তিনি আমাদেরই লোক। অমিয়ভূষণের পৈতৃক আবাস ছিল পূর্ববঙ্গে, পদ্মার কোলঘেঁষে পরিত্যক্ত নীল কুঠির হাভেলি। রেল শহর ঈশ্বরদীর পাকুড়িয়া গ্রাম। সামন্ত শাসনের অবসানের কিছু আগে পূর্ববঙ্গ ছেড়ে গোটা পরিবার কুচবিহারে থিতু হলেও তিনি উত্তরবঙ্গের কথাকার। গড় শ্রীখণ্ড থেকে তাসিলা রেঞ্জ, পাকশীর পদ্মা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা—এ বিস্তৃত জনপদের বিস্ময়কর লেখক। গড় শ্রীখণ্ডের পটভূমি পূর্ববঙ্গে, যেখানে বাঙাল নদী বন্ধনে পড়েছে লোক ভাষায় বলে বিরিজ। এ ঔপনিবেশিক স্থাপত্য আর তার নিকট দিঘা স্টেশন থেকে যে রাস্তা ধুলোয় উড়তে উড়তে চিকনন্দি সানিকদিয়ার চলে গেছে, স্যান্নাল মশাইদের বাড়ি। গড় শ্রীখণ্ডের এ জনপদেই লেখকের পূর্ব বাস।

আমৃত্যু ছোট কাগজের এ লেখক জীবদ্দশায় প্রকাশের চেয়ে অপ্রকাশিত থেকেছেন ঢের। পাঠকের ভাগ্য ভালো, মৃত্যুর পর তার রচনা সমগ্র প্রকাশিত হয়েছে। উত্তর উত্তর সাহিত্যের রসিক পাঠক ও গবেষকরা তাঁকে নিয়ে চর্চারত। অমিয়ভূষণ সাহিত্যের বদমায়েশির শিকার হলেও শিল্পী হিসেবে তার ব্যক্তিগত রুচি উচ্চস্তরের। আর যা-ই হোক, তিনি সাহিত্যের এন্টারটেইনার নন। বিস্ময়কর শিল্পস্রষ্টা। দুই বাংলার তথাকথিত সাহিত্য রাজধানীর না হয়েও অমিয়ভূষণ বাংলা সাহিত্যের আলাদা আলোকবর্তিকা।

গত বছর লেখকের জন্মশতবার্ষিকী পালিত হয়েছে। ওই বাংলায় ছোট ও বড় কাগজে কিছু কিছু আলোচিত হয়েছে, ‘কবিতীর্থ’ ও ‘এবং মুশায়েরা ’ বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করেছে। খুবই লজ্জার, এ বাংলায় সবাই একেবারেই নীরব। কিঞ্চিৎ এ দায় থেকে অমিয়ভূষণকে একজন পাঠকের ভাবে স্মরণ করছি। তারই রচিত মধু-সার নৌকায় চড়ে।

ক্ষীণকায় মধু সাধু খাঁ বহুবার পাঠের পরও পুনঃ পাঠের ইচ্ছা থাকে। কেন? মধু জলের দেশে জলে ভাসা লোক। বঙ্গ সাহিত্যের আরেক লোক নায়ক মনসামঙ্গলের চাঁদের মতো মধুও বেনে। শুরুতে মধু পাঠে চাঁদের কথা মনে পড়ে, পদবিতে মিল হলেও কর্মে ফারাক বিস্তর। মধ্যযুগের এ বেনে কেবল বাণিজ্য করে না, দেশ দেখে, দেখায়ও। ‘বাপের কালেই সূত্রপাত। এক অলিখিত অপরিণামদর্শী ব্যবসা। লাভ-লোকসানের হিসাব কারা যায় না, কাল-অকাল নেই, যদি প্রতিভা থাকে বুঝতে পারবে বেনেতি ব্যবসার মধ্যে কোথায় সে ব্যবসা ঢুকে পড়ে। তা ভালোই বলো আর মন্দ। তোপের সঙ্গে লাগোয়া হলে কী করা যায়? এ নিয়তি মধুর পিতার। খুড়োর হয়েছে বিক্ষুব্ধ ঝড়ো বাতাসে জলের সমাধি। তাই পুনরায় নদীর জলের ওপর অন্ধকার এলে সৃষ্টির যিনি কর্তা, তার কাছে মধুর প্রার্থনা এই—হে প্রাণ নেতা আবার প্রাণ দিহ, আবার চক্ষু দিহ, আবার দেখিবা দিহ, আবার। সাত পুরুষের বেনে মধুর অভিজ্ঞতা এমন, এখানে পুরুষ জীয়ে না। ‘জল, তরবার, তীব্র দুর্মদরতি নারীর মতো পুরুষের দেহের আয়ুর ভাগীদার হয়।’ পিতামহ গেছে চল্লিশে, বাবা দীর্ঘায়ু পেতে গিয়েও সাতচল্লিশে, খুড়ো মাত্র পঁচিশে, আর মধুর এখন সাঁইত্রিশ। হয়তো আন্য দেশে পুরুষ দীর্ঘস্থায়ী হয়, কিন্তু মধুর মৃত্যুর প্রার্থনায় আবার এ দেশেই জন্মাতে চায়। মধুকে লেখক হারামজাদা বলে পরিচয় করুক, তার বেনেতি কারবারে দোষ দেখুক, পরিশেষে রসিক পাঠকের কাছে মধু অতি পছন্দের। মধু-সা পাঠের আনন্দ এ মধুর বজরায় অনায়াসে উঠে যাওয়া যায়। জীবন ও নদীর ভাবনার দোলাচালে, ব্যক্তিকে জন্ম-মৃত্যুর বৃত্তে চিনে নেয়া যায়। মধুর নৌকায় মধ্যযুগের উত্তরের নদী-উপনদী বিহার, শিকার, আহার, যুদ্ধ, ঝড়, সাউকারি এমতো দর্শন পাঠকের কাছে চরম বিস্ময়।

 মধু-সাকে লেখক যেভাবে পরিচয় করান, তার অধিক পাঠককেই উপন্যাসে মধুকে আবিষ্কার করতে হয়। চিকন ঠাণ্ডা কালো রঙ, টিকালো নাক, টানা চোখ, বলে চক্ষু; সে চোখের প্রান্তগুলো লাল; দাঁতগুলো সুগঠিত, কিন্তু পান রসে লাল, চলেও যেন সাক্ষাৎ কালী মায়ের পুতি। টিকালো নাকের ওপর চুলের মতো সূক্ষ্ম রসকলি। গায়ে মোটা তসরের মেরজাই, অর্থাৎ কনুই পর্যন্ত হাতা, বোতামের বদলে বগলের নিচে ডোরে বাঁধা ছোট ঝুলের পাঞ্জাবি, পরনে দুই আঙুল চওড়া পাড়, খাটো কিন্তু সূক্ষ্ম ধুতি। পায়ে চামড়ার কটকি। মধুর নিজের নেশা মদ ও পান, সম্প্রতি বলাই তাকে ট্যাবাকু ধরিয়েছে। প্রথমে কটু গন্ধ পেলেও মধুর উদ্ভাবিত চন্দনের পাতলা শাঁস মেশানোয় এখন বেশ লাগে। আর এ কাজে বদর দক্ষ। তাও মধুর সেখানো, তার মাথা সবসময়ই খেলে। মধু-সার খুড়ো চরস টানতেন, কিন্তু চুয়ায় ভিজিয়ে সুগন্ধি করে। আর বিবি সাহেব ক্ষিরে জ্বাল দেয়া ভাঙ, গুলাবের গন্ধে ভুর-ভুর। মধু বললে, চন্দন কুচি কিছু মেশাও বদর। বদর মধু-সার কেনা খোজা ক্রীতদাসী, বজরায় বেটা ছেলের রাজ্যে যেন স্ত্রীলোকের কমনীয়তা, মথুরায় কিনেছিল। ঠোঁট উল্টানো, ভুশকালো সেই খোজাদের থেকে বদরের খনেক তফাত। সফেদার মতো গায়ের রঙ, টানা চোখ, হালকা ফুরফুরে ঠোঁট। কেবল নাকটা যা বদখৎ উঁচু আর তাতে নাকি বোঝা যায় ওর রক্তে ইরানি ছায়া আছে। মাস দুয়েক আগে এক রাতে মধু বদরকে লাথি মেরেছিল। বদর গা টিপছিল আর ঠিক তখন মধুর অনুভব করেছিল। বিছানায় স্ত্রীলোক এলে যেমতো অনুভব হয়। সমস্ত শরীরের চিন্তা আর রক্ত তার দিকে ছুটতে থাকে। তখন টাঁশ-ধরা মনে ঝাড়ার মতো লাথি ছুঁড়েছিল মধু। সে বদরকেও পরে কামতায় বেঁচেছিল। মধু-সাতিশয় হারামজাদা!&dquote;&dquote;

 মধু-সার বাস পূর্বাস্থলী, জাতে কায়েৎ। পিতার তিন পক্ষ, তৃতীয় পক্ষ বাবার চিতার সহমরণে সতী হয়েছিলেন। মধু দ্বিতীয় পক্ষের একমাত্র বেটা ছেলে। মধুরও দুই পক্ষ, দ্বিতীয়কে ঘরে এনেছিল আরেকটি পুত্রের আশায়, সে পক্ষ তিন সাল বাজা হয়। আর আছে এক বিবিসাহেব। কে এই বিবিসাহেব? নাচওয়ালী, বাঈ, বাঈজি, রাঁঢ়, সখের ক্রীতদাসী! তাও খুড়োর মৃত্যুর পর তার হয়েছে, মধু ডাঙায় এলে বছরে দুবার বিবিসাহেবের সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমায়। আর ডিঙায় থাকলে নদীর তেমন নীল জলে বিবিসাহেবের মুখটি দেখতে পায়। পিতার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারবলে নৌকাটি লাভ করে, সেটাই বেনের বজরা, ১০ সাল হয় মধুর বাণিজ্য। যিশুর পনেরোশ ছিয়াশি সালে (১৫৮৬ খ্রি.) তাম্রলিপ্ত থেকে মুর্শিদাবাদ হয়ে অসমে মধুর বজরা চলেছে। ভাগীরথী, ভৈরব, পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা প্রধান নদ-নদীসহ ধরলা, শিঙ্গামারী, মানসাই, চেকাখাতা নানা উপনদী ও খালের উজান ও ভাটায় তার নৌকা বয়ে চলে। পূর্বস্থলী থেকে কামতা এরপর উত্তর থেকে দক্ষিণে। আর এ কাজে তার সঙ্গে রয়েছে তার বাপের আমলের গন্না মাঝি। ১২ দাড়ের মল্লাদের খাওয়া, বিশ্রাম ও পরিচালনা করে। নৌকা কোথা থেকে কোথায় যাবে, কোথায় থামবে, তা মধু দেখে। দক্ষিণ থেকে চুয়া চন্দন, এলাচ-লবঙ্গ, শান্তিপুরী সখের চুড়ি, উত্তর থেকে নিয়ে যায় কস্তরি, আর পোস্তদানা, যষ্টিমধু, এন্ডি আর ভোটকম্বল, কখনো সন্তরা আর আমলকী। এবার বকুল আতর এনেছে। কখনো ভোট মেয়েদের কেনাবেচা আর স্পাইগিরিও করে।

 এ তো গেল মধুর বাণিজ্যের দিক। অন্যদিকে মধু-সা অন্যূন চারটে ভাষায় কথা বলে, নিজ ভাষা রাঢ়ী ছাড়াও সংস্কৃত, গৌড়ের ভাঙা ফারসি, হার্মাদি-মগাই। ইদানীং পঞ্চমের চর্চা চলছে, যার নাম কৌতুক মিশিয়ে বলে বাংলিশ। তাও আবার কি ইতিহাসের এক ইংরেজ পর্যটক রালফ ফিচ আট মাস ধরে মধুর নৌকায়। মধু-সা তাকে বলাই বলে ডাকে, আর সে কানাই। তবে লেখক ইতিহাস না বলে গল্প বলার দিকে ঝুঁকেছেন। মধু খুব অবাক হয়, এই বলাই নাকি সাত সমুদ্র পার হয়ে এসেছে দেশ দেখতে। দুজনই আলাপ করতে ভালোবাসে, নৌকার পাটাতনে কখনো সখনো বসে পানাহারের সঙ্গে ভাষা, ধর্ম, সংস্কৃতি, যুদ্ধ, জন্ম, আদিপাপ, মৃত্যু নিয়ে কিংবা নিছক পুরাণের গল্প বা রাজাদের গল্প বলে আরাম বোধ করে। কারণ মধুর নিজেরও অনুভব হয়, গল্প কি লেখকের? ছাই, গল্প যে বলে তারই সুখ। বলাইয়ের কাছে মধু-সা যেমন গল্প বলে সুখ পায়, বলাইও তেমনি। সেও তেমন অবাক হয় মধুকে দেখে, তার কাজকর্ম। আবার ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষ বলে অনেক বিষয়েই দুজনের মতের অমিল হলেও মধু-সা আর বলাই বন্ধু হয়ে ওঠে। চেকাখাতার হাটে বলাই নেমে গেলে বন্ধুর জন্য মনে ব্যথা পায়। অবশ্য এটা পর্যটকদের ধারাই বোধহয় যে তারা সহজে অক্লেশে যে দলটার সঙ্গে দীর্ঘ সময় চলছিল, তা থেকে নিজেকে পৃথক করে নিতে পারে।

 লেখক এ স্বল্পায়তনের উপন্যাস কোনো পরিচ্ছেদে ভাগ করেননি। নদীর স্রোত যেমত প্রবহমান, মধুর নৌকাও তেমনি। থাকা-খাওয়া কিংবা বিশ্রামের জন্য কখনো কখনো বিরতি দিলেও কোনো না কোনো কাজ চলতেই থাকে।

 কী আছে মধু সাধু খাঁ উপন্যাসে? সংক্ষেপে বলা যায়, চরিত্রের পরিচয়, ঝড়ের বর্ণনা, কামান দাগানো, সতীদাহ, হরিণী শিকার, রান্না আহার, রাজাকে ভেট আর খবর প্রদান, পর্যটকের সঙ্গে এলোমেলো আলাপ, মন্দিরে নৈবেদ্যর বাসনা, বন্ধু বিয়োগ, আদিপাপ, সাউকারি, মৃত্যু চিন্তা। পরিশেষে এ পাপ এ মৃত্যু চিন্তাই মধু-সার বোধে প্রবল হয়ে ওঠে। হয়তো এ ব্যবসা ভালো নয়। সাউকার নয়। পাপ বলবে? তা মধু, লোক একে পাপ বলে বোধহয়। একবার এক পক্ষ, অন্যবার অন্য পক্ষ, আর দুই পক্ষের মধ্যে নিজের স্বার্থ দেখা। পাপ? মানুষ যেমন বাঁচে আর যেমন বাঁচা উচিত, দুইয়ে অনেক খানি তফাত। আসলে জাত মেরেছে ফিরিঙ্গি পাপ-পুণ্যের কথা তুলে। মধু নিজেও তেমনি পাপের চিহ্ন হাতে বহন করে চলেছে। কী হতো যদি খুড়তো ভাইয়ের মাথায় শির চালিয়ে না দিত। অন্ধকারে নৌকার পাটাতনে জলের আঘাত যেমন ভয়, ভয় তেমনি আকাশেও, যখন লালে সোনালি আকাশে কালো কালো কুমিরের মতো মেঘ তেড়ে আসে, আবার একই জায়গায় তিনজন রাজা হয়, আর যুদ্ধের ভেতর সাউকারি নৌকা পড়ে যায়, শিকারি ঘাইয়ের ডাকে ছিটে আসা হরিণের মতো কোনো নদীর চরে অর্ধদগ্ধ হাড়-মাংসসহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে। মধুর বজরায় পিতার আমলের কামান দুটো আর কতক্ষণ রক্ষা করবে?

 এ মধু আর নদী এক। সে নদী জীবন স্রোতের, কোথাও ভাঙন, কোথাও চর, চরে বনবনানী। নদী দেখে আসা যায় বটে, ব্যাখ্যা করা যায় না। জীবন স্রোতেও এমন অনুষঙ্গ ভাবনার চোরাবালিতে খাবি খায়, তবুও জীবনই ধর্ম। নদীর মতোই বয়ে বয়ে, জন্ম-মৃত্যুর আদিম খেলায়।

 ফিরিঙ্গির দেশ হয়তো ভালো সাউকারির পক্ষে। রাঢ়ি হলেও রাজা একজনই। কিন্তু কী করা যাবে, এ দেশেই যদি সাউকারি করতে হয় তাকে। অন্য দেশ হয়তো অন্য রকম। কিন্তু কী করবে পুরুষে? কারণ কি ভালোই এ নদী? এ নদী আর সে নদীতে কেমন নেশা হয় মধুর? তাই মধুর ইচ্ছা ছেলের বেটা কিংবা তস্য বেটা হয়ে যেন এ দেশেতেই জন্মাই, যদি তেমন কিছু ঘটে।

 ‘কারণ যেমতো অন্ধকার হয়’

 এ অন্ধকার চির সত্য মৃত্যু নয় কি?