[নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত (১৮৬১—২৮.১২.১৯৪০) আদি নিবাস হালিশহর-চব্বিশ পরগনা।। খ্যাতনামা সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। ১৮৭৮ সালে জেনারেল অ্যাসেমব্লিজ ইনস্টিটিউট থেকে প্রবেশিকা পাস করেন। ১৮৮৪ খ্রি. করাচির ‘ফিনিক্স’ পত্রিকার সম্পাদক হন। ১৮৯১ খ্রি. লাহোরের ‘ট্রিবিউন’ ও ১৯০৫ সালে এলাহাবাদের ‘ইন্ডিয়ান পিপল’ নামক সাপ্তাহিক পত্রিকার সম্পাদনা করেন। ১৯০১ খ্রি. তিনি ও ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায় ‘দি টোয়েনটিয়েথ সেঞ্চুরি’ নামে একটি ইংরেজি মাসিক পত্র প্রকাশ করেন। ‘ইন্ডিয়ান পিপল’ পত্রিকা দৈনিক ‘লিডার’-এর সঙ্গে মিলিত হলে তিনি তার যুগ্ম সম্পাদক হন এবং পুনর্বার ১৯১০ খ্রি. থেকে দুই বছর ‘ট্রিবিউন’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। প্রথম জীবনে ‘স্বপন সঙ্গীত’ গীতিকাব্য (১৮৮২) এবং পরে ‘সাহিত্য’ ও ‘ভারতী’ পত্রিকার জন্য বহু ছোটগল্প ও কয়েকটি উপন্যাস রচনা করেছিলেন। বৃদ্ধ বয়সে বন্ধু রবীন্দ্রনাথের কয়েকটি কবিতার ইংরেজি তর্জমা গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন। এখানে ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত নগেন্দ্রনাথ গুপ্তের রিফ্লেকশনস অ্যান্ড রিমিনিসেন্সেস গ্রন্থ থেকে তার করাচিবাসের অধ্যায় থেকে নির্বাচিত অংশের অনুবাদ উপস্থাপন করা হলো। অবশ্য এ বইয়ের অনেক অংশই ১৯২৬ থেকে ১৯৩১ সালের মধ্যে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।

অনুবাদ করেছেন হাসান তানভীর]

 

১৮৮৪ সালে ২২ বছর বয়সে আমি করাচির উদ্দেশে কলকাতা ত্যাগ করি। সেটা এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ছিল। আমি আরাহের পশ্চিমে কখনো যাইনি। বাড়ি থেকে এত দূরে যাওয়ার দরকারও ছিল না। আমার পারিবারিক অবস্থা অতটা খারাপ ছিল না। সরকারের চাকরিতে আমি সহজেই জায়গা পেতে পারতাম। কিন্তু একজন যুবক হয়েও আমি এ ধরনের চাকরির প্রতি ভীষণ অনাগ্রহ অনুভব করেছি। আমি তরুণ ও রোমান্টিক ছিলাম। অ্যাডভেঞ্চারের প্রতি কৌতূহল আমার মধ্যে প্রবলভাবে আলোড়িত হয়েছিল। আট বছর বয়সে মতিহারিতে আমি মাকে হারিয়েছিলাম। বাবা আসলে আমার চলে যাওয়ায় বাধা দেননি, কিন্তু তিনি ভেবেছিলেন আমার ভারতের অন্য প্রান্তে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

করাচি যাওয়ার পথে আমার প্রথম যাত্রাবিরতি ছিল পাটনায়। এ সময় আমার বাবা সেখানে ছিলেন। বাড়ি থেকে এত দূরে যাওয়ার আগে তার সঙ্গে দেখা করা আমার কর্তব্য ছিল। তিনি কোনো আপত্তি করেননি, শুধু বলেছিলেন আমি যেন নিজেকে খুশি করতে পারি। তিনি আমাকে টাকাও দিয়েছিলেন, যদিও যাতায়াতের জন্য আমি যথেষ্ট পরিমাণ টাকা সংগ্রহ করেছিলাম।

সিন্ধুতে আমি একমাত্র যে মানুষটিকে চিনতাম তিনি ছিলেন হীরানন্দ শৌকিরাম আদভানি। তিনি আমার চেয়ে এক বছরের ছোট ছিলেন। হীরানন্দ কলকাতায় এসেছিলেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করেছিলেন। এরপর তিনি নিজ প্রদেশে ফিরে যান। তিনি আমাকে ‘সিন্ধ টাইমস’ নামে একটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র সম্পাদনায় তাকে সহযোগিতার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আমি তারুণ্যের উৎসাহে তার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলাম।

করাচি ক্যান্টনমেন্ট রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছার পর দয়ারাম গিদুমালের সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি ছিলেন এলফিনস্টোন কলেজের প্রাক্তন ছাত্র এবং করাচি সদর কোর্টের তত্কালীন রেজিস্ট্রার। তার কাছ থেকে আমি জানতে পারি যে সিন্ধু টাইমসের মালিক ছিলেন দুই পারসি ভদ্রলোক, কিন্তু সম্পাদকীয় বিভাগ নিয়ন্ত্রণে ছিল করাচিতে নতুন প্রতিষ্ঠিত ‘সিন্ধসভা’ নামের একটি রাজনৈতিক দলের। হীরানন্দ এবং আমাকে এ পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক নিযুক্ত করা হয়েছিল। আমি শিগগিরই জানতে পারলাম যে দয়ারাম ছিলেন সিন্ধসভার প্রাণ ও আত্মা। একই সঙ্গে সিন্ধু টাইমসের প্রধান কন্ট্রিবিউটরও ছিলেন তিনি। আমি ছিলাম স্থানীয় রাজনীতি বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ, কিন্তু আমি জানতে আগ্রহী ছিলাম। দয়ারাম ও অন্যান্য উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিরা আমাকে সাহায্য করার বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। সিন্ধসভার সদস্যদের মধ্যে ছিল হিন্দু, মুসলমান, পার্সি ও খ্রিস্টানরা। বেশকিছু ভারতীয় কর্মকর্তাও সদস্য ছিলেন এবং তারা সভার আলোচনায় সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। স্থানীয় সরকার, যার প্রতিনিধি ছিলেন সিন্ধুর কমিশনার এবং করাচির কালেক্টর, এ ব্যাপারে কোনো আপত্তি তোলেনি। কারণ সিন্ধসভার রাজনীতি ছিল নরম ধারার এবং এর কর্মসূচি কখনই নেতৃত্ব ও প্রতিনিধিত্বের বাইরে যায়নি। দয়ারাম গিদুমাল অকপটে সিন্ধ টাইমসে ইউরোপীয় এবং অন্য বিচারকদের রায়ের সমালোচনা করতেন। লেখকের পরিচয় কোনো গোপন বিষয় ছিল না, কিন্তু তিনি একজন সরকারি কর্মচারী ছিলেন তার লেখায় তা কারোরই মনে হয়নি।

সিন্ধের মানুষ

নৃতাত্ত্বিকভাবে পাঞ্জাব ও সিন্ধ অঞ্চলের মানুষ যে অভিন্ন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আদি আর্য বসতি স্থাপনকারীরা শুরুতে পাঞ্জাবে উপনিবেশ স্থাপন করে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি অংশ সিন্ধু নদীর তীর ধরে সিন্ধে বসতি স্থাপন করে। থর ও পার্কার জেলার ব্রাহ্মণাবাদের ধ্বংসাবশেষ সিন্ধে একটি প্রাচীন আর্য রাজ্যের অস্তিত্ব নির্দেশ করে। সিন্ধু ভূমির প্রাচীন সংস্কৃত বইগুলোতে সিন্ধু শব্দটি প্রায়ই উল্লেখ করা হয়েছে, যার অর্থ সম্ভবত নদীমাতৃক দেশ। মহাভারতে বলা হয়েছে যে জয়দরথ ছিলেন সিন্ধুর রাজা। সিন্ধু প্রদেশের বেলুচ বিজয়ের ফলে জনসংখ্যার বিরাট অংশ ইসলামে দীক্ষিত হয়। বর্তমানে মুসলমানরা সিন্ধুতে সংখ্যাগরিষ্ঠ। অন্যদিকে সংখ্যালঘু হিন্দুরা প্রধানত শহরগুলোতে বাস করে। মীরদের শাসনামলে সিন্ধু চারটি স্বাধীন জমিদারিতে বিভক্ত ছিল। এর মধ্যে শুধু খায়রপুরের মীর শাসন টিকে থাকে এবং তারা একটি সামন্ত রাষ্ট্র গঠন করে। মীরদের অধীন প্রধান কর্মকর্তা বা আমলারা হিন্দু ছিল এবং তারা এখনো আমিল নামে পরিচিত। তাদের অধিকাংশই হায়দরাবাদ, সিন্ধে বসতি স্থাপন করেছে এবং এখন তারা সরকারি কর্মচারী, আইনজীবী, ডাক্তার, প্রকৌশলী ইত্যাদি পেশায় নিয়োজিত আছে।

সিন্ধি ও বাঙালি

গত শতাব্দীর আশির দশক পর্যন্ত সিন্ধে কোনো কলেজ ছিল না। সেখানে শুধু সরকারি জেলা স্কুল এবং কয়েকটি মিশনারি প্রতিষ্ঠান ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার জন্য তরুণ সিন্ধিদের বোম্বে যেতে হতো। হীরানন্দকে কলকাতায় পাঠানো হয়েছিল। কারণ তার ভাই নবলরায় সিন্ধের একজন দক্ষ ডেপুটি কালেক্টর ছিলেন। তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম সমাজ এবং কেশব চন্দ্র সেনের নব বিধান চার্চের সদস্য। কয়েকজন সিন্ধি ও বাঙালির মধ্যে প্রথম বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপিত হয় যখন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর সিন্ধের একজন জেলা জজ হিসেবে নিযুক্ত হন। সত্যেন্দ্রনাথ কখনই ‘সাহেবি’ পোশাক পরেননি বা সাহেবি রীতিতে জীবন যাপন করেননি। তিনি ও তার স্ত্রী যেখানেই যেতেন সামাজিকভাবে খুব জনপ্রিয় হতেন। হায়দরাবাদ ও সিন্ধে তাদের সঙ্গে নবলরায়সহ আরো কয়েকজন সিন্ধি ভদ্রলোকের অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। দেওয়ান নবলরায় ছিলেন অসামান্য চরিত্রের অধিকারী, কঠোর, ধার্মিক, স্বল্পভাষী যা ছিল আমিল কর্মকর্তাদের সম্পূর্ণ বিপরীত।

স্বদেশী আন্দোলন তখনো অজ্ঞাত ছিল, কিন্তু নবলরায় নিজ থেকেই ছিলেন কট্টর স্বদেশবাদী। তিনি যে জামাকাপড় পরতেন তা ছিল সিন্ধে তৈরি এবং সাধারণ উপাদানের। তিনি জাঁকজমকপূর্ণ উল্টানো হ্যাট বাতিল করেছিলেন, যা মূলত সিন্ধের মীরদের দ্বারা প্রবর্তিত হয়েছিল। তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত তপস্বী, মিতব্যয়ী জীবনযাপন করতেন এবং একটি সাধারণ বিছানায় ঘুমাতেন। তার ব্যক্তিগত খরচ মাসে কয়েক টাকার বেশি ছিল না। তবে তিনি অবাধে এবং উদারভাবে প্রতিটি যোগ্য দাতব্য সংস্থাকে দান দিয়েছেন। নবলরায় শৌকিরাম একজন অসাধারণ মানুষ ছিলেন এবং তার জীবনযাপন রীতি হীরানন্দের জীবনে শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছিল। দুই ভাইয়ের মধ্যে দারুণ শারীরিক মিল ছিল। তারা উভয়েই কালো এবং উভয়ের মুখেই গুটিবসন্তের দাগ ছিল। নবলরায়ের বয়স ত্রিশ বছরের বেশি ছিল এবং গঠনগতভাবে তার মুখ ছিল প্রশস্ত ও শক্তিশালী। হীরানন্দের বয়স ছিল তখন মাত্র একুশ বছর। তার ছিল চওড়া কপাল। মুখে সবসময় একটা বিজয়ী হাসি লেগে থাকত। হীরানন্দ বাংলা বলতেন। তার ছোট ভাই মতিরাম, যাকে কলকাতায় স্কুলে পাঠানো হয়েছিল, খুব সাবলীলভাবে বাংলা বলতেন। কলকাতায় এখন অনেক সিন্ধি ব্যবসায়ী ও ডিলার রয়েছে।

সাংবাদিকতা ও অন্যান্য কাজ

দয়ারাম গিদুমাল করাচিতে বান্ডার রোডের কাছে গারিখাতা নামে একটি কোয়ার্টারে একটি বাড়ি কিনেছিলেন। এটি শহরের বাইরে একটি স্বাস্থ্যকর, পরিষ্কার এলাকা ছিল। হায়দরাবাদের যেসব আমিল জীবিকা অর্জনের জন্য করাচিতে থাকত তারা খুব কমই তাদের স্ত্রীদের সঙ্গে নিয়ে আসত। কারণ নারীদের ঘর ছেড়ে যাওয়া নিয়ে তাদের মধ্যে কুসংস্কার প্রচলিত ছিল।

সাংবাদিক হিসেবে আমাদের প্রথম উত্তেজনাপূর্ণ অভিজ্ঞতা ছিল একজন সামরিক কর্মকর্তার সফর। করাচির সেনানিবাস বা সদর সেকশনে বসবাসকারী কিছু মহিলার প্রতি বেলুচ সিপাহিদের অভদ্র আচরণের অভিযোগে আমরা কয়েকটি চিঠি প্রকাশ করেছিলাম। কয়েকদিন পরে লম্বা ও হিংস্র চেহারার একজন সামরিক অফিসার একটি লম্বা তলোয়ার সঙ্গে নিয়ে সম্পাদকীয় অফিসে উপস্থিত হলেন। এরপর কোনো ভূমিকা ছাড়াই সংবাদপত্রের একটি অনুলিপি আঁকলেন এবং চিঠির দিকে ইশারা করে কুরুচিপূর্ণভাবে জিজ্ঞাসা করলেন আমরা সেগুলো প্রকাশ করেছি কিনা। হীরানন্দ এবং আমি ছিলাম নির্বিকার। আমাদের যে প্রশ্নটি করা হয়েছিল তার শুধু একটি উত্তরই ছিল, যা আমি দিয়েছিলাম। অফিসারটি সম্ভবত রেজিমেন্টের অ্যাডজুট্যান্ট ছিলেন। তিনি নির্লজ্জের মতো ঘোষণা করেছিলেন যে যদি অভিযোগ প্রত্যাহার করা না হয় এবং ক্ষমা চাওয়া না হয়, তাহলে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। হীরানন্দ সুন্দরভাবে উত্তর দিলেন যে আমরা পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত। আমি পরামর্শ দিয়েছিলাম যে যদি রেজিমেন্টের একজন কর্মকর্তার দ্বারা এর প্রতিবাদলিপি পাঠানো হয় তবে আমরা তা প্রকাশ করব। কিন্তু আমরা যা প্রকাশ করেছি তার বিরোধিতা করতে বা দুঃখ প্রকাশ করতে পারব না। এতে সেই বীর পুরুষ আমাদের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকালো এবং তারপর তার খাকি পোশাক ও মেঝে ছুঁই ছুঁই তলোয়ার নিয়ে চলে গেল। এটা ছিল নিতান্তই ভাঁওতাবাজি। কারণ আমরা এই বিষয়ে পরে আর কিছুই শুনিনি।

আমি যে সবসময় সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম তা নয়। বাড়িতে আমি একটা বাংলা বই নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। এই সময়ে কলকাতায় বালক নামে একটি বাংলা মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। সম্পাদক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাগ্নে। কবি নিজেও এর একজন প্রধান লেখক ছিলেন এবং তিনি আমাকে লেখার জন্য করাচিতে চিঠি লিখেছিলেন। আমি কয়েকটি স্কেচ এবং দুটি ছোটগল্প পাঠিয়েছিলাম। এই গল্পগুলো পরে ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।