২৪ নভেম্বর সন্ধ্যা। শিল্পকলার গ্যালারি-৫ থেকে একটি অনুষ্ঠান শেষ করে বের হওয়ার পথেই চমকে যাই বাংলাদেশের কিংবদন্তি আলোকচিত্রীকে দেখে!

‘আনোয়ার ভাই আপনি কবে এলেন দেশে?’

আমার হাতটা ধরে জোরে হেসে বললেন, ‘গতকাল। শোনো! তুমি দাঁড়াও একটু, আমি গ্যালারিটা এক চক্কর দিয়ে ছবিগুলা দেখে আসি। তারপর তোমাদের সঙ্গে চা খাব, আড্ডা দেব,’ বলেই প্রজাপতির মতো ভোঁ করে দৌড়ে গ্যালারির ভেতরে প্রদর্শনী কক্ষে চলে গেলেন আমাদের আদর্শ, আমাদের অগ্রজ, বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিনেমাটোগ্রাফার ও বরেণ্য আলোকচিত্রশিল্পী আনোয়ার হোসেন।

আনোয়ার হোসেন ১৯৯৫ সাল থেকে স্থায়ীভাবে বাস করেন শিল্পের তীর্থভূমি প্যারিসে। বছরে একবার হলেও মাতৃভূমিতে আসার চেষ্টা করেন।

দেশে এলেই দেখা হয়ে যেত আলোকচিত্রের কোনো উৎসব বা প্রদর্শনী বা কোনো আড্ডায়। সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে ফেসবুকে কথা হলে বলতেন, ‘এবার ঢাকায় এসে তোমার ফটোগ্রাফি চর্চায় আড্ডা দেব ম্যারাথন।’ আমি আনোয়ার হোসেনকে বলেছিলাম, ভাই— এই প্রজন্ম আপনার কাজ দেখেনি বললেই চলে, এবার আপনাকে নিয়ে ফটোগ্রাফি চর্চায় একটা দুই দিনব্যাপী লেকচার সেশন করব আপনার ছবি নিয়েই। এই প্রজন্ম জানুক আনোয়ার হোসেনকে।

সম্মতি দিলেন, এ ডিসেম্বরেই হবে এমন একটি জ্ঞানগর্ভ আলোচনা, যেখানে থাকবে শুধু আনোয়ার হোসেনের অপ্রদর্শিত ছবি নিয়েই নতুন প্রজন্মের সঙ্গে কথোপকথন এবং ছবির স্লাইড শো।

স্বপ্ন বুনলাম এক রকম! হয়ে গেল বেদনার নীল! আনোয়ার হোসেনের সব ছবিই যেমন আমাদের দেখা হয়নি, ঠিক তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞাকে আমরা আমাদের বিকাশে কাজে লাগাতে পারিনি। তার মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মহাতারকা খুব বেশি নেই আমাদের। 

তিনি তার অসামান্য নির্মাণশৈলীর জন্য পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন, আবার বেদনার কথা এ মেধাবী আলোকচিত্রশিল্পীকে রাষ্ট্র সম্মানীত করতে পারেনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক বা স্বাধীনতা পদক দিয়ে। নির্মোহ, সরল, স্পষ্টবাদী, আনোয়ার হোসেনের জীবনে সুপারিশ বা ধরনা দেয়ার চর্চা যে নেই।

লেখার শুরুতে বলেছিলাম ২৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় শিল্পকলায় আমাকে অপেক্ষা করতে বলে আনোয়ার ভাই যে প্রজাপতির দৌড় দিয়েছিলেন, সেই দৌড় থেমে যায় ১ ডিসেম্বর ২০১৮ সকালে পান্থপথের একটি আবাসিক হোটেলে। অসমাপ্ত থেকে গেল সেলুলয়েডের ফিতা, ক্যামেরার শ্যাটার।

আমাদের আলো-ছায়ার সব্যসাচী আনোয়ার হোসেন শুধু একজন আলোকচিত্রশিল্পীই নন, তিনি সিনেমাটোগ্রাফার, স্থপতি, লেখক ও শিক্ষক। এসব ছাপিয়ে তিনি দেশের সূর্যসন্তান, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধা। স্যালুট! আমাদের আলোকচিত্রের মহানায়ক আনোয়ার হোসেন।

সন্তানের চোখে তাদের বাবা

আমার বাবা ফ্রান্সে একজন বিশিষ্ট নাগরিক। কিন্তু বাংলাদেশে তিনি একজন বরেণ্য ও খ্যাতিমান আলোকচিত্রশিল্পী, দেশসেরা সিনেমাটোগ্রাফার। এটা দেখে আমি অভিভূত। যদিও আমরা আমাদের পিতাকে হারিয়েছি, কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বাবার জন্য ভালোবাসা দেখে আমরা গর্বিত। গর্বিত এজন্য যে আমরা গুণী ও মহৎ এ ব্যক্তির সন্তান— কথাগুলো বলছিলেন সদ্যপ্রয়াত আনোয়ার হোসেনের জ্যেষ্ঠ পুত্র আকাশ হোসেন। বাবার প্রয়াণে সুদূর ফ্রান্স থেকে ছুটে এসেছেন ছোট ভাই মেঘদূত হোসেনকে নিয়ে। শিল্পকলায় বাবার স্মরণ সভা শেষে আলাপ করছিলাম আকাশ ও মেঘদূতের সঙ্গে তাদের বাবা আনোয়ার হোসেনকে নিয়ে। আকাশ বলল, ‘আমার বাবার সবচেয়ে বড় গুণ তার সরলতা, নির্মোহতা, নিরহংকার। বাবা এত বিখ্যাত ব্যক্তি কিন্তু তাহার কোনো ভাব নেই। সবার সঙ্গে মিশে যেতে পারতেন সহজেই। খুব আড্ডা দিতে পছন্দ করতেন। আমরা পিতা-পুত্রের চেয়ে বন্ধুই ছিলাম বেশি, আমুদে মানুষ আমার পিতা।’ &dquote;&dquote;

বাবার মতো আলোকচিত্রী হতে চাও? জিজ্ঞাসা করতেই আকাশ বলল, ‘ফটোগ্রাফি আমি পছন্দ করি। বাবার ফটোগ্রাফির ভক্ত আমি। কিন্তু ফটোগ্রাফি আমি করি না পড়াশোনার চাপে। পিএইচডি আপাতত আমার প্রধান লক্ষ্য।’ আকাশের পছন্দের বিষয়— গণিত ও কম্পিউটার সায়েন্স। আপাতত পড়াশোনা নিয়েই সময় কাটে ২১ বছরের এ তরুণের। আকাশ আশা করে, তার বাবার অসাধারণ কাজগুলো ভালোভাবে সংরক্ষিত হোক। সবাই তার বাবার কাজগুলো দেখুক। মানুষের অদেখা কাজগুলো নিয়ে প্রদর্শনী হোক দেশব্যাপী। নতুন প্রজন্ম তার বাবার সম্পর্কে জানুক।

বড় ভাই আকাশের চেয়ে ফটোগ্রাফিতে একটু বেশি আগ্রহ আছে মেঘদূত হোসেনের। তবে সেটাও যে খুব বেশি, তা কিন্তু নয়। বরং ক্যামেরার চেয়ে পিঁপড়া নিয়ে গবেষণা করতে ভালোবাসে মেঘদূত। পিঁপড়া কীভাবে বিচরণ করে, পিঁপড়ার জন্য নিরাপদ বাসস্থান, পিঁপড়ার অভয়ারণ্য— এগুলোই বেশি ভাবায় ১৮ বছরের এ কিশোরকে। বায়োলজি নিয়ে অধ্যয়নরত মেঘদূত বলে, ‘বাবার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা আমাদের মুগ্ধ করেছে।  আমি জেনেছি, বাবার ১০ শতাংশ ছবি মাত্র প্রদর্শিত হয়েছে বা মানুষ দেখেছে। আমি আশা করব সরকার এবং এ দেশের সংগঠনগুলো বাবার ছবি নিয়েই যেন দেশব্যাপী প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে, যার মাধ্যমে এ প্রজন্ম বাবার কাজের সঙ্গে পরিচিত হবে। এদিক-সেদিক ছড়ানো ছিটানো বাবার কাজগুলো একত্র করে একটা আর্কাইভ করা হোক’— এ দাবি করে মেঘদূত।

বাবাকে নিয়ে ‘আনোয়ার হোসেন ফাউন্ডেশন’ হচ্ছে জেনে মেঘদূত সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়। বাবার শূন্যতা প্রথমে খুব ভালো বুঝতে না পারলেও মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে বাবাকে সমাহিত করার সময় ভীষণ কষ্ট লেগেছে মেঘদূতের। বাবাকে এ অসময়ে এভাবে দেখবে তা কল্পনায় ছিল না বাংলাদেশের কিংবদন্তি আলোকচিত্রশিল্পীর কনিষ্ঠ এ পুত্রের। 

 

লেখক : আলোকচিত্রী ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক অ্যাসোসিয়েশন