দীর্ঘদিন মুক্তিযুদ্ধের তথ্য-উপাত্ত অনুসন্ধানের পর ১৯৭১-এ প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক হাতে লেখা সাইক্লোস্টাইল মেশিনে ছাপানো ‘পাক্ষিক অগ্নিবাণ’ পত্রিকা আমার হস্তগত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর দুই নম্বর সেক্টরের বৃহত্তর ঢাকা জেলার পশ্চিমাঞ্চলীয় সদর দপ্তর মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার দরিকান্দি গ্রামের কাজিবাড়ি থেকে প্রকাশিত হতো পাক্ষিক অগ্নিবাণ। এ পত্রিকাটি মোট চার সংখ্যা বের হয়েছিল। পত্রিকাটি সুচারুভাবে যাতে প্রকাশিত হয়, সেজন্য উপদেষ্টা পরিষদ, সম্পাদকীয় বোর্ড ও কর্মী পরিষদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী পরিচালনা বোর্ড গঠন করা হয়।

উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন আব্দুল মতিন চৌধুরী ও আব্দুর রউফ খান। সম্পাদকীয় বোর্ডে ছিলেন হায়াৎ আলী মিয়া, সৈয়দ আনোয়ার হোসেন পিন্টু, গোলাম মহিউদ্দিন ছানা, আবুল পাশা চুন্নু ও আশরাফ উদ্দিন খান। মহিলাবিষয়ক সম্পাদিকা ছিলেন নাসিমা সুলতানা। কর্মী পরিষদে ছিলেন রাকিব চৌধুরী, রজ্জ্বব আলী, লিয়াকত হোসেন, সিরাজ উদ্দিন, শাহ আলম, শহিদুল হক, ইয়াকুব হোসেন, জানে আলম খান, আব্দুস সাত্তার, আবুল মুনসুর, কাজি খুরশিদ আলম, মিসেস জোসলিন গোমেজ, মোশারফ হোসেন এবং সাইক্লোস্টাইল মেশিন অপারেটর ছিলেন অ্যান্থনি গোমেজ প্রমুখ। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এ পত্রিকায় ঢাকা পশ্চিমাঞ্চলের খবরাখবর পরিবেশন ছাড়াও বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের রণাঙ্গনের খবর ছাপা হতো। এছাড়া আন্তর্জাতিক সংবাদ টুকিটাকি খবর, সাহিত্যের আসর, সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় খবর বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।  

স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মুখপত্র হিসেবে অগ্নিবাণ পত্রিকাটির প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে ৫ অগ্রহায়ণ, শনিবার, ১৩৭৮ সাল মোতাবেক ২০ নভেম্বর ১৯৭১ সালে ঈদ সংখ্যা হিসেবে। হাতে লেখা ডুপ্লিকেটিং কাগজে সাইক্লোস্টাইল মেশিনে ছাপা ১০ পৃষ্ঠা-সংবলিত প্রথম সংখ্যা পাক্ষিক অগ্নিবাণ পত্রিকাটির দাম রাখা হয় ১ টাকা।

অগ্নিবাণ পত্রিকায় প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যায় প্রকাশিত সংবাদগুলোর মধ্যে ‘হরিরামপুর থানা মুক্তিবাহিনীর তত্পরতায়’, ‘কে বলে মুজিব কারাগারে?’, সিংগাইর থানার গোলাইডাঙার যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ৮১ জন নিহতের খবর, বায়রা-দোহার শিবালয় নবগ্রাম যুদ্ধে সাফল্যের খবর প্রকাশিত হয়। এছাড়া স্বাধীন বাংলা বেতারের বরাতে ঢাকা টেলিভিশন টাওয়ারে ক্ষতিসাধন, সিলেটের গোয়াইনঘাট থানা, টাঙ্গাইল জেলা ও কিশোরগঞ্জে আটটি থানা মুক্ত হওয়ার খবর, সেই সঙ্গে ‘রণাঙ্গনের শেষ সংবাদ’ শিরোনামে বিবিসির খবরের বরাত দিয়ে মুক্তিবাহিনীর নৌ-কমান্ডোদের চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি জাহাজ বিস্ফোরণ দ্বারা ক্ষতিসাধনের সংবাদগুলো বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের মনে নতুন উদ্দীপনা ও আশার সঞ্চার করে। ‘বিশ্বসংবাদ’ শিরোনামে ভয়েস অব আমেরিকার বরাতে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ৫৩০ জন যুবতীকে এক গোপন কক্ষে উলঙ্গ অবস্থায় আটক, পাকিস্তানি বাহিনীর অমানুষিক অত্যাচারে কয়েকজন যুবতীর পরনের কাপড় দিয়ে আত্মহত্যা এবং কিছুসংখ্যক যুবতী মুক্তি পেলেও তাদের গর্ভবতী হয়ে দুর্বিষহ মানবেতর জীবনের মর্মস্পর্শী ঘটনা প্রকাশিত হয়। এসব খবর বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় তুলেছিল।

‘টুকিটাকি সংবাদ’-এ ‘কালো বোরকা সমাচার’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়, ‘প্রতিদিন করাচি-লাহোর বিমানবন্দর কালো বোরকায় ছেয়ে যায়। কালো বোরকার অন্তরালে থাকা এই সব মহিলারা হচ্ছেন পাকিস্তানি জঙ্গি শাহী কর্তৃক বাংলাদেশে প্রেরিত খানসেনাদের উদ্বেবাকুল মাতা, ভগ্নি, স্ত্রী এবং আত্মীয়-স্বজন। প্রতিদিন তারা করাচি ও লাহোর বিমানবন্দরে ঢাকা থেকে আসা বিমানের প্রতীক্ষায় থাকেন। বিমান অবতরণ করার সাথে সাথেই এই সকল বোরকা পরিহিতা মহিলারা বিমানবন্দর ঘিরে ফেলেন। তাদের দু’চোখ থেকে তখন অবিশ্রান্ত অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরতে থাকে। গভীর উত্কণ্ঠার সঙ্গে তারা অনুসন্ধান করেন, ঢাকা থেকে আনীত মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত লাশের মধ্যে তাদের আপনজনের লাশ আছে কিনা।’

যুদ্ধ যে কত ভয়াবহ, তা এ সংবাদের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়। সেই সঙ্গে পাঠকরা যুদ্ধের করুণ ঘটনার সংবাদ পাঠে বেদনার্ত হয়। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক বস্তুনিষ্ট সংবাদ পরিবেশনায় বিশ্বস্ততায় সর্বজনীন হয়ে ওঠে পাক্ষিক অগ্নিবাণ। যুদ্ধের সংবাদ ছাড়াও ‘রক্তে লেখা সাহিত্যের আসর’ পত্রিকাটির মান ও রুচিবোধের পরিচয় বহন করে। সাহিত্যের আসরে স্থান পায় ‘মুক্তির ডাক’, ‘বঙ্গজননীর রঙ দেখিছি আমি’, ‘বহ্নিপ্রাণ’, ‘বাংলার মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা’। এমনিভাবে বিভিন্ন শিরোনামের প্রবন্ধ, কবিতা, সংবাদ পরিক্রমায় পত্রিকাটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

‘ইয়াহিয়া বনাম বাংলাদেশ’ শিরোনামে সম্পাদকীয়তে রয়েছে: ‘ইয়াহিয়া একটি বীভৎস নাম। শিহরিয়া উঠে একটি দেশ একটি জাতি। আর বিশ্ব বিবেক। বিবেক বর্জিত পশুর বিরুদ্ধে আমাদের যে ধিক্কার, ইয়াহিয়ার বিরুদ্ধে তার চেয়ে কি বেশি নয়?’&dquote;&dquote;

উপসম্পাদকীয়তে ‘এবারের ঈদ’ শিরোনামে লেখা হয়েছে: ‘ঈদ উৎসব প্রতি বছরের ন্যায় এবারো আমাদের আঙ্গিনায় উপস্থিত। এই মহান পবিত্র দিনটি আমাদের জীবনে বয়ে আনে স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দের নববার্তা। কিন্তু এবারের ঈদ তার ব্যতিক্রম। লাখো শহীদের রক্তস্রোতে বাংলাদেশ প্লাবিত।’

পাক্ষিক অগ্নিবাণ পত্রিকার সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয়, বিশ্বসংবাদ, রণাঙ্গনের খবরাখবর, রক্তাক্ষরে লেখা প্রবন্ধ, কবিতা প্রভৃতি সংগ্রামী মানুষের মানে দারুণ রেখাপাত করে।

অগ্নিবাণের দ্বিতীয় সংখ্যায় হরিরামপুর-শিবালয়-দোহার থানার মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল সামরিক অভিযানের খবরাখবর প্রকাশিত হয়। এবং শেখ মুজিবের ছবি উত্কীর্ণসহ বাণী সংবলিত হয়: ‘আমার সংগ্রাম শুধু বাংলাদেশের শোষিত মানুষের জন্য নয়, বিশ্বের সকল শোষিত মানুষের জন্য।’ এছাড়া ‘মুক্তিযুদ্ধ ও গণ সমর্থন’ নামে দীর্ঘ সম্পাদকীয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাহিত্যের আসরের লেখাগুলোর মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজের বীরত্বগাথা নিয়ে সহযোদ্ধা পাশার লেখা ‘অমর মাহফুজ’, ‘হাতে অগ্নিবাণ’ নামে একটি কবিতাও প্রকাশিত হয়। এ সংখ্যায় ‘পাক বর্বরদের অপপ্রচার’, ‘বিভিন্ন রণাঙ্গনের মুক্তিফৌজের সফল অভিযান’ শিরোনামে ঢাকা-মানিকগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ-যশোর এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্য অভিযানের সংবাদ স্থান পায়।

এরপর টেলিগ্রাফ সংখ্যা হিসেবে পরপর দুটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। প্রথম সংখ্যাটি এক পৃষ্ঠায় টেলিগ্রাম সংখ্যা হিসেবে বের হয় ২১ অগ্রহায়ণ। এতে রয়েছে বাংলাদেশকে ভারতের স্বীকৃতিদান, অভিনন্দন ও শেষ সংবাদ।

দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মবলিদানে, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। এই কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা লাভের পর পরই ১ পৌষ দ্বিতীয় টেলিগ্রাফ সংখ্যাটি প্রকাশিত হয় এক পৃষ্ঠায়। এতে স্থান পায় ‘বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত’, ‘বাঙালির ঘরে ঘরে আজ বিজয় উল্লাস’, ‘এই দিনে তোমাকে জানাই লাখো সালাম’ শিরোনামে নিবন্ধমূলক লেখা।

১৯৭১ সালে জাতির সংকট মুহূর্তে বাংলার কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষুরধার লেখনীতে অগ্নিবাণের পাতায় পাতায় জ্বলে ওঠে বহ্নিশিখা। জাতির দুর্দিনে অগ্নিবাণ পত্রিকার বস্তুনিষ্ঠ সংবাদগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বাজি রেখে দেশমাতৃকার মুক্তির লক্ষ্যে দুর্গম পথে চলার অফুরন্ত-দুরন্ত সাহস আর শক্তি জুগিয়েছে। সেই সঙ্গে দেশ ও সারা বিশ্ববাসী অগ্নিবাণে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানতে পেরেছে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরোচিত গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পত্রিকা পাক্ষিক অগ্নিবাণ  ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের কণ্ঠস্বর। কালের পাতায় যেন অগ্নিশিখায় প্রজ্বলিত এক অগ্নিবাণ। স্বাধীনতার ইতিহাসে অগ্নিবাণ আপন মহিমায় বহ্নিশিখার মতো সমুজ্জ্বল, চির অম্লান।

 

লেখক ও গবেষক