জন পল র্যাথবোন
অনুবাদ: শওকত হোসেন
মেইন কোর্স আসার ঠিক আগমুহূর্তে প্রসঙ্গ পাল্টানোর পরামর্শ দিলেন মারিয়ো ভার্গাস ইয়োসা। সাদা টেবিল ক্লথের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে বসন্তের শুরুর রোদ, কিন্তু আমাদের আলাপ সহসা গুরুগম্ভীর দিকে বাঁক নিয়েছিল। টুইট মারফত মেক্সিক্যান সীমান্তের সামরিকীকরণের ঘোষণা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী সাহিত্যিককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি সারা জীবন যেসব লাতিন আমেরিকান লোকানুবর্তী ও বক্তৃতাবাগীশের কথা লিখে গেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাদের কথা মনে করিয়ে দেন কিনা।
‘ট্রাম্প পুরোপুরি তৃতীয় বিশ্বের শাসকদের মতো। কে ভাবতে পেরেছিল যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের গণতন্ত্রের কাছে নতি স্বীকার করে নেবে?’ জবাব দিলেন তিনি। ‘ট্রাম্পের অধীনে, স্প্যানিশ প্রবাদে যেমন বলা হয়, কাপড় খুলে পড়া, রিপাবলিকান দলটির এখন সে অবস্থা।’
আমার মনের পর্দায় ভয়ানক একটা ছবি ভেসে গেল। তখুনি ইয়োসা বললেন, ‘তবুও কি আমরা আরো সুখকর বিষয় নিয়ে কথা বলব? আশাবাদী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। আশাবাদী হওয়ার মতো অনেক কিছুই আছে।’ বলে গম্ভীর গমগম শব্দে হেসে উঠলেন তিনি।
বয়স ভার্গাস ইয়োসার রসবোধকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। ৮২ বছর বয়সী এই লেখক এখন সারা দুনিয়ায় তার গদ্যের অসাধারণ মান, লেখক হিসেবে বৈচিত্র্য ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কারণে সুপরিচিত। আজীবন গণতন্ত্র, মুক্তবাজার ও ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে লড়াই চালিয়ে যাওয়া একজন চিন্তক তিনি। এমনকি ১৯৯০ সালে পেরুর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে আলবার্তো ফুজিমোরির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর হেরে যান ভার্গাস ইয়োসা।
তবু মাদ্রিদের প্রাণকেন্দ্রে তার পছন্দের পাথর ছাওয়া বিভিন্ন প্লাজা থেকে বাস্ক রেস্তোরাঁর দিকে যাওয়ার সময় কিঞ্চিৎ খোঁড়াচ্ছিলাম। হিস্পানিক বিশ্বের সবচেয়ে বেশি উদযাপিত জীবিত বুদ্ধিজীবীর ঔদ্ধত্যের খ্যাতি রয়েছে। তার রচনা অতিবাস্তবাদী এবং প্রায়ই মানুষের স্বভাব সম্পর্কে তিক্ত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে। টানটান, বিদ্রূপাত্মক রচনার বেশির ভাগই এক ধরনের শীতল কুয়াশা এবং দরবারি বৈরিতায় ভরা থাকে, যাকে লিমার সাথে সম্পর্কিত করেছি আমি—স্পেনের ঔপনিবেশিক ভাইসরয়্যালটির উত্তরাধিকার। ‘আমি সুখী নই বলেই লিখি। আমি লিখি তার কারণ এটা সুখহীনতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটা উপায়।’ একবার মন্তব্য করেছিলেন ভার্গাস ইয়োসা।
অবশ্য প্রাচীন স্কুল হুলিয়ান দে তোলোসার ভারী কাঠের দরজা ঠেলে খুলতেই আমার অস্বস্তি মিলিয়ে গেল। ভেতরটা স্বস্তিকরভাবে নিরিবিলি। বেলা আড়াইটা অনেকের কাছেই স্প্যানিশ লাঞ্চের পক্ষে বেশ জলদি হয়ে যায়। ফলে বেশির ভাগ টেবিলই খালি ছিল। ক্রিম-রঙ দেয়াল আর কাঠের প্যানেলগুলো কামরাটাকে কোনো বইয়ের প্রথম সংস্করণের মতো একটা ছাপ দিয়েছে। খোদ ভার্গাস ইয়োসার মতো অমন ধ্রুপদী অভিজাত না হলে হয়তো ভীষণ সেকেলে দেখাত।
আগে থেকেই দূরের কোণে বসে ছিলেন তিনি। সতর্ক, ঋজু ভঙ্গি, ধূসর নীল জ্যাকেট, শ্যামন শার্ট আর লাল টাইয়ে সজীব লাগছিল তাকে। স্প্যানিশ হরফের ভয়ঙ্কর গ্র্যান্ড ওল্ড ম্যানের জায়গায় এমনকি প্রফুল্লই লাগছে তাকে। সেকি প্রেমের কারণে? তিন বছর আগে ভার্গাস ইয়োসা তার ৫০ বছর বয়সী স্ত্রী, ফিলিপাইনে জন্মগ্রহণকারী সমাজকর্মী ইসাবেল প্রেইসলারকে ত্যাগ করেছেন। পপস্টার হুলিও ইগলেসিয়াস ছিলেন তার প্রথম স্বামী। সেলিব্রিটি ও মিডিয়া প্রদর্শনীর বিরুদ্ধে রচিত নিবন্ধের সংকলন নোটস অন দ্য ডেথ অব কালচারের (২০১৫) লেখক ভার্গাস ইয়োসা তখন থেকে হোলা ম্যাগাজিনে এত ঘন ঘন আবির্ভূত হওয়ার ভোগান্তি কীভাবে সহ্য করেছেন, সেটা ভাবেন। কিন্তু ভীষণ আবেগি মানুষ ভার্গাস ইয়োসা রোমান্সকে এক ধরনের ‘বেসামাল আবেগ’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেছেন, এত সুখী আর কখনো ছিলেন না তিনি।
‘কি চমৎকার—কত সুখ’—আমাকে স্বাগত জানাতে দাঁড়ানোর সময় বললেন তিনি। এরই মধ্যে টেবিলে সাজানো জলপাই, সসেজ ও পাতলা করে কাটা শূকরের মাংস খাওয়ার ফাঁকে শুভেচ্ছা বিনিময় করলাম আমরা। ‘কিন্তু হোম্ব্রে! আপনার স্প্যানিশ এত দুর্দান্ত কীভাবে?’ খাঁটি কৌতূহলের সাথেই আমাকে তোয়াজ করলেন তিনি। বললাম, এ ভাষায় কথা বলেই বেড়ে উঠেছি। ‘আসুন সবার আগে জরুরি ব্যাপারগুলো সেরে ফেলা যাক।’ বললেন তিনি। ‘কী খেতে পছন্দ করেন আপনি। কী পান করবেন? এখানকার মদটা অসাধারণ।’
মেইত্রে দি হাজির হলো, আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত একটা মেয়ে। টেবিলের ওপাশ থেকে হাওয়ায় চুমু ভাসাল সে। ‘দোন মারিয়ো, আপনাকে আবার দেখে খুব ভালো লাগছে।’ রেড বিন স্যুপ আর মাঝের খাবার হিসাবে রেস্তোরাঁর বিশেষ পদ শুলেটন নামে পুরু করে কাটা বোন ইন স্টিকের ফরমাশ দিয়ে শুরু করলাম আমরা। অন্য খাবারের বেলায় দোনোমনো করছিলাম—সাদা অ্যাসপ্যারাগাসের মৌসুম ফুরিয়ে গেছে—শেষে অল্প আগুনে ঝলসানো পোড়া মরিচ আর মসৃণ রিওহা নেয়ারই সিদ্ধান্ত নিলাম। গ্লাসে গ্লাস ঠুকলাম আমরা। ‘সালুদ!’
নিয়মনিষ্ঠ লেখক হিসেবে ভার্গাস ইয়োসার খ্যাতি রয়েছে। তা সত্ত্বেও তিনি বহুপ্রজ লেখক। তার সর্বশেষ উপন্যাসের তর্জমা দ্য নেইবারহুড সবে ইংরেজিতে বেরিয়েছে, অন্যদিকে ধ্রুপদী উদারনৈতিক চিন্তাভাবনা নিয়ে একটি প্রবন্ধ সংকলন লা লামাদা দে লা ত্রিবু (দ্য কল অব দ্য ট্রাইব) বেরিয়েছে গত বছর মার্চে।
তবু আমাদের কালে নতুন করে উদ্ভাবিত সাহিত্য আন্দোলন, লাতিন আমেরিকান বুমের শেষ ব্যক্তির সাথে সময় কাটানোর ব্যাপারটা মনে আবেগ তৈরির মতোই। ৫০টিরও বেশি গ্রন্থের রচয়িতা ভার্গাস ইয়োসা আন্ট হুলিয়া অ্যান্ড দি স্ক্রিপ্টরাইটারের (১৯৭৭) মতো কমিক ও যৌনতার উপন্যাস থেকে শুরু করে ক্ষমতার মনস্তত্ত্বের মতো শীতল গবেষণায় ছড়িয়ে আছেন। স্বৈরাচরের অধীনে ব্যক্তিগত শুদ্ধতায় কলুষিত হওয়া ও নিষ্ঠুরতার সন্ধান করা দ্য ফিস্ট অব দ্য গোট (২০০০) সম্ভবত তার সবচেয়ে বিখ্যাত বই।
তার সব রচনার এটাই পুনরাবৃত্ত থিম, ১৯৯৩ সালের স্মৃতিকথা, ব্যক্তিগত সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে রচিত আ ফিশ ইন দ্য ওয়াটারে সে রকমই বলেছেন তিনি। কেন্দ্রীয় ঘটনায় এর কারণ খুঁজে পাওয়া যেতে পারে: তার ১০ বছর বয়সে মৃত হিসেবে জানানো একজন বাবার আবির্ভাব। তার বাবা আর্নেস্তো তাগড়া এবং বলপ্রয়োগে অভ্যস্ত ছিলেন। স্ত্রীকে মারধর করতেন। ১৪ বছর বয়সী ছেলেকে মেরে লিমার লিওনসিও প্রাদো মিলিটারি একাডেমিতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আমি যেভাবে দেখি, লেখালেখিই পরে ভার্গাস ইয়োসার যুগপৎ লাতিন আমেরিকার দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা মোকাবেলার পাশাপাশি ব্যক্তিগত কষ্ট প্রশমনের কায়দায় পরিণত হয়েছিল—দৃশ্যত সফলভাবেই।
‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়তো বাকস্বর্বস্বতায় পর্যবসিত হয়েছে, কিন্তু লাতিন আমেরিকা গণতান্ত্রিক জোয়ার প্রত্যক্ষ করছে,’ পরিষ্কার তৃপ্তির সুরে বললেন ভার্গাস ইয়োসা—সেটা কেবল স্বস্তিকর উষ্ণ স্যুপ এসে পড়েছে বলে নয়। ‘সামরিক শাসনের আবেদন ফুরিয়ে গেছে। এখন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা স্থানীয় অভিজাতদের কেউই একে সমর্থন করছে না।’ কথা বলার সময় বাম হাত মুঠি পাকালেন তিনি। ‘সমাজতন্ত্রেরও এখন আর বাস্তব কোনো আকর্ষণ নেই...কিউবা ও ভেনিজুয়েলা বাদে সব অঞ্চলই এখন গণতন্ত্রের চর্চা করছে...ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ, কিন্তু গণতন্ত্রই। এটা অগ্রগতির দিকে একটা বিরাট পদক্ষেপ।’
লাতিন আমেরিকা নিয়ে তার আশাবাদের সহযাত্রী হতে চাই আমি। সম্ভবত একমত পোষণও করি। তার পরও এ অঞ্চলটি চলতি বছর ম্যারাথন প্রেসিডন্ট নির্বাচনের মুখোমুখি হচ্ছে। বাকি সব জায়গার মতো মেজাজ তুঙ্গে রয়েছে, আবেগ শক্তিশালী, প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাব বজায় আছে এবং জনপ্রিয় প্রার্থীরা নির্বাচনে এগিয়ে আছেন। পরিস্থিতি সম্পর্কে কী ভাবছেন জানতে চকিত সফরে নামা যায় কিনা জানতে চাইলাম।
কপালের ওপর থেকে এক গোছা রুপালি চুল সরালেন ভার্গাস ইয়োসা। ব্রাজিলের ব্যাপারে আশাবাদী তিনি, যদিও গভীরভাবে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী লাভা জাতো (‘কার ওয়াশ’) তদন্তের ফলে ডজন ডজন প্রবীণ রাজনীতিক, ব্যবসায়ী নেতা বিচারে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। এদের ভেতর সবচেয়ে বিতর্কিতভাবে লুলা দা সিলভা আছেন। ‘দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন ভীষণ গণতান্ত্রিক। সতর্ক বিচারকদের নামে একটা সৌধ নির্মাণ করা উচিত!’ জোরের সাথে বললেন ভার্গাস ইয়োসা।
ভেনিজুয়েলার ব্যাপারে কী ভাবছেন? ‘ব্যাপারটা করুণ। ভেনিজুয়েলার একমাত্র ইতিবাচক দিক হলো, কোনদিকে যাওয়া চলবে না, বাকি অঞ্চলকে সেটা বুঝিয়ে দিচ্ছে।’ আর্জেন্টিনা আশাপ্রদ পরিবর্তনের একটা লক্ষণ। ‘পেরোনবাদ এখন পিছু হটছে।’ কিন্তু পেরুর বেলায়, যেখানে পেদ্রো পাবলো কুচজিন্সকি বা পিপিকে মার্চে দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট পদে ইস্তফা দিয়েছেন? ‘পিপিকে’র পরিণতি দুঃখজনক। তবু পেরুভীয় গণতন্ত্র বেঁচে আছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট বৈধভাবেই দায়িত্ব নিয়েছেন। দুর্নীতিগ্রস্ত গণতন্ত্র দুর্নীতিমুক্ত স্বৈরাচারের চেয়ে শ্রেয়—বিষাক্ত উত্তরাধিকার রেখে যায় স্বৈরাচার।’
ভার্গাস ইয়োসা বরাবর এমনই শক্ত উদারবাদী ছিলেন না। কিউবার বিপ্লবের প্রতি তারুণ্যময় উৎসাহ ছিল তার, কিন্তু ১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকেই হাভানার সাথে বিচ্ছেদ ঘটে। ‘নিজেকে জোব্বাহারা যাজকের মতো মনে হয়েছিল—মুক্ত কিন্তু পরাস্ত।’ বললেন তিনি। ‘লন্ডনে যাওয়ার আগপর্যন্ত।’ ওখানে মার্গারেট থ্যাচারের আমলে গভীরভাবে অ্যাডাম স্মিথ, ফ্রেডেরিক হায়েক ও ইসায়াহ বার্লিনের রচনা পড়ার ভেতর দিয়ে নিজের রাজনৈতিক কম্পাসের দিক ঠিক করে নিয়েছিলেন। এ ধরনের ধ্রুপদী উদারবাদ, এমনকি তার উপন্যাসের ভক্তদের মাঝেও বিশ্বের কোনো একটি অংশে ঝাঁকুনি তোলে, যেখানে বামপন্থী দৃষ্টিভঙ্গিকে এখনো বুদ্ধিবৃত্তিক মর্যাদার তকমা ভাবা হয়। তা সত্ত্বেও তিনি কিন্তু রক্ষণশীল ডানপন্থীদেরও ধ্বজাধারী নন। ওলান্তা হুমালার প্রতি তার বিতর্কিত সমর্থন প্রায় নিশ্চিত করেই পেরুর ২০১১ সালের নির্বাচনকে তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মেয়ে কেইকো ফুজিমোরির বিরুদ্ধে বামপন্থীর নেতার বিজয়ের দিকে নিয়ে গেছে। তিনি মার্ক্সিস্ট গেরিলাদের সাথে কলোম্বিয়ার শান্তি প্রয়াসকেও সমর্থন করেন।
মাদক প্ররোচিত সহিংসতা এবং এর ফয়সালার সেরা উপায়সংক্রান্ত ধারণা আমাদের মেক্সিকোয় নিয়ে যাচ্ছে। ১ জুলাই অস্তিত্ব রক্ষার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মোকাবেলা করতে যাচ্ছে দেশটি। প্রাচীনপন্থী জাতীয়তাবাদী ও ভার্গাস ইয়োসার অপছন্দের গোত্রপিতা আন্দ্রেস ম্যানুয়েল ওব্রাদোর নির্বাচনে অগ্রগামী হয়ে আছেন। তার বিরুদ্ধে লড়ছে দীর্ঘদিনের শাসক ইনস্টিটিউশনাল রিভল্যুশনারি পার্টি (পিআরআই), ভার্গাস যেটিকে ‘নির্ভেজাল স্বৈরাচার’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কার পক্ষে ভোট দেবেন তিনি, জানতে চাইলাম আমি।
‘মেক্সিকোর ভয়ংকর সহিংসতা ও দুর্নীতি পিআরআইয়ের দীর্ঘদিনের বিষের ফল।’ কম মন্দকে বেছে নিয়ে বললেন তিনি। ‘কিন্তু অপ্রীতিকর কিছু এড়াতে আমার মনে হয় আমি এর প্রার্থীকে ভোট দেব। লোপেস ওব্রাদোর ভয়ংকর পশ্চাত্পদতার প্রতিনিধিত্ব করছেন।’ কপাল চাপড়ালেন তিনি। ‘বিশ্বাস করতে পারছি না, কথাটা আমি বলেছি। পিআরআইকে বেছে নিচ্ছি আমি! অবশ্যই তৃতীয় একটা পছন্দ আছে [সেন্টার রাইট প্রার্থী] রিকার্দো আনায়া। তরুণ ও চৌকস তিনি।’
এরপর আলোচনা উত্তরে মার্কিন সীমান্ত ও ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রসঙ্গে বাঁক নিলে, ভার্গাস ইয়োসা প্রসঙ্গ পাল্টানোর পরামর্শ দিলেন। এদিকে আমাদের স্টিকও হাজির হলো। মেহমানকে মাংসের টুকরো এগিয়ে দিয়ে চমৎকারভাবে ঝলসানোয় কালচে হয়ে আসা হাড় টেনে নিলাম আমি। সুস্বাদু ছিল সেটা: জ্বলন্ত আগুনে ধীরে ধীরে রান্না করা স্প্যানিশ মাংস কোনো কারণে আর্জেন্টাইন, ব্রাজিলীয় বা মার্কিন গরুর মাংসের মতো সমান খ্যাতি পায়নি। আমাদের মদের গ্লাসও ভরে নিলাম। রিওহা রেস্তোরাঁটা সত্যিই চমৎকার। আমরা সাহিত্যে ফিরে এলে আলোচনা অনায়াস ধারায় থিতু হলো।
অনুপ্রেরণাদায়ী ঢঙে তিনি বললেন, এখনো লেখালেখিকে তার কাছে কঠিন ঠেকে এবং প্রথম খসড়া বরাবরই অর্যাপ্ততার বোধে ভরিয়ে তোলে। ‘এমনকি আপনার পত্রিকার কলামগুলোও?’ জানতে চাইলাম। ১৫ বছর বয়সী শিশু সাংবাদিক হিসেবে ভার্গাস ইয়োসার প্রথম কাজ ছিল এল কোমেরিকোর পক্ষে লিমার ভয়ানক ক্রাইম বিট কাভার করা। ২০ বছরেরও বেশি স্প্যানিশ পত্রিকা এল পাইসে নিয়মিত কলাম লিখেছেন তিনি। ‘হ্যাঁ, এমনকি ওগুলোও। তবে সাংবাদিকতা আমার ভালো লাগে। সবসময় তা-ই করেছি। এটা আপনাকে অন্যান্য গোত্রের সাথে মেশার সুযোগ দেয়। লিমায় আমার তরুণ বয়সে ছোট মধ্যবিত্ত জগত আমার জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।’
হঠাৎ ক্ষুব্ধ চেহারা নিয়ে হাজির হলো মেইত্রে দি। ‘দোন মারিয়ো, বাধা দেয়ার জন্যে দুঃখিত। ওখানে বসা দুজন কলোম্বীয় মহিলা একটা খবর পৌঁছে দিতে জোর করছিলেন। আপনার বই ওদের কত ভালো লাগে, সেটা আপনাকে জানাতে চান ওরা।’ প্রশংসার জন্য তাকে ধন্যবাদ দিয়ে আমাদের টেবিলের চার টেবিল দূরে ওদের টেবিলের উদ্দেশে মাথা দোলালেন তিনি। কাজের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলার মতো ভার্গাস ইয়োসার ব্যবহারও সুবিদিত। হিস্পানিস্ট হিউ টমাস একবার আমাকে বলেছিলেন, ভার্গাস ইয়োসা লাতিন আমেরিকান লেখকদের বুম প্রজন্মের ‘সবচেয়ে মোহনীয়’ ব্যক্তি। কলোম্বীয়দের ভক্তিময় প্রশংসার সূত্র ধরেই মিলিটারি স্কুলে সিগারেটের বিনিময়ে ক্যাডেট কলেজের সহপাঠীদের জন্য প্রেমপত্র ও পর্নোগ্রাফিক গল্প থেকে শুরু করে ফুজিমোরোর অন্ধকার আমলের পটভূমিতে রচিত কারফিউর সময় দুজন ধনী ব্যবসায়ীর স্ত্রীর শয্যাসঙ্গীতে পরিণত হওয়ার সর্বশেষ রোমাঞ্চ উপন্যাস পর্যন্ত তার বেশির ভাগ রচনায় ছড়িয়ে থাকা যৌনতা নিয়ে প্রশ্ন করলাম।
‘বেশ, লাতিন আমেরিকার ব্যাপারস্যাপার কেমন আপনি জানেন। যৌনতা ঠিক রাস্তায় হাঁটার মতোই এড়ানো অতীত।’
স্টিক সরিয়ে নেয়া হলো। আররোস কোন লিচে আর দুটো এসপ্রেসোর ফরমাশ দিলাম আমরা। ‘খুবই ভালো ডেজার্ট,’ দারচিনি ছিটানোর সময় বললেন তিনি। ‘আসলে এটা এত ভালো ডিশ যে ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ ও পোর্তুগিজরা একে আপন মনে করে।’ পুডিং শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভাগ করে খেলাম আমরা। অবশেষে শেষের জন্য তুলে রাখা প্রশ্নটা রাখলাম।
তাকে বললাম, আমি রোমান্সের শক্তির পক্ষে। তবু তিনি পাপারাজ্জিদের হাতে কী পরিমাণ ভোগান্তি ও বাড়িসজ্জার বিস্তৃতির মুখে পড়েছিলেন যে এখন এত ঘৃণা করেন, যা তার জীবনের অংশ হয়ে গেছে?
বেশ, আপনি রোমান্সের শক্তি বুঝে থাকলে এর অভিজ্ঞতা আপনার হয়েছে,’ রসিকতা করলেন তিনি। ‘প্রেমের ক্ষেত্রে সবসময়ই পরীক্ষা দিতে হয়। নইলে সেটা প্রেমই নয়। পরীক্ষা একে শক্তিশালী করে। ভালোবাসা বাড়াতে সাহায্য করে। তবে ভালোবাসার জন্য সবসময়ই মাসুল গুনতে হয়। সবকিছুইর দাম আছে।’
‘এমনকি সাহিত্যেও?’ জানতে চাইলাম। ‘না। সাহিত্য, বিশেষ করে পড়াশোনা আমাকে কেবল সন্তুষ্টিই দিয়েছে’—বিড়বিড় করে বললেন তিনি।
ভার্গাস ইয়োসা বললেন, একটা নতুন উপন্যাস শুরু করতে যাচ্ছেন তিনি। জানতে চাইলাম, আদৌ কখনো লেখালেখিতে যতি টানবেন কিনা তিনি। ৮০ বছরে পা দেয়ার পর ফিলিপ রথ যেমন করেছিলেন। ‘লেখালেখিই আমার কাজ। এটাই আমার জীবন।’ সাথে সাথে জবাব দিলেন তিনি। ‘বেঁচে থাকা, তবে মৃত্যুই সবচেয়ে খারাপ বিষয় হতে পারে। যদিও অনেকের বেলায়ই তা ঘটে।’ দুই ঘণ্টা আগেই প্রত্যাশিত বিপুল সৌন্দর্য আর বিনয়ের ভঙ্গিতে টেবিলে মাথা নোয়ালেন ভার্গাস ইয়োসা। ‘আসলে লিখতে লিখতে মরার আশা করি আমি।’
[জন পল র্যাথবোন ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের লাতিন আমেরিকান সম্পাদক।]






