প্রথম ভাগ আদৌ লিখিত হয় নাই, অথচ দ্বিতীয় ভাগ মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইয়া গিয়াছে—এরূপ গ্রন্থ সকল দেশের সাহিত্যেই নিতান্ত সুদুর্ল্লভ, কেবল বঙ্গসাহিত্যেই এরূপ একখানি মাত্র গ্রন্থ দেখিতে পাওয়া যায়—তাহার নাম ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’। পুণ্যশ্লোক বিদ্যাসাগর মহাশয় সেই “অদ্বিতীয়” গ্রন্থ রচনা করিয়া যেরূপ বিচারবুদ্ধির প্রাখর্য্য প্রকাশিত করিয়াছিলেন, তাহার প্রকৃত মর্য্যাদা অনুভব করিতে অসমর্থ হইয়া, তাঁহার জীবিতকালেই অনেকে বাঙ্গালার ইতিহাসের ‘প্রথম ভাগ’ রচনা করিবার জন্য ব্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন। তাহার ফলে বঙ্গসাহিত্যে এক অলৌকিক উপাখ্যান, ইতিহাসের মর্য্যাদা লাভ করিয়া, সকলের নিকট সুপরিচিত হইয়া পড়িয়াছে। তাহা “বক্তিয়ার খিলজির বঙ্গ-বিজয়”—অথবা “লক্ষ্মণসেনের পলায়ন-কলঙ্ক!” এই কলঙ্ককাহিনী বন্যাতাড়িত আবর্জ্জনারাশির ন্যায় রঙ্গালয়ের দ্বারদেশে পুঞ্জীকৃত হইবা মাত্র, তদ্দ্বারা অর্থোপার্জ্জনের সুযোগ লক্ষ্য করিয়া, বঙ্গ রঙ্গালয় তাহাকে পরম সমাদরে ক্রোড়ে তুলিয়া লইবার পর, তাহা ক্রমে নিরক্ষর নর-নারীর নিকটেও সুপরিচিত হইয়া উঠিয়াছে! এত কালের পর সম্প্রতি একজন সুনিপুণ চিত্রকর তাহা লইয়া একখানি চিত্রপট রচনা করিয়া, লক্ষ্মণসেনের পলায়ন-কলঙ্ক চিরস্মরণীয় করিবার চেষ্টা করিয়াছেন। যাহা এইরূপে বাঙ্গালীর গৃহে গৃহে চিরপরিচিত হইয়া উঠিয়াছে, তাহা যে সর্ব্বথা অলীক, এখন তাহার আলোচনা করিতেও অনেকে অসম্মত হইতে পারেন। কিন্তু স্বদেশের ইতিহাসের সকল ঘটনাই স্বাধীনভাবে আলোচনা করা কর্ত্তব্য,—যাহা সত্য, তাহা নির্ণয় করিয়া, প্রচলিত ইতিহাসের সংশোধনকার্য্যে হস্তক্ষেপ করা কর্ত্তব্য,—কালবিলম্বে অসত্য কখনও সত্যের মর্য্যাদা লাভ করিতে পারে না। লক্ষ্মণসেনের পলায়ন-কলঙ্কের মূলে আদৌ কোন সত্য সংশ্রব বর্ত্তমান আছে কিনা, এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধে তাহাই সংক্ষেপে আলোচিত হইবে। পূর্ব্বে অনেকবার “বক্তিয়ার খিলিজির বঙ্গবিজয়” সমালোচনা করিতে গিয়া, প্রসঙ্গক্রমে লক্ষ্মণসেনের পলায়ন-কলঙ্কের কিছু কিছু আলোচনা করিয়াছিলাম। এখন চিত্রপট প্রকাশিত হইতেছে দেখিয়া মনে হইতেছে,—বঙ্গসাহিত্যে যাহা প্রকাশিত হয়, সকল শিক্ষিত বঙ্গবাসী তাহা পাঠ করেন কিনা সন্দেহ!
বক্তিয়ার খিলিজির বঙ্গগমনের ষষ্টি বর্ষ পরে, সুবিখ্যাত মুসলমান ইতিহাসলেখক মিন্হাজ-ই-সিরাজ এদেশে উপনীত হইয়াছিলেন। তিনি “তবকাৎ-ই-নাসেরী” নামক দিল্লী-সাম্রাজ্যের যে ইতিহাস রচনা করিয়া গিয়াছেন, তাহার বিংশ পরিচ্ছেদে প্রসঙ্গক্রমে বঙ্গভূমির কিছু কিছু সংক্ষিপ্ত কাহিনী উল্লিখিত হইয়াছে। তাহাতে লিখিত আছে—বক্তিয়ার সপ্তদশ অশ্বারোহী লইয়া “নওদিয়া” নামক রাজধানীতে উপনীত হইবামাত্র, “রায় লছমনিয়া” নামক হিন্দু নরপতি পলায়ন করিয়াছিলেন। মিনহাজ বিচারনিপুণ ঐতিহাসিকের ন্যায় এই কাহিনীর সত্যাসত্য নির্ণয়ে অগ্রসর না হইয়া, লিখিয়া গিয়াছেন,—যাহারা বক্তিয়ারের সহিত বিজয়-যাত্রায় বহির্গত হইয়াছিল, তাহাদের মধ্যে যাহারা তখন পর্য্যন্ত জীবিত ছিল, তাহাদের মুখে এই কাহিনী শ্রবণ করিয়াছিলেন। মিন্হাজের গ্রন্থ প্রমাণরূপে উল্লিখিত করিয়া, বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে এই কাহিনী সংকলিত হইবার পর, ইহা ক্রমশঃ সর্ব্বত্র প্রচারিত হইয়া পড়িয়াছে। ইহার মূল প্রমাণ মিন্হাজের গ্রন্থ,—একমাত্র প্রমাণ মিন্হাজের গ্রন্থ,—তাহারও একমাত্র প্রমাণ বৃদ্ধ সৈনিকের পুরাতন আখ্যায়িকা! বক্তিয়ার খিলিজির বঙ্গগমনের ষষ্টিবর্ষ পরে এদেশে আসিয়া, মিন্হাজ যে বৃদ্ধ সৈনিকের নিকট এই অলৌকিক কাহিনী শ্রবণ-করিয়াছিলেন বলিয়া লিখিয়া গিয়াছেন,—তিনি তখন অশীতপর বৃদ্ধ;—তাঁহার সত্যনিষ্ঠা বা আত্মগৌরব-ঘোষণার প্রবল প্রলোভন কতদূর প্রবল ছিল, এতকাল পরে তাহার মীমাংসা করিবার সম্ভাবনা নাই!
মুসলমানাগমনের অব্যবহিত পূর্ব্ববর্ত্তী যুগে যাঁহারা এ দেশের রাজসিংহাসন অলংকৃত করিতেন, সেই সকল সুগৃহীতনামা নরপালগণের নানা শাসন-লিপি আবিষ্কৃত হইয়া, আমাদিগের নিকটে যে সকল পুরাতত্ত্বের দ্বার উদ্ঘাটিত করিয়া দিয়াছে, তাহা সপ্তদশ অশ্বারোহীর অলৌকিক দিগ্বিজয়কাহিনীর সামঞ্জস্য রক্ষা করিতে পারে না। বাঙ্গালার ইতিহাসের প্রধান দুর্ভাগ্য সকল যুগেই সমানভাবে বর্ত্তমান,—সকল যুগেই তাহা বিজেতার বিদ্বেষপূর্ণ বিকৃত লেখনী হইতে প্রসূত হইয়াছে,—কোন যুগেই দেশের লোকে দেশের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করিবার আয়োজন করেন নাই!
বক্তিয়ার স্বাধীনভাবে প্রাচ্যভারতে সাম্রাজ্য সংস্থাপনে অগ্রসর হইয়া, কিয়ত্পরিমাণে কৃতকার্য্য হইবামাত্র, দিল্লীর মুসলমান বাদশাহ, তাহাকে দিল্লীসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করিবার জন্য লালায়িত হইয়া উঠিয়াছিলেন। ইহার জন্য প্রথম হইতেই দিল্লীসাম্রাজ্য এবং গৌড়ীয়সাম্রাজ্যের মধ্যে কলহ সংঘটিত হইবার সূত্রপাত হয়,—এবং ইহার জন্যই দিল্লীর ইতিহাসলেখকগণ দিল্লীর গৌরব ঘোষণা করিয়া (গৌড়ীয় সাম্রাজ্যের কলঙ্ক কীর্ত্তন করিয়া) ইতিহাস রচনা করিতে প্রবৃত্ত হন। যে সকল মুসলমান বীর শোণিত ক্ষয় করিয়া গৌড়ীয় সাম্রাজ্যে অধিকার বিস্তার করিয়াছিলেন, দিল্লীশ্বর তাঁহাদিগের কোনরূপ সহায়তাসাধন না করিয়াই, তাঁহাদিগের বিজয়গৌরবের ফলভোগ করিবার জন্য লালায়িত হইয়া উঠিয়াছিলেন। দিল্লীসাম্রাজ্যের ইতিহাস লেখকের পক্ষে এই সকল কারণে গৌড়ীর মুসলমানগণের দিগ্বিজয় ব্যাপারকে অনায়াসলব্ধ অকিঞ্চিত্কর যুদ্ধগৌরব বলিয়া ব্যাখ্যা করা অভ্যস্ত হইয়া উঠিয়াছিল। মিন্হাজের কাহিনী আদৌ কোনও বৃদ্ধ সৈনিকের নিকট হইতে সংকলিত, অথবা তাঁহার কপোলকল্পিত মাত্র, তদ্বিষয়েও সন্দেহশূন্য হইবার উপায় নাই!
যাহা হউক, বক্তিয়ার খিলিজির বঙ্গাগমন সময়ে এদেশ রাঢ়, মিথিলা, বরেন্দ্র বঙ্গ এবং বাগ্ড়ী নামক ভাগপঞ্চকে বিভক্ত থাকিবার কথা আমরা মুসলমান লেখকদিগের গ্রন্থেই দেখিতে পাই। তৎকালে এই পঞ্চবিভাগ গৌড়ীর সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ও এক রাজার অধীন ছিল। বিক্রমপুর, লক্ষ্মণাবতী এবং লক্ষৌ নামক তিন স্থানে তিনটি রাজধানী প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই বর্ণনায় “নওদিয়া” নামক স্থানে কোনও রাজধানী সংস্থাপিত থাকিবার উল্লেখ নাই। “নওদিয়া” কোথায় ছিল,—তাহা রাজধানী হইলে, তত্প্রদেশে মুসলমান জায়গীর প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল কিনা,— রায় লছমনিয়াই বা কাহার নাম—এ সকল প্রশ্নের কোনরূপ সদুত্তর প্রাপ্ত হইবার উপায় নাই।
গৌড়ীয় ধ্বংসাবশেষের মধ্যবর্ত্তী খালিমপুর নামক আধুনিক গ্রামে ধর্ম্মপাল নামক নরপালের যে তাম্রশাসন আবিষ্কৃৃত ও স্বর্গীয় উমেশচন্দ্র বটব্যাল মহাশয়ের যত্নে প্রকাশিত হয়, তাহাতে দেখিতে পাওয়া যায়,—ধর্ম্মপালের রাজধানী পাটালপুত্রেই সংস্থাপিত ছিল। তিনি মগধাধিপতি হইয়াও, গৌড়ীয় সাম্রাজ্যের কিয়দংশে অধিকার বিস্তার করিয়াছিলেন। মুঙ্গেরে আবিষ্কৃৃত দেবপাল নামক নরপালের তাম্রশাসনে দেখিতে পাওয়া যায়,—তৎকালে রাজধানী মুদ্গগিরি নগরেই সংস্থাপিত ছিল। তাহার পর বঙ্গভূমির নানা স্থানে—পূর্ব্ব এবং উত্তরবঙ্গে—পালনরপালগণের রাজ্য ও রাজধানী সংস্থাপিত হইবার পরিচয় নানা শাসনলিপিতে প্রাপ্ত হওয়া যায়। পাবনার অন্তর্গত মাধাইনগরে আবিষ্কৃৃত লক্ষ্মণসেন দেবের একখানি তাম্রশাসনে দেখিতে পাওয়া যায়,—“কর্ন্নাট ক্ষত্রিয়বংশের” সেন নরপালগণ বঙ্গভূমিতে কিরূপে অধিকার বিস্তার করিয়াছিলেন। এই রাজবংশের বিজয়সেন দেব নামক নরপাল রাজসাহীর অন্তর্গত বরেন্দ্র প্রদেশে প্রদ্যুম্নেশ্বর মন্দির নামক মন্দির প্রতিষ্ঠার সময়ে যে ফলকলিপি রচনা করাইয়াছিলেন, তাহাতে বিজয়সেন দেবের বিজয়কাহিনী উল্লিখিত আছে। বিজয়সেনের পুত্র বল্লালসেন গৌড়াধিকার করিয়া, “গৌড়েশ্বর” নাম গ্রহণ করেন। তিনিও বীরকীর্ত্তির জন্য প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন। তাঁহার পুত্র লক্ষ্মণসেন দেব পশ্চিমে কাশী এবং পূর্ব্বে কামরূপ পর্য্যন্ত বিজয় লাভ করিয়া, বীরকীর্ত্তির জন্য বিখ্যাত হইয়া উঠিয়াছিলেন। মুসলমান ইতিহাসলেখকগণ বলেন,—এই নরপতির নামানুসারেই পুরাতন গৌড়নগরের নাম “লক্ষ্মণাবতী” বলিয়া পরিচিত হইয়া উঠিয়াছিল। অনেক দিন পর্যন্ত এদেশের মুসলমান রাজ্য দিল্লীর ইতিহাসলেখকদিগের গ্রন্থে “লক্ষ্মণাবতীরাজ্য” বলিয়াই উল্লিখিত আছে। লক্ষ্মণসেনের বীরপুত্র বিশ্বরূপসেনের শাসনলিপিতে দেখিতে পাওয়া যায়,—তিনি বাহুবলে আত্মরক্ষা করিয়া—
“গর্গযবনান্বয় প্রলয় কালরুদ্র”
নামে পরিচিত হইয়াছিলেন। মিন্হাজ যখন এদেশে পদার্পণ করেন, তখনও (বক্তিয়ার খিলিজির বঙ্গাগমনের ষষ্টিবর্ষ পরেও) পূর্ব্ববঙ্গ লক্ষ্মণসেনের পুত্রগণের অক্ষুণ্ন অধিকারে বর্ত্তমান ছিল,—তদ্দেশে তখন পর্য্যন্তও মুসলমানশাসন বিস্তৃত হইতে পারে নাই।
শাসনলিপির ও মুসলমান-ইতিহাসলেখকের এই সকল উক্তির সমালোচনা করিলে বুঝিতে পারা যায়,—বক্তিয়ার সহজে এদেশে অধিকার বিস্তার করিতে পারেন নাই;—তিনি যেখানে অধিকার বিস্তার করিয়াছিলেন, তাহা লক্ষ্মণাবতীর নিকটবর্ত্তী কয়েকটি পরগণা মাত্র; এবং সেখানেই মুসলমানদিগের সর্ব্বপ্রথম জায়গীর লাভের প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া যায়। অধ্যাপক ব্লকম্যান পুরাতন বঙ্গভূমির ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক তথ্য সংকলনের জন্য প্রভূত অধ্যবসায় স্বীকার করিয়া যে প্রবন্ধ রচনা করিয়া গিয়াছেন, তাহাতে তিনিও লিখিয়া গিয়াছেন,—“দিনাজপুরের অন্তর্গত দেবকোট নামক স্থানে একটি সেনানিবাস সংস্থাপিত করিয়া, বক্তিয়ার যুদ্ধকলহে লিপ্ত ছিলেন; এবং সেই সেনানিবাসই তাঁহার বিজয়রাজ্যের পূর্ব্বোত্তর সীমা বলিয়া পরিচিত ছিল।” এই সেনানিবাসে ১২০৫ খৃষ্টাব্দের সমসময়ে বক্তিয়ার খিলিজির মৃত্যু হয়। উত্তরবঙ্গের “রাজরাজন্যকগণের” দীর্ঘকাল পর্য্যন্ত বাহুবলে স্বাধীনতা রক্ষা করিবার কথা অধ্যাপক ব্লকম্যান স্পষ্টাক্ষরে ব্যক্ত করিয়া গিয়াছেন। এই সকল প্রমাণ অতিবৃদ্ধ মুসলমান সৈনিকের অলৌকিক আখ্যায়িকার সামঞ্জস্য রক্ষা করিতে পারে না।
সে আখ্যায়িকার যে “নওদিয়ার” রাজধানী ও “রায় লছমনিয়া” নামক নরপতির উল্লেখ আছে, তাহার সহিতও শাসনলিপির সামঞ্জস্য দেখিতে পাওয়া যায় না। এরূপ ক্ষেত্রে কেহ কেহ অনুমান করিয়া লইয়াছিলেন,—“নওদিয়া” নবদ্বীপের অপভ্রংশ মাত্র, এবং “লছমনিয়াও” তবে লক্ষ্মণসেনেরই অপভ্রংশ! মিন্হাজ লিখিয়া গিয়াছেন,—“রাজ্যাব্দের অশীতিবর্ষে বক্তিয়ার খিলিজির দিগ্বিজয় সুসম্পন্ন হইয়াছিল।” তদনুসারে আরও একটি অনুমানের আশ্রয় গ্রহণ করা অনিবার্য্য হইয়া পড়িয়াছিল। কাহারও পক্ষে অশীতিবর্ষ পর্য্যন্ত রাজ্যভোগ করা সম্ভব বলিয়া বোধ হয় না;—শৈশবে সিংহাসনে আরোহণ করিবার অনুমানও লক্ষ্মণসেনের পক্ষে সুসঙ্গত হইতে পারে না। কারণ, তিনি যে পরিণত বয়সেই পিতৃসিংহাসনে আরোহণ করেন, তাহার নানা প্রমাণ ও কিংবদন্তী সংস্কৃত সাহিত্যে সুপরিচিত। বল্লাল ও লক্ষ্মণসেনের মধ্যে যে সকল কবিতা বিনিময় হইত, তাহা এখনও কণ্ঠে কণ্ঠে ভ্রমণ করিতেছে। এরূপ অবস্থায় একটি অসামান্য অনুমানের অবতারণা করা অনিবার্য্য হইয়া পড়িয়াছিল। সকল রাজার পক্ষেই সিংহাসনে আরোহণ করিবার সময় হইতে রাজ্যাব্দ গণনা করিবার রীতি প্রচলিত ছিল;—কেবল লক্ষ্মণসেনের পক্ষেই তাঁহার জন্মতিথি হইতে অব্দ গণনা করিবার একটি অসামান্য রীতির অনুমান করিয়া লওয়া হইয়াছিল! “লক্ষ্মণ সংবৎ” নামক একটি অব্দগণনারীতি অদ্যাপি মিথিলায় কোন কোন স্থানে প্রচলিত আছে:—এক সময়ে নানা স্থানে এই অব্দ ধরিয়া শিলালিপি খোদিত হইত। শ্রীযুক্ত রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় বুদ্ধগয়ার দুইখানি শিলালিপিতে এইরূপ অব্দ গণনার উল্লেখ দেখিয়া, তাহার সমালোচনা করিয়া দেখাইয়া দিয়াছেন,—“৫১ লক্ষ্মণাব্দের পূর্ব্বে কোনও সময়ে লক্ষ্মণসেন দেবের দেহান্তর সংঘটিত হয়। মুসলমান-ইতিহাসলেখক লক্ষ্মণসেনকে পলায়ন-কলঙ্কে কলঙ্কিত করেন নাই;—তদীয় রাজ্যাব্দের অশীতি বর্ষে দিগ্বিজয়ের উল্লেখ করিয়া গিয়াছেন;—আমরাই তথ্যনির্ণয়ে অগ্রসর না হইয়া, অনুমানবলে “রায় লছমনিয়াকে” লক্ষ্মণসেন বলিয়া ধরিয়া লইয়া, অযথা কলঙ্কে স্বদেশের ইতিহাস মলিন করিয়া তুলিতেছি!
দুঃখ এই—যে বর্ষে এই সকল তথ্য আবিষ্কৃৃত হইয়া, লক্ষ্মণসেনের অলীক কলঙ্কের অপনোদন করিয়া দিয়াছে, ঠিক সেই বর্ষেই কলাসমিতির পক্ষ হইতে এক চিত্রকরের “পলায়ন কলঙ্ক” নামক একখানি সর্ব্বথা কাল্পনিক চিত্র প্রকাশিত হইয়াছে; আর—আর সেই সুনিপুণ চিত্রকর—একজন বাঙ্গালী!
[প্রবাসী ১০ম সংখ্যা, মাঘ, ১৩১৫ ]






