জীবনানন্দ দাশের জীবনের সঙ্গে বরিশাল ও কলকাতার যেসব সড়ক ও অলিগলি যুগপত্ভাবে সম্পর্কিত, কলকাতার বালিগঞ্জ এলাকার রাসবিহারী এভিনিউ শুধু তার অন্যতমই নয়, বরং সবচেয়ে বেশি আলোচিতও। কারণ এখানেই ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় ট্রামের ধাক্কায় তিনি গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন। রক্তাক্ত হয়ে পড়েছিলেন এবং শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে এক সপ্তাহ চিকিৎসার পরে মারা যান ২২ অক্টোবর রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে।
তবে শুধু এই কারণেই রাসবিহারী এভিনিউ গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এই সড়কের দুটি বাড়িতে জড়িয়ে আছে তার অনেক স্মৃতি। একটি তার বন্ধুপ্রতিম আপন ছোট ভাই অশোকানন্দ দাশের ঠিকানা এবং এর অদূরেই জীবনানন্দের আবিষ্কারক, লেখক ও সম্পাদক বুদ্ধদেব বসুর ঠিকানা ‘কবিতা ভবন’। এখন এ বাড়ি দুটি কেমন আছে, সেখানে কারা থাকেন, সেখানে গেলে জীবনানন্দকে পাওয়া যাবে কিনা—এসব প্রশ্ন মাথায় নিয়েই এ অনুসন্ধান।
কলকাতার পূর্ব-পশ্চিম সংযোগকারী সড়কগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান রাসবিহারী এভিনিউ একসময় বালিগঞ্জ এভিনিউ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে বিশিষ্ট রাজনীতিক, আইনজীবী ও সমাজকর্মী স্যার রাসবিহারী ঘোষের নামে এই সড়কের নামকরণ হয়। কলকাতার অন্যতম বৃহৎ ও জনপ্রিয় শপিংকেন্দ্র গড়িয়াহাট এই সড়কের উপরেই। কলকাতার অভিজাত আবাসিক এলাকাগুলোও এই সড়কের আশেপাশে।
রোড টু ১৭২/৩
জীবনানন্দের সর্বশেষ আবাস ১৮৩ ল্যান্সডাউন রোডের বাড়ি থেকে মূল সড়ক রাসবিহারী এভিনিউয়ে উঠে পূর্বদিকে কিছুদূর গেলেই হাতের ডানে ত্রিকোণ পার্ক। স্থানীয়রা এটিকে ট্রায়াংগুলার পার্ক (ইংরেজি নাম) নামেই চেনে। এ পার্কের কোনায় চোখে পড়ে ১৭২/৩ রাসবিহারী এভিনিউয়ের সুন্দর বাড়ি। এ বাড়িতে বসে অশোকানন্দের ছেলে অমিতানন্দ দাশের (জন্ম ১৯৪৭) সঙ্গে আমার প্রথম কথা হয় গত বছরের ২৬ অক্টোবর। হাসপাতাল থেকে জীবনানন্দের মরদেহ সরাসরি আনা হয় এ বাড়িতে। অমিতানন্দ তখন সাত বছরের শিশু। জানালেন, মানুষের মরদেহ দেখার অভিজ্ঞতা সেটিই প্রথম। সেই মধ্যরাত ও পরদিন ভোরের কিছু দৃশ্য এখনো তিনি মনে করতে পারেন, তবে সেই স্মৃতি খুবই ঝাপসা।
অমিতানন্দ জানান, তার দাদু (মায়ের বাবা) ১৯৩৭ সালে বাড়িটা নির্মাণ করেছিলেন। তখন বাড়িটা ছিল পৌনে তিনতলা। বিয়ের পরে কিছুদিন রসা রোডে মোহিনী ম্যানশন এবং পরে ১৮৩ ল্যান্সডাউন রোডে থাকতেন তার মা-বাবা। আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তা অশোকানন্দ ১৯৪৮ সালে দিল্লিতে বদলি হয়ে গেলে তার স্ত্রী-পুত্র ১৭২/৩ রাসবিহারী এভিনিউয়ের বাসায় গিয়ে ওঠেন। ১৯৪৮-এর ২৫ ডিসেম্বর এই বাসায়ই মারা যান জীবনানন্দের মা কবি কুসুমকুমারী দাশ। ২০১১ সালে পুরনো বাড়িটা ভেঙে ফেলা হয়। ২০১৩-১৪ সালে বাড়ির কাজ শেষ হয়। এখন এটি ছয়তলা অ্যাপার্টমেন্ট। অমিতানন্দ থাকেন পাঁচতলায়।
সেই চেয়ার-টেবিল, ট্রাংক
সুন্দর গোছানো ঘর। বিশাল ড্রইংরুম। রুমের এক প্রান্তে একটি টেবিলের উপরে টেলিভিশন রাখা। অমিতানন্দ জানালেন, এই টেবিলটা বরিশাল থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল। বোধ হয় এটা জীবনানন্দেরই ছিল। পাশেই একটা কাঠের ইজি চেয়ার। এটি ছিল জীবনানন্দের কাকা ব্রহ্মানন্দ দাশের (১৮৭৯-১৯৫২)। টেবিলটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখি। চেয়ারটায় বসার ইতস্তত করি। তারপর সংকোচ ঝেড়ে একটু বসি। আহা, এ চেয়ারে হয়তো শিশু জীবনানন্দও বসেছেন কাকার কোলে চড়ে। বরিশালের বাড়ি সর্বানন্দ ভবনে এই টেবিলেই হয়তো লিখেছেন কালজয়ী সব কবিতা, গল্প, উপন্যাস।
অমিতানন্দ শোয়ার ঘরে গিয়ে একগোছা চাবি নিয়ে আসেন। ড্রইংরুমসংলগ্ন একটি বদ্ধ ঘরের তালা খোলেন। তখন একটি বেড়াল পাশে এসে দাঁড়ায়। অমিত মনে করিয়ে দেন, জীবনানন্দ বরিশালের বাড়িতে ‘বেড়াল’ নামে একটি কবিতা লিখেছিলেন:
‘সারাদিন একটা বেড়ালের সঙ্গে ঘুরে ফিরে কেবলই আমার দেখা হয়;
গাছের ছায়ায়, রোদের ভিতরে, বাদামি পাতার ভিড়ে;
কোথাও কয়েক টুকরো মাছের কাঁটার সফলতার পর
তারপর সাদা মাটির কঙ্কালের ভিতর।’
কী আছে এই ঘরে? সে এক বিস্ময়! দরজা খুলতেই চোখে পড়ে বইয়ে ঠাসা বেশ কয়েকটি আলমিরা। একটি আলমিরার উপরে দূর থেকেই চোখে পড়ে ধুলোজমা একটি কালো ট্রাংক। ট্রাংকের ভেতরে ছেঁড়াফাটা, উইপোকায় খাওয়া বেশকিছু বই। ১৯৩০ সালে জীবনানন্দের বিয়ের সময়ে তাকে উপহার হিসেবে দেয়া ‘রুবাইয়্যাত’ও রয়েছে সেখানে। পাওয়া গেল জীবনানন্দকে নতুন করে আবিষ্কারকারী ‘ময়ূখ’ পত্রিকার কয়েকটি সংখ্যা। জীবনানন্দের মৃত্যুর পরের বছর হাওড়া গার্লস কলেজ তাকে নিয়ে যে সংকলনটি করেছিল, তারও একটি কপি। মিলল ধূসর পাণ্ডুলিপির প্রথম সংস্করণ।
এই ভবন থেকে এখনো ‘সন্দেশ’ নামে একটি পত্রিকা বের হয়। এটি এখন সমবায় সমিতি। অমিতানন্দ এটির সেক্রেটারি। আর কলেজ স্ট্রিটে ‘নিউ স্ক্রিপ্ট’ নামে যে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান চালু করেছিলেন অশোকানন্দ, তিনি সেটিরও দেখাশোনা করেন।
শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পরে জীবনানন্দের মরদেহ আনা হয় এই বাড়িতেই। রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে মারা যাওয়ার পর মধ্যরাতে গাড়িতে মরদেহ আনা হয়। সারা রাত মরদেহ রাখা হয় দোতলায়। ভোরবেলা নামানো হয় বাড়ির সামনে। আসতে থাকেন আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু, সুহূদ, সহকর্মীরা। হাসপাতালে সেবা-শুশ্রূষা করেছিলেন শান্তি ব্যানার্জি নামে যে মমতাময়ী নার্স, তিনিও এলেন। অর্থাৎ জীবনানন্দের শরীর সর্বশেষ স্পর্শ করেছিল এই বাড়ির আঙিনা ও ঘর। নিজের ১৮৩ ল্যান্সডাউন রোডের বাড়িতে মৃত্যুর পরে আর তাকে নেয়া হয়নি। ওই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন সর্বশেষ ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যায়। ফলে ১৭২/৩ রাসবিহারী এভিনিউয়ের এই বাড়িতেই জীবনানন্দের সর্বশেষ স্মৃতি। কেননা এখান থেকেই মরদেহ নেয়া হয় কেওড়াতলা মহাশ্মশানে, সেখানে দাহ করে ভস্ম করে দেয়া হয় একজন কবিকে; একজন নির্জনতাপ্রিয় মানুষকে, সারা জীবন যাকে এক বিপন্ন বিস্ময় তাড়িয়ে বেরিয়েছে।
কবিতা ভবন
অশোকানন্দের বাড়ি থেকে আরেকটু পুব দিকে হাঁটলে গড়িয়াহাট মোড়ের কাছে হাতের ডান দিকে চোখে পড়ে ২০২ রাসবিহারী এভিনিউ। এই ভবন থেকে বেরিয়েছিল তৎকালীন অনেক লেখকের কালজয়ী সব গ্রন্থ, যার মধ্যে অন্যতম জীবনানন্দের ‘বনলতা সেন’। কবিতা ভবনের ‘এক পয়সায় একটি’ গ্রন্থমালার অন্তর্ভুক্ত হয়ে ১৯৪২ সালের ডিসেম্বরে কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়, যার প্রচ্ছদশিল্পী ছিলেন শম্ভু সাহা।
বুদ্ধদেব এই বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। তিনতলা বাড়িটার উপরের দুইতলা এখন পরিত্যক্ত। জরাজীর্ণ। যেকোনো সময় ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। উপরের তলায় একটি সাইনবোর্ডে লেখা ‘শ্রী দুর্গা ধাম’। নিচে ‘অনুরাধা’ ও ‘জলসাঘর’ নামে দুটি কাপড়ের এবং ‘টাইমকো’ নামে একটি ঘড়ির দোকান।
এখন এই বাড়ির উপরের তলায় ওঠার কোনো অবস্থা নেই। পলেস্তারা খসে পড়ে এখন ভেতরের লাল ইটও বেরিয়ে এসেছে। যেকোনো সময় হুড়মুড় করে ভেঙে পড়লে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বোধ করি বাড়িটাকে অতটা গুরুত্বপূর্ণ ভাবছে না। ভাবলে এত দিনে এটিকে হেরিটেজ ঘোষণা না করার কোনো কারণ নেই।
রাসবিহারী এভিনিউয়ের চওড়া সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে কিছুটা দূর থেকে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকলে কেবলই মায়া হয়। আহা, এই বাড়ির দোতলায় বসেই বুদ্ধদেব প্রকাশ করেছিলেন ‘বনলতা সেন’, প্রুফ দেখেছিলেন ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র। ‘কবিতা’ পত্রিকারও কয়েকটি সংখ্যা বেরিয়েছিল এই ঠিকানায়। বস্তুত ওই সময়ের বলতে গেলে সব কবি-সাহিত্যিকের দম ফেলার জায়গা ছিল এই বাড়িটি।
বুদ্ধদেব বসুর মেয়ে মিনাক্ষী দত্তর সঙ্গে এই বাড়িটি নিয়ে আমার আলাপ হয় গত ২৬ জানুয়ারি। কলকাতার জোড়াসাঁকোয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ির সামনে লিটল ম্যাগাজিন উৎসবে। আবছায়া স্মৃতি ঘেঁটে বললেন, ‘ওঁর (জীবনানন্দ) তো খুব লাজুক স্বভাব ছিল। দরজা খুলে আগে দেখত কেউ আছে কিনা। বাবা ছাড়া কেউ থাকলে দ্রুত নেমে যেত। বাবা ছাড়া কারো মুখোমুখি হতো না। আবার সোফায় বসত সামনে ঝুঁকে। যেন এখনই উঠে যাবে।’
অপর্ণা মজুমদারকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বুদ্ধদেবের স্ত্রী প্রতিভা বসু (কোরক, প্রাক-শারদ ১৪০৫, পৃষ্ঠা ৭২) বলেছেন, ‘আড্ডা আমাদের বাড়িতে প্রায় নিয়মিত ছিল। বিভিন্ন ধরনের মানুষ আসতেন। কিন্তু আশ্চর্য জীবনানন্দকে কখনো সে আড্ডায় বিশেষ যোগ দিতে দেখিনি। হয়তো কখনো এসে পড়লেন, কিন্তু লোকজন দেখলেই তিনি আর দাঁড়াতেন না। বুদ্ধদেব একা থাকলেই হয়তো তিনি একটু বসলেন।’
আত্মজীবনীতে (বুদ্ধদেব বসু, আত্মজৈবনিক, পৃষ্ঠা ২০০১) কবিতা ভবনে এক সন্ধ্যার বর্ণনা দিচ্ছেন বুদ্ধদেব নিজেই: ওইদিন কবিতা পাঠের আসর ছিল। কিন্তু নিজের ভেতরে থাকা মানুষটি (জীবনানন্দ) এসেই বললেন তার দাঁতে ব্যথা। বুদ্ধদেবরা অনেক চেষ্টা-তদবির করেও জীবনানন্দের মুখ থেকে একটা কবিতার লাইনও বের করতে পারেননি। বরং শিশুর মতো গালে হাত দিয়ে বলতে থাকেন, ‘উহ! দাঁতে ব্যথা।’ বলতে বলতে চিরাচরিত শশক-পদক্ষেপে উঠে চলে যান।
বাড়ির ভেতরটা কেমন ছিল? বুদ্ধদেব লিখছেন, ‘বাড়িতে একটিমাত্র লেখার টেবিল, আমি সেটি প্রায় সারাক্ষণ জুড়ে থাকি। রানু লেখে মেঝেতে বসে। দরজার পাল্লায় ঠেস দিয়ে। তার হাঁটুতে প্যাড, মনোযোগ বারবার বিস্রস্ত। তাকে কখনো উঠে যেতে হয় ভৃত্যের কথায়, রান্নার তদারকিতে, কখনো সন্তানের খুনসুটি আবদার মেটাতে, বাড়িতে অতিথি এলে তাদের আপ্যায়নের ভারও তার। এরই মধ্যে চলে লেখালেখি।’ অর্থাৎ একদিকে বুদ্ধদেব, অন্যদিকে তার স্ত্রী। একই ছাদের নিচে দুই লেখক।
বুদ্ধদেবের মেয়ে দয়মন্তী বসু সিং জানাচ্ছেন, উত্তরের বারান্দায় সুভাষচন্দ্র বসুর বিশাল এক আবক্ষ পোর্ট্রেট ছিল। ছবিটি এঁকেছিলেন সৌরেন সেন। বাড়ির অদূরেই দেশপ্রিয় পার্কে আজাদ হিন্দ ফৌজের জনসভার জন্য। সভা শেষে পোর্ট্রেটটি এই বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। কারণ বুদ্ধদেবের বড় মেয়ে মিনাক্ষী ছিলেন নেতাজির বিরাট ভক্ত। পরে অবশ্য ছবিটা এই বাড়ি থেকে সম্ভবত নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওতে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই বাড়িতে আড্ডা হতো বিশুদ্ধ বাঙালি শৈলীতে। আয়োজনহীন, কিন্তু স্বতঃস্ফূর্ত। সন্ধ্যা থেকে রাত সাড়ে ১০টা। অতিথিদের আসা-যাওয়া। অল্প পরিসরেই প্রাণখোলা আড্ডা। সপ্তাহের প্রতিদিন, বছরের বারো মাস। বিরামহীন। কোনো সন্ধ্যাই ফাঁকা যায় না। আপ্যায়নের মেনু শুধুই চা। মাঝে মধ্যে বড়জোর ডালমুট কিংবা পাঁপর ভাজা। তাতেই তুষ্টি।
তবে শেষ দিকে ১৮৩ ল্যান্সডাউন রোডের বাড়িটা ছাড়ার জন্য জীবনানন্দ যেমন অস্থির হয়ে উঠেছিলেন, বুদ্ধদেবের ক্ষেত্রে ঘটেছিল ঠিক তার উল্টো। ২০২ রাসবিহারী এভিনিউয়ের বাড়িটা ছাড়তে হবে, এই কথা ভেবে ঘুমের মধ্যেও তিনি অসহ্য যন্ত্রণায় ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠতেন। ১৯৬৫ সালে নাকতলা এলাকায় নিজের বাড়িতে চলে যান বুদ্ধদেব। অর্থাৎ ২০২ রাসবিহারী এভিনিউয়ে তারা ছিলেন ৩০ বছর।
জলযোগের সামনে সেই ট্রাম
বরিশালে থাকতেই জীবনানন্দের হাঁটার নেশা ছিল। ছোট ভাই অশোকানন্দকে নিয়ে হেঁটেছেন মাইলের পর মাইল। এত হাঁটাহাঁটির পরও ডায়াবেটিস তাকে ক্ষমা করেনি। ফলে শেষ দিকে হাঁটাটা শারীরিক প্রয়োজনেই বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। প্রতিদিন তার এই সান্ধ্যভ্রমণের অন্যতম সঙ্গী সুবোধ রায় (জীবনানন্দ স্মৃতি, মাসিক বসুমতি, অগ্রহায়ণ ১৩৬২) জানাচ্ছেন, প্রতিদিন তারা পাঁচ থেকে সাত মাইল হাঁটতেন। ল্যান্সডাউন রোড দিয়ে রাসবিহারী এভিনিউয়ের কিছুটা পশ্চিমে, তারপর রসা রোড ছুঁয়ে সাদার্ন এভিনিউ দিয়ে সোজা গড়িয়াহাটার গোল পার্ক। কোনোদিন চক্রাকারে প্রদক্ষিণ করতেন ঢাকুরিয়া লেক থেকে ছোট লেক, একেবারে টালিগঞ্জের ব্রিজ পর্যন্ত।
যেদিন দুর্ঘটনা ঘটে, ওইদিন বিকালেই জীবনানন্দের বাসায় বসে আগের দিন বেতারে কবিতা পড়ার অভিজ্ঞতা শুনেছিলেন সুবোধ রায়। পরে হাঁটতে বেরোনোর জন্য বাসায় যান পোশাক বদলাতে। কিন্তু জীবনানন্দ তার অপেক্ষা না করে একাই বেরিয়ে পড়েন। ভেবেছিলেন সুবোধের সঙ্গে পথেই দেখা হবে। ফেরার পথে রাস্তা পেরোনোর সময় সেই বিস্ময়কর দুর্ঘটনা। ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় ‘জলখাবার’ নামে একটি মিষ্টির দোকান এবং ‘জুয়েল হাউজ’ নামে গহনার দোকানের সামনে থেকে রাস্তা পেরোনোর সময় ট্রামের সঙ্গে ধাক্কা খান। ধারণা করা হয়, ডায়াবেটিসের কারণে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গিয়েছিলেন কিংবা অন্যমনস্ক ছিলেন। শেষদিকে এই অন্যমনস্কতা তীব্র আকার ধারণ করে। ট্রামের ক্যাচার থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করা হয় কবি জীবনানন্দ দাশকে। যে বাহনের নিচে পড়ে সাধারণত কেউ হতাহত হয় না, সে রকমই এক বাহন এই রাসবিহারীতে নতুন এক ইতিহাসের জন্ম দিয়ে গেল।
রাসবিহারীর ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে একটি ভবনের দোতলায় চোখে পড়ে সাইনবোর্ড ‘জুয়েল হাউজ’। আহা, এই তো সেই দোকান। সাইনবোর্ডে লেখা ‘পরেশ নাথ দত্ত এন্ড সন্স প্রাইভেট লিমিটেড; জুয়েল হাউজ, ১২৮ রাসবিহারী এভিনিউ, রাজকমল অ্যাপার্টমেন্ট’। কিন্তু জলখাবারটা কোথায়?...
লেখক ও গবেষক মধুময় পাল জানাচ্ছেন, দোকানটি ছিল ল্যান্সডাউন ও রাসবিহারী মোড়ের কাছেই। তার দু-তিনটি দোকান পরেই জুয়েল হাউজ। যেহেতু জীবনানন্দের ডায়াবেটিস ছিল এবং ডায়াবেটিস রোগীদের লুকিয়ে মিষ্টি খাওয়ার প্রবণতা থাকে, ফলে তিনিও লুকিয়ে ওই জলখাবারে গিয়ে মিষ্টি খেতেন। এদিক-ওদিক ভালো করে তাকাতেন। দেখতেন পরিচিত কেউ আছে কিনা। দোকানটা যেহেতু বাড়ির ঠিক উল্টো দিকেই, ফলে পরিচিতজন থাকাটাই স্বাভাবিক। পরিস্থিতি বুঝে দোকানিকে বলতেন, দুটো রসগোল্লা দিন। সেই রসগোল্লা খাওয়ার দোকানের সামনেই ঘটল ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনা।
জলখাবারের নামটি পরবর্তীতে বদলে হয় শেলী ক্যাফে। দোকানটি এখন আর নেই। ক্লিন্টন বি সিলি (অনন্য জীবনানন্দ, পৃষ্ঠা ১৩) জানাচ্ছেন, জীবনানন্দকে ট্রামের ক্যাচার থেকে বের করেছিলেন শেলী ক্যাফের মালিক চুনি লাল দেব, রাসবিহারী ও ল্যান্সডাউন মোড় থেকে ১০ কদম দূরেই ছিল যার দোকান। পরবর্তীকালে জীবনানন্দ গবেষকরা দুর্ঘটনাস্থলটি চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন এবং সেই ছবিও বিভিন্ন বইতে সংযুক্ত হয়েছে। তখন ট্রাম লাইন ছিল মাটির ওপর। ঘাস ছিল। কিন্তু কলকাতার ট্রামগুলো এখন পিচঢালা রাস্তার ওপর। একপাশ দিয়ে বাস ও অন্যান্য বাহন, অন্য পাশ দিয়ে ট্রাম।
সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়ের (সেই রাতে রাসবিহারীর ট্রাম হয়ে উঠল ইতিহাসযান, এই সময়, ২২ অক্টোবর ২০১৩) ভাষায়, ‘এক হেমন্তরাতে নিয়তিতাড়িত যে ট্রাম রাসবিহারী এভিনিউর ঘাস চিরে এগিয়ে আসে, দেশপ্রিয় পার্ক পার হতেই সে রূপান্তরিত হয়ে যায় ইতিহাসযানে। জীবনানন্দ শেলী কাফের সামনে কিয়স্কের পাশে থ্যাঁতা ইঁদুরের মতো রক্তমাখা ঠোঁটে পড়ে থেকে আমাদের বিস্মিত করে রেখে গেলেন চিরদিনের মতো।’
রাসবিহারী এভিনিউয়ের চওড়া সড়কের পাশে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করি কখন সিটি বাজিয়ে একটি ট্রাম আসে। তারপর সত্যিই আসে। একবার পুব থেকে পশ্চিমে, তারপর পশ্চিম থেকে পুবে চলে যায় মাঝারি গতির এই বাহন। আনন্দবাজার পত্রিকা (দেবাশিস ঘড়াই, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮) জানাচ্ছে, যে ট্রামটি জীবনানন্দকে ধাক্কা দিয়েছিল, কাকতালীয়ভাবে সেই ট্রামটি পরবর্তীতে এক অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। প্রশ্ন হলো, এটা কি নেমেসিস (অন্যায়ের প্রতিশোধ), নাকি সেই বিপন্ন বিস্ময়!






