এক.

এ বছর ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’-এর ৭৫ বছর হলো। বাংলার সমাজকে বিপর্যস্ত করার ঐতিহাসিক ওই অধ্যায় নিয়ে আমাদের সমাজে আলাপ-আলোচনা-স্মরণ সামান্যই। একটি বইয়ের সূত্রে এখানে কিছু কথা বলতে হচ্ছে। বইটিকে স্মরণই মুখ্য লক্ষ্য। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষের মতোই ছবির এ বইয়ের বয়সও ৭৫ বছর হলো। মূল্যবান এ গ্রন্থের রচয়িতা চিত্রশিল্পী চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য। ‘কাস্ট সিস্টেম’-এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে চিত্তপ্রসাদ সচরাচর ‘ভট্টাচার্য’ পদবি ব্যবহার করতেন না। বইটি অনেকখানি তার চিত্রকলারই সংকলন। সঙ্গে রয়েছে স্কেচগুলোর অল্প অল্প বিবরণ।

কৈশোরে চাটগাঁয়ে থাকতেন চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য। এখানেই বামপন্থী আদর্শে দীক্ষিত হন। কলকাতায় গিয়ে তা আরো দৃঢ় হয়। ১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষকালে তাকে এবং আলোকচিত্রী সুনীল জানাকে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখার জন্য পাঠানো হয় তখনকার কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে। সুনীল জানার সঙ্গে চিত্তপ্রসাদের ঘুরে ঘুরে দেখা দুর্ভিক্ষের সেই মাঠচিত্রের সংকলনই এই বই। ব্রিটিশ সরকার তাত্ক্ষণিকভাবে সেদিন চিত্তপ্রসাদের ‘হাংরি বেঙ্গল’-এর সব কপি আটক করে পুড়িয়ে ফেলে। একটি কপি কোনোভাবে ওই অবস্থা থেকে রেহাই পায়। তারই প্রচ্ছদের ছবি এটি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘুরে ঘুরে এ বইয়ের প্রদর্শনী হয় মাঝে মাঝে। ভারতের আর্ট কালেক্টর ‘ডিএজি’ বইটির ওই কপি ২০১১ সালে কিনে নেয় চিত্তপ্রসাদের বোনের কাছ থেকে। পেন্সিলের রাজনীতি অনুভবের জন্য পাঁচ হাজার কপি থেকে বেঁচে যাওয়া ‘হাংরি বেঙ্গল’-এর ওই একটি কপি বাংলার অনেক গবেষকের কাছেই আজ অমূল্য এক রত্নবিশেষ।

দুই.

১৯৪৩-এ বাংলার দুর্ভিক্ষ ও পরবর্তী মহামারীতে মারা গিয়েছিল অন্তত ৩০ লাখ মানুষ। মৃত্যুর এ সংখ্যাই বলে দেয়— কী দুর্যোগ গিয়েছিল সে সময়। কিন্তু এই মন্বন্তরের কার্যত তেমন কোনো সরেজমিন ডকুমেন্টশনই হয়নি তখন।

বর্তমানে অনেক গবেষণায় প্রমাণিত, ব্রিটেনের যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের দুরভিসন্ধিমূলক নীতিকৌশলই বাংলায় ওই আকালের বড় কারণ ছিল। এক্ষেত্রে ২০১০ সালে প্রকাশিত মধুশ্রী মুখোপাধ্যায়ের ‘চার্চিলস্ সিক্রেট ওয়ার’ গুরুত্বপূর্ণ বহু বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য হাজির করেছে। যা থেকে প্রমাণ মেলে জাপান বর্মা দখলের কারণে ব্রিটিশশক্তি কীভাবে চাল মজুদে অত্যধিক জোর দেয়। তখন বর্মা ছিল ব্রিটেনের ভারতীয় বাহিনীর খাবারের বড় এক সরবরাহকারী। ব্রিটিশদের নির্দয় ও সচেতন মজুদনীতির কারণে বাংলায় সাধারণ মানুষের মাঝে প্রধান খাবারের অভাব দেখা দেয় সেসময়। বছরের শুরুতে এক দফা সাইক্লোন পরিস্থিতিকে আরো দুর্বিষহ করেছিল মাত্র। উপনিবেশিক প্রশাসন এ খাদ্যসংকটের কথা বহির্বিশ্বে গোপন রেখেছিল। যুদ্ধের উছিলায় বর্বর এক সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়। ভারতীয়দের প্রতি ছিল চার্চিলের তীব্র বর্ণবাদী ঘৃণা। অথচ তখনো তাদের বাহিনীতে খেটে চলেছিল লাখ লাখ ভারতীয় সৈনিক। আর বাংলায় মরছিল সেসব সৈনিকের অনেক নিকটাত্মীয়। কী অসাধারণ শাসন কৌশল!

দুর্ভিক্ষরূপী ওই গণহত্যার বছরটি ছিল বাংলা ১৩৫০ সাল। সে কারণেই আজো গ্রামবাংলায় ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর’ নামেই তার স্মৃতিচারণ করেন বয়স্কজনরা। এটাও এখন জানা, বাংলায় দুর্ভিক্ষের মাঝেই ব্রিটেন ও শ্রীলংকায় চাল নেয়া হচ্ছিল ইন্ডিয়া থেকে। অন্যদিকে গ্রাম সমাজে চালের সরবরাহ কমাতে নৌকা ও গরুর গাড়ির চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল।&dquote;&dquote;

দুর্ভিক্ষ বিষয়ে তথ্যপ্রবাহে নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও মাঠপর্যায় থেকে প্রকৃত অবস্থা জানতে কমিউনিস্ট পার্টি ছিল তখন উদগ্রীব। দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পি সি যোশী ছিলেন প্রকৃতই দূরদর্শী। সাংগঠনিক নেতাদের পরিবর্তে তিনি এ কাজের জন্য বাছাই করেন দুই শিল্পীকে। চিত্তপ্রসাদ বিভিন্ন জেলা ঘুরে দুর্ভিক্ষের চাক্ষুষ মহাকাব্যিক এক চিত্ররাজি এঁকেছিলেন ‘হাংরি বেঙ্গল’ গ্রন্থে। সহযাত্রী সুনীল জানাও সেদিন এমন সব ছবি তুলেছিলেন, যা আজো দর্শককে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। হাংরি বেঙ্গলে বিভিন্ন জেলার পরিস্থিতির পৃথক পৃথক স্কেচ রয়েছে। প্রতিটি স্কেচেই বাংলার সেদিনকার বোবা কান্নার ছাপ। কৃষিজীবী সমৃদ্ধ বাংলায় ‘ভাতের ফেন’ চাওয়া সে-ই প্রথম। এমনও বিবরণ পাওয়া যায়, চালবাহী মালগাড়ি চলে যাওয়ার পর শিশুদের পাঠানো হতো রেললাইনে চাল খুঁজতে! পোকামাকড়ও খাচ্ছিল মানুষ— শুধু ক্ষিধার জ্বালায় নয়, পরের মৌসুমের ফসল যেন কোনোভাবে মার না যায়, সেই ভয়ে।

সব অর্থেই চিত্তপ্রসাদের হাংরি বেঙ্গল ৭৫ বছর আগের বাংলার মানবসৃষ্ট বিপন্নতার দুর্লভ এক চিত্র-দলিল। যদিও চাটগাঁয়ে— বাংলাদেশে তিনি সেই সূত্রে স্মরিত হয়েছেন কিনা জানি না। তবে হওয়া জরুরি।

কেবল তাকে সম্মান জানাতেই নয়, শিখতেও— শিল্পকলা ও শিল্পী কীভাবে সমাজের আর্তনাদকে ভাষা দেয়। অযুত শিল্পকর্মের মাঝেও যেরূপ কণ্ঠস্বর এখন বিরল। ‘বাজার’-এর বাইরে যেন লেখক-চিত্রী-আলোকচিত্রীদের আর কোনো দায় নেই আজ আর। খাদ্য সংকট থেকে খাদ্য সমৃদ্ধির যুগে এসে আমরা এখন প্রকৃতই আরেক দুর্ভিক্ষে পড়েছি বোধহয়। পঞ্চাশের মন্বন্তর থেকে এটাও আমাদের জানা, ‘দুর্ভিক্ষের স্মৃতি’ ভোলা যায় না। হয়তো আজকের বুদ্ধিজীবিতার দুর্ভিক্ষের কথাও আমাদের অনাগত স্মৃতিচারণে থেকে যাবে।

তিন.&dquote;&dquote;

চিত্তপ্রসাদ-সুনীল জানা শিল্পী জুটি সম্পর্কে আরো দুটি কথা বলা দরকার। সুনীল জানার জন্ম আসামে, ১৯১৮ সালে। তিনি চিত্তপ্রসাদের চেয়ে তিন বছরের ছোট ছিলেন। যদিও বেঁচে ছিলেন ৩৪ বছর বেশি। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়তেন।

চিত্তপ্রসাদ ও সুনীল জানা উভয়ই ছিলেন কমিউনিস্ট নেতা পি সি যোশীর ঘনিষ্ঠ এবং তখনকার প্রগতি লেখক সংঘের সদস্য। পার্টি কমিউনে থাকতেন।

কমিউনিস্ট নেতা হিসেবে যোশী ছিলেন প্রকৃতই ভিন্ন ধাঁচের। গণমাধ্যম হিসেবে পেন্সিল ও ক্যামেরা যে কত শক্তিশালী হতে পারে, সেটা তিনি জানতেন। তার আগ্রহেই চিত্তপ্রসাদ ও সুনীল জানার স্কেচ এবং ছবি বের হতো তখন ‘পিপলস্ ওয়ার’ পত্রিকায়। চিত্তপ্রসাদ ফ্যাসিবাদবিরোধী অনেক পোস্টারও এঁকেছিলেন ওইদিনগুলোতে। অনেক সময়ই পিপলস্ ওয়ার-এর এক পাতাজুড়ে এ দুজনের ছবি ও স্কেচ ছাপা হতো। পার্টি পত্রিকায় এ রকম দৃশ্য আজকালও বিরল। কিন্তু যোশি তাই ঘটিয়েছিলেন। চিত্তপ্রসাদ ও সুনীল জানার কাজে ফুটে উঠত তখনকার ওয়ার্কিং ক্লাসের বাস্তব অবস্থা। অন্য কাগজগুলো ব্রিটিশ সেন্সরশিপের কারণে মাঠপর্যায়ের ঘটনাবলি প্রকাশে দ্বিধান্বিত থাকত। পিপলস্ ওয়ার সে কারণে দেশ-বিদেশের অনেকের কাছেই ছিল ভারতের অবস্থা বোঝার নির্ভরযোগ্য সূত্র। এভাবেই একপর্যায়ে খ্যাতনামা ‘লাইফ’ ম্যাগাজিনের সাংবাদিক মার্গারেট বোর্ক হোয়াইট ছুটে এসেছিলেন সুনীল জানার সঙ্গে কাজ করতে।&dquote;&dquote;

যোশী কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে চিত্তপ্রসাদকে বিশেষ সহায়তা করলেও যত দূর জানা যায়, তাকে রাজনৈতিকভাবে তৈরি করেছিলেন চট্টগ্রামের পূর্ণেন্দু দস্তিদার।

হাংরি বেঙ্গলের স্কেচ এবং সুনীর জানার ছবির মতোই বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম ওই অধ্যায়ের আরেক নিবিড় করুণ সাক্ষী জয়নুল আবেদিনের স্কেচ। এটাও ৭৫ বছর আগের বাংলার মন্বন্তরের গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

এক্ষেত্রে আরেকজনের কথাও বলতে হয়। তিনিও ছিলেন প্রথাবিরোধী এক চরিত্র— ফ্রিদা বেদি। ব্রিটিশ এই নারী পাঞ্জাবে কমিউনিস্ট পিয়ারে লাল বেদিকে বিয়ে করে ভারতের রূপান্তরবাদী রাজনীতিতে জড়িয়ে গিয়েছিলেন এবং চিত্তপ্রসাদ ও সুনীল জানাদের বাংলা সফরের কিছুদিন পর তিনিও সরেজমিনে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি দেখে ‘বেঙ্গল লেমেন্টিং’ নামে একটি গ্রন্থ লিখেন। যার প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন শোভা সিং। হাংরি বেঙ্গলের মতোই ‘বেঙ্গল লেমেন্টিং’ পঞ্চাশের মন্বন্তরের আরেক বিরল প্রামাণ্য দলিল।

লক্ষণীয় যে, চিত্তপ্রসাদ, সুনীল জানা, ফ্রিদা বেদি— তারা কেউই প্রচলিত অর্থে তাদের সময়ের সমাজ গবেষক ছিলেন না। কিন্তু তাদের হাত দিয়েই আমরা পাচ্ছি ওই সময়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সমাজচিত্রগুলো। জয়নুল আবেদিন এবং সোমনাথ হোরকেও এই তালিকায় যুক্ত করতে পারি আমরা। এসব মহান শিল্পীর কারণেই বাংলায় ব্রিটিশদের অবহেলায় সৃষ্ট গণহত্যার ঐতিহাসিক স্মৃতি ৭৫ বছর পরও জীবন্তভাবে বেঁচে আছে। বস্তুত রাষ্ট্রবাদী গবেষণা সাহিত্যের বাইরে অপ্রচলিত সূত্রগুলোই যে উপনিবেশ এবং উপনিবেশ-উত্তর কর্তৃত্ববাদী শাসনামলের নির্ভরযোগ্য সমাজচিত্র দেয়, তার এক চিরসবুজ নজির হাংরি বেঙ্গল ও বেঙ্গল লেমেন্টিং। এসব সূত্রের ওপর দাঁড়িয়েই পরবর্তীকালে অমর্ত্য সেনসহ অনেকেই দুর্ভিক্ষ বিষয়ে অনেক গবেষণা কাজ করেছেন। এসব সাক্ষ্যের ওপর দাঁড়িয়েই হয়তো একদিন চার্চিলসহ তত্কালীন ব্রিটিশ নেতৃত্বের বিচারের দাবি উঠবে। ১২ থেকে ১৫ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর জন্য হিটলারের সহযোগীরা যদি বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন— তিন-চার মিলিয়ন বাঙালির মৃত্যুর জন্য চার্চিলের সহযোগীরা নন কেন? সুতরাং এমন দিন দূরকল্পনা নয় যে, একটি বই একটি গণহত্যার বিচারের দাবি তৈরি করবে। চিত্তপ্রসাদ হয়তো তার শিল্পীসত্তার সেই মানবিক অন্তর্দৃষ্টির ওপরই বাজি ধরেছিলেন।&dquote;&dquote;

পুনশ্চ:

বাংলায় পঞ্চাশের মন্বন্তরের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের শৈলেন সরকার সম্প্রতি একই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের অসাধারণ যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তার কথাও বলতে হয়। এখনো ওই দুর্ভিক্ষের স্মৃতি নিয়ে সেদিনের না খেতে পাওয়া মানুষদের যারা বেঁচে আছেন, তাদের ভাষ্য সংরক্ষণ করছেন শৈলেন সরকার। বলা বাহুল্য, ৯০-১০০ বছর বয়সী মানুষগুলো বাংলার সমাজে এখন খুব কম। তার পরও যারা আছেন, তাদের খুঁজে বের করছেন শৈলেন সরকার। তার পরিশ্রমী প্রচেষ্টায় বেরিয়ে এসেছে ওই দুর্ভিক্ষে বাংলার মানুষ কী অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেছে তার বিবরণ। মন্বন্তর ও হাংরি বেঙ্গলের ৭৫ বছর পূর্তিকালে শৈলেন সরকারের এ উদ্যোগকেও অভিনন্দন জানাতে হয়।

 &dquote;&dquote;

লেখক: দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস-বিষয়ক গবেষক