শীতলপাটির নিচে চুন-সুড়কির এবড়োখেবড়ো মেঝে পিঠে লাগে যাদের, তাদের কথক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। আমাদের প্রধানতম কথাসাহিত্যিকদের একজন। উপন্যাসের সংখ্যার নিরিখে তিনি অত্যন্ত স্বল্পপ্রজ, কিন্তু সেই সাংখ্যমানই হয়তো মনে করিয়ে দেয় প্রাকৃতিক জগতের সেই সত্যটিকে, উঁচুর দিকের প্রাণীর সন্তানসন্ততির সংখ্যা কম হয়। ওঁর লেখা নিয়ে গবেষণার অনেক সুযোগ রয়েছে নিশ্চয়ই, কিন্তু যাঁর প্রতি আন্তরিক পক্ষপাত থাকে, তাঁকে বিশ্লেষণ করা সহজ নয়, আমার জন্য নয়।
ইলিয়াসের উপন্যাস নিয়ে বলা হয়েছে অনেক, ‘চিলেকোঠার সেপাই’ ও ‘খোয়াবনামা পাঠকের-সমালোচকের ভুবনে একটি অবশ্যপূজ্য (এবং সর্বজনপূজ্যতে) মন্দিরবিশেষ, ইলিয়াসের গল্প নিয়েও প্রচুর কথা হয়েছে এবং বাংলা সাহিত্য যতদিন টিকে থাকবে ততদিনই বলা হবে নিশ্চয়ই, ওঁর উপন্যাসের কলকবজা নিয়ে কথা হবে, গল্পের চিত্রণ নিয়ে গবেষণা হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে ওঁর উপন্যাসের চেয়ে গল্পগুলোই আদরণীয় বেশি, সত্য সংগ্রহের ও সত্য প্রকাশের এক রকমের উন্মাদনা ইলিয়াসের লেখায় অন্তঃসলিলা হয়ে বয়ে যায়, তা কিছুতেই কোনো অসম্ভবের কাছে নতি স্বীকার করে না, কোনো কুশ্রিতাকে জরির ঢাকনা পরায় না, সেই উন্মাদনাকে পাঠক হিসেবে আমার একটু ছোট স্কেলে সইতে পারার সীমাবদ্ধতাই হয়তো এর কারণ। গল্পের ইলিয়াস খুব যত্ন করে অসংখ্য পলকাটা একটি হীরার মতো, এক কুচি অসামান্য উজ্জ্বলতা, যে গৃহী-বিজেতা-দস্যুর হাতে হাতে ফিরেছে রশ্মি বিকীর্ণ করে করে। কিংবা কখনো ফিলিগ্রির কাজ করা সাবেকি গহনার মতো, কারিগরের শিল্পিত হাতের প্রাচীন নকশা আছে তাতে, সময়াতীত বলেই যা অমূল্য। সীমিত সময়ের আওতায় তাঁর সবক’টি গল্প নিয়ে আলাপ সারা অসম্ভব, কিছু গল্প এবং তার শিল্পশৈলী নিয়ে এখানে কিছু সামান্য কথা বলতে চাই। এ ব্যাখ্যায় চিত্রকলার কিছু ঘরানার সাথে তুলনামূলক আলোচনা আসবে। কারণ ইলিয়াস পড়তে গিয়ে আমার বারবার মনে হয়েছে এর প্রধানতম আবেদন এর বর্ণিল চিত্রণে, এর টেক্সচারে। মাহমুদুল হকের ‘কালো বরফ’ উপন্যাসে যেমন চরিত্রগুলোর অধিকাংশ ডায়ালগ গন্তব্যের দিকে যাত্রা নয়, বরং আবহের অংশ, চরিত্র চিত্রণের অংশ, অন্তর্গত লিরিসিজমের অংশ, ইলিয়াসের অনেক গল্পেও তাই। মর্মভেদী তাঁর দৃষ্টি, বলার ভঙ্গি নির্মোহ, ক্ষেত্রবিশেষে নির্মম। তাঁর দৃশ্য নির্মাণের দ্রুতি মাতিসের রেখাগুলোর মতো কৃপণতায় ও মাধুর্যে ভরা। মাধুর্য না বলে বোধহয় বলা উচিত ‘অ্যাকিউরেসি’ বা ‘যথার্থতা’ শব্দটি। তাঁর কৌতুকবোধ তীক্ষতায় ও ক্ষিপ্রতায় চমকে দেয় পাঠককে। যা অস্বস্তিকর, যা বিব্রতকর, তাও অনায়াসে হয়ে ওঠে তাঁর গদ্যের উপাদান।
গদ্যভঙ্গির প্রসঙ্গ এলে বলা যায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ফিকশনাল প্রোজের ধরনটি হচ্ছে ন্যারেটিভ প্রোজ। এটি এক্সপোজিটরি নয়, এটি ব্যাখ্যা দেয় না, পারসুয়েসিভ প্রোজ নয় এটি, যা পাঠককে বুঝিয়েসুঝিয়ে একটি গন্তব্য অবধি নিয়ে যাবে, বরং এটি ঘটমানের ও পুরাঘটিতের বৃত্তান্ত শোনায় এবং কখনো কখনো এটি ডেস্ক্রিপ্টিভ প্রোজ, চিত্রধর্মী। এই বিবরণধর্মিতা পাঠককে ঋদ্ধ করে আবার বিক্ষিপ্ত করে, ইশারা করে, ইন্ধন জোগায়, কিন্তু ঠিক বলে-কয়ে দেয় না। মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ও জটিলতাকে পাঠকের কাছে হাজির করে, কিন্তু ব্যঞ্জনা বৈ আর কিছু হাতে তুলে দেয় না (‘মিলির হাতে স্টেনগান’ গল্পে যেমন করে আসে ‘সোহেল না সিডনি না ফয়সল’ বারবার), বাকিটা পাঠককে ব্যাখ্যা করে নিতে হবে। ‘যোগাযোগ’ গল্পে মামাবাড়ি বেড়াতে যাওয়া মা রোকেয়ার চোখ দিয়ে ইলিয়াস দেখাচ্ছেন, “স্বরূপখালী স্টেশনে নেমে যখন নৌকায় ওঠে, তারও আগ থেকে শৈশবের অল্প অল্প চেনা গোরু-বাছুর, সবুজ ও ধূসর গাছপালা, ন্যাংটো কালো রাখাল বালক, পুকুরপাড়ে পচা ঘাসের ঘন সুবাস, খড়ের হলদে গাদা, গেরস্থ বাড়ির ঈশান কোণে গোয়ালঘরের গন্ধ, হালকা মিষ্টি গন্ধের খোলা সাদা রোদ—কতকাল পর এদের দেখা পেয়ে রোকেয়ার সমস্ত বুক, পিঠ, মুখ, চোখ কানায় কানায় ভরে গিয়েছিল।’ কেবল একটি মাছরাঙা দেখে তার মনে হয় ফেলে আসা ছেলের কথা, কেন একটি ছোঁ মারা রঙিন পাখি দেখার সামান্য ইন্ধনে পুত্রের কথা মনে হয় রোকেয়ার? এখানে কি কোনো ইশারা রয়েছে ভবিষ্যতের? ফিল্মের ক্যামেরা যেমন অদৃশ্য আততায়ীর পয়েন্ট অব ভিউ থেকে দেখিয়ে দর্শককে বুঝিয়ে দেয়, অন্য কেউ দেখছে এ দৃশ্য, তেমন একটি কাজ মনে হয় গল্পটিকে। গল্পটির নাম কী ভীষণভাবে ‘যোগাযোগ’, একটি ঘটনার সাথে আরেকটির, একটি বোধের সাথে আরেকটির পরম্পরা রচনা। ‘খোঁয়াড়ি’তে যেমন ‘ধাক্কা দিতেই কপাট দুটো দুজন অন্ধ ভিখারির মতো দুদিকে ঢলে পড়ে’, গল্পের নামের অন্তর্নিহিত ভাব বারে বারে ফিরে আসে দৃষ্টিভঙ্গিতে আর কাহিনীতে, কিন্তু ছদ্মবেশে।
ইলিয়াসের বৃত্তান্ত কখনো দীর্ঘ, যেমন ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’য় তিনি অনেকগুলো লাইন খরচ করে ছমছমে বৃষ্টি হয়ে যাওয়া রাত্রির বিবরণ দিয়েছেন, সেখানে বর্ষণক্ষান্ত রাস্তার রিকশার ছলছল চলাচল এসেছে, পাতাবাহারের ভিজে গন্ধভরা সারি এসেছে, এসেছে বিষাদবর্ণ দেয়াল—টাংস্টেন বাতির টিমটিমে আলো আর চকিতে চলে যাওয়া ভক্সওয়াগনের হুসহাস, এমনকি এসেছে ‘দেয়ালে কোনোদিন-উড়বে-না তুলোর সাদা প্রজাপতি ও সবুজ সুতোর প্রেমিক ময়ূর দম্পতি’র লালচে হয়ে ওঠা। সেখানে প্রথম বাক্যেই ‘মনোরম মনোটোনাস’ অনুপ্রাস এসেছে মনোলগ তৈরি হবে তার জানান দিতে, অনুপ্রাসের তো একটি উদ্দেশ্য থাকে সচরাচর। ‘সাধের মধ্যে সেঁধে’/সেঁধিয়ে থাকার মতো ছোট্ট কিন্তু অলংঘ্য অনুপ্রাস এসেছে একটি ঘোরগ্রস্ত যুবকের পরিবারের বাকি সদস্যরা যে স্বাভাবিক সেটির বর্ণনায়। গল্পের আবহ নির্মাণ এতটাই ব্যয়বহুল, কেননা এই আবহই একটি চরিত্র। ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’-এও তেমনি আবহ এবং পটভূমি মিলে একটি বড় চরিত্র, তাই তারা বিশদ। ইলিয়াসের এমনসব বৃত্তান্তে কখনো অপ্রাসঙ্গিক উপাদানও এসেছে, অথচ তা সজীব করেছে ন্যারেটিভকে। ওই সামান্য অপ্রাসঙ্গিকতাটাকে কন্ট্রাস্ট হিসেবে ব্যবহার করে, পেন্টাটনিক স্কেলের মধ্যে থাকা একটি বিচ্যুতির সেমিটোন হিসেবে ব্যবহার করে তিনি তাঁর গদ্যের বর্ণিল জগত নির্মাণ করেছেন।
এখানে একটু বলে রাখি, কখনো অনুপ্রাস ও মেটাফর ভারবাহী করে তুলেছে তাঁর গদ্যকে, সামান্য পাঠক হিসেবে এমনটি আমার মনে হয়েছে। যেমন ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ গল্পে—
১. “ইজি চেয়ারের বিস্তৃত হাতায় বেহায়া বার্নার্ড শ’র ওপর আব্বার পুরু চশমা মশারিকে পানসে তাকাচ্ছে”। কিংবা,
২. ‘অক্ষরগুলো উদাস বয়ে যায়, যেন অনন্তকাল কুমারী থাকার জন্য একজন রিক্ত রক্তাক্ত জন্মদান করল এদের।’ কিংবা
৩. ‘চোখের চোপসানো চুলোয় বলকানো আঁধার ফুটিয়ে রঞ্জু আব্বা ও আম্মার সঙ্গে নিজের ঘরে ফিরল।’ কিংবা
৪. ‘পুরনো জাম গাছটায় হাজার হাজার ভিজে পাতা উদ্বন্ধন আত্মহত্যায় অতৃপ্ত ঝুলছে।’
কিন্তু লেখক সেই ভার শুধরে নেন না, বরং তিনি আরো আরো মনোরম ভার চাপিয়ে যেন এক রকমের জেদ করেই মনোটনি তৈরি করে দেন। সিজোফ্রেনিয়াক রঞ্জুর চারপাশে স্পর্শ ও ঘ্রাণের পৃথিবীকে একটা ঘেরাটোপের মতো টাঙিয়ে দেন গল্পকার, সে ‘ছড়ার ছবি’ বইটার নতুন নতুন তেতো সুন্দর গন্ধ মনে করে, মনে করে তাদের ঘুম পাড়িয়ে ট্রাঙ্কের ন্যাপথলিন দেয়া তোলা শাড়িটা পরে আম্মা সিনেমায় যেত যখন, তখন কেমন গন্ধের দমক টের পেত সে, এত কিছু সে টেনে আনে তার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পৃথিবীতে, কিংবা ইলিয়াস সেগুলোকে পেড়ে আনেন, একেকটি বেদম বেনাল দৃশ্যকে বমাল ধরে আনেন রঞ্জুর মাধ্যমে এবং তিনি একবার নামপুরুষে আরেকবার উত্তমপুরুষে রঞ্জুকে কথা বলান, যেন পিকাসোর সেই অ্যাভিনঁর পতিতাদের মুখ, একটি মুখ সামনে থেকে দেখা, সেই একই মুখ পাশ থেকেও একই সময়ে দেখা, স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষ যুগপত্ভাবে এ দুই প্রেক্ষিত থেকে দেখতে পারে না, এতে একটা ঘোরের আবহ তৈরি হয়ে যায়। কার মনে ঘোর তৈরি হয়? সে কি পাঠক নাকি শ্রোতা নাকি সে দর্শক? ইলিয়াস তাঁর গল্পের পাঠককে দর্শকে পরিণত করেন। পাঠক ‘উৎসব’ গল্পটির সেই রাস্তার লোকগুলোর মতো জড়ো হয়ে ঠাণ্ডা হালিম খেতে খেতে কুকুরের সঙ্গম দেখে, সেই অপাঙেক্তয় আনোয়ার আলির মতো করে বড়লোক বাড়ির মেয়েদের এয়ারকন্ডিশনের ওপর ফুল স্পিডে পাখা চালিয়ে ডিউক এলিংটন শুনতে শুনতে লোনলিনেসে মিষ্টি কষ্ট পেতে দেখে, যে নিষিদ্ধ গ্রহের নর-নারীদের দেখে এসে আনোয়ার আলির নিজের স্ত্রীকে চরম বিস্বাদ লাগে। বিমল করের একটি গল্প ‘পালকের পা’র কথা এখানে এসে আমাদের মনে পড়ে যায়, যেখানে নায়ক পূর্বপরিচিতা ও চিরবাঞ্ছিতা নারীর মহার্ঘ্য ঘর থেকে ফিরে এসে স্ত্রীর যা কিছু দেখে তা-ই তার কাছে ঘেয়ো বলে মনে হয়, মনে হয় মামুলি, ছেঁড়া ন্যাকড়ার মতো মেরামতের অযোগ্য; ইলিয়াসের আনোয়ার আলি স্ত্রীকে স্পর্শ করে দেখে তার হাতে যেন রাবার গ্লাভস পরা, তাতে সাড় নেই, আমি নিশ্চিত পাঠক তখন দর্শকই থাকে না শুধু, কুশীলবও হয়ে ওঠে সেই দৃশ্যনির্মিতিতে, রিলিফের কাজ ভরা দেয়ালের মতো যেন এসব দৃশ্য ছোঁয়া যায়, কিংবা অভিনয় করা যায় এতে।
তাত্ক্ষণিক মুহূর্ত বিনির্মাণে তিনি অত্যন্ত দক্ষ। রুটির দোকানের মালিক তোতা মিয়া যখন বালক কর্মচারী জুম্মন আলিকে নিয়ে চলে যায় কাজের অজুহাতে, তখন ভিড়ের কেউ বলে ওঠে, ‘জুম্মন আলি তো কুত্তার বায়োস্কোপ দেইখা গেল, অহন তুমি হালায় বায়োস্কোপ মারো জুম্মনরে লইয়া, হেইডা দ্যাখবো ক্যাঠায়?’ তাতে কি আপনি পাঠক হিসেবে শিশুর প্রতি যৌন নির্যাতনের ইঙ্গিত পেয়ে আমূল চমকে ওঠেন না? আমিও উঠি। কিন্তু ইলিয়াস থাকেন অবিচল। কোনো আহা-উহুমূলক কিছুই লেখেন না তিনি, সমবেদনার একটিমাত্র অব্যয়ধ্বনিও যেভাবে আত্মপ্রকাশের বাহন হয়ে ওঠে কথকের, সেটি তিনি সযত্নে পরিহার করেন।
একটু আগেই বলেছি ইলিয়াস ব্যঞ্জনাটুকু হাতে তুলে দেন, বাকিটা পাঠকের দায়। এই হাতে তুলে দেয়ার সময় গল্পকারের মনোভাব, মুখের রেখা, মর্জি কিংবা অভীপ্সার কিছুই বোঝা যায় না, তাঁর মুখ থাকে নির্লিপ্ত। এ কারণেই দেখা যায় ডিক্লারেটিভ সেনটেন্স বা স্টেটমেন্টে লেখা গল্প তাঁর, এক্সক্লামেশন বা ইম্পারেটিভ সেনটেন্স আসছে শুধু ডায়ালগগুলোয়, কিংবা কখনো কখনো সেখানেও নয়। প্রতিশোধ গল্পটিতে আমরা ওসমানকে ভগ্নীপতিকে হত্যা করার জিঘাংসা থেকে আত্মহত্যার লিপ্সার দিকে একেবারে বয়ে যেতে দেখি, সেই যাত্রাকালে ইলিয়াস প্রায় সিম্বলিক শটের মতো করে ‘সালাউদ্দিন ভাই হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’ নামের মোরগ পোলাওয়ের দোকানের সাইনবোর্ডটি দেখান সবিস্তারে, সেখানে একটি মোরগ এক পায়ে দাঁড়িয়ে থেকে সিগারেট ঠোঁটে ধরার মতো করে তার জাত ভাইয়ের মাংসে রাঁধা এক প্লেট মোরগ পোলাও ধরে আছে। একটি আপাততুচ্ছ মোরগ জানান দিচ্ছে, মানুষ মানুষের হন্তারক হয়ে উঠবে এক রকমের নিরেট স্বাভাবিকতায়...কিংবা যখন ওসমান সংবিৎ ফিরে পাচ্ছে, সে দিনের আলোয় নিজের হাত মেলে ধরে দেখছে ‘সেখানে হূদয়, বুদ্ধি, আয়ু, প্রেম প্রভৃতির রেখা’ দুপুরের খর রোদে খটখট করছে, (ইলিয়াস নাম ধরে ডাকছেন জীবনের অজস্র উপাদানকে যারা মৃত্যুর পাশাপাশিই আজন্ম বহমান) অর্থাৎ সে আত্মহত্যার দিক থেকে ফিরে আসছে জীবন আর জীবনের অতুল সম্ভাবনার দিকে।
ইলিয়াসের গল্পে বক্তব্যগুলো পর পর সাজানো নয়, কিছুটা পিছু হটে গিয়ে দর্শক-পাঠককে তিনি খানিকটা রসদ জুগিয়ে দেন, তারপর আবার ঠেলে দেন প্রগাঢ় বাস্তবের ঘটমানতায়। দৃশ্য নির্মাণকল্পে তিনি যে মেটাফোর ও সিমিলি ব্যবহার করেন, সেগুলোও অনাস্বাদিতের স্বাদ আনে পাঠকের কানে আর চোখে। যেমন ‘ফেরারি’ গল্পে ফাতেমা কাঁদলে তার মুখের বিলীয়মান বসন্তের দাগে অশ্রুবিন্দু জমে সেগুলোকে বসন্তের জ্যান্ত গুটি মনে হয় (এক ঝলক পয়েন্টিলিজম), একই গল্পে আণ্টাঘর ময়দানে ফাঁসি হওয়া সেপাইরা এখনো মাথায় লাল-নীল লাইট ফিট করে মহল্লাজুড়ে ঘুরে বেড়ায় বলে জানা যায়। কিংবা ‘যোগাযোগ’ গল্পে সজনেতলায় সাদা-কালো মাটিতে লম্বা লম্বা আঙুলের মতো সজনের ছায়া অল্প বাতাসে একবার ছড়িয়ে পড়ে, একবার গুটিয়ে নেয় অচেনা জন্তুর হাতের মতো। কিংবা একই গল্পে তিনি হাসপাতালের করিডোর দিয়ে যেতে থাকা রোকেয়ার চোখে রোগীদের দেখাতে পর পর কয়েকটি বিশেষ্যর পরে আমদানি করেন কয়েকটি জেরান্ড, বহুত্ব তৈরি হয় অত্যন্ত বর্ণিল উপায়ে। ক্রিয়াপদের ব্যবহার কে জানত এত অভিনব অথচ জুতসই হতে পারে, উৎসব গল্পে যখন ‘সমগ্র মুখমণ্ডলে গ্রাম্যতা, কেবল গ্রাম্যতা তোতলায়।’ ‘পিতৃবিয়োগ’ গল্পে ‘কার না কার মেয়ে জাম গাছ থেকে পড়ে ঠ্যাং ভাঙলে কোন অজপাড়াগাঁয়ে গিয়ে মাগুর মাছের ঝোল দিয়ে তার জন্য ভাত মাখে’, ফভিস্টদের কৃপণ-মধুর রেখার দেখা পাওয়া যায় ইলিয়াসে। বারবার।
যতই লেখার মধ্যে নির্লিপ্ত মুখ দেখান ইলিয়াস, তাঁর বক্তব্য চাপা পড়ে থাকে, এমন দুর্নাম দিতে পারবে না কোনো দুঃসাহসীও। ট্রাকচালক ট্রাফিক জ্যামে রিকশাওয়ালাকে খিস্তি করে যা বলছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, ভাজা চপের দিকে চেয়ে থাকা কম্পাউন্ডার প্রতাপের বেয়াদব জবাবে মনে মনে হানিফ খিস্তি করছে, ‘মালাউনের বাচ্চা, চাইয়া চাইয়া দ্যাখ। জিন্দেগিতে খাইতে তো আর পারবি না। দেইখাই মর।’ এই ছোট ছোট ব্যবচ্ছেদ সমাজের এমন সব প্রস্থচ্ছেদকে দেখায়, যা অস্বীকার করার কোনো পরিসরই নেই।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্প পড়ার পরের অনুভূতি কী? এক রকমের নির্ভুলতার বোধ, যা বাস্তবকে যাপন করার ভেতর দিয়ে মানুষ অনুভব করে সেটা। আর কী? কী থাকে পাঠকের হাতে, যা সে তার ব্যক্তিগত যাপিত জীবনে পায় না? উত্তরে ‘ফেরারি’ গল্পটি থেকে একটি দীর্ঘ লাইন এখানে বলার লোভ সংবরণ করতে পারছি না। ‘এই সময় হান্নান ঘরের প্রত্যেকটি লোক ও মেয়েলোককে নানা প্রকার ইঙ্গিত করে, যেমন সে হানিফকে নাক খুঁটতে বারণ করে, হবিবর আলী মৃধাকে ইশারা করে ময়লা ও ছেঁড়া গেঞ্জিটার ওপর জামা চড়ানোর জন্য, দরজার ওপার থেকে উঁকি দিতে থাকা বৌকে কাছে আসতে বলে; কিন্তু ওর কোনো নির্দেশ কেউ বুঝতে না পেরে কেবল এদিক ওদিক তাকায়।’ এই লাইন বাস্তবেরই সামান্য বিস্তার, কিন্তু কি চমত্কারভাবে নাটকীয়, কত সহজে তা একটি পরিচিত দৃশ্যকে বহুমাত্রিক ও সামগ্রিক করে তোলে। ইমপ্রেশনিস্ট শিল্পীরা তুলি দিয়ে ছোপ ছোপ রঙ ফেলে বাস্তবের আলো-ছায়াময় পৃথিবীই আঁকতেন, দুই পা দূরে গিয়ে চোখ সরু সরু করে দেখলেই ছোপগুলোর ভেতরের আকার ফুটে বের হতো ক্যানভাস থেকে, ছবির বিষয়বস্তুর চেয়ে বড় হয়ে উঠত দর্শকের যে মনোভাব, তা তৈরি করতে সক্ষম সেই অনুভবটুকু, ইলিয়াসের অনেক গল্প সেই রকম পুঞ্জ পুঞ্জ রঙের ভেতর থেকে উঠে আসা বাস্তব, সামগ্রিক বাস্তব, অথচ নতুন করে দেখার আনন্দে তা চৈতন্যকে নাচিয়ে তোলে। কিছুক্ষণ আগে আমি কিউবিস্টদের সাথে তাঁর গল্পের চরিত্র চিত্রণের তুলনা দিয়েছি, ‘তারা বিবির মরদ পোলা’ গল্পে ইলিয়াস যখন লেখেন, ‘ওপরে মস্ত উঁচু ছাদ, ছাদের নিচে গভীর খাদের মতো বেঢপ আকারের বড়ো এই ঘর’, তখন আমি পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্টের হাতে তৈরি ঘন বস্তুকে দেখি, সেখানে আকার শুধু আকার নয়, আরো অনেক মনোজাগতিক সংকটকে ঘনিয়ে তোলে, আবারো ক্যামেরার মতো করে চরিত্রের মাথার তালুর ওপরে উঠে যায় ইলিয়াসের পারস্পেক্টিভ।
‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ লেখার সময় ইলিয়াস যা তৈরি করেন, তা ‘বারোক’ আলোর মতো দীপ্তিমান সুন্দর, চিয়ারোস্কুরোর মতো নাটকীয়। কোত্থেকে এসেছে প্রদীপ নামের এই যুবক, তারপর কোথায় ফিরে যাবে আবার, কী কারণে এই চলে যাওয়া, কী পেতে এই ফিরে আসা, যাওয়া ও আসার মাঝে বন্ধনী-বন্দি এই সময়টুকুতে এত বিষাদময় হর্ষ কেন আমদানি হচ্ছে, এর কোনো সরল উত্তর নেই, ক্যানভাসের সিংহভাগ অন্ধকারে ডুবে যাওয়ার পরও যৎসামান্য আলোকসম্পাতে রাফায়েলের পেইন্টিং যেমন সুন্দর, তেমন কিছু আছে এসব নিরুত্তর নির্মিতিতে, পাঠক আসলেই যেন প্রদীপ নামের সেই যুবকের পিসির ঘরের অভীভূত নেংটি ইঁদুরের মতো কালো পুঁতির চোখ দিয়ে দেখে প্রদীপের ফেলে যাওয়া জগতকে, সেই জগতের ইন্দ্রজালকে।
একজন নগণ্য পাঠক হিসেবে বলতে পারি, যখন ইলিয়াসের গল্প পড়ি, কলকবজা নেড়েচেড়ে অন্ধের হস্তীদর্শনের মতো করে বুঝতে চেষ্টা করি, গল্পটি শুঁড়ের মতো নাকি গজদন্তের মতো। আয়নার বিপরীতে আয়না ধরার ফলে যেমন অনন্ত প্রতিফলন তৈরি হতো ছেলেবেলার খেলায়, একটা যাত্রা তৈরি হতো আয়নার অসীম গভীরে, সেই রকম কিছু হয় পাঠকমনে, এই যাত্রার এই জাদুর এই যমক বিন্যাসের শেষ নেই।






