরিকল্পনা অনুযায়ী তার সঙ্গেই আমার থাকার কথা। আমরা দুজন পেছনে, গাড়ির সামনের পুরোটাই যেন ড্রাইভারের—আমার খটকা লাগল। বিত্তবান পরিবারগুলো তাদের গাড়িতে সার্বক্ষণিক ড্রাইভার রাখে, কোম্পানিও বড় কর্মচারীদের সার্বক্ষণিক ড্রাইভারসহ গাড়ি দিয়ে থাকে। করাচিতে ফ্লাইওভার আর হাইওয়ের জাল। এসব রাস্তায় চলাচল মানে হাঁসফাঁস করা লাখ লাখ মানুষের মোকাবেলা করা। বহু লেন-সড়কে আমরা উঠে আসি; বাসের ওপর মানুষ, পাশে হাতল ধরে ঝুলছে। এই চলার পথে আমার সেই আন্টি করাচি শহরে টিকে থাকার কয়েকটি টিপস দিলেন। বাইক চালিয়ে কেউ যদি আমার গাড়ির পাশে এসে থামে এবং পিস্তল বের করে, তাহলে আমার কোনো কথা বলার দরকার নেই—আমার কাছে টাকাকড়ি, সোনাদানা যা আছে এবং আমার মোবাইল ফোন সব যেন তার হাতে তুলে দিই। তাহলে অপহূত হওয়ার আশংকা কমে যাবে। আমাকে বলা হয়েছে, বিপদত্সংকুল কোনো জনপদের মধ্য দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় যেন না থামি। কয়েকজন যদি গাড়ির চাকায় পিষ্ট হয়ে মারাও যায় তাতেও আমার থামা চলবে না। আমি বুঝতে পারি, এ পরামর্শ গাড়িতে চলাচল করা পর্যটকের জন্য। করাচির ধনী লোকেরাই সবচেয়ে বেশি বিপদাপন্ন ও সহিংসতার শিকার। আমার আত্মীয়ও করাচির অবস্থাপন্ন পরিবারগুলোর মতো উচুঁ দেয়ালের আড়ালে বসবাস করে। উঁচু দেয়াল তো বটেই, তাদের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে একে-৪৭ রাইফেলের ২৪ ঘণ্টার প্রহরা। ক্যাফে এবং অনেক দোকানে মেটাল ডিটেক্টর বসানো হয়েছে। কখন কোন ঘাতক ঢুকে পড়ে। ১৯৯০-এর দশক থেকেই যে কারো গুলিবিদ্ধ হয়ে মরার আশংকা বেড়ে গেছে। প্রতিদিন শুটারদের টার্গেটের শিকার হয়ে ১৫-২০ জন মৃত্যুবরণ করেছ—পুরোটাই দলাদলি, রাজনৈতিক কিংবা জাতিগত। রাস্তায় খণ্ডযুদ্ধ, বন্দুক নিয়ে ছোটাছুটি কখনো কখনো একটি মহল্লাকেই অচল করে দেয়। তবে ভালো দিক হচ্ছে এসবের প্রতিক্রিয়া সামান্য। শহরের একদিকে যখন খুনোখুনি চলছে, অন্যদিকে জীবন ও বাণিজ্য চলছে স্বাভাবিক গতিতে।

ক্লিফটন ও ডিফেন্স এলাকায় জনগণ শহরের ভেতর দুর্গ শহর নির্মাণ করে প্রসাদোপম বাড়িতে বসবাস করে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে নিরাপত্তার অন্বেষা করছে—যাদের জীবনের সঙ্গে লায়ারি বা ওরাঙ্গি বসতির মানুষের দুস্তর তফাত।


করাচিতে সহিংসতা নিত্যকার ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ক্লিফটন সমুদ্রসৈকতে যাওয়ার উদ্যোগ ভেস্তে যাবে। নিরাপত্তার প্রশ্নে হয়তো পুলিশ মাঝপথেই আটকে দেবে। প্রতিদিন সকালে আমি আমার আন্টির সঙ্গে মার্বেলের মেঝেতে মোড়া বাড়ির বসার ঘর থেকে বিলাসী বাগান ডিঙিয়ে প্যাগোডার ওপর ছড়ানো বৃক্ষের সমারোহ দেখি। তার পোষা তোতা আমাদের কথার শব্দ তুলে নিয়ে তা বলার চেষ্টায় চিত্কার করে ওঠে। এ কী তামাশা! সবার আগে পৌঁছে এক্সপ্রেস ট্রিবিউন। এ পত্রিকার করাচি সংস্করণে প্রতিদিনই ছাপা হয় ক্রাইম ম্যাপ—অপরাধের মানচিত্র। শিরোনামে থাকছে শুটিং, রেইড, মিসহ্যাপস কিংবা ডেডবডি ফাউন্ড। আধপাতাজুড়ে টার্গেট কিলিং-গ্যাং ফাইটিং।

সহিংসতার শেকড় অনেক গভীরে। করাচির ইতিহাস দ্রুত অভিবাসনের এবং দ্রুত শহর বর্ধনের। ১৯৪৭ সালে বন্দর শহর করাচির জন্যসংখ্যা ছিল পাঁচ লাখেরও কম, এখন সেখানে লোকসংখ্যা দুই কোটি—এমনকি লন্ডনেরও তিন গুণ। ভারতের রক্তাক্ত অঞ্চল নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল পাকিস্তান। ভারত থেকে ট্রেনবোঝাই শূন্যহাত মুসলমান পরিবার দুঃসহ নির্মমতা কাটিয়ে জীবন নিয়ে চলে এসেছে। ট্রেনের ও শরণার্থীদের শেষ গন্তব্য করাচি। অন্যান্য শহর শরণার্থীদের প্রত্যাখ্যান করেছে। পছন্দ করে নয়, বাধ্য হয়েই তারা করাচিকে গন্তব্য করে নিয়েছে। এ শরণার্থীরা মোহাজির, ঠাঁই পেয়েছে শরাণার্থী শিবিরে। দাঙ্গার ভয়ে পালিয়ে যাওয়া হিন্দু ও শিখদের শূন্যপদে তারা চাকরিতে ঢুকেছে।

দেশভাগের ক’মাস পর ১৯৪৮ সালে মাহাত্মা গান্ধী খুন হলে আমার নানা ও নানির বিয়ের উৎসব ছেঁটে ফেলা হয়। সেই সপ্তাহেই তাদের বিয়ে। শিগগিরই আমার নানি উত্তর ভারতের মুসলিমপ্রধান অংশে তার মা-বাবার বাড়ি ফেলে নানার পরিবারের সঙ্গে করাচি চলে আসেন। তিনি শরণার্থী শিবিরে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতে থাকেন। দুই বছর পর ১৯৫০-এ আমার মায়ের জন্ম হয়। এত বড় শরণার্থী সংকটের পরও নতুন দেশের রাজধানী করাচি আশা ও স্বপ্নের শহরে পরিণত হয়েছিল।

সংকট শুরু থেকেই, প্রথমে মোহাজির বনাম স্থানীয় সিন্ধি। স্বল্পশিক্ষিত সিন্ধিরা অধিকতর শিক্ষিত মোহাজিরদের কাছে চাকরি ও বাণিজ্যে মার খাচ্ছিল। অচিরেই তাড়া পরস্পরবিরোধী, পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসী এবং শত্রুতে পরিণত হলো। ১৯৭০-এর দশকে আমার নানা-নানি, মা, দুই খালা ও মামা নতুন জীবনের খোঁজে লন্ডন চলে এল।

এর মধ্যে রুশ আক্রান্ত আফগানিস্তানের বাস্তুচ্যুত আফগানরাও করাচিতে এসে জমায়েত হলো। মোহাজিররা মোত্তাহিদা কওমি মুভমেন্ট শুরু করল। এদিকে পাকিস্তানের বড় রাজনৈতিক দলগুলো দেশীয় স্বার্থে শরণার্থীদের ব্যবহার করতে লাগল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিল। পাকিস্তানে জাতি গঠনের সংকট রয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর অর্ধেক সময় সরাসরি সামরিক শাসনের অধীনে ছিল পাকিস্তান, গণতন্ত্রের চর্চা ছিল না।

২০১২ সালে আমি করাচি দেখেছি এবং ১৯৭০-এর দশকে আমার মা ও আত্মীয়রা যে করাচি দেখেছে তা এক নয়—তখনো কিছু স্বপ্ন অবশিষ্ট ছিল। গত এক দশকে আমি অনেকবার করাচি এসেছি। সহিংসতা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ২০১৪ সালে করাচি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও আক্রমণের শিকার হয়। করাচির বিভিন্ন অংশের মানুষ যখন সাংবাদিক পেয়ে আমার কাছেই তাদের অভিজ্ঞতালব্ধ সহিংসতার কথা বলতে থাকে, আমি জানি এ কাহিনীর কোনো শেষে নেই। এমন কিছু বলার সুযোগ আমার থাকে না, যা তাদের আতঙ্কিত মুখাবয়বে কিছুটা আশার সঞ্চার করবে।

 

সামিরা শ্যাকল: সম্পাদক, নিউ হিউম্যানিস্ট