অনূদিত লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ‘মাটি’ পত্রিকার ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ সংখ্যায়। সম্পাদক গোলাম কিবরিয়া। নির্বাহী সম্পাদক মারুফ রায়হান। এখানে পরিমার্জিত আকারে উপস্থাপিত। অনুবাদক প্রিসিলা রাজ
এক জাপানি কবি বলেছিলেন, ‘তুমি যখন আয়নার দিকে তাকাও, তখন তুমি নিজের প্রতিবিম্বকে দেখো না, বরং তোমার প্রতিবিম্ব তোমাকে দেখে।’
আলোকচিত্র আজ শাটার, সেলুলয়েড, লেন্স আর ভিডিওটেপের মাধ্যমে মানুষ আর প্রকৃতির পরম প্রতিবিম্ব হিসেবে হাজির হয়েছে। জাপান আর কবিতা থেকে অর্ধেক পৃথিবী দূরে, আজ এখানে আমরা ফটোগ্রাফিক পরিপ্রেক্ষিতের মাধ্যমে সংস্কৃতির শিকড় সন্ধানের মরিয়া চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছি। এ সন্ধানের শুরু হয়েছিল ১৮২৭-এ গ্রীষ্মের এক দুপুরে, নিসেফোর নিপসের প্রথম ছবিটি তোলার সঙ্গে সঙ্গে। সেই যাত্রা ‘ত্রিশ মিনিটের দাগুরিওটাইপ’ ও উইলিয়াম হেনরি ট্যালবটের পেপার নেগেটিভের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আজকের সর্বত্র বিরাজমান ইলেকট্রনিক ইমেজের যুগে এসে পৌঁছেছে।
১৯ আগস্ট ১৮৩৯-এর সেই নিয়তিনির্দিষ্ট দিনে দাগুরিও তার ফটোগ্রাফির জাদু দিয়ে উত্তেজিত প্যারিসবাসীকে মুগ্ধ করে দিয়েছিলেন। পরবর্তী কয়েক ঘণ্টায় ফ্রান্সের দোকানগুলোয় ভবিষ্যৎ আলোকচিত্রীদের ঝড় বয়ে গিয়েছিল। আর আজ পৃথিবীর ১০০টি দেশ থেকে আলোকচিত্রপ্রেমী মানুষ এক একক ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন FIAP (International Federation of Photographic Art), RPS (The Royal Photographic Society), PSA (International Federation of Photographic Art)-এর মাধ্যমে, যার মূলে রয়েছে আলোকচিত্র।
এখন সময় এসেছে আত্মানুসন্ধানের, যা আলোকচিত্রের গত দেড়শ বছরের ইতিহাসে আড়ালে থাকা ইমেজভাণ্ডারকে কেন্দ্র করে চালিত হবে। তৃতীয় বিশ্বের আলোকচিত্রকে শনাক্ত করা, একই সঙ্গে বিশ্লেষণ করার সময় এখন। এ অনুসন্ধানের অনেকখানি জুড়ে থাকবে FIAP, RPS ও PSA-এর ভ্রূণ সঞ্চারের ইতিহাস, আর থাকবে আমাদের মাতা এ পৃথিবী স্বয়ং।
চাঁদের আকাশে পৃথিবীর উদয় হয়। বিশাল রুপোর গোলকের মতো, উজ্জ্বল, স্নিগ্ধ। শান্তির দূতের মতো সাদা মেঘে ঢেকে যায় মানবের তৈরি তৃতীয় বিশ্ব। স্বর্গের গভীর নীল আর কালোয় ভাসতে ভাসতে নভোচারীরা একে অন্যের ছবি তোলেন। অনেক নিচে, অযুত মানুষের পৃথিবীতেও শাটারের শব্দ ওঠে, অমরত্বের তেষ্টা মেটাতে। শিল্পায়নসমৃদ্ধ হূদয় ও মস্তিষ্ক আর জাপানি ও জার্মান ক্যামেরার কাব্যিক সূক্ষ্মতার মিলনে অমরত্বের অনেকখানি সাধ তার মেটে।
কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের মগ্ন হূদয়রা আজো চেষ্টা করে যায় বুদ্ধি খাটিয়ে নিজের মান্ধাতার আমলের যন্ত্রটিকে বাগ মানানোর। বাংলাদেশের রাস্তায় কালো কাপড়ের নিচে পথ আলোকচিত্রীর কালো চোখে যখন ফুটে ওঠে গভীর অভিনিবেশ, ক্যামেরার সামনে তখন গভীর বিস্ময়ে অপেক্ষা করে আরেক মানুষ কাঠের বাক্সের জাদু দেখবে বলে। মিনিটে ছবি তোলা যন্ত্রের কাছে হার মানে দক্ষিণ আমেরিকার নারীর দুর্বার কৌতূহল। আর আফ্রিকায় উপজাতীয় কৃষ্ণকলি বিশ শতকের পোলারয়েড, আলোকচিত্র আর যোগাযোগের হিং টিং ছট দেখে চমত্কৃত হয়।
পূর্ব বা পশ্চিম যার হাতেই থাক না কেন, উত্তর অথবা দক্ষিণ যার ভাবনাকেই রূপায়িত করুক না কেন, তৃতীয় বিশ্ব অথবা সুবিধাভোগী জাতি যার চোখেই দেখা হোক না কেন, ক্যামেরা সবসময়ই প্রকাশ করে, অভিব্যক্ত করে। বিগত দশকগুলো ধরে মানুষের ইতিহাসকে বৈশ্বিকভাবে বোঝার ক্ষেত্রে আলোকচিত্র নিয়ামক ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি মানব ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হিসেবেও তার প্রতিষ্ঠা ঘটেছে।
অতীতচারণা
কয়েক হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অধিকারী তৃতীয় বিশ্ব, যা তাকে আলোকচিত্র আবিষ্কারের প্রায় শুরু থেকে এর প্রতি আকৃষ্ট করেছে। ১৮৩০ সালের কাছাকাছি কোনো এক সময় ফটোগ্রাফিক ইমালশনের সঙ্গে গ্লাসপ্লেট আর পেপারের প্রথম সখ্য যখন স্থাপিত হলো, তৃতীয় বিশ্বের সঙ্গেও যোগাযোগটা হলো ঠিক সে সময়েই।
‘১৮৪০ থেকে ১৮৬০— এ সময়টুকুতে বালি, জাপান, চীন ও ভারতের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী জায়গাগুলোর ঔজ্জ্বল্য অনেকটাই মরে আসে, কারণ ক্যামেরার জাদু দিয়ে ততদিনে আলোকচিত্রী বাজার থেকে লোকশিল্পীকে হটিয়ে দিয়েছেন। এ বিজয় এতটাই নিশ্ছিদ্র ছিল যে, আমরা ১৮৬৬ সালে গোবি মরুভূমিতে ভ্রাম্যমাণ বণিককে তার স্টিরিওগ্রাফটিকে নিয়ে জমজমাট ব্যবসা ফাঁদতে দেখি।’
‘তবে পুরো এশিয়ায় মাত্র দুজন কি তিনজন শিল্পী আলোকচিত্র শিল্পের দিকে কঠিন যাত্রার কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছিলেন। এদের মধ্যে মাত্র একজন একে পুরোপুরি পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি হচ্ছেন রাজা দীনদয়াল, ১৮৮৪ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত যিনি হায়দরাবাদে ষষ্ঠ নিজামের দরবার আলোকচিত্রী ছিলেন। দীনদয়ালের ছবিতে ক্যামেরার বাস্তব পর্যবেক্ষণের সঙ্গে ভারতীয় চিত্রশিল্পীর শিল্পদৃষ্টির এক চমত্কার সমন্বয় ঘটেছিল। ফলে তিনি উনিশ শতকী ভারতের সর্বোত্কৃষ্ট নেটিভ ফটোগ্রাফার হয়ে উঠেছিলেন।’
‘ভারতীয় ধ্রুপদী চিত্রশিল্পীর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তাকে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে যাওয়ার অনায়াস অনুশীলন করতে হয়। ড্রাফটসম্যান ও চিত্রকর দয়ালও সেই ঐতিহ্যের হাত ধরে তার ক্যামেরার চোখকে নিসর্গ থেকে প্রতিকৃতি, প্রতিকৃতি থেকে দলগত (panoramic group shot) ছবি, দলগত ছবি থেকে স্থাপত্য এবং স্থাপত্য থেকে সামাজিক ব্যাখ্যাধর্মী ছবিতে নিয়ে গেছেন। সব ক্ষেত্রেই সাফল্য ছিল অনায়াসলব্ধ ও স্বচ্ছন্দ। উনিশ শতকের আলোকচিত্রীদের মধ্যে একমাত্র দীনদয়ালই মহারানী ভিক্টোরিয়ার কাছ থেকে সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। রানীর আলোকচিত্রী হিসাবে নিয়োগ পান তিনি।’১
তবে তৃতীয় বিশ্বের মানুষের ওপর স্রেফ তৃতীয় বিশ্বের বাসিন্দা হওয়ার কারণেই নিয়তি যে নির্মম পরিহাসগুলো করে থাকে, তার হাত থেকে দীনদয়ালও রেহাই পাননি। ইতিহাসের নিষ্ঠুরতার কাছে তাকেও মাথা নোয়াতে হয়েছে। ১৯১০ সালে তার মৃত্যু হয়। তারও অনেক বছর পর তার প্রতিষ্ঠিত আলোকচিত্রের পারিবারিক ব্যবসায়ে ধস নামে। দয়াল পরিবার দয়ালের সংগৃহীত ও নিখুঁতভাবে তালিকা করা ৫০ থেকে ৬০ হাজার গ্লাস নেগেটিভ টুকরো কাচের দামে বিক্রি করে দেয়। আমাদের অশেষ সৌভাগ্য যে দীনদয়ালের পাশাপাশি ‘বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ড’, ‘জনসন অ্যান্ড হফম্যান’ ও অন্যান্য ব্রিটিশ আলোকচিত্রী ব্যক্তিগত আগ্রহে ভিক্টোরিয়া যুগের ভারতকে তাদের ক্যামেরায় ধরে রেখেছিলেন। তাদের ছবি আজ আমাদের সেই যুগের কথা বলে, যার পরিণতিতে সৃষ্টি হয়েছে আজকের তৃতীয় বিশ্ব। দয়ালের পারিবারিক ব্যবসায় মেয়েদের আলোকচিত্র তোলা শেখানোর জন্য ‘জেনানা স্টুডিও’ পর্যন্ত খোলা হয়েছিল। এর পরিচালক ছিলেন মিসেস কেনি লেভিক নামে এক ব্রিটিশ ভদ্রমহিলা, তার স্বামী ১৯০০ সালে ‘টাইমস অব লন্ডন’-এর স্থানীয় প্রতিনিধি ছিলেন।
সিলোনের (শ্রীলংকা) ওপর জুলিয়া মার্গারেট ক্যামেরনের কাজ এবং ঊনিশ শতকের শেষ ও বিশ শতকের শুরুর দিকে কয়েকজন পশ্চিমা আলোকচিত্রীর কাজ তৃতীয় বিশ্বের সে সময়কার রূপকে অমর করে রেখেছে। ১৮৫৫-এর জানুয়ারিতে বোম্বে ফটোগ্রাফিক সোসাইটির প্রথম সাময়িকী প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে এশিয়ার আলাকচিত্রের ওপর ছবিসমৃদ্ধ সাময়িকী ‘দি ইন্ডিয়ান অ্যামেচারস ফটোগ্রাফিক অ্যালবাম’ প্রকাশিত হতে শুরু করে।
থাইল্যান্ডে আলোকচিত্রের সূচনা হয় রাজা তৃতীয় রামের সময়ে। তবে থাইল্যান্ডের সাধারণ মানুষ ছবি তুলতে খুব একটা উৎসাহী ছিল না। তাদের একটি বিশ্বাস ছিল, ছবি তুললে আয়ু কমে যায়। এটি আজো তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে লোকবিশ্বাস হিসেবে টিকে আছে। থাইল্যান্ডে প্রথম আলোকচিত্র স্টুডিও স্থাপিত হয় ১৮৬৩ সালে এবং প্রথম শ্রেষ্ঠ আলোকচিত্র নির্বাচন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় ১৯০৫ সালে। ১ হাজার ১৮৪টি ছবি নিয়ে এতে ১০৪ জন আলোকচিত্রী অংশ নেন। রাজা চুলালং কর্ন, যিনি নিজেই ছিলেন একজন দক্ষ আলোকচিত্রী, ১৮৯৫ সালে এক নিবন্ধে লেখেন, ‘ড্রাইপ্লেট প্রসেস এখানে মাত্র গত ১৫ বছর ধরে শুরু হয়েছে। প্রথম দিকে বেশির ভাগ আলোকচিত্রই নষ্ট হয়ে যেত। পরে ডাকনৌকা দ্রুত পাড়ি দিতে শুরু করলে এদের মানও উন্নত হতে শুরু করে।’
ভারত আর থাইল্যান্ড তৃতীয় বিশ্বের আলোকচিত্রের গুরুকুল এবং তাদের যে শত সহস্র সমস্যা নিত্য মোকাবেলা করতে হতো তার উদাহরণ মাত্র। এর ১০০ বছর পরও তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে সৃষ্টির তৃষ্ণা মেটানোর জন্য আলোকচিত্র ‘ডাকনৌকার’ অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে। আজকে ভারত FIAP অনুমোদিত ছয়টি ও PSA অনুমোদিত আরো কয়েকটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীর নিয়মিত আয়োজন করছে। থাইল্যান্ড তার ১৫০তম আলোকচিত্র বার্ষিকী উপলক্ষে প্রতিষ্ঠা করেছে “আলোকচিত্র জাদুঘর’। তবে ভালো ছবি তোলার জন্য যে প্রযুক্তি ও কাঁচামালের প্রয়োজন, এসব দেশের আলোকচিত্রীদের এখনো অনেক কষ্টে সেগুলোর জোগাড় করতে হয়। সুতরাং উন্নয়নশীল দেশগুলোর আলোকচিত্রের উন্নতি অনেকটাই তাদের অর্থনীতির উন্নয়নের গতিমুখ দ্বারা নির্দেশিত।
প্রাণের সন্ধান, মাধ্যমের সন্ধান
‘যে বিশ্বে শতকরা ৪০ ভাগ দ্রব্য শতকরা ৬ ভাগ লোক ভোগ করে, যে বিশ্বে উন্নয়ন সিঁড়ির এ-মাথা আর ও-মাথার দেশের মাথাপিছু আয়ের অনুপাত ২০০ : ১, সেখানে কোনো কিছুতে পূর্ণতা অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া বড়ই কঠিন।’২ তৃতীয় বিশ্বে অন্ন আর জীবনধারণের ন্যূনতম ব্যয়ের তুলনায় আলোকচিত্রের খরচ অনেক বেশি। ফলে শিল্পীর জীবনযাপনের সংগ্রাম আর জেলাটিন শিল্প— এ দুয়ের অবস্থান এখানে নির্ধারিত হয় বিপরীত মেরুতে। জীবনজুড়ে আর্থিক টানাপড়েন তৃতীয় বিশ্বের আলোকচিত্রে এক ভিন্ন ব্যঞ্জনা ও মাত্রা যোগ করেছে। এখানে শিল্পীর আত্মানুসন্ধান থেকে শিল্প ফটোগ্রাফিক প্লেটে স্থান করে নেয়।
প্রাচীন সংস্কৃতির অধিকারী হয়েও তৃতীয় বিশ্বের দৃশ্যাবলিতে যা প্রবলভাবে উপস্থিত, তা এর সংস্কৃতি নয়; বরং এর মানুষ এবং তাদের জীবনধারণের তীব্র ও বিচিত্র চেষ্টা। এখানে প্রকৃতি নয়, মানুষ, ফুলের কুঁড়ি নয়, মানুষের চোখ, নদীর শান্ত স্রোত নয়, অশ্রু এবং বাতাসে দীর্ঘশ্বাসের ধ্বনি জীবন ও জীবনকেই একমাত্র দেখার বিষয় বলে স্থির করতে শিল্পীকে বাধ্য করে। সমসাময়িককালে তাই তৃতীয় বিশ্বের আলোকচিত্রের বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে স্বয়ং মানুষ এবং শিল্পের এ সন্ধান অনুষ্ঠিত হয়েছে মানুষের হূদয়ের অন্তরতম উৎস থেকে।
তৃতীয় বিশ্বের আলোকচিত্রকে দারিদ্র্য ও তার কঠিন বাস্তবতা যেন আবিষ্ট করেছে, চিত্র বিষয় হিসেবে বারবার ফিরে এসেছে। পল ফ্যাক্স যেমনটা বলেছেন: ‘আলোকচিত্রের মাধ্যমে মানুষের মনকে নাড়া দিতে চাই আমি, গভীরভাবে এবং যত বেশি স্তরে সম্ভব তত বেশি স্তরে।’
ফলে আমরা দেখি জগতের অধিকাংশ নৈসর্গিক আলোকচিত্র যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ভাগ্যবান দেশগুলোর ক্যামেরায় নির্মিত হয়েছে। এসব দেশে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অনেক ছন্দোবদ্ধ, শান্তিময়। আলোকচিত্রীর চোখে তারই ছবি ধরা পড়ে। তবে এক্ষেত্রে তৃতীয় বিশ্বের ব্যতিক্রম হচ্ছে হংকং, এর সংলগ্ন চীনের কিছু অংশ ও ম্যাকাও। সেখানকার বিস্তীর্ণ জলরাশি ও উচ্চ পাহাড়মালার নিসর্গের রূপ হাজার বছর ধরে চীনা শিল্পীরা ধরে রেখেছেন চিত্রমালা ও সিল্কস্ক্রলের প্রসিদ্ধ ঐতিহ্যে। ক্যামেরা এখানে পেইন্টিংস ও সিল্কস্ক্রলের সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকে ধরে রাখার প্রয়াস পেয়েছে।
তৃতীয় বিশ্বের অধিকাংশ দেশের নিত্য জীবনচর্যায় ধর্ম ও সংস্কৃতি এ দুটি শব্দ প্রায় সমার্থক। এখানে ধ্যানই একমাত্র সময়, যখন মানুষ ক্ষুধাকে অতিক্রম করে যায়, যখন ঈশ্বরের প্রার্থনার কাছে হার মানে প্রতিবাদ, জীবনের দৈনন্দিনতাকে ছাড়িয়ে যায় উৎসবসংগীত আর মানুষের বহুমূল্য হাসি অশ্রুর মুক্তোবিন্দুকে মুছে দেয়। এসব মুহূর্তেই তৃতীয় বিশ্বের আলোকচিত্রীরা ক্যামেরায় সাদা-কালোর পরিবর্তে রঙিন ফিল্ম পোরেন, আঙুলের অতি সাবধানী স্পর্শের বদলে ক্যামেরার শাটারে গতি ভর করে, গুনে গুনে এক্সপোজার দেয়ার পরিবর্তে তখন তারা ফিল্ম খরচ করেন অকাতরে।
আর তৃতীয় বিশ্বে প্রকৃতি তো সর্বত্র বিরাজমান। তাকে মনে করতে হয় না, তিনি নিজেই মনে করিয়ে দেন বালিঝড়, অবিরত বর্ষণ, কালবৈশাখী আর বর্ষার তাণ্ডবে। কিন্তু জীবন চলমান, চাকা ঘুরছে, বৃষ্টি কাদামাখা পায়ের পাতার উজ্জ্বলতা ফিরিয়ে দিচ্ছে। সব জলহাওয়ায় মানানো নাইকন নেই বলে এখানকার আলোকচিত্রীদের প্রকৃতি ও মানুষের ভালোবাসার এ লুকোচুরি ধরে রাখতে তাদের সাধারণ যন্ত্রটিতে কতই না কসরত করতে হয়। সম্প্রতি তাদেরই তোলা একঝাঁক ছবিতে এ শ্রম আয়াস আর ভালোবাসার স্পর্শ আমরা গভীরভাবে বোধ করতে পেরেছি।
শিল্পায়নের বিপুল কলসখানি
তৃতীয় বিশ্বের আলোকচিত্র শিল্প এখন আত্মানুসন্ধান আর শিল্পোন্নয়নের টানাপড়েন, এ দুয়ের মাঝামাঝি অবস্থান করছে। প্রযুক্তি যখন বয়সে অপেক্ষাকৃত নবীন এ শিল্পের দ্রুত উন্নতি ঘটিয়ে চলেছে, তখন তৃতীয় বিশ্বের আলোকচিত্রীদের শিল্প সৃষ্টি কেন্দ্র থেকে যেন ক্রমে দূরে সরে আসছে। তাদের ছবির যথেষ্ট প্রদর্শনী হয় না এবং আন্তর্জাতিক সংযোগ থেকেও তারা প্রায়ই অনেকটা দূরে, ফলে তাদের শিল্পোত্কর্ষ লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যাচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বের নিয়তি এতটাই ‘ভালো’ যে, এর যে রূপ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোয় প্রকাশ পাচ্ছে তার প্রায় সবটুকুই পাশ্চাত্যের আলোকচিত্রীদের ক্যামেরায় ধরা। প্রচুর ব্যস্ততার মধ্যে এরা কয়েক দিনের সফরে আসেন, নিয়ে আসেন ভিন্ন সংস্কৃতির বোধ, দৃষ্টি ও ‘অ্যাসাইনমেন্ট’-এর চাপ, যা তাদের ক্যামেরা-দৃষ্টিতে ধরা পড়ে। তাদের ছবির বিষয়বস্তু হয় নাটকীয় অথবা চমক জাগানো, সাপুড়ে অথবা দারিদ্র্য, অভিষেক অথবা ধ্যান, উপজাতীয় জীবনের খণ্ডাংশ বা শহরের বস্তি, স্নানের ঘাট কিংবা হাতির সারি। এসব ছবি চমত্কৃত করে, বিক্রিও হয় ভালো, কিন্তু বিরল সে ছবি, যে ছবি কথা বলে। ‘লাইফ’ পত্রিকার জন্য কাজ করতে গিয়ে একদা ইউজিন স্মিথকে মন্তব্য করতে হয়েছিল, ‘বহু ছবি তুলেছি আমি... তীব্র, দুঃসাহসী, ব্যঞ্জনাধর্মী আলোকচিত্র, যার বেশির ভাগই ছিল চতুর আর কারিগরির মারপ্যাঁচে ভরা। সেখানে ফিল্ডের গভীরতার অভাব ছিল না, অভাব ছিল অনুভূতির গভীরতার।’
হেনরি কার্টিয়ার ব্রেসনও একবার দুঃখ করে বলেছিলেন, ম্যাগনামের আলোকচিত্রীরা অধিকাংশই তৃতীয় বিশ্বের ওপর কাজ করলেও এর ৪০ জন আলোকচিত্রীর মাত্র দুজন তৃতীয় বিশ্বের। এদের একজন ব্রজিলের সেবাস্তিও সালগাদো, অন্যজন ইরানের আব্বাস।
তবে স্বাভাবিকভাবে এখানেও সংবেদনশীল ব্যতিক্রম রয়েছে। আর্নস্ট হ্যাসের ‘হিমালয়ের তীর্থযাত্রী’ অথবা ব্রায়ান ব্রেক ও ম্যারি অ্যালেন মার্কের উপমহাদেশের জীবন, আশা আর সংগ্রামমুখর মানুষময় আলোকচিত্রাবলি এ ব্যতিক্রমের মধ্যে পড়ে। ওয়ার্নার বিশফের সাদা-কালোয় তোলা তৃতীয় বিশ্বের জীবন থেকে তার গভীর মমতাময় হূদয়কে অনায়াসে পড়ে নেয়া যায়।
কয়েক দশক ধরে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির আলোকচিত্রীরাও চমক জাগানো ও নাটকীয় ছবির পাশাপাশি সেই সব ছবিও তুলেছেন, যেখানে তৃতীয় বিশ্বের অন্তরের চিত্র ও আবেগ প্রকাশ পেয়েছে। আর আজকের তৃতীয় বিশ্বে, ভারত থেকে আর্জেন্টিনা পর্যন্ত মাটি থেকে উঠে আসা একঝাঁক মেধাবী আলোকচিত্রী ক্যামেরার চোখে তাদের একান্ত বিশ্ব উন্মোচন করবেন বলে প্রতীক্ষা করে আছেন।
প্রভু নই, বন্ধু
ভালো আলোকচিত্রের মৌলিকত্ব সম্ভবত এর নিবিড় সংলগ্নতায়। তৃতীয় বিশ্বের সংস্কৃতির জটিলতা, জীবনধারণের জটিল ও বহু বিচিত্র দর্শন এ বিশ্বেরই কয়েকজন বিখ্যাত এবং অনেক অজানা আলোকচিত্র শিল্পীর কাজে গভীরভাবে অনুভূত এবং প্রকাশিত হয়েছে।
এদের মধ্যে দুজন হচ্ছেন ভারতের রঘু রাই ও আর্জেন্টিনার পেদ্রো লুই রাওতা। তাদের বিশাল মাপের বিষয়ভিত্তিক কাজ তৃতীয় বিশ্বের আরো বহু ক্যামেরাকাব্য রচয়িতার ঐতিহ্য ও সামর্থ্যের সূচক।
রঘু রাইয়ের ক্যামেরায় ভারত, তার মানুষ, তার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ধর্ম ও আধুনিক যুগের অন্তরস্পর্শী চিত্র রাইকে দ্বিমাত্রিক এ শিল্পের ইতিহাসে অমর করে রাখবে। পুরনো দিল্লির সন্ধ্যালোকে মুসলিম নারীর নামাজ পড়ার দৃশ্যের পাশাপাশি কলকাতায় হুগলি নদীর পটভূমিতে কালী মন্দিরে প্রার্থনারত প্রৌঢ় পথিক— রঘু রাইয়ের হূদয় ও মস্তিষ্কে ইসলাম ও হিন্দু ধর্ম উপস্থাপিত হয়েছে সর্বজনীন মানবিকতার স্নিগ্ধ আলোয়। আর প্রতিদিনের জীবনে লুকোনো অজস্র মুক্তোর মতো মুহূর্তকে ধরতে রাই ওড়েন সংগীতছন্দে। কুমারী মেয়ের ঝাঁক যে হিল্লোলে রোদ-হাওয়ায় উড়িয়ে-ভাসিয়ে শাড়ি শুকোয়, রাইয়ের ক্যামেরায় ভর করে তা।
সাদা-কালো থেকে রঙে স্বচ্ছন্দ আসা-যাওয়া রঘু রাইয়ের। দিল্লির ওপর রচিত রাইয়ের চিত্রনিবন্ধ মানুষ আর ইতিহাসের মধ্যে চিরায়ত ভালোবাসা, ইটের গাঁথুনির সঙ্গে হূদয়ের বন্ধনকে প্রতিষ্ঠিত করে। ভারতের প্রতি রাইয়ের সুগভীর ভালোবাসা, যা তাকে আজন্ম আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তা-ই তার রঙিন আলোকচিত্রগুলোয় ব্যঞ্জনা পেয়েছে। হয়ে উঠেছে একেকটি মাস্টারপিস। তাজমহল রাইয়ের সাম্প্রতিকতম প্রকাশনার বিষয়। ছবিগুলোয় তাজ সম্পর্কে শিল্পীর আচ্ছন্নতার বোধ বড় স্পষ্ট। তাজের প্রতি তার দৃষ্টি পর্যটকের মুগ্ধ ও বিস্ময়াহত দৃষ্টি নয়, তাজের কানে কানে তাই তিনি উচ্চারণ করেন প্রভু নয়, বিশ্বস্ত বন্ধুর মৃন্ময় শব্দাবলি।
ভারতীয় আলোকচিত্র আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সম্মানিত হচ্ছে দুই দশক ধরে। এ সম্মান তার প্রাপ্য। রঘুবীর সিং পবিত্র গঙ্গা নদীর ওপর তার আট বছরের সিন্দাবাদী যাত্রা সম্পন্ন করেছেন। এক্ষেত্রে তার ভূমিকা পথপ্রদর্শকের। রাজস্থান, কলকাতা, কাশ্মীর আর আন্দামানের ওপর করা তার অন্যান্য কাজ প্রতিযোগিতাবহুল আজকের রঙিন ফটোসাংবাদিকতার মাঠে ভারতকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। বই আকারে প্রকাশিত তার রোমাঞ্চকর ছবিগুলো বিশ শতকের ভারতীয় জীবনের স্থায়ী সাক্ষী। এছাড়া পাবলো বার্থোলোমিউ ভারতের মাদকাসক্তি এবং ভোপাল ট্র্যাজেডির ওপর ছবি তুলে হল্যান্ডে বিশ্ব সংবাদচিত্র প্রতিযোগিতায় দুবার পুরস্কার পেয়েছেন। আশ্বিন গাথার ছবিতে ভারতীয় জীবনের রোমান্টিক আবহ, জাহাঙ্গীর গাজদারের ছবিতে ভারতের বর্ণময় উৎসব, এস পলের সাদা-কালো পটে জীবনের জিজ্ঞাসাময় উপস্থাপন এবং দিলিপ মেহতার আন্তর্জাতিক চিত্রসাংবাদিকতা শুধু যে ভারতের আলোকচিত্রকে সমৃদ্ধ করছে তা নয়, এগুলো বিশ্বজুড়ে এ শিল্পের অমূল্য সম্পদ। ভারতে এখন FIAP ও PSA-এর কার্যক্রম বহুগুণে বেড়েছে। সে দেশের আলোকচিত্রীদের মধ্যে এক কলকাতাতেই শ্রী বেনুসেন একাধারে MFIAP (Master Photographer of FIAP) এবং Excellence of Service Rendered (ESFIAP) হওয়ার সম্মান অর্জন করেছেন। তাছাড়া সুশান্ত ব্যানার্জি, অমিতাভ শীল, টিকে দত্ত, অদিত আগরওয়াল, এসআর মণ্ডল এবং আরো অনেকে নিজ যোগ্যতায় AFIAP (Artist FIAP) হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।
১৯৩৪ সালে দক্ষিণ আমেরিকার কেন্দ্রে, আর্জেন্টিনায় একটি শিশুর জন্ম হয়। ১৯৫০-এ তিনি ছবি তোলা শুরু করে, ১৯৭০ সালের মধ্যে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ আলোকচিত্রীদের সারিতে পেদ্রো লুইস রাওতার নাম খোদাই হয়ে যায়। দক্ষিণ আমেরিকার মানুষ ও জীবনধারার প্রতি পেদ্রোর গভীর ভালোবাসা ও সহানুভূতি জারিত ‘পিপলস ফটোগ্রাফি’র ছবিগুলোকে সাদা-কালো ছবির জগতে একটি মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। পেদ্রো ছবি তোলা ও প্রদর্শনী দুটোতেই সিদ্ধহস্ত ছিলেন। ১৯৬৯ সালে তিনি হল্যান্ডে ‘বিশ্ব সংবাদচিত্রী পুরস্কার’ লাভ করেন এবং ১৯৭০ থেকে ’৭৩-এর মধ্যে প্রায় ৮০টি স্বর্ণপদক ও আলোকচিত্রজগতে যত শীর্ষ পদক আছে, তার সব কয়টি পান। পেদ্রোর কাজ ছাড়াও ‘ডোন্ট ক্রাই ফর মি আর্জেন্টিনা’ একঝাঁক প্রতিভাবান আলোকচিত্রীকে শিল্পের প্রেরণা জুগিয়েছিল। এদের মধ্যে জুয়ান কার্লোস ভিলরিয়াল সমসাময়িক লাতিন আমেরিকার অন্যতম বিশ্বস্ত চিত্ররূপকার। মিগুয়েল কাপরারা ও ফেলিসিয়ানো জিনমার্টের মতো MFIAP আলোকচিত্রীরা এ শিল্পের মুকুটে উজ্জ্বল সব রত্নের মতো। চিত্র রেনেসাঁর জোয়ার আজ আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সেবাস্তিও ও সালগাদোর ব্রাজিল থেকে ম্যানুয়েল আলভারেজ ব্রাভোর মেক্সিকো পর্যন্ত। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, দক্ষিণ আমেরিকার সাম্প্রতিক ৫০০ শতাংশ থেকে ৩ হাজার শতাংশ মুদ্রাস্ফীতির পটভূমিকায় এ শিল্পগুরুদের ভবিষ্যৎ কী?
আলোকচিত্রের জাদু আজ তৃতীয় বিশ্বের সুদূর প্রান্তে শিল্পীর হূদয় দখল করে নিয়েছে। আলোকচিত্রীরা সেখানে ফটোগ্রাফি নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। বাংলাদেশী আলোকচিত্রীরা স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত ৩০০-এরও বেশি আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছেন, চরম প্রযুক্তিগত অসুবিধার পরও। তুরস্ক, সাইপ্রাস, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মাল্টা এবং অন্য দেশগুলো এক দশক ধরে আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। বতসোয়ানা, জ্যামাইকা, সিয়েরা লিয়ন, মালদ্বীপ বা পাপুয়া নিউগিনি থেকে দারুণ সব আলোকচিত্রভিত্তিক কাজ আজ আর অবাক হওয়ার মতো কোনো ঘটনা নয়। তৃতীয় বিশ্বের এ শিখাকে জ্বালিয়ে রাখার জন্য এখন এ দেশগুলোর একটি আন্তর্জাতিক আলোকচিত্রী সংঘ জরুরি হয়ে উঠেছে। এ ধরনের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়েই কেবল সংস্কৃতি ও সীমান্তের বাধা পেরিয়ে, ধর্ম ও অর্থনীতির স্বার্থ সংকীর্ণতা ভেদ করে, শিল্প ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানুষে মানুষে চিরায়ত বন্ধন রচনা করা সম্ভব হবে।
শিল্প, না রাজনীতি?
তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় আলোকচিত্রের ধারা গড়ে উঠেছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সামাজিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে বা সমাজচিত্র তুলে ধরার উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। এর কারণ শিল্পের পাশাপাশি এর শত শত বছরের রাজনৈতিক পশ্চাত্পট। পশ্চিমে বিবর্তিত ‘আর্ট ফটোগ্রাফি’ ধারাটিকে বরণ করে নেয়ার চেষ্টা তৃতীয় বিশ্বে কেবল হাল আমলে দেখা যাচ্ছে। এর কারণগুলো হতে পারে শিল্পীর সুগভীর ঐতিহ্য সংলগ্নতা, বিষয় হিসেবে সামাজিক সংগ্রাম ও খোদ মানুষ দ্বারা আচ্ছন্ন থাকা, জীবন ও শিল্প সম্পর্কে অত্যন্ত ভিন্ন মূল্যবোধ এবং তার সঙ্গে রয়েছে শিল্পায়নভিত্তিক অর্থনীতির অভাব।
উত্তরের দেশগুলোয় মানুষ প্রায় সময় জীবনকে সুন্দর করে সাজানোর একটি উচ্চমূল্যের উপকরণ হিসেবে সানন্দে শিল্পের ব্যবহার করে থাকে। আর দক্ষিণের মানুষের কাছে শিল্প ব্যবহারের জিনিস। পাশ্চাত্যে ভোগ্যপণ্যের আকর্ষণ বাড়াতে বিজ্ঞাপন আলোকচিত্রের বিকাশ এবং অসংখ্য আর্ট গ্যালারি ও আর্ট ডিলারের উপস্থিতি এসব দেশে শিল্পবস্তু হিসেবে আলোকচিত্রের নতুন চাহিদা তৈরি করেছে। ফলে এদিক থেকে আলোকচিত্রের জায়গা হয়েছে বিমূর্ত ছবি ও ভাস্কর্যের সঙ্গে একই সারিতে। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বে আলোকচিত্রের প্রয়োজন নিরূপণ হয় সামাজিক ব্যবহারযোগ্যতার নিরিখে, সেটি কারো জন্য সামাজিক কারণে হতে পারে, আবার হতে পারে কারো আত্মার খোরাকের জন্য। সৌভাগ্যক্রমে ছবি সীমিত সংখ্যায় প্রিন্ট করা ও সেজন্য ফিল্ম নেগেটিভ নষ্ট করার নার্সিসাসি ধারণা ও চর্চা থেকে আমরা এখনো অনেক দূরে। কারণ এখানে আলোকচিত্র তথা শিল্প একযোগে সবার উপভোগের বিষয়। সুতরাং তৃতীয় বিশ্বের ওপর তোলা ‘লিমিটেড এডিশন প্রিন্ট’ যদি পশ্চিমা কোনো গৃহের দেয়ালের শোভা বাড়ায়, তবে তা এক ধরনের পরিহাসই হবে।
সৃজনশীলতার দায়বোধ যদি কেবল আত্মার কাছেই হয়ে থাকে, তাহলে বিষয় উপস্থাপনে উত্তর ও দক্ষিণের শৈলীর ভিন্নতা নিয়ে আপত্তি করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। ইমেজের ব্যক্তিত্বে ব্যক্তি, ভূমি ও সংস্কৃতির ছাপ থাকবে, যার ওপর ভিত্তি করে ইমেজের নিজস্ব চরিত্র গড়ে উঠবে— এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
তৃতীয় বিশ্বে বেশির ভাগ দেশের মানুষের জীবন রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিপর্যস্ত। রাজনৈতিক আদর্শ ও জটিল যুক্তিবোধের গোলকধাঁধায় আলোকচিত্র শিল্পের আদর্শাবলির প্রায় সলিল সমাধি ঘটে। তৃতীয় বিশ্বের আলোকচিত্রীরা স্বদেশের রাজনৈতিক পালাবদলের ছবি ক্যামেরায় ধরতে গিয়ে বহু বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। তারা যখন ক্যামেরার শাটার টেপেন তখন শাটারের শব্দের সঙ্গে মিশে যায় তিরস্কার, নির্যাতন, সেন্সরশিপের কাঁচি আর প্রাণনাশের হুমকির আওয়াজ। ট্র্যাজেডি হচ্ছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি এ পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন তার নিজের দেশে বসে। এ ট্র্যাজেডির আরেক দিক, পশ্চিমা ফটোগ্রাফাররা যখন তৃতীয় বিশ্বের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের ছবি তুলতে আসেন তখন তাদের এত বাধার মুখোমুখি হতে হয় না। ফলে বিশ্বের নামিদামি সাময়িকীর আলোকচিত্রীরা খরচের তোয়াক্কা না করে আলোকচিত্রে সমসাময়িক তৃতীয় বিশ্বের ইতিহাস রচনা করতে পেরেছেন। এভাবেই আমরা পেয়েছি কোরিয়ান যুদ্ধের ওপর ডেভিড ডগলাস ডানকান, ভিয়েতনামের ওপর ল্যারি বারোজ, বাংলাদেশের ওপর ডন ম্যাককুলিন, এছাড়া এডি অ্যাডামসের বিখ্যাত সংবাদচিত্রগুলো।
স্বল্প পরিসরে হলেও তৃতীয় বিশ্বের আলোকচিত্রীরা আন্তর্জাতিক সংবাদচিত্রে নিজেদের উত্কর্ষ প্রমাণ করেছেন। কিশোর পারেখের ‘দ্য ব্রুটাল বার্থ অব বাংলাদেশ’, দিলীপ মেহতার আফগানিস্তান যুদ্ধের ওপর ‘কন্ট্যাক্ট প্রেস ইমেজেস’, পিটার ম্যাগুবেনের দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ, করিমের মুহূর্তের ক্ষিপ্রতায় তোলা সাদাতের হত্যাদৃশ্য, সেবাস্তিও সালগাদের ক্যামেরায় সাহেল দুর্ভিক্ষ ও আব্বাসের ফটোসাংবাদিকতা এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।
যোগাযোগ ও সংগঠন
‘সময়ের সাথে সাথে মানুষের ইতিহাস আরো বেশি করে যোগাযোগ ও বিপর্যয়ের মধ্যে নির্ধারিত হচ্ছে। সকল স্তর ও মাত্রায় যোগাযোগ ব্যবস্থার পূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটিয়ে মানুষের ভবিষ্যেক নিশ্চিত ও সুদৃঢ় করাই এখন আমাদের প্রধান দায়িত্ব। ইতিহাস ছাড়াও মানুষের যে ভবিষ্যৎও আছে, এ প্রত্যয় আমাদের শিশুদের মধ্যে স্থাপন করা দরকার।’৩
তৃতীয় বিশ্বে আজ সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও সহজ যোগাযোগ মাধ্যম হলো দর্শনযোগ্য মাধ্যম, যার কেন্দ্রে আছে আলোকচিত্রবহুল পত্রিকা, চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন। আলোকচিত্র এ তিনটিরই প্রাণ। তথ্যচিত্র থেকে শুরু করে কাহিনীচিত্র, টেলিভিশন বিজ্ঞাপন থেকে সোপ অপেরা সবকিছুতেই ক্যামেরা ইমেজের উপস্থিতি অনিবার্য।
কানাডার দূরতম কোণ থেকে পাপুয়া নিউগিনির গহিন গ্রামে হাজার মাইল দূরত্বে থাকা মানুষের মধ্যে, তাদের সংস্কৃতির মধ্যে সেতু তৈরি করতে পারে আধুনিক প্রযুক্তির আশীর্বাদ এ ছবিযন্ত্র। তাই তৃতীয় বিশ্বের ভবিষ্যৎ যদি রচনা করার ইচ্ছে থাকে, এর শিশুদের যদি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখানোর ইচ্ছে থাকে, তবে এখনই আমাদের সেই শ্রমসাধ্য নির্মাণ শুরু করতে হবে; যার একটি হবে দৃষ্টিমাধ্যমে পরস্পরের সংস্কৃতি ও শিল্পকে পরস্পরের কাছে পৌঁছে দেয়া।
১৯৫০ থেকে FIAP-এর দ্বিবার্ষিক আলোকচিত্র প্রদর্শনী, RPS-এর ১২৫ বছরের বেশি সময় ধরে প্রদর্শনী, জাতিসংঘ আয়োজিত প্রদর্শনী, PSA অনুমোদিত আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী প্রভৃতি তৃতীয় বিশ্বের আলোকচিত্রকে আবিষ্কারের ক্ষেত্রে বিপুল অবদান রেখেছে। এ উদ্যোগগুলো এসব দেশে আলোকচিত্রের নতুন নতুন দিক উন্মোচন করেছে, নতুন নতুন প্রতিভা আবিষ্কার করেছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো তাদের FIAP ও PSA স্বীকৃত আলোকচিত্রীদের কাজ নিয়ে যৌথ প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে। অতীতে FIAP অনুমোদিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তৃতীয় বিশ্বের আলোকচিত্রীরা বহু মেডেল জিতেছেন। পাশাপাশি ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ, মাল্টা ও সাইপ্রাসকে যৌথভাবে কমনওয়েলথের শ্রেষ্ঠ আলোকচিত্র সংস্থা হিসেবে সম্মানিত করা হয়েছে।
এসব ছবি তৃতীয় বিশ্বের আলোকচিত্রীদের শিল্পশৈলী ও সংবেদনশীলতার সাক্ষ্য রেখেছে। পৃথিবীর দুর্গম অঞ্চলের বিচিত্র সংস্কৃতির সমাজে অনাবিষ্কৃত প্রতিভার অস্তিত্ব প্রমাণ করেছে। এ পটভূমিতে দাঁড়িয়ে কমনওয়েলথ প্রদত্ত আলোকচিত্র পুরস্কার, ‘লন্ডন ’৮৭’ আয়োজিত ‘ইমেজেস’ অনুষ্ঠান কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর আলোকচিত্রীদের জন্য এক ধরনের উপসংহার হিসেবে কাজ করেছে। তবে ইচ্ছে করলে এ সংস্থা FIAP, RPS, PSA ও ইউনেস্কোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়িয়ে এ শিল্পমাধ্যমটির আন্তর্জাতিক বিকাশে আরো ভূমিকা রাখতে পারত।
আগামী
FIAP, RPS ও PSA তাদের আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে তৃতীয় বিশ্বের আলোকচিত্রীদের জন্য পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারে। আলোকচিত্রের দ্বিশতবার্ষিকীর সন্তান আজকের ‘চিত্রশিশুদের’ ভবিষ্যতের জন্য আমরা কিছু পদক্ষেপ নিতে পারি বৈকি—
‘তৃতীয় বিশ্বের আলোকচিত্র বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন’ গঠন।
এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা আর আফ্রিকায় আলোকচিত্র, ভিডিওগ্রাফি ও সিনেমাটোগ্রাফি শেখানোর জন্য ছোট ছোট ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা বিচার।
অন্তর্বর্তীকালীন ইউনেস্কো বা এ-জাতীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরো বেশি ফেলোশিপ ও বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা।
আলোকচিত্র সংরক্ষণের জন্য একটি আন্তর্জাতিক আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে তৃতীয় বিশ্বের আলোকচিত্রীদের ছবির প্রিন্ট নেগেটিভ ও স্লাইড সংরক্ষণ ও প্রকাশের ব্যাপারে বিশেষ সুবিধা থাকবে।
আন্তর্জাতিক আলোকচিত্রের ওপর একটি নিয়মিত সাময়িকী প্রকাশের ব্যবস্থা।
প্রত্যেক তৃতীয় FIAP দ্বিবার্ষিক প্রদর্শনী ও কংগ্রেস, PSA সম্মেলন ও RSP প্রদর্শনী তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশে আয়োজন করা।
তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর তৃতীয় বিশ্বের আলোকচিত্রীদের তোলা ছবির ছোট ছোট বই প্রকাশের জন্য আগ্রহী প্রকাশক, ফাউন্ডেশন বা ট্রাস্টের সন্ধান।
উপরের ‘স্বাপ্নিক প্রস্তাবগুলো’ বাস্তবায়নে FIAP, PSA, RSP ও ইউনেস্কোর জন্য আরো বেশি বাজেটের প্রচেষ্টা।
স্বপ্ন দেখতে দোষ নেই। তাই আমরাও স্বপ্ন দেখতে পারি সেদিনের, যেদিন তৃতীয় বিশ্বের একজন আলোকচিত্রীর ছবি দিয়ে সাজানো ‘তৃতীয় বিশ্বের একটি দিন’ নামে বই বের হবে এবং আমরা বিস্ময়ে আর আনন্দে দেখব ‘অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন বা চীনের একটি দিনের’ মতো এ আমাদের জীবনেরই মহাকাব্য।
যাত্রা
‘আলোকচিত্র সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান আজ অক্ষরজ্ঞানের মতোই অপরিহার্য হয়ে দেখা দিয়েছে। ভবিষ্যতে এমন সময় আসবে যখন নিরক্ষর বলে বিবেচিত হবেন সেইজন, যার অক্ষরজ্ঞান ও ছবি তোলার জ্ঞান দুটোর কোনোটাই নেই।’৪
তৃতীয় বিশ্বের অবস্থা এতটাই নাটকীয় যে, এখানে একদিকে অধিকাংশ মানুষ কলম ধরতে শেখার নিরন্তর সংগ্রামে নিরত, আরেকদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গার্সিয়া মার্কেজ আর সোয়েঙ্কারা বিশ্বের সাহিত্যভাণ্ডার পূর্ণ করে চলেন। যখন এ বিশ্বের অধিকাংশ পরিবারের কাছে ক্যামেরা স্বপ্নের মতন তখন এ বিশ্বেরই আলোকচিত্রীরা পৃথিবীর কাছে তাদের সমৃদ্ধ হূদয় আর জীবনকে মেলে ধরেছেন।
সন্দেহ নেই, অনন্তের পানে এ এক মহাযাত্রা। তৃতীয় বিশ্বের শিশুরা জন্ম নেয় ঐতিহ্য আর ইতিহাসের দিগন্তে। এখানে শৈশব মা-বাবা ও স্বজনের ভালোবাসা আবিষ্কারে কাটতে পারে অথবা নিত্যসাথী হতে পারে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার ক্ষমাহীন রাত। কৈশোর স্নেহের বন্ধনে পরিপুষ্ট হতে পারে, অথবা প্রাপ্য হতে পারে অনাথের শূন্য জীবন। যৌবন মুঠোভরে দিতে পারে জীবন বিকাশের শক্তি, অথবা ভাগ্যে লিখে রাখতে পারে অন্ন সন্ধানের রূঢ় সংগ্রাম। তৃতীয় বিশ্বের মানুষ প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছলে নিজেদের যাবতীয় অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান নিজেদের জীবনে প্রয়োগ করেন, অথবা অন্যদের জীবনে দান করেন। এভাবেই এখানে আশা আর হতাশায় জারিত জীবনের পরিণতি ঘটে। তবে প্রত্যেক সূর্যাস্তে অথবা রাতে বিদ্যুৎ বাতি নিভে যাওয়া যেমন আরেকটি সূর্যোদয়ের ইঙ্গিত আনে, তেমনি জীবন থমকে যায় মানবজীবনের গূঢ় অর্থ পুনরাবিষ্কার করবে বলে।
তৃতীয় বিশ্বের কোনো এক প্রান্তে কোনো এক শিল্পী শৈশব থেকে বার্ধক্য অবধি ক্যামেরা ও আলোকচিত্রে যাত্রা করতে পারেন। জীবনের সব রূপ আর অনুভবকে ক্যামেরায় ধরে রাখার চেষ্টা করতে পারেন। একটা যাত্রা কখন শুরু হয় অথবা শেষই বা হয় কোথায়, এটা হয়তো কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়। জন বার্গার তার সচিত্র ‘A Seventh Man’ বইয়ে বলেছেন, “স্বপ্নে এক বন্ধু বহু দূর থেকে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল। তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তুমি কীভাবে এসেছ, ফটোতে না ট্রেনে’?” সব আলোকচিত্রই আসলে এক ধরনের বাহন, যাতে চড়ে অতীত আর অদেখা সামনে এসে দাঁড়ায়। সব আলোকচিত্রেই অনুপস্থিতির অনন্ত প্রকাশ ঘটে।
আর আমার আছে তিনটি জিজ্ঞাসা: ‘তুমি কীভাবে এসেছ, সাদা-কালোয় না রঙিনে? কোত্থেকে এসেছ, তৃতীয় বিশ্ব, কমনওয়েলথ, নাকি বিশ্বমানবতার কাছ থেকে? কার মধ্য দিয়ে এসেছ, FIAP, RPS, UNESCO, PSA, নাকি অনন্তসন্ধানী আলোকচিত্রের ১৫০ বছরের ইতিহাসের ভেতর দিয়ে?’
তথ্যসূত্র
(১) ওয়রসউইকের Princely India বই থেকে সংকলিত, ১৯৮০ (Pennwick/Agrinde/Knopf)
(২) ম্যাকব্রাইড কমিশন রিপোর্ট
(৩) এইচ জি ওয়েলস
(৪) Laszlo Maholy-Nagy






