শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম যুগের সুযোগ্য ছাত্র সুরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলীর (১৯০৯) ‘লক্ষ্মণ সেনের পলায়ন’ নামে ছবিটি নিয়ে যে বিতর্কের ঝড় উঠেছিল, সমসময়ের খুব কম চিত্রকর্মের ক্ষেত্রেই তা ঘটেছে। সুরেন্দ্রনাথ মাত্র ২৪ বছর বেঁচে ছিলেন। অবন ঠাকুরের এ প্রতিশ্রুতিবান শিল্পীটি অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। গুরু অবন ঠাকুর তার এই প্রিয় শিষ্যটিকে বিশেষ স্নেহ করতেন, এমনকি নন্দলাল অপেক্ষাও শিল্পের রস গ্রহণে সুরেন্দ্রনাথ অধিক সমর্থ ছিলেন বলে বিবেচনা করেছেন। এ গুণী শিল্পীর অকালমৃত্যুর আগেই তার অনেক ছবি প্রকাশিত হয়েছে প্রবাসী, ভারতী ও মডার্ন রিভিউতে। ভগিনী নিবেদিতার ‘Myths of the Hindus & Buddhists’ বইটির জন্য ছবি এঁকেছিলেন তিনি।

১৯০৮ সালে তার ‘লক্ষ্মণ সেনের পলায়ন’ ও ‘বত্রিশ সিংহাসন’ ছবির জন্য সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্টের প্রথম প্রদর্শনীতে ২৫ টাকা পুরস্কার পেয়েছিলেন। সুরেন্দ্রনাথের ‘লক্ষ্মণ সেনের পলায়ন’ নব্য বঙ্গীয় শিল্পরীতির অনুরাগীদের অবিমিশ্র প্রশংসা পেলেও ছবিটির প্রতি বিরুদ্ধ মতও ছিল সমান জোরালো। ছবিটি নাকি ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগে দুষ্ট। আর এহেন আক্রমণ এসেছিল সে আমলের অনেক বিখ্যাত শিল্পবোদ্ধার কলম থেকে। এখানে বলা আবশ্যক, ছবিটি নয়, ছবির বিষয়বস্তুই ছিল আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু। শিল্পীর বিরুদ্ধে অভিযোগের মূল সূত্রটি হলো, সপ্তদশ মুসলিম অশ্বারোহীর আক্রমণ এবং তদানীন্তন বঙ্গধিপতি লক্ষ্মণ সেনের বিনা যুদ্ধে রাজপ্রাসাদ ত্যাগের প্রচলিত কাহিনীকে বিশ্বাস করে সুরেন্দ্রনাথ এ ছবিটি এঁকে অনৌচিত্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। এ চিত্রকর্মটি নব্য বঙ্গীয় শিল্পরীতির একনিষ্ঠ সমর্থক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের ইংরেজি মডার্ন রিভিউতে এমন এক সময়ে প্রকাশিত হয়, যখন বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের অভিঘাতে সৃষ্ট উগ্র জাতীয়তাবাদ দেশজুড়ে এক প্রবল ঘূর্ণাবর্তের জন্ম দিয়েছিল। জাতীয়তাবাদের ঝড়ো হাওয়ার গর্জন, স্বদেশীদের বিদেশী পণ্য বর্জন, আর শাসককুলের নির্মম পীড়নের ঝঞ্ঝাবহুল পরিণীতিতে নব্য বঙ্গীয় শিল্পরীতির উত্থান আর পরবর্তীতে অবনীন্দ্রনাথসহ তার শিষ্যদের সমকালীন শিল্প ও শিল্পীদের চিন্তাচেতনায় ক্রমবর্ধমান প্রভাব অচিরেই এ শিল্পরীতির বিপরীতে প্রতিপক্ষের তীব্র বিরাগ ও বিরোধিতার উদ্ভব হলো। ‘লক্ষ্মণ সেনের পলায়ন’ নামক সেই চিত্রটি বিপরীতমুখী স্রোতের আবর্তে কীভাবে গভীর নিন্দা পঙ্কে নিমজ্জিত হয়েছিল, এখানে তারই একটি পটভূমিকা সংক্ষেপে তুলে ধরা প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

সবাই জানি, বিশ শতকের গোড়ার দিকে অবনীন্দ্রনাথ ও তার অনুগামীদের হাতে নব্য বঙ্গীয় শিল্পরীতির সৃষ্টি। একদিকে প্রবাসী ও মডার্ন রিভিউ, অন্যদিকে ব্রিটিশ সরকার পোষিত ইন্ডিয়ান সোসাইটি অব ওরিয়েন্টাল আর্টের (১৯০৭) মাধ্যমে এ শিল্পীরীতির প্রচার ঘটে। তবে এর দ্রুত প্রাধান্য বিস্তার, এ দেশের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে এর ভূমিকা—এসবই পশ্চিমা প্রকৃতিবাদী বাস্তব রীতির অনুরাগীদের যথেষ্ট ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। অবনীন্দ্রপন্থীরা তাদের শিল্পরীতিকে প্রকৃত ভারতীয় আদর্শবাদী কল্পনাপ্রধান শিল্প হিসেবে দাবি করায় বিরোধীরা প্রকৃত ভারতীয়ত্বের সঙ্গে এর আঙ্গিকের প্রশ্ন তুলে আক্রমণ তীব্র করার সুযোগ পেয়েছিল। শুধু এই নয়, প্রশ্ন উঠেছিল পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক কাহিনীর সার্থক রূপায়ণ নিয়েও। ‘রাজ’-এর এর পৃষ্ঠপোষকতার কারণে ‘জাতীয়তাবাদী শিল্প’-এর যথার্থ বিকাশ ব্যাহত হয়েছিল বলেও অপবাদ ঘটেছিল বিস্তর।

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সরকারি শিল্প প্রশাসকরা মনে করতেন, ভারতীয় শিল্প কারুকলা (ডেকরাটিভ আর্ট) স্থুল। চারুকলার (ফাইন আর্ট) ঐতিহ্য এখানে নেই। কাজেই ইউরোপীয় প্রযুক্তির সহায়তা ভারতীয়দের প্রয়োজন। তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কলকাতায় সরকারি মহলে প্রথম পরিবর্তনের বাতাস বইল। প্রিন্সিপাল ই. বি হ্যাভেলের জমানায় (১৮৯৬-১৯০৬) সরকারি নীতি মেনে কাজ শুরু করলেও অবনীন্দ্রনাথ তথা নব্য বঙ্গীয় শিল্পরীতিকে ‘আবিষ্কার করার পর’ হ্যাভেল ‘আমৃত্যু এর আনুকূল্য করেছেন’। এ সময় স্বদেশী আন্দোলন উগ্র পন্থার দিকে ঝোঁকায় রাজনীতিবর্জিত সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে সমর্থন দেয়ার নিরাপদ পথই বেছে নিল শাসককুল।

নব্য বঙ্গীয় চিত্রকলার বিরোধিতার সূত্রপাত এভাবে দানা বাঁধে ভারতের পাশ্চাত্যপন্থীদের দৌলতে। কেবল ভারতের পাশ্চাত্যপন্থীরাই বিরোধিতার আগুন উসকে দেননি, ভারতীয় প্রত্নতত্ত্বের পণ্ডিতরাও বিদ্বেষের তোপ দাগতে বিলম্ব করেননি। যেমন ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় বা প্রত্নতাত্ত্বিক রমাপ্রসাদ চন্দ।

শিল্পরীতি ও শিল্পাদর্শ নিয়ে অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে রমাপ্রসাদ চন্দের বিতর্ক সবারই জানা। ‘ভারতের প্রাচীন চিত্রকলা’ নামে এক প্রবন্ধে রমাপ্রসাদ চন্দ উল্লেখ করেছেন, তার দৃষ্টিতে অবনীন্দ্রনাথের প্রবর্তিত চিত্রকলার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে ব্যাপক বিরোধিতা রয়েছে। আপত্তিকারকদের মধ্যে প্রাচীনপন্থীরাও আছেন। যদিও অবনীন্দ্রনাথ দাবি করেন, তিনি প্রাচীন শিল্পকলার অনুরাগী। রমাপ্রসাদের বিশেষ আপত্তির কারণ—নব্য বঙ্গীয় চিত্রকলায় স্বভাবানুকরণ একেবারেই অনুপস্থিত—যা ছিল অজন্তার চিত্রকলায় বা ভারতীয় ভাস্কর্যে। সংস্কৃতে লেখা ভারতের প্রাচীন শিল্পশাস্ত্র উদ্ধৃত করে রমাপ্রসাদ নিজ মত সমর্থন করতে চেয়েছিলেন।&dquote;&dquote;

‘প্রবাসী’ ও ‘মডার্ন রিভিউ’র সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় বরাবরই তার পত্রিকায় অবনীন্দ্রনাথ ও তার শিষ্যদের সমর্থন জানিয়ে এসেছেন। তিনি রমাপ্রসাদের এ আক্রমণের এক তীব্র উত্তর দেন। সংস্কৃত পণ্ডিতদের উদ্ধৃতি ব্যবহার করে রমাপ্রসাদ চন্দ্রের আপত্তিকে তিনি অবজ্ঞার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ইংরেজি সাহিত্যে ব্যুত্পত্তি হলেই যেমন কেউ পাশ্চাত্য চিত্র বিশেষজ্ঞ হয় না, তেমনি সংস্কৃতে পণ্ডিত হলেই কেউ প্রাচীন ভারতীয় চিত্রকলার মর্মজ্ঞ হয়ে পড়বেন, এমন কথা নেই। রমাপ্রসাদ চন্দ ই. বি. হ্যাভেলের উক্তিকে তার বক্তব্যের সমর্থকরূপে হাজির করেছিলেন। সেজন্য প্রবাসী সম্পাদক বললেন, হ্যাভেল প্রকৃতির প্রশংসা যদি এ ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে অন্যত্র অন্তত বিবেচ্য হওয়া উচিত। বরং এটাও বলা উচিত যে হ্যাভেল, ভগিনী নিবেদিতা প্রমুখ ‘আধুনিক বঙ্গীয়-চিত্রকরগণের বিশেষ অনুরাগী’। রমাপ্রসাদ চন্দের উপস্থাপিত ‘স্বাভাবিক’ শিল্পের দৃষ্টান্তগুলো বিশ্লেষণ করে তার অভিযোগ নাকচ করে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় বলেন, তিনি অজন্তার অধিকাংশ ছবির প্রতিলিপি পুস্তকে ও ফটোগ্রাফে যা দেখেছেন, তাতে সেগুলো কোনোক্রমেই স্বাভাবিক বলা যায় না। তার মতে, ভারতের নানা স্থানে বহু প্রাচীন প্রস্তরমূর্তি পাওয়া গেছে, এর অধিকাংশই অস্বাভাবিক ভঙ্গির। রমাপ্রসাদ চন্দ স্বাভাবিক মূর্তি বলে ব্রহ্মা ও বিষ্ণুর যে দুটি ভাস্কর্যের ছবি তার প্রবন্ধে দৃষ্টান্ত হিসেবে দিয়েছেন, সেটি উল্লেখ করে প্রবাসী সম্পাদক দাবি করেন যে ওই মূর্তি যদি স্বাভাবিক হয়, তাহলে অবনীন্দ্রনাথ এবং তার ছাত্রদের এ ধরনের অনেক ছবির নাম করা যায়, যেগুলো ওইরূপ ‘স্বাভাবিক’।

শিল্প গবেষকদের অভিমত, অবনীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত বঙ্গীয় শিল্পরীতিতে অজন্তা শৈলী, মোগল শিল্পকলা, ইউরোপীয় শিল্পের প্রকৃতিবাদ, রাজপুত শিল্প ঘরানা ও জাপানি ওয়াশ পদ্ধতির অপূর্ব সমন্বয় ও বুদ্ধিদীপ্ত সংমিশ্রণ অবন ঠাকুরের তুলিতে প্রাচীন ভারতীয় শিল্পের নব আঙ্গিকে উজ্জীবন ঘটে, যা কিনা প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য, ইতিহাস, ধর্মীয় ও মিথলোজিক্যাল কাহিনীর ঐশ্বর্য্যে ছিল প্রোজ্জ্বল। অবন ঠাকুর তার মায়াবী জলরঙের কোমল ছোঁয়ায় সারা ভারতে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সেই ঐশ্বর্য। অবনীন্দ্রনাথ অবশ্য ধর্মীয় বা পৌরাণিক মিথসমৃদ্ধ কাহিনীর চেয়ে প্রাচীন ঐতিহাসিক ধ্রুপদী ভারতীয় সাহিত্যের বিষয়বস্তু আঁকতেই বেশি পছন্দ করতেন। অবন ঠাকুরের বেশ কয়েকজন শিষ্য তাদের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন, কিন্তু বেশির ভাগ ছাত্রই তাদের গুরুর শিল্পদর্শনের উঁচু শিখর ছুঁতে পারেনি।

নব্য বঙ্গীয় শিল্পরীতির আবির্ভাবের পর থেকেই এর অনুকূল ও প্রতিকূল সমালোচনার শুরু হয়। এ মতদ্বৈধতার ধারাবাহিকতায় সে সময়ে সাহিত্য সমাজে একটা দলাদলি সৃষ্টির উপক্রম হয়েছিল। অনেক জ্ঞানী-গুণী এ বিতর্কে অংশ নেন। নানা সাময়িক পত্রে একালের শিল্পকলা সম্পর্কে প্রচুর চিন্তাপূর্ণ লেখা বেরিয়েছে।

বাংলা সংস্কৃতিজগতের দিকপাল যেমন অবনীন্দ্রনাথ, উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী, সুকুমার রায়, অর্ধেন্দু কুমার গাঙ্গুলী তর্ক-বিতর্কে পক্ষে-বিপক্ষে নেমেছেন। এ বিতর্কের বিস্তারিত আলোচনা দরকার নেই এখানে।&dquote;&dquote;

বিখ্যাত কথা সমালোচক আনন্দ কুমার স্বামী নব্য বঙ্গীয় চিত্রকরদের প্রভূত প্রশংসা করেছেন নানাভাবে নানা পত্রপত্রিকায়।

রবীন্দ্রনাথ একটা সময় পর্যন্ত সমর্থন করেছেন নব্য বঙ্গীয় শিল্পরীতির আন্দোলনকে। অবনীন্দ্রনাথ ও নন্দলালকে তিনিই উদ্বুদ্ধ করেছেন ভারতীয়তার নতুন আঙ্গিক ভাবনায়।

আবার যখন দেখেছেন যে একটা সংকীর্ণ গণ্ডির গতানুগতিকতায় আটকে যাচ্ছে এ রীতি, তখন তিনিই প্রতিবাদ করেছেন, প্রসারিত করতে বলেছেন শিল্প সৃষ্টি।

নব্য বঙ্গীয় রীতি প্রাথমিকভাবে বিস্তার লাভ করতে থাকে গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলে অবনীন্দ্রনাথের প্রথম পর্বের ছাত্রদের মধ্য দিয়ে, ১৯০৫ সালে তিনি যখন আর্ট স্কুলের উপাধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত হন। সে বছরই ভর্তি হন নন্দলাল বসু। পরবর্তীকালে তার সৃষ্টির মধ্য দিয়েই নব্য বঙ্গীয় শিল্পরীতি নানা দিগন্তে প্রসারিত হয়। ১৯০৫ সালেই ভর্তি হন সুরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলী, ১৯০৬-এ অসিতকুমার হালদার। ক্ষিতীন্দ্রনাথ মজুমদার ভর্তি হন ১৯০৭-এ। কে ভেংকটাপট্ট ১৯০৯-এ। এরই কাছাকাছি সময়ে ভর্তি হন দুর্গেশচন্দ্র সিংহ, শৈলেন্দ্রনাথ দে, সত্যেন দত্ত, হাকিম মহম্মদ খান, সমরেন্দ্র গুপ্ত, যতীন্দ্র কুমার সেন, প্রমোদ কুমার চট্টোপাধ্যায়। উল্লিখিত শিল্পীরা হ্যাভেলের আদর্শে ও অবনীন্দ্রনাথের প্রেরণায় বিকশিত হয়েছেন। অবনীন্দ্রনাথকে যদি বলা যায় নব্য বঙ্গীয় রীতির প্রথম প্রজন্মের শিল্পী, তাহলে এদের বলা যায় এ ঘরানার দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পী।

বিখ্যাত কলা সমালোচক আনন্দকুমার স্বামী নব্য বঙ্গীয় চিত্রকরদের প্রভূত প্রশংসা করেছেন নানা প্রসঙ্গে।

এবার আনন্দ কুমার স্বামী নব্য বঙ্গীয় চিত্রকরদের কী ধরনের প্রশংসা করেছেন, তা একটু দেখা যাক। কুমার স্বামীর রবি বর্মার প্রচণ্ড সমালোচনা করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় অবনীন্দ্রনাথকে সমকালীন ভারতবর্ষের সেরা শিল্পী বলেছেন, তা করেছিলেন রবি বর্মার সঙ্গে তুলনা প্রসঙ্গেই। রবি বর্মার ধারার অসারতা সম্পর্কে সম্ভবত সেই প্রথম ব্যাপক ও গুরুত্বপূর্ণ আক্রমণ। সেজন্য রবি বর্মার অনুরাগীদের কাছে তিনি বিশেষ সমালোচনার পাত্র হয়েছিলেন।

অবনীন্দ্রনাথের আবির্ভাব সম্পর্কে বলেছেন, অবনীন্দ্রনাথ নিঃসন্দেহে বর্তমান ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ জীবিত শিল্পী। ভারতীয়রা একবার যদি নিজ কর্তব্য সম্পর্কে অবহিত হয়, যদি তারা বোঝে যে পশ্চিমের কাছে তাদের ধার করার কিছু নেই, বরং দেবার আছে, তাহলে তারা পৃথিবীকে শিল্প ও অন্য বিষয়ে কী দিতে পারে, অবনীন্দ্রনাথ নিজেই এর তাত্পর্যপূর্ণ প্রকাশ। তিনি এ কথাও জানাতে দ্বিধা করেননি যে অবনীন্দ্রনাথের শিল্প সৃষ্টি ইংল্যান্ডে ইংরেজ শিল্পীদের কাছে ভারতের অন্য শিল্পীদের তুলনায় অনেক বেশি পরিচিত। সে দেশে তার শিল্প সম্পর্কে ভাবনা ও আলোচনা অনেক বেশি। এ জিনিস সচরাচর ঘটে না। যেসব ব্যক্তি নিজেদের শিল্পবুদ্ধি প্রয়োগ করতে অনিচ্ছুক, তাদের উদ্দেশে বলে উঠলেন, তারা যেন ইউরোপে অবনীন্দ্রনাথের সমাদর এবং ইউরোপীয় শিল্পীদের কর্তৃক রবি বর্মা সম্পর্কে সম্পূর্ণ উপেক্ষার তাত্পর্য বুঝে নেন।

অবনীন্দ্রনাথের কাব্যের মূল্যায়ন করতে গিয়ে কুমার স্বামী তার চিত্রাবলিকে প্রথম সারিতে স্থান দিয়েছেন। কুমার স্বামীর দৃষ্টিতে এ চিত্রাবলির মধ্যে সেরা হলো নির্বাসিত যক্ষ ও ঊর্ধ্বলোকের সিদ্ধগণ। এর পরই তিনি উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম হিসেবে স্থান দিয়েছেন শাজাহানের অন্তিম শয্যা—ওইসব জলরঙের সুকুমার ছবিগুলোর কোমল প্রশান্তি, লাবণ্য এবং দুর্লভ ভারতীয়তা একেবারে অভিভূত করে দেয়।

 

বিশ্বজনীন ভাষায় ভারতীয় ভাবের নিখুঁত প্রকাশ&dquote;&dquote;

আনন্দকুমার স্বামী অবনীন্দ্রনাথ বন্দনা করতে গিয়ে সম্ভবত অজান্তেই ভিমরুলের চাকে ঢিল ছুড়েছিলেন। সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক সুরেশচন্দ্র সমাজপতির হুল ফোটানোর দক্ষতা সর্বজনবিদিত। তিনি রে রে করে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। তার কলম ভিমরুলের চেয়েও মারাত্মক, তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। সমাজপতির অবনীন্দ্র দূষণ সম্পর্কে সামান্য কিছু বলা সম্ভবত এখন অপ্রাসঙ্গিক বিবেচিত হবে না। আক্রমণাত্মক সমালোচনায় নব্য বঙ্গীয় শিল্পীদের ছবিগুলোকে নিষ্ঠুরভাবে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করেছেন তিনি। তার অজস্র মন্তব্যের মধ্যে কয়েকটি দৃষ্টান্ত হাজির করেছেন গবেষক শঙ্করী প্রসাদ বসু তার ‘নিবেদিতা ও ভারতের শিল্প আন্দোলন’ শীর্ষক ধারাবাহিক রচনায় (দেশ পত্রিকা)।

বঙ্গীয় শিল্পরীতির প্রথম পর্বের শিল্পকর্মের সবচেয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল অসিত হালদারের ‘বুদ্ধ ও সুজাতা’ ছবিটি। এ বিষয়ে সমাজপতির মন্তব্য (সাহিত্য, ভাদ্র ১৩১৬):

“... সুজাতার পদ্মপাণিদ্বয় যেভাবে বুদ্ধের দিকে অগ্রসর হইতেছে তাহা দেখিয়া মনে হয়, বুদ্ধদেব যদি তরুমূলে উপবেশন না করিয়া উচ্চ তরুশাখায় সমাসীন থাকিতেন, সেখানেও সুজাতার কর-বংশদণ্ডদ্বয় তাঁহার সম্মুখে পায়সপাত্র ধরিয়া দিতে পারিত। এমন দীর্ঘতর পাণি আকাশ হইতে চন্দ্র-সূর্যকেও অনায়াসে পাড়িয়া আনিতে পারে। ‘স্বাভাবিকতার’ শ্রাদ্ধই যদি প্রাচীন ভারতীয় চিত্রকলা পদ্ধতির একমাত্র উদ্দেশ্য হয়, তাহা হইলে আমরা নাচার।”

উদ্ধৃতির জন্য শঙ্করী প্রসাদ বসুর দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত ধারাবাহিক রচনা নিবেদিতা ও ভারতের শিল্প আন্দোলন।

অবনীন্দ্রনাথের ‘গণেশ-জননী’তে সমাজপতির দৃষ্টিতে ঘাঘরা পরা গণেশ-জননী শিশু গণেশকে তুলে ধরেছেন, আর লাল টুকটুকে গণেশ শুঁড় দিয়ে গাছের ডাল জড়িয়ে ধরে পাতা খাওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত। এর পরে তার মন্তব্যটি হুল ফোটানো গোছের, কারণ তার মনে হয়েছে ‘চিত্রকর-গণেশ তুলিকা-তন্তে জড়াইয়া ধরিয়া আমাদের প্রাচীন পৌরাণিকী কল্পনাগুলি পদদলিত করিতেছেন।’

অবনীন্দ্রনাথের কাজরী চিত্র প্রসঙ্গে: ‘কেমন করিয়া বলিব, কেমন সেই ছবিখানি! কোন ভাষায় বর্ণিব সেই তিন রূপসীর তিন রূপ! কেমন করিয়া বুঝাইব তাহাদের ঢেউ খেলানো দেহযষ্টির সেই আঁকা-বাঁকা ভাব, প্যাঁকাটি-বিনিন্দিত হাতের সেই ত্রিভঙ্গিম ভঙ্গি, শুকনো পাকানো লতানু আঙুলের সেই উেক্ষপ বিক্ষেপ প্রক্ষেপ! কোন ছন্দে বাখানিব এই তিন সুন্দরীর সৌন্দর্য!’ (সাহিত্য, অগ্রহায়ণ ১৩২৪)।

অবনীন্দ্রের শিষ্যদের মধ্যে প্রবাসী বা ভারতীতে যেহেতু নন্দলালের ছবি বেশ মনোযোগ ও প্রশংসার সঙ্গে ছাপা হয়েছে, তাই সমাজপতির আঘাত তার উপরেই বেশি পড়েছে। যেমন নন্দলালের ‘কৈকেয়ী’ চিত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘... একখানি অপরূপ চিত্র—আষাঢ়ে কল্পনার উদ্ভট উদ্গার। মন্থরা দেখিয়াই নয়ন মন্থর হইয়া গেল, সমগ্র সৌন্দর্য ভোগ করিবার জন্য দৃষ্টি চিত্রকরের কল্পনালোকে কুচ্ করিতে পারিল না। যত পারো গালি দাও, সত্য বলিতে ছাড়িব না—এ চিত্রকল্পনার অপমান, অত্যন্ত জঘন্য।’ (সাহিত্য, আশ্বিন ১৩১৬)

নন্দলালের ‘মহাদেবের তাণ্ডবনৃত্য’ ছবি নিয়ে ঘোর বিতর্ক শুরু হয়েছিল, যা কখনো কখনো ব্যক্তিগত আক্রমণের পর্যায়ে গিয়ে ছাড়ায়। সাহিত্য পত্রিকায় এই সূত্রে লেখা হয় (আষাঢ় ১৩১৬):&dquote;&dquote;

‘মহাদেব তাণ্ডবনৃত্য করিতেছেন অথবা হাড়গিলের মতো এক পায়ে দাঁড়াইয়া আছেন, তাহা বুঝিতে পারিলাম না। ভারতীয় চিত্রকলা পদ্ধতির অমোঘ নিয়মে মহাদেবের আলতামাখা পদতল একটু দীর্ঘ বলিয়াই মনে হয়। আর লতানে অঙ্গুলি—চম্পক নয়, যেন লাউডগাগুলি ত্রিশূল দণ্ডে জড়াইয়া আছে। মহাদেবের শ্মশ্রু নাই, গুম্ফ নাই। ভারতীয় চিত্রকলা পদ্ধতির অনুরোধে চিত্রকর বসুজা নরসুন্দর হইয়া মহাদেবের সেই মান্ধাতার আমলের দাড়িগোঁফ কামাইয়া দিয়াছেন। সৌভাগ্যক্রমে মাথার কুঞ্চিত কেশগুচ্ছ মুণ্ডন করিয়া দেন নাই।’

এহেন সমালোচনা উক্ত্যক্ত হয়ে অর্ধেন্দু কুমার গাঙ্গুলী শ্রী ছদ্মনামে প্রবাসীতে মহাদেবের শ্মশ্রু মুণ্ডন নাম দিয়ে পাল্টা হুল ফুটালেন। সমাজপতির সমালোচনার সমালোচনা নয়, সদালোচনাও নয়, কিন্তু কুৎসা জল্পনা। তিনি দাবি করেন, সমাজপতি মহাদেবকে হাড়গিলা বলেছেন। ভদ্র সন্তানকে ইতর ভাষায় গালি দিয়েছেন। সমাজপতির ‘গালিবর্ষণপটুতা দেশ বিখ্যাত’ ইত্যাদি এখানেই ইতি না দিয়ে সমাজপতির ক্রোধে ঘৃতাহুতি পড়তে দেরি হয়নি। সমাজপতির প্রচণ্ড শ্লেষাত্মক লেখা বেরোল (অগ্রহায়ণ, ১৩১৬) তার সাহিত্য পত্রিকায়। পুরো লেখাটির একটি মাত্র অংশ এখানে উদ্ধৃত করা হলো:

‘ভারতশিল্প ও দেবমূর্তি সম্বন্ধে আলোচনা করিবার অধিকার কেবল ঠাকুরবাড়ির পটুয়া, পরিকর ও মুরুব্বিদিগকে ও তাঁহাদের বাহন প্রবাসীকে কোন্ কর্নওয়ালিস দলিল লিখিয়া দশসালা বন্দোবস্ত করিয়া দিয়াছিলেন, তাহা বলিতে পারি না। কিন্তু দেখিতেছি, সে অধিকার চিরস্থায়ী স্বত্বে পরিণত হইয়াছে।’

গবেষকরা অভিমত প্রকাশ করেছেন, উপরের উদ্ধৃতিতে সমাজপতির আক্রোশের অংশটি যথার্থ নয়। তবে তারা এও বলেছেন, বঙ্গীয় শিল্প আন্দোলনের প্রথম পর্বে অনেক ছবিতেই যে দেহ গঠনকে অগ্রাহ্য করার প্রবণতা মাত্রা ছাড়িয়েছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এতক্ষণ বঙ্গীয় শিল্পরীতির নানা পর্বের কাহিনী-পটভূমিকা হিসেবে বলা হলো, এবার মূল কাহিনীতে ফেরা যাক। এ বাদানুবাদ আর তর্ক-বিতর্কের কালে ভারতীয়তাবাদের ঝড়ো হাওয়ায় গতিসঞ্চার হয়েছিল সে সময়ের স্বদেশী আন্দোলন, বিদেশী পণ্য বর্জন ও বিপ্লববাদের দুর্বার আকর্ষণে। আর সেই উথাল-পাথাল সময়ে অবনীন্দ্রনাথবিরোধীদের তূণীরে সুরেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলী একটি মোক্ষম তীর তুলে দিলেন। সেই তীরটি হলো, তার আঁকা ‘লক্ষ্মণ সেনের পলায়ন’ নামের ছবিটি; যা এ প্রবন্ধের গোড়াতেই উল্লেখ করা হয়েছে। এবার সমাজপতি এবং অন্যরা ঝাঁপিয়ে পড়লেন সুরেন গাঙ্গুলীর ওপর। আক্রমণের কারণ তার ছবি নয়, ছবির বিষয়বস্তু। অচিরেই ছবিটির ইতিহাসগত তাত্পর্য নিয়ে একটি বিতর্ক শুরু হয়ে গেল মডার্ন রিভিউয়ের জানুয়ারি, ১৯০৯ সংখ্যায়।

ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ‘The Flight Of Lakshman Sen’ নাম দিয়ে এক রচনায় নানা ঐতিহাসিক তথ্যযোগে প্রমাণ করতে চাইলেন, এই তথাকথিত পলায়ন কাহিনীর তথ্যভিত্তি নাকি নেহাতই দুর্বল। এরই সূত্র ধরে তিনি আপত্তি করলেন ছবিটি আঁকার ঔচিত্য বিষয়ে। অপরপক্ষে সুরেন গাঙ্গুলীর ছবিকে তারিফ করার মতো গুণী ব্যক্তিদের অভাব হয়নি। সুরেনবিরোধীদের দিকে প্রথম তোপ দাগেন আনন্দ কুমার স্বামী (মডার্ন রিভিউ, মার্চ ১৯০৯)। তার যুক্তি, ঐতিহাসিক সত্যাসত্যের বিচারকে ছবির রসসত্যের বিচারের ক্ষেত্রে টেনে আনা অনুচিত। অবনীন্দ্রনাথও একই যুক্তি নিয়ে শিষ্যের উদ্ধারে এগিয়ে এলেন। ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার যেমন লক্ষ্মণ সেনের ‘কলঙ্কভঞ্জন’ করতে চেয়েছিলেন, তেমনি শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ চেয়েছেন প্রিয় শিষ্য-শিল্পীর কলঙ্কভঞ্জন করতে—প্রবাসীর বৈশাখ ১৩১৬ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘কলঙ্কভঞ্জন’ পত্রে এবং বঙ্গদর্শনের বৈশাখ ১৩১৬ সংখ্যায় নামকরণ রহস্য প্রবন্ধে।

অবনীন্দ্রনাথ বোঝাতে চেয়েছিলেন ইতিহাসের সত্যাসত্য সম্পর্কে দায় নেই শিল্পীর। তিনি কটু থেকে মধু, হীনতা থেকে মিষ্টতা বের করতে পারেন। অবনীন্দ্রনাথ, কুমার স্বামী, নিবেদিতা সবাই সুরেন গাঙ্গুলীর এ ছবিটির প্রশংসা করেছিলেন নান্দনিক উত্কর্ষের জন্য। পরবর্তীতে অবনীন্দ্রনাথ একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘আর্টিস্ট মাত্রেই দুই পথ অবলম্বন করে; এক প্রাচীন শিল্পের মধ্যে নির্দিষ্ট হওয়া আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে প্রাচীনের সঙ্গে যোগ রাখিয়া নতুন নতুন সৃষ্টির দিকে অগ্রসর হওয়া। সুরেন্দ্রর জীবন প্রথম পথে গিয়াছে, নন্দলাল দ্বিতীয় পথে চলিতেছে।’ (পঞ্চানন মণ্ডল, ভারত শিল্পী নন্দনাল, প্রথম খণ্ড, পৃ: ৭৬)

এ উক্তির মধ্যে নব্য বঙ্গীয় রীতির প্রকৃত মূল্যায়ন আছে—বলেছেন মৃণাল ঘোষ, তার বিংশ শতকে ভারতের চিত্রকলা আধুনিকতার বিবর্তন গ্রন্থে।

এতসব চাপান-উতোরের পরেও অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় বলতে ছাড়েননি যে একজন সুনিপুণ চিত্রকর একখানি চিত্রপট রচনা করিয়া লক্ষ্মণ সেনের পলায়ন কলঙ্ক নাকি চিরস্মরণীয় করিবার চেষ্টা করিয়াছেন।

সমাজপতি এমন সুযোগ পেয়ে তা হাতছাড়া করেননি। সাহিত্য পত্রিকার বৈশাখ, ১৩১৬ সংখ্যায় অবনীন্দ্রনাথের বঙ্গ-দর্শনে প্রকাশিত প্রবন্ধের ধারালো সমালোচনা করে লেখা। তিনি অভিযোগ করলেন, অবনীন্দ্রনাথ নাকি ভুলে গেছেন এই কল্পিত হীনতার (লক্ষ্মণ সেনের পলায়ন) সঙ্গে জাতীয়তার সংস্রব আছে।

 

এবার হ্যাভেল তার ‘Indian Sculpture and Painting’ পুস্তকে The Flight of Lakshaman sen চিত্রকর্মটি সুরেন্দ্রনাথের প্রশংসা করে বলেন যে তিনি বাংলার একটি প্রসিদ্ধ ঘটনাকে চিত্রায়িত করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি নব্য বঙ্গীয় চিত্রকলা সম্পর্কে নিম্নোক্ত মন্তব্যটি করেন:

‘It is manifestly impossible to do full justice to the New School of Calcutta in a few selected examples by three or four of its artists, though they will suffice to show the reality and sincerity of the revival. The deeper significance of the movement lies, however, not so much in its actual accomplishment, as in the clear evidence it gives of a spiritual resurrection, of the re-awakening of the artistic soul of India from the narcotic slumber, induced by the deadly drugs of a soulless pedagogy, in which there are never dreams of beauty or visions of a fairer world.

Should we take the re-awakening as a challenge or as an inspiration to the Empire?’

লক্ষ্মণ সেনের পরিণতি তথা সেন রাজত্বের অন্তিম পর্ব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষকরা পরিশ্রমসাধ্য গবেষণা করেছেন। সেই গবেষণার বিস্তারিত আলোচনার পুনরাবৃত্তি এ নিবন্ধের বিষয়বস্তু নয়। ইতিহাসে দেখা যায় যুদ্ধ-বিগ্রহে কৌশলগত পশ্চাত্পসরণ একটি মান্য প্রথা বলে গৃহীত। এটি অতীতেও ছিল, এখনো রয়েছে। এহেন পশ্চাত্পসরণে কাপুরুষতার গ্লানি থাকার কথা নয়। বৃদ্ধ রাজা লক্ষ্মণ সেন পালিয়েছিলেন বটে, কিন্তু ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় জেমস কি পালাননি?

আনন্দ ভট্ট রচিত ‘বল্লালচরিত’ থেকে জানা যায়, পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরে সেনদের শক্তিশালী অবস্থান এবং ঘাঁটি ছিল। আনন্দ ভট্ট জানিয়েছেন, বিক্রমপুরে লক্ষ্মণ সেনের পিতৃব্য সুখ সেন এবং কুমার ধ্রুব, বিষ্ণু মন্ত্র, ধরা সেন প্রমুখ সর্বেসর্বা ছিলেন।

লক্ষ্মণ সেন বিক্রমপুরে এসে হয়তো ভবিষ্যতে হূতরাজ্য পুনরুদ্ধারের চিন্তাভাবনা করছিলেন। লক্ষ্মণ সেনের রাজধানী ছেড়ে যাওয়ার পরই পূর্ববঙ্গসহ সমস্ত বাংলা মুসলিম অভিযাত্রীদের দখলে আসেনি। লক্ষ্মণ সেনের পরও প্রায় দীর্ঘদিন লেগেছিল নবাগত মুসলিম অভিযাত্রীদের পূর্ববঙ্গসহ পুরো বাংলা ভূমিতে তাদের শাসন কায়েম করতে। লক্ষ্মণ সেনের রাজত্বে ২৭ বর্ষে জারিকৃত ভূমিদানের একটি তাম্রলেখ ঢাকার অদূরে ভাওয়ালে পাওয়া গেছে। লক্ষ্মণ সেন অতি বৃদ্ধ বয়সে মারা যান।

 

‘লক্ষ্মণ সেনের পলায়ন’ সে যুগে শিল্পীর স্বাধীনতা ও শিল্পীর চিন্তাচেতনাকে নিয়ন্ত্রিত করার ঔচিত্য বা অনৌচিত্য নিয়ে যে বিতর্ক তুলেছিল, তা আজও শেষ হয়নি। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের চিত্রকর্ম ইতিহাসের সত্যাসত্যকে অস্বীকার করতে পারে কিনা, এমন বিতর্ক এখনও প্রাসঙ্গিক।

ঋণ স্বীকার

Indian Sculpture And Painting.

By E.B.Havell

Cosmo publications, New Delhi, 1980

 

বিংশ শতকে ভারতের চিত্রকলা আধুনিকতার বিবর্তন

মৃণাল ঘোষ, প্রতিক্ষণ, কলকাতা।

 

নিবেদিতা ও ভারতের শিল্প আন্দোলন

শঙ্করী প্রসাদ বসু

দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিক রচনা হিসেবে প্রকাশিত

 

বৃহত্বঙ্গ: দীনেশ চন্দ্র সেন, পৃষ্ঠা ৪৮৫-৪৮৭

দৈনিক আনন্দ বাজারে প্রকাশিত ইন্দ্রজিৎ চৌধুরীর সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধ