‘ঢাকা দখল’— এই ছিল চার্লস মোড্রেক-এর সংবাদ শিরোনাম। ১৬ ডিসেম্বর নয়াদিল্লি থেকে এ ‘ডেসপাচ’

টি পাঠিয়ে ছিলেন। ১৭ ডিসেম্বর তা প্রকাশিত হয় নিউইয়র্ক টাইমসে

এবিসি টেলিভিশনের বব ক্লার্ক এবং ২৫ মার্চ স্বচক্ষে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ দেখা টেড কোপেল যখন ওয়াশিংটনে নিযুক্ত পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আগা হিলালিকে বললেন, পূর্ব পাকিস্তানে গ্রামের পর গ্রাম আগুনে ভস্মীভূত করা হয়েছে। হিলালি টিভি ক্যামেরার সামনে বললেন, ‘গ্রামের পর গ্রাম মোটেও ধ্বংস করা হয়নি, কিছু বাড়িঘরে আগুন লেগেছে।’

ভারতীয় মেজর জেনারেল আয়ান কার্দোজো সিলেট সেক্টরে সাফল্যের একটি গোপন খবর দিলেন: বিবিসি ভুল করে এক ব্যাটালিয়নকে এক ডিভিশন বলে প্রচার করায় সীমান্তের এপারে পাকিস্তানি অফিসার ও জওয়ানরা ঘাবড়ে যায় এবং দ্রুত আত্মসমর্পণ করে।

একাত্তরের পাকিস্তানি কমান্ডো জেনারেল ইয়াহিয়ার কৌশলগত ভুলের কথা বলেন: পূর্বাঞ্চলে প্রয়োজন ছিল প্রতিরক্ষা আর পশ্চিমাঞ্চলে আক্রমণ। ইয়াহিয়া ঠিক উল্টোটা করে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ঢাকার ধূলিকে চুমো খাইয়েছেন, ভারতকে বড় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর সংবাদ গুরুত্ব দিয়েই নিউইয়র্ক টাইমস ছেপেছে। পুরো সংবাদটিই অনূদিত হলো।

নিউইয়র্ক টাইমসে স্বাধীনতার সংবাদ

‘ঢাকা দখল’— এই ছিল চার্লস মোড্রেকের সংবাদ শিরোনাম। ১৬ ডিসেম্বর নয়াদিল্লি থেকে এ ‘ডেসপাচ’টি পাঠিয়ে ছিলেন। ১৭ ডিসেম্বর তা প্রকাশিত হয়। সংবাদটি ভাষান্তরিত হলো—

নয়াদিল্লি, ১৬ ডিসেম্বর। পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা দখল করার পর এবং পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ কবুল করার পর ভারত আজ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সম্পূর্ণ অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করেছে।

পূর্বাংশে আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে হাজার মাইল দূরে পশ্চিম রণাঙ্গনে পাকিস্তানের সঙ্গে কোনো চুক্তি ছাড়াই বন্দুকের শব্দ থেমে গেছে, কাল রাত ৮টা থেকে অস্ত্রবিরতি কার্যকর হবে।

পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের কী মর্যাদা হবে, তা নিয়ে ১৪ দিনের তিক্ত যুদ্ধ শেষে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘আমাদের বিবেচনায় বর্তমান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অর্থহীন।’

পাকিস্তানে ঘাটতির সমস্যা

দেশব্যাপী এক বেতার ভাষণে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খান বলেন, ‘যুদ্ধ অব্যাহত আছে এবং আমরা লড়াই চালিয়েই যাব।’

নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরা বিশ্বাস করেন (প্রেসিডেট যা-ই বলুন) পাকিস্তানের সরবরাহ লাইনে তীব্র সমস্যা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি ও গোলাবারুদের মজুদ পাকিস্তানকে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে টিকতে দেবে না।

পশ্চিম রণাঙ্গনে ছোট পাকিস্তানি শহর পাঞ্জাবের শাকার গড়ের কাছে এ দ্বন্দ্বের সবচেয়ে বড় ট্যাংকযুদ্ধে ভারত পাকিস্তানের ৪৫টি ট্যাংক ধ্বংস করেছে বলে দাবি করেছে, অন্যদিকে ভারত হারিয়েছে ১৫টি ট্যাংক।

ভারত যখন পূর্বাঞ্চলে বিজয় উদযাপন করছে, চীন অভিযোগ করেছে ভারত তার প্রোটেক্টরেট সিকিম ও তিব্বতের সীমান্ত লঙ্ঘন করে চীনা ভূখণ্ডে অন্যায় অনুপ্রবেশ করেছে।

চীনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান

ভারতীয় কর্মকর্তারা বলেছেন, চীন সীমান্তে কোনো যুদ্ধই হয়নি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, পিকিং (এখন বেইজিং) পাকিস্তানের সমর্থক, তাদের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় আক্রমণ শুরু হয় ৪ ডিসেম্বর ভোরে এবং ৪ ডিভিশন পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যদলের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে আজ বিকাল ৪টা ৩১ মিনিটে তা শেষ হয়।

ঢাকায় আত্মসমর্পণ দলিল সই করেন পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লেফেটন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি এবং ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা।

বিদ্রোহী বাংলাদেশ সরকারের চারজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা কাল ঢাকা এসে পৌঁছবেন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের কার্যক্রম শুরু করবেন।

আত্মসমর্পণ দলিলে বলা হয়, ভারতীয় বাহিনী আত্মসমর্পণকৃত সব পাকিস্তানি সৈন্য, বিদেশী নাগরিক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য এবং পশ্চিম পাকিস্তান বংশোদ্ভূত সবার নিরাপত্তা প্রদান করবে।

পশ্চিম পাকিস্তানি ও তাদের সমর্থক এবং বিহারিদের ওপর কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক নিপীড়ন এবং তাত্ক্ষণিক বিচার ও হত্যা ঠেকাতে ভারত তার দৃঢ় সংকল্পের কথা ব্যক্ত করেছে। ১৯৭১-এর মার্চে পাকিস্তান থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলে বাঙালিরা আট মাস ধরে পশ্চিম পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে নির্মমভাবে লাঞ্ছিত হয়।

আজকের আত্মসমর্পণ সম্পূর্ণভাবে একটি সামরিক বিষয়— ভারত ও পাকিস্তানের সংকট সমাধানের কোনো রাজনৈতিক চুক্তি নয়। এমনকি আন্দোলনকারী বাঙালি ও পাকিস্তানের মধ্যেও নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হচ্ছে, পূর্ব বাংলার ক্যারিশম্যাটিক রাজনৈতিক নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্যে কী ঘটবে, তা জানা। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে রয়েছেন।

শেখ মুজিব নামে বহুল পরিচিত এ নেতার মুক্তির জন্য ভারত পাকিস্তানের জেনারেল ইয়াহিয়ার ওপর যতটা বেশি সম্ভব চাপ দেবে। তাকেই আন্দোলনকারী বাঙালিরা প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছে এবং তাদের দেশের নাম দিয়েছে বাংলাদেশ। ভারতীয়রা আশঙ্কা করছে তাকে মুক্তি দেয়া না হলে পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষমতার লড়াই এবং সংকট বিরাজ করবে।

ঢাকায় পাকিস্তানি কমান্ডার জেনারেল নিয়াজি ঢাকার যুক্তরাষ্ট্র কনস্যুলেট অফিসের মাধ্যমে গতকাল আত্মসমর্পণের বার্তা পাঠালে জটিল দরকষাকষি পর্ব শেষ করে এ আত্মসমর্পণের আয়োজন করা হয়। ভারতীয় কর্মকর্তা আজ জানিয়েছেন জেনারেল নিয়াজি তার সৈন্যদের নির্ধারিত এলাকায় ‘রিগ্রুপ’ করতে চেয়েছেন অর্থাৎ লড়াই থামিয়ে সৈন্যদের স্ব স্ব অফিসারের নিয়ন্ত্রণে অস্ত্র সংবরণ করতে চেয়েছেন।

বোমাবর্ষণ বন্ধের নির্দেশ&dquote;&dquote;

কিন্তু তা ভারতীয়দের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। তারা সকাল ৯টায় মধ্যে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণের নির্দেশ পাঠায়। আত্মসমর্পণ উৎসাহিত করতে রাত থেকে বোমাবর্ষণ বন্ধ রাখা হয়।

সকাল ৯টার আলটিমেটাম শেষ হওয়ার ৩০ মিনিট আগে জেনারেল নিয়াজি মিলিটারি রেডিওতে ভারতীয় আহ্বানের জবাব দেন। তিনি ৬ ঘণ্টা সময় প্রার্থনা করেন, তিনি একে বলেন সন্ধি। আত্মসমর্পণের বিস্তারিত দরকষাকষির জন্য একজন সিনিয়র ভারতীয় জেনারেলকে ঢাকায় আসার আমন্ত্রণ জানান।

ভারতীয় বাহিনী যখন উত্তর দিক থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে এগোচ্ছে এবং ঢাকার মাত্র দুই মাইলের মধ্যে চলে এসেছে, তখন ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব হেলিকপ্টারে ঢাকা এলেন।

জেনারেল জ্যাকব ও নিয়াজি যখন আত্মসমর্পণ চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে সম্মতি জানালেন। জেনারেল জ্যাকবের ঊর্ধ্বতন জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা ও অন্যান্য ভারতীয় কর্মকর্তা আত্মসমর্পণের চূড়ান্ত দলিল সই করতে ঢাকায় এলেন। ভারতীয় প্রতিনিধি দলে মুক্তিবাহিনী নামে খ্যাত বাঙালি বিদ্রোহী গেরিলাদের চিফ অব স্টাফ অন্তর্ভুক্ত ছিলেন (এ অংশটি যথার্থ নয়)। তারপর আনন্দ-উচ্ছল বাঙালি জনতার সামনে দুটি ভারতীয় ব্যাটালিয়ন এবং দুটি বাঙালি ব্যাটালিয়ন ঢাকায় প্রবেশ করে এবং পাকিস্তানি বহিনীর কাছ থেকে সবকিছু বুঝে নেয়।

পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কিছু সংখ্যক সৈন্য কেবল ঢাকায় অবস্থান করছিল, অন্যরা বিভিন্ন অঞ্চলে। নয়াদিল্লিতে ভারতীয় কর্মকর্তারা জানান, অস্ত্র সমর্পণ করার জন্য নিয়াজি সব ইউনিটে নির্দেশ পাঠিয়েছেন।

পূর্বাঞ্চলে যুদ্ধে নাটকীয় শেষ অধ্যায়ে ভারতীয় বাহিনী গত রাতে বিভিন্ন ধরনের সৈন্যদের একটি কম্পোজিট ফোর্সের মাধ্যমে ভারত তার প্রথম অ্যাম্ফিবিয়াস ল্যান্ডিং- উভচর অবতরণ করে, নৌ-সেনারা তীরে উঠে কক্সবাজারের দক্ষিণাঞ্চলে হালকা প্রতিরোধ নস্যাৎ করে দেয়।

এ অ্যাম্ফিবিয়াস ল্যাংন্ডিং এটা বুঝিয়ে দেয় যে একদা তুলনামূলকভাবে দুর্বল ও অসংগঠিত ভারতীয় বাহিনী অংশত সোভিয়েত সহায়তায় সাম্প্রতিক সময়ে অনেক উন্নতি সাধন করেছে। এ যুদ্ধে ভারত অগ্রগামী প্রযুক্তি ও পদ্ধতি ব্যবহার করেছে— হেলিকপ্টার থেকে আক্রমণ, বিপুলসংখ্যক প্যারাট্রুপার অবতরণ এবং নৌ-অবরোধ।

মিসেস গান্ধী পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধবিরতির নির্দেশের সঙ্গে জাতির উদ্দেশে তার বেতার ভাষণও পাঠানো হয়েছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘে অবস্থানরত তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার শরণ সিংকেও তা জানিয়ে দেয়া হয়েছে। ইন্দিরা গান্ধীর বার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে: ‘সীমান্ত সম্প্রসারণের কোনো আগ্রহ ভারতের নেই। এখন যেহেতু পাকিস্তানি বাহিনী বাংলাদেশে আত্মসমর্পণ করেছে এবং বাংলাদেশ মুক্ত, আমরা মনে করি এ অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অর্থহীন।

ভারতীয় সংসদে আনন্দ

লেবু-বর্ণ শাড়ি পরে প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধী যখন ভারতীয় পার্লামেন্টে পূর্ব পাকিস্তানে আত্মসমর্পণের সংবাদ দেন, লোকসভা উল্লাসে ফেটে পড়ে।

নয়াদিল্লিতে যদিও এ নিয়ে কোনো গণবিজয় উৎসব হয়নি, লোকজন যথারীতি কর্মক্ষেত্রে গিয়েছে। তাদের প্রশান্ত অবয়বের আড়ালে স্পষ্টতই আনন্দ-অহংকার ফুটে ওঠে। তারা ক্ষুব্ধও ছিল, প্রেসিডেন্ট নিক্সনের জন্য এক ধরনের ঘৃণা জমিয়ে রেখেছে। তারা মনে করেন, নিক্সন শেষ মুহূর্তে পাকিস্তানকে উদ্ধার করার জন্য বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহরের একটি টাস্কফোর্স পাঠিয়েছেন।

ভারতে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মান ও গুরুত্ব ধুলায় লুটিয়েছে, সোভিয়েত ইউনিয়ন সেখানে তাদের ক্রমাগত কূটনৈতিক সমর্থন এবং জাতিসংঘের অস্ত্রবিরতি প্রস্তাবে পুনঃ পুনঃ ভেটো দিয়ে জনগণের কাছে সম্মানের আসনে অবস্থান করছে।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছেন, তা শুনে মনে হবে তিনি পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাচ্ছেন।

পাকিস্তানের একটি পদাতিক ও দুটি সাঁজোয়া ডিভিশন রয়েছে, এদিকে সীমান্তে ভারতীয় পক্ষেও প্রায় সমান বহর রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এতে কদিনে ভারতীয় একজন কর্মকর্তার ভাষায় তারা পাঞ্জাবের পাকিস্তান অংশে শাকারগড় শহরে বিস্তারিত জরিপ চালিয়েছে এবং ৩৬০ বর্গমাইল পাকিস্তানি এলাকা নিজেদের দখলে নিয়েছে।

গত রাতে এবং আজ পাকিস্তান ভয়ঙ্কর পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছে। ভারতীয় বাহিনী শাকার গড়ে বাসান্তার নদীর পশ্চিম তীর পর্যন্ত পৌঁছেছে। এখনো শহর দখল করতে পারেনি।

ভারতীয়রা বলেছে, তারা ট্যাংকের স্কোয়াড্রন পাঠিয়ে পাল্টা আক্রমণ করেছে— প্রতি স্কোয়াড্রনে ১৪টি ট্যাংক— একটার পর একটা স্কোয়াড্রন গিয়ে ভারতীয় বাহিনীতে শক্তি যোগ করছে। মুখপাত্র জানায়, এ কারণে আজ ভয়ঙ্কর ট্যাংক যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে।

ভারতীয় বাহিনীর চিফ অব আর্মি স্টাফ জেনারেল এসএইচপিজে মানেকশ বলেছেন, আজ পূর্ব বাংলায় যে পাকিস্তানি সেনাদল আত্মসমর্পণ করেছে, তাদের সৈন্যদের জন্য উপযুক্ত এবং প্রাপ্ত মর্যাদা ও সম্মান দেয়া হবে। পশ্চিম রণাঙ্গনে যুদ্ধ সম্পূর্ণ শেষ হয়ে না আসা পর্যন্ত পাকিস্তানি সৈন্যদের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি ভাবা যাচ্ছে না।

যৌথ কমান্ড&dquote;&dquote;

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার ও গণ সুযোগ-সুবিধাগুলো চালু করতে ভারতীয় ও বাঙালি সৈন্যদের যৌথ কমান্ড কাজ করবে, এতে বাঙালিরা সম্মত। যৌথ কমান্ডে ভারতীয়রা জ্যেষ্ঠ মর্যাদার।

একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা একান্তে বলেছেন, বিশ্বাস করুন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমরা বাংলাদেশ থেকে বেরিয়ে যেতে চাই। আমার দখলদার বাহিনী হিসেবে থাকতে চাই না, কিংবা এমন মনে হোক এটাও চাই না।

ভারতীয় কর্মকর্তারা বলেছেন, ভারত সীমান্ত লঙ্ঘন করেছে বলে চীন যে অভিযোগ করেছে, তাতে বিচলিত হওয়ার কারণ নেই। একজন বলেছেন, চীনের এ কথায় অমঙ্গলের কোনো আশঙ্কা নেই, তিনি যুক্তি দেখিয়েছেন চীন দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষাই করছে, এখন হস্তক্ষেপ করে পাকিস্তানের কোনো উপকার করতে পারবে না।

অন্য পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, চীন অবশ্যই আতঙ্কিত এবং তার দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতে কূটনৈতিক সাফল্যে ক্রুদ্ধ। ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এখন বন্ধুত্বের চুক্তিতে আবদ্ধ। ১৯৬২ সালে সংক্ষিপ্ত ও সীমিত আকারের সীমান্ত যুদ্ধে চীন ভারতকে ভালোভাবেই পরাস্ত করেছিল।

বিবিসির ভুল ভারতকে যুদ্ধজয়ে সাহায্য করেছে&dquote;&dquote;

১৯৭১ যুদ্ধের ভারতীয় বীর মেজর জেনারেল আয়ান কার্দোজো বলেছেন, যুদ্ধকালে বিবিসিতে প্রচারিত একটি ভুল সংবাদ পাকিস্তানকে পরাস্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তখনকার পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৫ গোর্খা রাইফেল ব্যাটালিয়নের একজন মেজর ছিলেন আয়ান কার্দোজো। এ ব্যাটালিয়নে ছিল ৭৫০ জন সৈনিক। তাদের তখনকার দায়িত্ব ছিল সিলেটের কাছাকাছি আটগ্রাম দখল করা।

এ ব্যাটালিয়নের অস্ত্র মজুদ ও খাদ্য সরবরাহ ঘাটতি ছিল— তার পরও দুটি পাকিস্তানি সেনা ব্রিগেডকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে। তাদের ছিল তিনজন ব্রিগেডিয়ার, একজন কর্নেল, ১০৭ জন অফিসার, ২১৯ জন জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার এবং ৭ হাজার জওয়ান। এটি ছিল ভারতীয় বিজয়ের শ্রেষ্ঠতম একটি।

মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত কার্দোজো তার একটি গ্রন্থ প্রকাশনার অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন, এ কৃতিত্বের প্রধান দাবিদার ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং করপোরেশন।

১৯৭১-এ বিবিসিই ছিল সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যম। বিবিসি ১৯৭১ যুদ্ধের সার্বক্ষণিক বিবরণ প্রচার করেছে। বিবিসি একটি ভুল করে ফেলল। ৫ গোর্খা রাইফেল ব্যাটালিয়নের কিছু সৈন্য না বলে জানাল, এক ব্যাটালিয়ন গোর্খা সৈন্য সিলেটে অবতরণ করেছে। রেডিওতে আমরা যেমন শুনেছি, পাকিস্তানও শুনেছে। কাজেই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম আমরা ভান করে যাব যে আমরা এক ব্রিগেডের অংশ। কার্দোজোর ব্যাটালিয়ন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করল যে, ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ তাদের চেয়ে ১০ গুণ বড় পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করল। আত্মসমর্পণের আগে পর্যন্ত মেজর কার্দোজোর এবং ভারতীয় বাহিনীর অন্যদের বিশ্বাস ছিল পাকিস্তানি বাহিনী এক ব্রিগেড, কিন্তু আত্মসমর্পণের সময় অবাক হয়ে দেখল তা দুই ব্রিগেডের চেয়েও বেশি।

১৯৭১-এর যুদ্ধে ল্যান্ড মাইন বিস্ফোরণে তার পা মারাত্মক জখম হয়। ঝুলে থাকা পা তিনি নিজেই তরবারির কোপে কেটে ফেলে তার গোর্খা ব্যাটম্যানকে বলেন, ‘যাও পা-টা কবর দিয়ে এসো।’

একাত্তরে পাহারা মেজর মনোবল হারাননি। তিনি চাকরি অব্যাহত রেখেছেন তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রথম প্রতিবন্ধী কমান্ডার, যিনি পদাতিক ব্রিগেড পরিচালনা করেছেন।

মেজর জেনারেল কার্দোজো একজন সুলেখক। লেফটেন্যান্ট জেনারেল বিলিমরিয়ার জীবন ও সময় নিয়ে তিনি একটি বই লিখেছেন। বীর যোদ্ধাদের নিয়ে এবং ১৯৭১ যুদ্ধে ভারতীয় নৌজাহাজ আইএনস কুকরির ডুবে যাওয়া নিয়ে তিনি বই লিখেছেন।

আগা হিলালির বিব্রতকর টেলিভিশন সাক্ষাত্কার

১৫ আগস্ট ১৯৭১ ওয়াশিংটনের এবিসি টেলিভিশন নেটওয়ার্ক ওয়াশিংটনে পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত আগা হিলালির সাক্ষাত্কার নেয়। বব ক্লার্ক সাক্ষাত্কার নেন। পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে প্রশ্ন করেন টেড কোপেল। সাক্ষাত্কারের অংশবিশেষ—

ববক্লার্ক: আপনি কি স্বীকার করবেন যে আপনাদের সেনাবাহিনী দায়িত্বজ্ঞানহীনভাবে বেসামরিক জনগণকে হত্যার অপরাধে অপরাধী?

আগা হিলালি: খুবই সামান্য, যদি হয়েও থাকে একেবারে সামান্য।

বব ক্লার্ক: খুব সামান্য!

আগা হিলালি: কিছু হয়ে থাকলে, তা খুবই সামান্য। আওয়ামী লীগের প্রচারণায় যখন অন্তত ১ লাখ ৬০ হাজার সশস্ত্র ব্যক্তি রাষ্ট্র ছেড়ে বেরিয়ে গেল, ফেডারেল সরকারের সেনাবাহিনীকে তাদের মুখোমুখি হলে বুঝতেই পারেন— ২৫ মার্চ সেনাবাহিনীকে বলা হয়েছিল। এই ১ লাখ ৬০ হাজার সশস্ত্র মানুষের মোকাবেলা করতে, তাদের বল প্রয়োগে নিহত হয়েছে, তবে বেসামরিক জনগণের বেলায় তা ক্রসফায়ারের কারণে। বেসামরিক জনগণকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করেনি, সশস্ত্র জনতার মোকাবেলা করতে হয়েছে তাদের।

(আগা হিলালির প্রতিটি বাক্য দ্বিধান্বিত, অসমাপ্ত ও পৌনপৌনিক।)

বব ক্লার্ক: রাষ্ট্রদূত সাহেব এ হত্যাযজ্ঞের খবর আমাদের কাছে বিভিন্ন ধরনের উৎস থেকে এসেছে, বিদেশী কূটনৈতিক, মিশনারি, সাংবাদিক যারা ঘটনার শুরুতেই সেখানে ছিলেন— আর এই যে বিপুল সংখ্যক শরণার্থী পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে চলে যাচ্ছে, এতে কি হত্যাযজ্ঞের প্রমাণ মেলে না।

আগা হিলালি: বিদেশী কূটনীতিকরা ঢাকায় ছিলেন— যত বেশি সংখ্যায় মানুষ হত্যা করার কথা বলা হচ্ছে, তারা তা কোথাও দেখেননি।

টেড কোপেল: রাষ্ট্রদূত সাহেব, আপনার প্রাপ্য সব সম্মান দিয়েই আপনাকে বলছি যে, আমি মার্চে ঢাকাতেই ছিলাম, ২৫ মার্চ রাতে আমরা নির্মম নির্যাতন দেখেছি, নিরস্ত্র জনসাধারণের বিরুদ্ধে ট্যাংক ব্যবহার করতে দেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ে বোমা মারতে দেখেছি, অবশ্য একটা সময় পর আমাদের আর বাইরে যেতে দেয়া হয়নি— আপনি নিশ্চয়ই বলবেন না এর সবই পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য বাহিনীর বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলের কাজ। শুনুন, বেসামরিক লোক হত্যা করা হয়েছে, তাদের হত্যা করা হয়েছে, যখন তাদের প্রতিরোধ করার কোনো সুযোগ ছিল না।

আগা হিলালি: হ্যাঁ, আমি তো বলিনি যে কোনো বেসামরিক লোক মারা যায়নি। গ্রামের পর গ্রাম মোটেও ধ্বংস করা হয়নি, কিছু বাড়িঘরে আগুন লেগেছে।

বব ক্লার্ক: কিন্তু আমাদের কাছে রিপোর্ট আছে এ ধ্বংস অত্যন্ত বিস্তৃত, গোটা গ্রাম ধ্বংস করা হয়েছে।

আগা হিলালি: এটা আসলে তথ্যের ফারাকের ব্যাপার। এটা এমন বিস্তৃত কিছু নয় যে, তা আবার নির্মাণ করা যাবে না। কিছু নষ্ট হয়েছে— কিন্তু এটা এমন নয় যে আমরা পুননির্মাণ করে শরণার্থীদের সেখানে পুনরায় থাকার বন্দোবস্ত করতে পারব না।

 

পাকিস্তানি সৈনিকের ফ্ল্যাশব্যাক ১৯৭১

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাবেক সাজোয়াঁ ও কমান্ডো অফিসার জাভেদ হুসেইন ফিরে দেখছেন ১৯৭১। ঈষৎ সংক্ষেপে তার লেখাটি অনূদিত—

১৯৭০-এর নির্বাচনে জনগণের রায় অমান্য করে এবং পূর্ব পাকিস্তানে নিজ দেশের মানুষের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী লেলিয়ে দিয়ে পাকিস্তানের সেনা নেতৃত্ব ভয়ঙ্কর সংকট ও আতঙ্কের রাজত্ব কায়েম করে।

একটি রাজনৈতিক সংকটের সামরিক সমাধানের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় ভারতের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধের কথা এবং সেই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার কথা ভাবা উচিত ছিল। আর তা করতে গেলে সবার আগে ঢাকার প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা উচিত ছিল তার। ভারত ও পাকিস্তান উভয় বাহিনীরই কৌশলগত ফোকাল পয়েন্ট হচ্ছে ঢাকা। ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার ব্যবধানে দুটি ফ্রন্টে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত শক্তি দুই দেশের কোনোটিরই ছিল না। সুতরাং ভারত সঠিকভাবেই পশ্চিম রণাঙ্গনের জন্য কৌশলগত প্রতিরক্ষা কানুন এবং পূর্ব রণাঙ্গনের জন্য কৌশলগত আক্রমণাত্মক কানুন অনুসরণ করে।

ভারতীয় সেনাবাহিনী তাদের টার্গেট যে ঢাকা, তা সঠিকভাবেই চিহ্নিত করে এবং খুব দ্রুত যে ঢাকা দখল করা যাবে না, তাও নিশ্চিত হয়। সেজন্য ঢাকায় কেন্দ্রীভূত শক্তি চারদিকে বের করে আনার পরিকল্পনা করে। জেনারেল নিয়াজির বাতিক এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি ইঞ্চি জায়গা শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে রক্ষা করা, হাস্যকর কৌশল তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আরো সহায়তা করে।

এদিকে ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তান ও কাশ্মীরকে ইতিহাসের কাছে ছেড়ে দেন।

২০ নভেম্বর ১৯৭১ থেকে নিয়াজির হাস্যকর কৌশল কাজে লাগিয়ে ২ হাজার ৭০০ কিলোমিটার সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে ছোট মাপের আক্রমণ চালাতে থাকে। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের বাহুল্যের অহংকার করা প্রতিরক্ষা কৌশল ভারতীয় ফাঁদে আটকে যায়। ঢাকা থেকে সমরশক্তি সীমান্তের দিকে পাঠিয়ে দিয়ে নিয়াজি ঢাকার প্রতিরক্ষা শক্তি নিঃশেষ করে দেন।

ফলে ১৪ ডিসেম্বর বিনা বাধায় ভারতীয় বাহিনী ঢাকায় পৌঁছল। আসলে নভেম্বরের শেষ নাগাদ এসে পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্ত প্রতিরক্ষা প্রায় ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নিয়াজির কর্মকৌশল ব্যর্থ হলো এবং তিনি নিয়ন্ত্রণ হারালেন। তিনি যদি তার রণাঙ্গন চারদিকে বিস্তৃত না করে কেবল ঢাকার প্রতিরক্ষায় মনোযোগ দিতেন, তাহলে ঢাকার পতন অন্তত ছয় মাস ঠেকিয়ে রাখা যেত।

জুলাই ১৯৭১ থেকে পূর্ব রণাঙ্গনে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সমারোহ বাড়তে থাকে পশ্চিম থেকেও আনা হয়। ১৯৬৭তে সিনাইতে আরব বাহিনীর প্রস্তুতি দেখে ইসরায়েল যা করেছিল, ভারত তাই অনুসরণ করে।

১৯৭১-এর সেপ্টেম্বরে যখন ভারতীয় বাহিনী পশ্চিম রণাঙ্গনে পূর্ব প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি নেয়নি, পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আক্রমণ চালিয়ে রাভি চেনার করিডোর বিচ্ছিন্ন করে সাম্বা মধুপুর লাইন দখলে এনে ভারত অধীকৃত কাশ্মীর ভারত ভূখণ্ড থেকে আলাদা করে ফেলা যেত। তারপর এগোনো যেত জম্মুর দিকে। ভূকৌশলগত আক্রমণ বিবেচনা করলে এটিই হতো পাকিস্তানের জন্য শ্রেষ্ঠ আঘাত, যা হয়তো যুদ্ধের মোড় পাল্টে দিতে পারত। সেক্ষেত্রে ইয়াহিয়া খান দুটি পদাতিক ও দুটি সাজোয়াঁ ডিভিশন এবং কমান্ডো রিজার্ভে রেখে চার ডিভিশন পদাতিক ও তিনটি সাজোয়াঁ ব্রিগেড এবং কিছু সংখ্যক কমান্ডো দিয়ে আক্রমণ পরিচালনা করতে পারতেন।

কিন্তু ৩ ডিসেম্বর তিনি যখন পশ্চিম সীমান্ত খুললেন তিনটি পদাতিক ডিভিশন ও একটি সাজোয়াঁ ব্রিগেড কৌশলগতভাবে গুরুত্বহীন তিনটি সেক্টরে অপচয় করলেন (চাম্ব, জয়সালমার ও পুঞ্চ সেক্টরের প্রতিটিতে এক ডিভিশন পদাতিক ও চাম্ব সেক্টরে একটি সাজোয়া ব্রিগেড)। তিনটি অপারেশনই ব্যর্থ হলো, রাভি চেনার করিডোরে পাল্টা আঘাতও ব্যর্থ হলো, পাকিস্তানকে দুঃখজনক ক্ষতির বোঝা বহন করতে হলো। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ যখন যুদ্ধ শেষ হলো, বহু অর্থমূল্যে সৃষ্টি করা সৈন্য বাহিনীর বিশাল রিজার্ভ রয়ে গেল অব্যবহূত, স্বল্পকালীন যুদ্ধের বেলায় এ এক অমার্জনীয় অপরাধ।

সময়মতো আক্রমণ পরিচালনা করতে পারলে একই সঙ্গে কাশ্মীর উদ্ধার এবং পূর্ব পাকিস্তান রক্ষা করা হয়তো সম্ভব হতো। সময়মতো সাড়া না দেয়ায় ইয়াহিয়ার সামনে আর কোনো সুযোগ রইল না। সুযোগ চলে গেল, সেই সঙ্গে ইতিহাসে প্রবাহিত হলো পূর্ব পাকিস্তান ও কাশ্মীর। সেদিন বিকালে ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সম্মান ধুলায় লুটিয়ে গেল।

যুদ্ধ জেতায় উচ্চতর রণপরিকল্পনা ও উচ্চতর রণকৌশল। ১৯৬৫ ও ১৯৭১— দুটো যুদ্ধে পাকিস্তানে পরিকল্পনা ও কৌশল নির্ধারণে নেতৃত্বের অভাব ছিল। ১৯৬৫-র অপারেশন গ্র্যান্ড স্ল্যামে ব্যর্থতার জন্য দায়ী ইয়াহিয়া খান কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সুযোগটি হারালেন ১৯৭১ সালে।