গ্রামটিকে শনাক্ত করতে অবশেষে ৩০৫ বছর লেগে গেল!

এখন আর সন্দেহ নেই যে, বাঙ্গালা ১১২০ সালে রাজা প্রেমনারায়ণ রায় চৌধুরী নাগরী ভাষায় যে গ্রামটির কথা লিখেছিলেন এবং ওই লেখার ১৬৪ বছর পর ঈসায়ী ১৮৭৭ সালের জানুয়ারিতে মিস্টার ব্লেকের ডায়েরিতে বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায় যে আশ্চর্য জনপদের, মূলত দুটোই এক গ্রাম। ৩০৫ বছর পর আমরা নিশ্চিত হলাম, গ্রামটির নাম অন্ধের গাঁও। রূপান্তরিত হওয়ার ফলে তা এখন আন্ধারগাঁও। নাকি অন্ধগাঁও? এই গ্রাম ও কাহিনীর প্রথম উদ্ভাবক রাজা প্রেমনারায়ণ রায় চৌধুরী, যিনি পরবর্তী সময়ে রাজা ইসলাম খাঁ নাম ধারণ করেন এবং সংস্কৃত ও নাগরী ভাষার বদলে বুহিতে চড়ে নদী পার হওয়ার মতো ফারসি ভাষার আশ্রয়ে চলে যান।

মিস্টার ব্লেইক ছিলেন ভয়াবহ ফারসি-বিদ্বেষী মানুষ। দাপ্তরিক ভাষা পাল্টে ইংরেজি করার পক্ষে সোচ্চার আমলাদের শীর্ষস্থানেই ছিল তার অবস্থান। তিনি প্রত্যন্ত সুনামগঞ্জের প্রথম এসডিও বা মহকুমা প্রশাসক। অন্ধের গাঁও বা আন্ধারগাঁও নাম জেনে থাকলে জমিদার রাজা ইসলাম খাঁর নামও তার জানার কথা। না জানলেও ক্ষতি নেই, কিন্তু কাহিনীটি নাগরী বা ফারসি ভাষা থেকে আহরিত হওয়ার সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি না হওয়ার বিষয়টিকেও উড়িয়ে দেয়া যায় না। হতেও পারে, কোনো গাঁওবাসীর কাছে শুনে লেখাটা ঝেড়ে নামিয়ে দিয়েছেন ব্লেইক, তার অকপট কথনের ডায়রিতে। তৃতীয় বিকল্পকে সত্য মেনেই আমরা সামনে এগোতে থাকলে দেখতে পাই, বিস্ময়ের অসংখ্য দরোজা। সেই দরোজা-দূরবর্তী স্থান বিলাতের ব্রমলি; দরোজার পর দরোজা। মিস্টার ব্লেইক ও বিশ্বখ্যাত লেখক এইচ জি ওয়েলসের জন্মস্থান বিলাতের একই স্থানে। ২০ বছর পর মিস্টার ব্লেইক যখন স্বদেশে ফিরে যান, তখন ওয়েলসের বয়স মাত্র ৩১ বছর এবং এরই মধ্যে তার সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘টাইম মেশিন’ প্রকাশনার দুই বছর পেরিয়ে গেছে।

জনপ্রিয়তার সে ঢেউ মিস্টার ব্লেইককেও স্পর্শ করেছিল অনুমান করি। তা না হলে এক সন্ধ্যায় তাকে ওয়েলসের বাড়িতে হাজির হতে দেখব কেন? বেশ কুণ্ঠিত ছিল তার পদক্ষেপ।

কল্পনার সেই সন্ধ্যাটিকে সাজিয়ে নিতে আমাদের তাই মোটেও অসুবিধা হয় না। ...অন্ধকার ঝাঁপিয়ে পড়েছিল গোটা ব্রমলিতে, সঙ্গে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। প্রাথমিক পরিচয় পর্ব শেষ হওয়ার পর এইচ জি ওয়েলস তাকে কফি পানের আমন্ত্রণ জানালে ব্লেইক মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বললেন, আমি আসলে আপনার কিছু মূল্যবান সময় হরণ করতেই এসেছি।

ওয়েলস মৃদু হাসলেন, কোনো সমস্যা নেই। আজ রাতটা আমি পুরোপুরি অবসর। হাতে কোনো লেখা নেই। ...শুধু ভাবছি।

ব্লেইক বললেন, আমি দীর্ঘদিন ভারতবর্ষে ছিলাম। কয়েক বছর আমাকে কাটাতে হয়েছে সুনামগঞ্জ নামক একটি প্রত্যন্ত মহকুমায়...।

তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিলেন ৩১ বছরের যুবা ওয়েলস, জাস্ট অ্যা মিনিট প্লিজ। ক্যান ইউ টেল দ্য স্পেলিং অব সুনামগঞ্জ?

ইংরেজিতে দু-দুবার বানানটা বলে মিস্টার ব্লেইক অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন, ‘আমার বয়স বর্তমানে ৭৭ হতে মাত্র ১৪ দিন বাকি। আসছে ২১ সেপ্টেম্বর আমার মৃত্যু হবে।’

চমকে উঠলেন ওয়েলস। তার ঠোঁট ফসকে বেরিয়ে গেল, মাই গড! ২১ সেপ্টেম্বর আমার জন্মদিন। ...কিন্তু অনির্ধারিত মৃত্যু তারিখ নিয়ে আপনি এত নিশ্চিত হলেন কীভাবে?

সেজন্য আমি ভারতবর্ষের কাছে ঋণী। ওখানকার জ্যোতিষীরা যে তারিখ ও ক্ষণ আগাম বলে দেয়, তার হেরফের সাধারণত হয় না। ওদেরই কথামতো আমি তাই ৭ তারিখকে বেছে নিয়েছি। ওরা বলেছিল, এই তারিখে আমি যেন কোনো বিখ্যাত লোকের সঙ্গে দেখা করি এবং সব ঘটনা খুলে বলি। সেই ব্যক্তির জবানি বা কলমে যদি অবিশ্বাস্য ঘটনাটি মানুষ শোনে বা পড়ে, তবে সবাই আমলে নেবে। ...আমি বোধহয় সঠিক লোকের কাছেই এসেছি।

ওয়েলস হেসে ফেললেন, দেখুন, ড্রিম ইজ মোর পাওয়ারফুল দ্যান নলেজ। আমাদের কিছু পূর্বসূরি স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেই আমরা আবিষ্কার করতে পারছি। ...তাদের তুলনায় আমি কিছুই না।

মিস্টার ব্লেইক গম্ভীর গলায় বললেন, এটা আপনার বিনয় মিস্টার ওয়েলস। লোকে এখনই আপনাকে ‘দ্য ফাদার অব ফিউচার’ বলতে শুরু করেছে। ...যাক গে, আমি আর বাগাড়ম্বরে যাব না, মূল ঘটনায় আসি। ফর গড সেইক, আপনি মনোযোগ দিয়ে শুনবেন। মন্তব্য চাইব কথা শেষ হওয়ার পরে।

এইচ জি ওয়েলস নড়েচড়ে বসলেন, অফকোর্স। আপনি বলুন।

মিস্টার ব্লেইক তার কাহিনী বলতে শুরু করলেন:

গ্রামটার কথা আমি প্রথম যখন শুনি, বিশ্বাস হয়নি। একটা গ্রামের সবাই অন্ধ হয় কী করে? তখন আমাকে জানানো হয়, কোনো এক সময়ে ওই গ্রামে মহামারী আকারে গুটিবসন্ত দেখা দিয়েছিল। এ রোগে আক্রান্ত শতাধিক লোকের মৃত্যু ঘটে। বেঁচেবর্তে যারা ছিল, তাদেরকে অন্ধত্ব বরণ করতে হয়। ...কিন্তু আমি যখন গ্রামটিতে যাই, ওই ঘটনার প্রায় ১৬৪ বছর পেরিয়ে গেছে। এরই মধ্যে কয়েকটি জেনারেশনের আগমন ও বিয়োজন ঘটার কথা। গুটিবসন্তের প্রাদুর্ভাবও আর হয়নি। অথচ আমি সবাইকে অন্ধ দেখতে পাই। ...তাদেরই একজন পঞ্চাশের মতো বয়স, নাম খোমার। সে হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করে, আপনার জানাশোনা কোনো আয়না ব্যবসায়ী আছে কিনা। আমি চমকে উঠি। এর দুটি কারণ। প্রথমত, একজন অন্ধ লোকের কাছে আয়নার প্রয়োজনীয়তা নেই। দ্বিতীয়ত, মাত্র ৪২ বছর আগে ১৮৩৫ সালে আয়না আবিষ্কৃত হয়, যা ধনাঢ্য পরিবার ছাড়া ভারতবর্ষে তখনো ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়নি। এ অবস্থায় একটি অজপাড়াগাঁয়ে আয়নার কথা শুনে আমার ভিমড়ি খাওয়ার দশা। ...মনে হয়, তা ছিল অনেকাংশেই যৌক্তিক।

এইচ জি ওয়েলস আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। বললেন, আমাকে একটু ফ্লোর দিতে হবে মিস্টার ব্লেইক।

হ্যাঁ, বলুন।

প্রথমত, আয়না নিয়ে আপনার বক্তব্যের কিছু সংশোধন প্রয়োজন। খ্রিস্টপূর্ব ছয় হাজার বছর আগে মিসরে আয়না ব্যবহার করার কথা আমরা ইতিহাসে প্রথম দেখতে পাই। নানা রকমের আয়না তখন ব্যবহূত হতো। পাথর, সোনা ও রুপার আয়না অভিজাত মহলে ভীষণ আদৃত ছিল। দ্বিতীয়ত ...।

মিস্টার ব্লেইক বলে উঠলেন, এসব তথ্য আমার জানা মিস্টার ওয়েলস। কিন্তু মূল বিষয়টা তথ্য নিয়ে নয়। একজন অন্ধ মানুষের আয়না সম্পর্কিত কৌতূহল নিয়ে, যে আয়না বেপারির খোঁজ করছিল।

দ্যান, আপনি কী বললেন?

হেসে ফেললেন মিস্টার ব্লেইক, আমি তক্ষুনি ব্যাগ খুলে একটা ছোট্ট আয়না তার হাতে ধরিয়ে দিলাম। ...আশ্চর্য, সে আয়নাটা চোখের সামনে নিয়ে অচেনা চেহারার বর্ণনা দিতে লাগল।

স্ট্রেঞ্জ!

আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কেননা সে যে বর্ণনা দিচ্ছিল, তা মোটেও তার চেহারার নয়, পুরোপুরি আমার। এমনকি, আমার কালো রঙের হ্যাটও সেই বর্ণনার বাইরে থাকল না। ...আমার ভীতির আরেকটা কারণ, ওই লোকটা, যার নাম খোমার, সে আচমকা বলে উঠল, তাহলে ২১ তারিখেই আপনি চলে যাচ্ছেন?

ওয়েলসের শরীর হঠাৎ শীতার্ত বাতাসের ঝাপটায় যেন কেঁপে উঠল। ফিসফিসিয়ে বললেন, মাই গড!

মিস্টার ব্লেইক জোর করে হাসার চেষ্টা করলেন, আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, খোমারের আরো তিনটি বাংলা শব্দ আছে, তা হলো আবেশ, ঘোর ও আচ্ছন্নতা। ইংরেজিতে ‘হ্যাংওভার’ শব্দ দিয়ে এগুলোকে কাভার করা যায় না। কিছু লোক পরে আমাকে জানাল, সারাক্ষণই সে একটা ঘোরের মধ্যে থাকে, মনে হয় নেশা করেছে। ...কিন্তু শুক্রবার এলে তার নেশার যেন ধরন পাল্টে যায়। সকাল থেকে শুরু হয় সূর্য উপাসনা।

এটা তো ভারতবর্ষের অনেক পুরনো ধর্মীয় আচার।

মাথা ঝাঁকালেন ব্লেইক, হ্যাঁ। তবে সবার বেলায় বিষয়টি প্রযোজ্য নয়। যেহেতু সে সনাতন ধর্মের মানুষ নয়, মুসলমান, সে কারণে তার ওপর সবাই ছিল প্রচণ্ড বিরক্ত। গ্রামের লোকজন সেদিন জুমার নামাজ পড়তে মসজিদে যায়। ...আর খোমার সূর্যের দিকে তাকিয়ে কাটাকুটি খেলে হাত নাড়িয়ে। কখনো কখনো অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। মাথায় ও শরীরে পানি ঢালার অনেকক্ষণ পর তার আচ্ছন্নতা কাটে এবং সে ফিসফিসিয়ে দু-একটি কথা বলে। সব বোঝা যায় না। তবে এইটুকু সবাই স্পষ্ট অনুভব করে, খোমার স্বাভাবিক কোনো মানুষ নয়। তাই দোররা মারার শাস্তি থেকে সে রেহাই পেয়ে যায়। ...আমি সবকিছু অবগত হওয়ার পর সভয়ে তাকে জিজ্ঞেস করি, তোমার তো চোখের মণি নেই, সূর্যের আলো কোনো ক্ষতি করারও কথা নয়, তাহলে অজ্ঞান হয়ে যাও কেন? আর আয়নায় কী করে অন্যের চেহারা দেখতে পাও?

এইচ জি ওয়েলস কিছুটা মুখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কী উত্তর দিল খোমার?

মিস্টার ব্লেইকের ফ্যাকাসে হাসিটি আরো যেন গুটিয়ে গেল; ম্লান মুখে তিনি বললেন, আমার প্রশ্ন শুনে খোমার হো হো হাসিতে ফেটে পড়ল। বলল, আমি সূর্যের কাছ থেকে শক্তি পাই। এই শক্তিবলে আমি অন্যের ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারি। অন্যের চেহারাও দেখতে পাই। কিন্তু সেই শক্তি শরীরে পুরোপুরি ধারণ করতে পারি না, তাই অজ্ঞান হয়ে পড়ি। যেদিন শরীর সম্পূর্ণ সামর্থ্য অর্জন করবে, সেদিন আমি নিজেকে দেখতে পাব। সেজন্য মাসে চারদিন সূর্য উপাসনা করি। ৪০ দিন পর নিয়মিত হব। নিয়ম করে প্রতিদিন চলবে আলো-ছায়ার খেলা।

‘লাইট অ্যান্ড শ্যাডো।’ বিড়বিড়িয়ে উঠলেন ওয়েলস, যে লাইটই দেখেনি, সে ছায়া দেখবে কী করে? তবে পর্যাপ্ত পরিমাণের ভিটামিন ডির কারণে রৌদ্রতাপও এক ধরনের শক্তি। শুনেছি, গ্রীষ্মকালে অনেক দেশে প্রচণ্ড রোদ ও গরমে হিটস্ট্রোক পর্যন্ত হয়। সম্ভবত খোমার সূর্য উপাসনার সময় তাতে আক্রান্ত হচ্ছিল।

মিস্টার ব্লেইক বললেন, আমারও তাই ধারণা। কিন্তু স্বল্পসংখ্যক লোক এরই মধ্যে হিটস্ট্রোককে জজবা বলতে শুরু করেছে। এরা আবার ভেতরে ভেতরে খোমারের প্রচণ্ড ভক্ত। তাকে সবসময় সালাম-আদাব দেয়।

হোয়াটস দ্য মিনিং অব জজবা?

ইটস্ ওয়ান কাইন্ড অব রিলিজিয়াস ওয়ার্ড। ঈশ্বরের ধ্যানে আর জিকিরে তিনি কিংবা তার শক্তি এসে যখন মানুষের ওপর ভর করে, তখন নাকি কোনো হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। এ অবস্থাকে বলে জজবা।

এই জিকির বা ধ্যান কি রোদে বসে করতে হয়? সূর্যের দিকে তাকিয়ে...?

মিস্টার ব্লেইক বললেন, নট নেসেসারি। জিকির যেকোনো সময় করা যায়, তবে সাধারণ মানুষ নামাজ শেষে করে। আর খোমার করে সূর্যের সঙ্গে কাটাকুটি খেলার সময়। ...এর কি কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে মিস্টার ওয়েলস...? মানে এসব থেকে কি কোনো অতীন্দ্রিয় শক্তি লাভ সম্ভব?

এইচ জি ওয়েলস গম্ভীর গলায় বললেন, আমি একটু চিন্তাভাবনা করে আপনাকে কথাটার উত্তর দিব। ...তবে কিছু মনে করবেন না মিস্টার ব্লেইক, আপনার গল্পের অনেক জায়গায় ফাঁক আছে। অনুমতি দিলে অসঙ্গতিগুলো আমি তুলে ধরতে পারি।

মিস্টার ব্লেইক বারবার মাথা ঝাঁকাতে লাগলেন, অফকোর্স। আপনি বলুন।

টাইম মেশিনের লেখক ওয়েলসের ঠোঁটে তখন মৃদু হাসি, যারা অন্ধ, তারা কী করে খোমারের সব কার্যকলাপ দেখতে পায়? সে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলে তাকে উদ্ধার করে কে? কীভাবেই বা টের পায় কিংবা দেখতে পায় যে খোমারকে জজবায় পেয়েছে?

এই প্রশ্নগুলো আমার মনেও ছিল মিস্টার ওয়েলস। ওরা বলে, সূর্য ওদের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিয়েছে ঠিকই, কিন্তু ছায়া কেড়ে নিতে পারেনি। সেই শক্তিবলে ওরা অথির ও থির বস্তুর পার্থক্য বুঝতে পারে। ঘ্রাণ ও শব্দের মিশ্রণ সেই শক্তিকে ত্রিগুণ বলীয়ান করে তোলে। ওরা বলে, ছায়াশক্তি। যেন শেক্সপিয়ারের কোনো নাটকের সাইক্লোরামা, যেখানে ধরুন ছায়া পড়েছে বোবা ও অন্ধ মানুষের। ওরা হাঁটছে, কথা বলছে, মুদ্রাবিনিময় করছে, পণ্য নিয়ে বাড়ি ফিরছে, কারো কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। সবাই কুশলও বিনিময় করছে নাম ধরে ধরে। আদর করে বউকে ডাকছে মৌ, মানে হানি। সেখানেও কোনো ভুল হচ্ছে না।

লেখকের ঠোঁট বিড়বিড়িয়ে উঠল, স্ট্রেঞ্জ।

মিস্টার ব্লেইক বললেন, আমি কথার প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি মিস্টার ওয়েলস। এ গল্পটি আপনি লিখবেন, এ আমার একান্ত অনুরোধ। আরেকটি আবদার থাকবে আপনার কাছে। যদি অভয় দেন, তো বলি।

ওয়েলস হেসে ফেললেন, হ্যাঁ হ্যাঁ, একশ বার।

সুনামগঞ্জের সাবেক এসডিও আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন। কথা বলতে হাত চেপে ধরলেন লেখকের, ইংল্যান্ডের বহুল প্রচারিত দৈনিকে একটি সুপারিশ লিখবেন সরকারের উদ্দেশে। লিখবেন অনতিবিলম্বে ছোট ছোট আয়না যেন পাঠানো হয় ভারতবর্ষে। কম বিনিয়োগে অনেক লাভ হবে ব্রিটিশদের। ভারতবর্ষে আয়নার বিপুল চাহিদা। ...আর প্রথম প্রায়োরিটি যেন পায় আন্ধারগাঁও। আই মিন দ্য ভিলেজ অব ব্লাইন্ডস, আন্ডার সুনামগঞ্জ সাব-ডিভিশন।

ওয়েলস আরেক দফা হাসলেন, আপনার দ্বিতীয় আবদারটা রাখা মনে হয় না সম্ভব হবে। লোকে পাগল ভাববে আমাকে। অন্ধদের জন্য আয়না পাঠানোর প্রস্তাব দেয়া অস্বাভাবিক ব্যাপার নয় কি?

মিস্টার ব্লেকের চেহারা অকস্মাৎ ম্লান হয়ে গেল। ক্ষীণ গলায় বললেন, কিন্তু খোমার আমাকে বলেছিল, অন্ধগাঁওয়ে আয়না পাঠালে পিকুইলিয়ার অন্ধত্ব থেকে সবাই মুক্তি পেত।

অন্ধত্বের আবার ধরন আছে নাকি?

ইয়েস স্যার। তা তো আমার সামনেই প্রমাণ করল খোমার। আয়না নিয়ে হুবহু বর্ণনা দিল আমার, এমনকি কালো হ্যাটটা পর্যন্ত বাদ গেল না। আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, নিজের চেহারা সেই আয়নায় ওরা দেখতে পায় না, পায় অন্যের।

এ ব্যাপারটি কী শুধু খোমারের বেলায় প্রযোজ্য, না অন্যদেরও...।

লেখককে কথা শেষ করতে দিলেন না ব্লেইক। বললেন, আমি জানি এ প্রশ্নটা আপনি করবেন। ...আমি নিজের চোখেই দেখেছি, খোমারের আয়না সামনে ধরে অন্য একজন অন্ধ হুবহু খোমারের চেহারার বর্ণনা দিচ্ছে। তখন আমি বলেছিলাম যে, খোমার একদম ঠিক বর্ণনা।

এইচ জি ওয়েলস বললেন, হতে পারে ছায়াশক্তি বলেই লোকটা ওই কাজ করেছে। আয়না সেখানে একটা উসিলা মাত্র।

আমি আপনাকে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারব না ওয়েলস। আপনার নিশ্চয় মনে আছে, মহাকবি শেক্সপিয়ার তার এক নাটকের সংলাপে বলেছিলেন, ‘দেয়ার আর মেনি থিংস ইন হ্যাভেন অ্যান্ড আর্থ’। সব কিছুর ব্যাখ্যা দিতে হয় না স্যার।

মৃদু হাসলেন ওয়েলস, আপনি শেক্সপিয়ারের খুব ভক্ত বোঝা যাচ্ছে।

ইয়েস স্যার। অকপটে স্বীকার করলেন ব্লেইক, ছোটবেলায় পড়েছি তো স্যার, ভারতবর্ষে যাওয়ার অনেক আগে, ভোলা তাই সম্ভব হচ্ছে না। তার মতো বড় কবি বিশ্বে আর আসেনি।

এইচ জি ওয়েলস কোনো মন্তব্য করলেন না।

 

দুই.

এই ঘটনার কয়েক দিন পরে আমরা পত্রিকান্তরে একটি গল্প দেখতে পাই। গল্পটার পটভূমি আন্ধারগাঁও নয়, এক পার্বত্য অঞ্চলের। মানুষজন যেখানে হাতে গোনা যায়। ডানিয়েল নামে ২৫ বছরের এক যুবক সেই পার্বত্য এলাকার সাহসী মানুষ, যে বালকবেলা থেকে স্বপ্ন দেখেছে দুর্গম পাহাড়ের প্রাচীর ডিঙানোর। একই স্বপ্নে আক্রান্ত ছিল তার পিতা, পিতামহ ও প্রপিতামহ। তারা পরাভব মেনেছে দারিদ্র্য ও অটুট স্বপ্নের অভাবে। ডানিয়েল (কল্পিত নাম) একই পথের শিকার হতে চায় না। সেজন্য তার ধ্যান-জ্ঞান হয়ে উঠেছে ওই দুর্গম প্রাচীর পাড়ি দেয়া। যেকোনো মূল্যে সে জয়ী হতে চায়। পাহাড়ের চূড়াই হয়ে ওঠে তার লক্ষ্য। ইচ্ছার কাছে সব বাধাবিপত্তি পরাভূত হয় এবং ডানিয়েল সত্যি সত্যি একদিন সেই পাহাড়ের প্রাচীর ডিঙিয়ে নতুন দেশের দেখা পায়। অদ্ভুত সুন্দর একটি দেশ।

চোখ জুড়ানো ফুল, ফল আর ফসলে ভরা। বেশুমার পাখি ওড়াউড়ি করছিল। যেন গান জুড়ে দেয়া হয়েছে! চারপাশে সুরের লহরী। এ রকম অনাবিল অভ্যর্থনার মধ্যে পড়ে ডানিয়েল দিশেহারা হয়ে যায়। সেও উচ্চৈঃস্বরে গান জুড়ে দেয়। আর তখনই অভাবিত ঘটনাটি ঘটে।

চারপাশ থেকে পিলপিল করে হেঁটে আসা মানুষজনকে সে দেখতে পায়। দূর থেকে মনে হচ্ছিল সারিবদ্ধ পুতুলের মিছিল, যেন চাবি দেয়া সবাই। একই ছন্দ, একই লয়। একসঙ্গে সবার পায়ের ওঠানামা। সৈনিকদের মার্চপাস্ট বললেও খুব একটা ভুল বলা হয় না, কেবল অস্ত্র নেই কারো হাতে। একটু ভয়ই পেয়ে যায় ডানিয়েল। ওরা যদি তার ক্ষতি করে? লোকগুলো দৃষ্টিসীমার আরো কাছাকাছি হলে বিস্ময়ে অভিভূত যুবক গলা ফাটিয়ে চিত্কার করে উঠতে যাচ্ছিল, তাড়াতাড়ি মুখ চাপা দিয়ে কোনোমতে সামলায় নিজেকে। সারিবদ্ধ একটা মানুষেরও চোখের পাতা নেই। তার মানে কি ওরা অন্ধ?

অন্ধ হলে তাকে দেখছে কী করে!

চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা ডানিয়েল ভয়ে চোখ বুজে ফেলল। বিড়বিড়িয়ে বলল, আমি তোমাদের কোনো শত্রু নই। ক্ষতি করার কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে এখানে আসিনি। নিছক কৌতূহলে...।

বাধা দিয়ে সবচেয়ে বয়স্ক লোকটি বলে উঠল, তা আমরা তোমাকে দেখেই বুঝতে পেরেছি।

আশ্চর্য! আপনারা দেখতেও পান?

অবশ্যই। সেই বয়স্ক লোকটি উত্তর দিল, আমাদের সামনে সব একদম পরিষ্কার। তবে তোমার মতো বাপু এত কুিসত প্রাণী আর দেখিনি।

ডানিয়েল মনে মনে আহত হলো। নিজের দেহসৌষ্ঠব নিয়ে এতকাল সে বেশ অহংকারীই ছিল। অনেক মেয়ের সপ্রশংস চাউনি লাভ করেছে জীবনে, কেউ কখনো এ ধরনের কথা বলেনি। সে চুপ করে রইল।

বয়স্ক লোকটা এক গাল হেসে বলল, ভয়ে তুমি যখন চোখ বন্ধ করে থাকো, তখন বরং তোমাকে অনেক সুদর্শন লাগে। তোমার মতো সাধারণ মানুষ যারা আছে, শুনেছি পৃথিবীতে তাদের সংখ্যাই নাকি বেশি। এর মানে কি বুঝতে পারছ?

ডানিয়েল মাথা নাড়ল। না, সে বুঝতে পারছে না।

লোকটা তা-ও যেন দেখতে পেল স্পষ্ট। বলল, তার মানে পৃথিবীতে কুিসত মানুষের সংখ্যাই বেশি।

আপনারা কি কুিসত মানুষকে ঘৃণা করেন?

না, মানুষকে ঘৃণা করি না, তবে তাদের আদত-খাসিলত তো ঘৃণা করার মতোই। ওরা তাই নিকৃষ্ট। আর ওদের কারণে আমরা শ্রেষ্ঠ ও অহংকারী।

ডানিয়েল এবার চোখ দুটি খুলল। এখন আরো স্পষ্ট চারপাশ। সে দেখতে পেল সারিবদ্ধ মিছিলের ভেতরে মেয়েদের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। নানা বয়সের নারী। যারা অপেক্ষাকৃত তরুণী, গোলাপি গোলাপের মতো তাদের গায়ের রঙ। দীঘল চুল, ক্ষীণ কোমর, ভারী নিতম্ব, মানানসই পয়োধর, সব মিলিয়ে ঈশ্বরের সযত্নে বানানো এক-একজন মানবী, নাকি পরী? শুধু চোখের দিকে তাকালেই সব কল্পনা ফুত্কারে নিভে যায়। মানবী না, পরীও না, ওরা যেন মাটির ভাস্কর্য! ওরা অন্ধ।

বয়স্ক মানুষটা বলে উঠল, তুমি যখন এখানে এসেই পড়েছ, থাকো যতদিন খুশি। তবে না বলে পালানোর চেষ্টা করো না। একেবারে মাঠে মারা যাবে।

ডানিয়েল বলল, যদি ভালো লেগে যায় দেশটা, আর যদি বুঝতে পারি যে, বহির্জগতের মানুষের চেয়ে আপনারা সত্যি শ্রেষ্ঠ, তাহলে হয়তো আর কোনো দিন ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করব না।

হা হা হা। ভালো বলেছ। তবে তুমি নিশ্চিত থাকতে পারো যে, আমরা সত্যি শ্রেষ্ঠ। তোমরা দাবি করতে থাকো একটার পর একটা, করতেও পারো, কিন্তু ধোপে টিকবে না। কারণ তোমাদের দেশগুলোয় চুরি-ডাকাতি-খুন-রাহাজানি-ধর্ষণ-গুম লেগেই আছে, আমাদের দেশে এসব নেই। শব্দগুলোকে ডিকশনারি থেকে আমরা ঝেঁটিয়ে বিদায় করে দিয়েছি।

ডানিয়েল ফিসফিসিয়ে বলল, আপনারা তবু চক্ষুষ্মান নন। চোখ নেই আপনাদের। আমরা চক্ষুষ্মান।

বয়স্ক লোকটা হাসল, চোখের পাতা খুলতে পারলেই মানুষ চক্ষুষ্মান হয় না। পৃথিবীর সব শিশু চোখ বন্ধ অবস্থায় জন্ম নেয়। তোমরা নিশ্চয় তাকে কুকুর শাবক বলো না, বলো মানবশিশু। শুনেছি, ফরাসি দেশে যে শিশু চোখ খোলা অবস্থায় জন্ম নেয়, তাকে প্রতিভাবান ভাবা হয়। আদর করে ডাকা হয়, ভয়েন্ত। আর আমরা বলি, মানব গুণাবলি যে যত শীর্ষে নিতে পারবে, সে তত প্রতিভাবান। আমাদের দেশে প্রতিভাবান মানুষের সংখ্যাই বেশি। তোমাদের দেশে বিরল।

ডানিয়েল উত্তরে কিছুই বলতে পারল না। চোর-ডাকাতহীন দেশে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল সে মনে মনে।

 

তিন.

এ কাহিনী দীর্ঘ হতেই পারে, হয়েছিলও। বিশদ পড়তে চাইলে এইচ জি ওয়েলসের রচনাবলি ঘেঁটে বের করা সম্ভব, তবে নায়কের নাম ডানিয়েল নয়, এটা নিশ্চিত।

আশ্চর্য যে, সত্যিকারের ডানিয়েলকে আমরা খুঁজে পাই ২০১১ সালে, যখন ব্রমলিতে মিস্টার ব্লেকের কবর দেখার কৌতূহল জাগে। ডানিয়েল সে কবরস্থানের গোররক্ষক। তার সঙ্গে পরিচয় ঘটে ক্যান্টের বাসিন্দা জনৈক খোমারের (প্রকৃত নাম হাসান) মাধ্যমে। পেলহাম রোডের একটি পেল্লায় বাড়ির মালিক সে। ঊনত্রিশ বছর আগে সামরিক শাসন জারির প্রতিবাদে সে বাংলাদেশ ত্যাগ করেছিল। তার নাম খোমার রাখার কারণ মানুষটা আচ্ছন্নতা-বিলাসী এবং স্বাপ্নিক। সে এখনো স্বপ্ন দেখে যে, বাংলাদেশ একদিন কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত হবে এবং সেদিনই সে দেশে ফিরবে। এসব দিবাস্বপ্ন আসলে দ্রব্যগুণ ছাড়া দেখা সম্ভব নয়, তাই নানা কিসিমের সুরা অহরহ পান করতে হয় খোমারকে।

তারই পরামর্শে ঢাউস আকৃতির একটা পিংক-ভদকা নিয়ে হাজির হই ডানিয়েলের আস্তানায়। অভাবিত সাড়া পাই। ১৮৯৭ সালের রেজিস্ট্রি খাতা সে বের করে অনেক খুঁজে-পেতে। তার কষ্ট দেখে আমরাই বিব্রত হচ্ছিলাম। ডানিয়েল তখন জানায়, ডোন্ট ওরি। এখানে না পেলে কম্পিউটারে দেখে নিব, সব সেভ করা আছে।

হতাশা দ্রুত গ্রাস করতে থাকলে মানুষের চেহারায় স্পষ্ট ছাপ পড়ে। সম্ভবত তাই আমার দিকে তাকিয়ে ডানিয়েল মৃদু হাসে এবং আগের মতোই বলে, ডোন্ট ওরি। পুরনো রেজিস্ট্রি খাতায় অনেক কিছু স্পষ্ট থাকে না। শত বছরের বেশি হয়ে গেলে কাগজের ছ্যাড়াবেড়া অবস্থা হয়ে যায়। ভালো দশা থাকার কথা নয়। আমরা তাই সব ডকুমেন্ট কম্পিউটারে সেভ করে রাখি।

খোমার বলে ওঠে, তাহলে আর দরকার নেই খাতা দেখার। প্লিজ, চেক ইয়োর কম্পিউটার।

আমিও মাথা নেড়ে সায় দেই।

ডানিয়েলের টেবিলের ওপর রাখা সাদা কাগজে স্পষ্ট লেখা: মিস্টার ব্লেইক, ডাইড ইন...।

পর্দায় ভেসে ওঠে সেই নাম। হ্যাঁ, ২১ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দ। জন্ম: ১২ জানুয়ারি, ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দ। পিতা: মিস্টার হেইক, ব্রমলি, ইংল্যান্ড।

ভরদুপুরে, যদিও আকাশ মেঘে ঢাকা বলে বেলা বোঝার উপায় নেই; সেলফোনের ঘড়িটি বলে দিচ্ছিল বেলা পৌনে ১টা, গা কাঁপিয়ে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেলাম। শিরশিরিয়ে উঠছে শরীরের রক্তস্রোত...। অন্ধ খোমারের ভবিষ্যদ্বাণী এক চুলও নড়েনি। সুনামগঞ্জের প্রথম ডিসিকে বলে দেয়া নির্দিষ্ট তারিখেই মৃত্যু হয়েছে তার। এইচ জি ওয়েলস তা কি জেনে গেছিলেন? হাসান ওরফে খোমারকে আমি নিজের আশঙ্কার কথা জানাই। ফিসিফিসিয়ে বলি, চলো, কেন জানি আমার খুব ভয় করছে।

 

চার.

সেবার ইংল্যান্ড থাকা হয়েছিল টানা ছ’মাস। জুনের মাঝামাঝি গিয়ে পুরো ’১১ সালটা শেষ করে দিয়ে এসেছিলাম। একাধিকবার গিয়েছিলাম মিস্টার ব্লেকের কবর দেখতে। কোনোবারই চোখ ভুল করেনি। হ্যাঁ, ২১ সেপ্টেম্বর, যে দিনটা আবার এইচ জি ওয়েলসের আবির্ভাব দিবস। এই তারিখটা আরেক দফা দেখা হয়েছিল ওয়েলসের জন্মভিটায়। যদিও ভিটা বলতে কিছুই নেই ওখানে। আছে বিশাল একটি মার্কেট। সেই মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে ইংলিশদের দোকানদারি পরিচিতিটা ফের ঝালাই করে নিয়েছিলাম।

দেশে ফেরার পর আদি খোমারের জন্মভিটা দেখার তাগাদা ভীষণভাবে পেয়ে বসে। সময় ও সুযোগ হয়ে ওঠে না। আবার পরিকল্পনা সাজাই। ঢাকা থেকে বড়জোর ৩৫০ কিলোমিটার। শরীর ও মন একসঙ্গে সাড়া দেয় না। শরীর, মন ও চোখ, চলে একজন; একত্র হয় না সব, ফলে সাত বছর পেরিয়ে যায়।

অবশেষে একদিন আচানক ঘটনাটি ঘটে। অন্ধ ষাঁড়ের মতো দিশেহারা হয়ে দিগ্বিদিক ছুটতে থাকি এবং এক শ্রাবণ-সন্ধ্যায় নিজেকে আবিষ্কার করি অকুস্থলে। অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছিল। তবে আন্ধারগাঁও আর আন্ধারে নেই, ঝলমলে বাতি জ্বলছে সর্বত্র।

চা স্টলে বসে গ্রামটির নানা কিছু জানার বাই চেপে গেলে আমাকে নিরস্ত করে সহযাত্রী আশরাফ। বলে, দিস ইজ নট দ্য প্রোপার টাইম। আগে চলুন থানায় যাই।

সঙ্গে সঙ্গে সম্বিৎ ফিরে আসে। ঘোর থেকে ফিরে আসা হয়। আমি যাচ্ছি অনুজের লাশ শনাক্ত করতে। গত পরশু রাতে দুই দলের গোলাগুলিতে নিহত হয়েছে সে। পুলিশ বলছে দুই দল দুষ্কৃতির দেনা-পাওনা নিয়ে বিবাদের শিকার আবদুল মতিন খোমার। তার পকেটে আমার সেলফোন নাম্বার ছিল। ...কে ঠিক, কে বেঠিক, তা এখনো জানি না। জানার কোনো উপায়ও নেই। আমি জানতাম, ভাইটা গবেট এক ব্যবসায়ী। সত্য বরাবরই ঝাপসা কাচ! বারবার কাঁচামালের ব্যবসায় মার খায়, ফের উঠে দাঁড়ায়, টলতে টলতে আবার হোঁচট খায়। কিন্তু তার ডাকনাম তো খোমার নয়, খোকন, আবদুল মতিন খোকন। খোকনের বদলে ওই নাম বসাল কে? খোমার চক্ষুষ্মান ছিল না, খোকন চক্ষুষ্মান। তবে এটা ঠিক যে পৃথিবীর কোনো চক্ষুষ্মানই সবকিছু ঠিকঠাক দেখতে পায় না। সামান্য সে দেখে, বেশির ভাগই আড়ালে থেকে যায়। সেজন্য প্রশ্ন জাগে, আসলেই কি সেখানে গিয়েছিলাম!