মুখোমুখি: ইংমার বার্গম্যানের সঙ্গে জীবন নিয়ে লিভ উলম্যান

অনুবাদ: শওকত হোসেন

নিজের বর্ণাঢ্য পেশা ও পরলোকগত সুইডিশ পরিচালকের সঙ্গে জটিল সম্পর্ক নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন পর্দা-প্রতিমা।

 

ইংমার বার্গম্যানের ১০টি ছবিতে অভিনয় এবং দুটি চিত্রনাট্য পরিচালনার সুবাদে নরওয়েজীয় অভিনেত্রী লিভ উলম্যান অনস্বীকার্যভাবেই তার ছবির সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। তার প্রেমিকা ও তর্কসাপেক্ষে তার মহত্তম চলচিত্রের ভাবনা উলম্যান ১৯৬৬ সালে সুইডিশ পরিচালকের নিজস্ব দ্বীপ আবাস ফারোয় প্রথম তার ছবিতে কাজ করেন।

এরই পরিণামে নির্মিত পারসোনা ছবিটি তার সর্বোচ্চ সাফল্য হয়ে থাকতে পারে বটে, কিন্তু তাদের কাজের সম্পর্কটি সেই গ্রীষ্মের শেষে জেগে ওঠা ভালোবাসা অবসানের বেশ পরও ২০০৩ সালে তার শেষ ছবিটি অবধি টিকে ছিল। বার্গম্যানের জন্মশতবর্ষে লন্ডনের বিএফআই সাউথব্যাংকে অনুষ্ঠানরত চলচ্চিত্র নিয়ে তিন মাসের পূর্ণাঙ্গ রেট্রোস্পেক্টিভ সম্পর্কে বিশ্বচলচ্চিত্রের অন্যতম মহান অভিনেত্রীর সঙ্গে তাদের সফল কিন্তু জটিল সম্পর্ক নিয়ে আলাপে বসেছিলাম।

প্রশ্ন: এতগুলো বছরে নিশ্চয়ই বার্গম্যানের সঙ্গে আপনার জীবন নিয়ে শতশতবার সাক্ষাত্কার দিয়েছেন।

উলম্যান: আমি আসলে কিছু মনে করি না, কারণ অনেক সময় নতুন নতুন কিছু জানা যায়। বিশেষ করে এখন ওর চলচ্চিত্র থেকে বরং বেশি করে লেখালেখির দিকে নজর দিতে গিয়ে ও আমাকে কি চমত্কার একটা ভার দিয়ে গেছে বুঝতে সাহায্য করে এটা। নতুন এক বার্গম্যানকে আবিষ্কার করছি আমি, আমার কাছে ওর নতুন হওয়ার কথা ছিল না, তবু নতুন নতুন। স্রেফ এই অবিশ্বাস্য লেখালেখি আর মানুষের স্বীকৃতি। এমনকি বার্গম্যানের সঙ্গে সম্পর্কহীন কিছু নিয়ে সাক্ষাত্কার দেয়ার সময়ও মনে হয় যেন বারবার ওর কাছেই ফিরে যাচ্চ্ছি।

প্রশ্ন: আপনাদের পেশাগত ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের এতগুলো বছরে কোন জিনিসটা সবচেয়ে বেশি ভুল ধারণা বলে জানতে পেরেছেন?

উলম্যান: ভুল ধারণার কথা আমার জানার কথা নয়, তবে অনেকই হওয়ার কথা। প্রায়ই আমার কাছে ওর সম্পর্কে কিছু বলতে কেমন লাগে জানতে চাওয়া হয়, ওর সম্বন্ধে বলার জন্য নিজেকে আমার উপযুক্তই মনে করি। কারণ ও বেঁচে থাকতে শেষ মুহূর্তে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাওয়া বাতিল করে দিত, তখন তার হয়ে সেসব জায়গায় আমাকেই হাজির হতে হতো। পরিচালক ও অভিনেত্রী হিসেবে আমরা অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছি, তাছাড়া বন্ধু এবং কয়েক বছর ধরে প্রেমিকা হিসেবেও অনেক ভালো করে চিনতাম ওকে আমি। আপনি যখন কাউকে প্রেমিক হিসেবে জানবেন, তখন অন্যরা যেসব কথা জানে না, সেগুলো একজন প্রেমিকাই কেবল জানতে পারে। তাই ওকে নিয়ে বলতে আমার ভালোই লাগে।

আমি কী করছি সেটার ও খোঁজ রাখত। বিবি অ্যানদারসেন ও হ্যারিয়েট অ্যানদারসেনের বেলায়, ওদের বিদেশে যাওয়াটা পছন্দ ছিল না ওর। এমনকি ওরা বাইরে গিয়ে ভালো কাজ করলেও। ম্যাক্স ফন সিডোওকে ও বলেছিল, ‘ম্যাক্স, কেন নিজের ক্যারিয়ার ধ্বংস করছ?’ কিন্তু কোনো কারণে আমার বাইরে কাজ করা পছন্দ করত ও। আমি নিউইয়র্কে মঞ্চে কাজ করতে গেলে স্রেফ এক রাতের জন্য ওখানে যেতে প্রচণ্ড আগ্রহী হয়ে উঠত ও। সম্ভবত ওর যেটা করার ইচ্ছা ছিল, সেটা আমি করায় খুশিই ছিল।

প্রশ্ন: ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তখনকার কথা বারবার স্মরণ করতে গিয়ে কি আপনার স্মৃতি প্রভাবিত হয়েছে? কারণ আপনি একবার বলেছেন, স্মৃতিচারণের ক্ষেত্রে বাছবিচার করতে হয় আপনাকে...

উলম্যান: কবে বলেছি এ কথা?

প্রশ্ন: কয়েক বছর আগে এক সাক্ষাত্কারে।

উলম্যান: মনে হয় আমার মেয়ের একটা বই প্রকাশই এর কারণ ছিল। দুর্দান্ত লেখক ও, কিন্তু ছোটবেলার স্মৃতির ব্যাপারে অত্যন্ত খুঁতখুঁতে। প্রথমে এতে বেশ বিচলিত হয়েছিলাম, কিন্তু ওর স্মৃতি তো আমার স্মৃতি নয়। সেদিক থেকে আমার স্মৃতিও নির্বাচিত। সবকিছু যেরকম ছিল, যেমনটা হওয়ার কথা, আমি সেভাবেই রাখতে চাই।

প্রশ্ন: আপনার দ্বিতীয় স্মৃতিকথা চয়েসেসে আপনি বার্গম্যানের সঙ্গে কাটানো সময়ের বয়ান দেয়া এক প্রেমিকের ভূমিকায় নিজেকে হাজির করেছেন, আপনার কাছেই আপনার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। আপনাকে ‘দুর্গে বন্দি রূপকথার রাজকন্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে বার্গম্যান।

উলম্যান: লেখালেখির মানে আপনার আত্মাকে কাগজের বুকে নামিয়ে আনা, এবং একবার সেটা করা হয়ে গেলে আপনি বুঝবেন আপনার আত্মা থেকে এসেছে বলে ওটা সত্যিকারের আপনিই। ঠিক এটাই বিশ্বাস করত ইংমারও, ও বলত: প্রথমে কাগজে এবং তারপর চলচ্চিত্রে নিয়ে আসা গেলে সেই চলচ্চিত্র আপনার আত্মার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। যেমন আমি আর আপনি এখন কথা বলছি। শ্রোতাদের আত্মা থেকে এর স্বীকৃতি রয়েছে। ওর লেখালেখি নিয়ে কাজ শুরুর আগে পরিচালক হয়েও লেখক হিসেবে ও কতটা অবিশ্বাস্য ছিল, সবসময় বুঝতে পারিনি। এমনকি ছবিটা বানিয়ে ফেলার পরও মঞ্চায়নের জন্য প্রাইভেট কনফেশন্স অভিযোজনের কাজ শুরু করার পরই বুঝতে পারি, লেখালেখিতে ওর হাত কত শক্ত ছিল।

আমাদের সম্পর্কটা যে কেমন ছিল জানি না। আজ থেকে ৪৫ বছর আগে রোমান্টিক সম্পর্কে জড়িত ছিলাম আমরা, কিন্তু এটা জানি, আমি যা কিছু ঠিক বলে জানতাম, তার বিরুদ্ধে ছিল সেটা। আমি তালাক নিয়েছি। বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে সন্তান নিয়েছি। আমার ক্রিশ্চান পরিবার আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায়নি। ওর পক্ষে নিরাপদ এই দ্বীপে ছিলাম আমি, কিন্তু এই দ্বীপকে ঠিক নিজের বলে মনে হয়নি। কিন্তু কখনো নিরাপদ বোধ করতে পারব না, এমন অবিশ্বাস্য আর বাস্তব সময়ের কথাও আমি জানতাম। আমাকে কেবল ও স্বীকৃতিই দেয়নি, বরং আমরা যখন একে অন্যের চোখের দিকে তাকাতাম, ও বুঝতে পারত যে, ওকেও স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।

জানতাম আমাদের যা-ই ঘটুক, এমনকি সরে আসার পর যখন জেনে গেলাম যে, আর কখনো ফেরা হবে না, বাকি জীবনের জন্য এমনই থাকবে। আমার মনে হয়, আমাদের বন্ধুত্ব থেকেই গিয়েছিল। এবং সেটা ওর মৃত্যু পর্যন্ত, এখন যেভাবে মনে করছি তার চেয়ে ভিন্ন রকম রোমান্সের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল আমাদের সম্পর্কটা। এমন সব ছবি দেখি, যেগুলো তোলার কোনো স্মৃতি আমার নেই, যেসবে কোনো চেয়ারে ঘুমিয়ে আছি, আর আমাকে আলগোছে ছুঁয়ে দিয়ে স্রেফ পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে ও। আমি জানি যে, আমরা সত্যিই ওতপ্রোতভাবে সম্পর্কিত ছিলাম। অবশ্যই অন্যরাও একই কথা বলতে পারে, কিন্তু সেটা আমার সঙ্গে মেলে না।

প্রশ্ন: ধীরাজ অধিকারীর ২০১২ সালের প্রামাণ্যচিত্র লিভ অ্যান্ড ইংমার-এ সেই সময়ে আপনার স্মৃতিচারণসহ বিভিন্ন সিকোয়েন্স একসঙ্গে জুড়েছে। এটা ছবিগুলোকে স্পষ্টভাবে আত্মজৈবিক করে তুলেছে। আপনিও কি তা-ই মনে করেন?’

উলম্যান: ছবিটা সত্যিই আমার ভালো লেগেছে, তরুণ পরিচালককেও আমার পছন্দ হয়েছে, কিন্তু লোকে আমার ছবিতে [সিনস ফ্রম আ ম্যারিজ] সহিংসতাকে বিশ্বাস করবে, এটা মানতে পারি না। ইংমার আদৌ সহিংস ছিল না। জানি অনেক বদভ্যাসই ছিল ওর, কিন্তু সহিংস ছিল না। চূড়ান্ত ছবিটা দেখার আগে ব্যাপারটা কীভাবে অমন মনে হতে পারল বুঝতে পারিনি। আপনার ভেতরেই সহিংসতা ঘটছে, এটা খারাপ, তবে চেঁচামেচি আর লাথি হাঁকানোর ব্যাপার নেই।

আপনি কাউকে ঘৃণা করলে ওই মানুষটিকে নিয়ে আপনার ক্রোধ আর অসন্তোষ কারো লাথি মারার চেয়ে ঢের বেশি খারাপ। ব্যাপারটা খুবই ভয়ঙ্কর, কারণ এ থেকে রেহাই পাওয়া খুব কঠিন। এ ছবির অদ্ভুত দিকটা হচ্ছে, যখনই আমি কোনো ছবির সঙ্গে সফরে যাচ্ছি, শ্রোতারা সবসময় ইংমারের কথা জানতে চেয়েছে। ফলে একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার ঘটে গেছে। এখন কেউ আর উঠে ইংমার সম্পর্কে জানতে চায় না। কেউ আর উঠে দাঁড়িয়ে আমার কথা জিজ্ঞেস করে না। সবাই নিজেদের কথা বলে। এমনকি আমার আর ইংমারের ভেতর ঘটে থাকতে পারে বলে মনে হওয়া সমস্ত সহিংসতা ওদের ভেতর একটা কিছু উন্মুক্ত করে দিয়েছে, তারা এখন নিজেদের মতামতই বলতে থাকে।

প্রশ্ন: আপনার স্মৃতিকথা দুটো পড়ে যেভাবে আপনি ইংমার ও পরবর্তী সময়ের প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের কথা লিখেছেন, সত্যিই আ ডল’স হাউজের সমাপ্তির কথা মনে করিয়ে দেয়। আপনার কাছে বছর পরিক্রমায় বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা নাটক এটা। একে চলচ্চিত্রে রূপায়ণ করার কোনো পরিকল্পনা আছে?

উলম্যান: ছবিটা আমার কাছে ছিল। দারুণ একটা চিত্রনাট্য ছিল আমার কাছে। এক বছরেরও বেশি সময় কেট ব্লানচেট ছিল আমার হাতে। আমাদের হাতে আমেরিকান টাকাও ছিল। তারপর সন্তান হবে বলে ছবিটা আর করতে পারল না ও, তো কেট উইন্সলেটকে নিয়েছিলাম, প্রায় দুই বছর আমার সঙ্গে ছিল সে। সমস্ত লোকেশনও ঠিক করা ছিল। কিন্তু শেষতক ব্যাপারটা তালগোল পাকিয়ে যাওয়ায় সত্যিই ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ি, তারপর স্রেফ বাদ দিয়ে দিয়েছি।

প্রশ্ন: আবার কি ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে?

উলম্যান: আবার পরিচালনা করব বলে মনে করি না। অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করতে আমি পছন্দ করি সত্যিই, কিন্তু নারী পরিচালক হওয়াটা দারুণ কঠিন। আমার এ বয়সে নারী পরিচালক হওয়া আরও কঠিন। অভিনেতাদের কারণে নয়, বরং টেকনিক্যাল লোকজনের কারণে। লাইন প্রডিউসার, সিনেমাটোগ্রাফারদের কারণে। না, আর ও কাজ করব না বলেই স্থির করেছি আমি।

এখনো নাটকটার রাজনৈতিক অনুরণন রয়েছে। প্রায় ১৪০ বছর আগে এটি রচিত হয়েছে এবং খুব সামান্যই পরিবর্তন এসেছে ভাবলে খারাপ লাগে।

এটাও আমার আর পরিচালনা করতে না চাওয়ার আরেকটা কারণ। আমাকে চরকি নাচ নাচতে হবে। খালি হোটেল রুমের ভেতরে-বাইরেই নয়, বরং লোকজন যাতে ক্ষেপে না ওঠে, তাই ওদের ঘিরেও নাচতে হবে। নারী হিসেবে পুরুষের কাছ থেকে শ্রদ্ধা পাওয়ার জন্য সুবোধ আর প্রীতিকর হয়ে উঠতে হবে আমাকে। তা না হলে নিজেই ক্ষিপ্ত হয়ে সবকিছু গুবলেট করে বসতে পারি। পুরনো কেতায় বড় হয়েছি আমি, তারপর নারী স্বাধীনতার পর্বটি এসেছে। আমার প্রজন্ম এর মাঝখানে ছিল। অনেক নারীই আগের অবস্থায় থেকেই খুশি ছিল। আমি না নাচার বহু চেষ্টা করেছি, কিন্তু আজো নাচি। এটা বলা আমার পক্ষে জরুরি যে, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বহু নারীর সঙ্গে ভয়ঙ্কর আচরণ করা হচ্ছে। কেবল আমাদের মতো সুবিধাপ্রাপ্ত নারীরাই অত্যাচারিত হচ্ছে না ভুলে যাওয়াটা সহজ, আরো দরিদ্রতর দেশগুলোয় আরো বহু আছে এমন, যারা নিত্যদিন পরিবারের টিকে থাকার স্বার্থে নিপীড়নের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হয়, যেভাবে আছে তার চেয়ে বেশি করে এ ব্যাপারটার এজেন্ডায় থাকা উচিত।

প্রশ্ন: বিশেষ করে হাইতির সঙ্গে আপনার দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। ক্ষমতাবান মানুষটির মুখ থেকে ‘শিটহোল’ কান্ট্রি সম্পর্কিত মন্তব্য নিশ্চয়ই আঘাত দিয়েছে।

উলম্যান: ক্ষমতাসীন মানুষটা সবাইকেই এমনি ঘৃণায় ভরে তুলছেন। এমনকি বিমানে চড়ার সময়ও মনে হয়, যেন সবাই আগের চেয়ে ঢের বেশি আক্রমণাত্মক। আগে বা পরে কোনো একটা দেশকে আহত না করে আপনি এমনি ঘৃণা নিয়ে কথা বলতে পারেন না। অবশ্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই এটা আঘাত দিয়েছে। কিন্তু তিনি যাদের সম্পর্কে বলছেন, তাদের আরো বেশি কষ্ট দিয়েছে। যে ঘৃণার বার্তা তিনি পাঠাচ্ছেন, সত্যিই ভীতিকর ব্যাপার।

প্রশ্ন: আওয়ার অব দ্য উল্ফ-এর জন্য বার্গম্যানের লেখা একটা পঙিক্ত রয়েছে, ‘কোনো নারী যখন একজন পুরুষের সঙ্গে দীর্ঘসময় বাস করে, তখন সে পুরুষটির মতো হয়ে যায়।’ আপনি কি এর সঙ্গে একমত? আপনি আর বার্গম্যান কোনদিক থেকে পরস্পরের মতো হয়ে উঠেছেন?

উলম্যান: আমার মনে হয়, আমরা একই রকম ছিলাম। ও কখনো কথাটা স্বীকার করেনি, কিন্তু আমি কোনোদিনই হ্যারিয়েট বা বিবির কাছ থেকে চরিত্র নিইনি। আমি ছিলাম। ও হয়তো সিনস ফ্রম আ ম্যারিজের মতো নয়, কিন্তু আমি অনেকটাই ওর মতো ছিলাম। যমজ আত্মা ছিলাম আমরা। একটা হাতের নিরাপত্তা ছিল সেটা। আমরা সবসময় ‘আমার হাত’ বলে আমাদের চিঠিগুলো শেষ করতাম। আমাদের দুজনেরই দাদি ছিল, আমরা খুবই ভালোবাসতাম ওদের। ও সবসময় বলত, ‘আমার পুরো জীবনই আসলে দাদি আমাকে যে অদ্ভুত জগতের গল্প বলত, সেখানেই ফিরে যাওয়ার প্রয়াস ছিল।’ ঠিক তাই করেছে ও। ওর কল্পনাগুলো ছিল এসব নিয়েই। যে কল্পনা আপনি কখনো ভুলতে পারবেন না।

প্রশ্ন: আপনার চরিত্রগুলোকে সবসময় খুবই গভীরে প্রোথিত বলে মনে হয়। সেগুলোকে ছেড়ে যাওয়া কি সহজ ছিল? ছেড়ে আসার পর তাদের জীবন নিয়ে কি আর ভেবেছেন?

উলম্যান: ছেড়ে দেয়াটা কখনই কঠিন ছিল না, কারণ সেগুলো ছিল স্রেফ চরিত্র। ইংমার কখনই ওরা কি সে ব্যাখ্যা জোগায়নি, কিংবা আপনার কল্পনায় ঢুকে পড়েনি। চিত্রনাট্য পড়ার পর নিজেকেই একটা কিছু সৃষ্টি করে নিতে হতো আপনাকে। ও বলত, ‘আরেকটু বেশি, একটু কম।’ যখন খুব বেশি কিছু ও বলেনি সে সময়গুলোকেই আমার জাদুকরী মুহূর্ত বলে মনে হয়। একটা দৃশ্যের কথা মনে আছে, যেখানে আমাকে আত্মহত্যা করতে হয়েছিল, ও কেবল তাকিয়ে দেখছিল। কারো উদ্দেশে ওকে একমাত্র যে কথাটি বলতে শুনেছি সেটা ছিল, ‘চিনির বড়ি দিয়ে বড়িগুলো বদলে দেয়ার কথা মনে ছিল তো?’ কী করেছে জানত ও, কিন্তু ক্যামেরা চালু হতেই আমার মনে ওই কথাটা ঢুকিয়ে দিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। উত্তেজনাকর ছিল ব্যাপারটা!

প্রশ্ন: লেখার সময় কোনো চরিত্র সম্পর্কে তার ধারণা এবং আপনার ব্যাখ্যা নিয়ে কখনো মতবিরোধ তৈরি হয়েছে, কিংবা আপনি যা করতেন তার ক্ষেত্রে কি পুরোপুরি উন্মুক্ত ছিলেন তিনি?

উলম্যান: উহুঁ, ভিন্ন ব্যাখ্যার সুযোগই দিত না ও। তবে যেভাবেই হোক, ওর সঙ্গে আমার ওই ধরনের বিরোধ তৈরি হয়নি। কার জন্য লিখছে জানত ও। একমাত্র ইনগ্রিড বার্গম্যানের বেলায়ই এ জিনিসটা লক্ষ করেছি। মারাত্মক ছিল সেটা। অটাম সোনাতা নিয়ে পরস্পরকে ঘৃণা করেছে ওরা। মা হিসেবে আমার সঙ্গে সে যত ভয়ঙ্কর কাজ করবে, তার সবই এ তিন পৃষ্ঠার মনোলোগে রয়েছে। অবিশ্বাস্য পঙিক্ত সব। অবশ্যই, একজন অভিনেত্রী হিসেবে কাজটা করার ব্যাপারে কিছুটা ধারণা ছিল আমার। স্রেফ সে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকার সময় প্রথমেই আমার সমস্ত সংলাপ সারতে হয়েছিল, ও শুনে গেছে। আমি কাজটা করেছি, বেশ ভালোই হয়েছিল। কিন্তু ধাক্কা খেয়েছে ইনগ্রিড, যদিও ক্যামেরা ওর দিকে ছিল না।

ওটা ওর দিকে ফেরানোর পর বলেছে, ‘আমি এটা করতে চাই না। কেন তা আমি বলব না। ওকে আমার আঘাত করতে ইচ্ছা করছে।’ এভাবে চিত্কার করে উঠেছে ইনগ্রিড। তখন ইংমারও চেঁচাচ্ছিল। করিডোরে গিয়েও চেঁচামেচি করেছে। আর আমরা ভেবেছি, ‘ছবির দফারফা!’ তবে শেষ পর্যন্ত ওরা ভেতরে ফিরে আসে, ইনগ্রিডের প্রতিভা ও অভিনেত্রীর সংকটে, প্রতিভাই বিজয়ী হলো। দৃশ্যটা শেষ করল ইনগ্রিড, কিন্তু ওর চেহারা যদি দেখতেন, ওই ঘৃণা— সংলাপগুলো উচ্চারণ করার কারণে— ছিল পুরো বাস্তব। তাই ওর অস্কারের মনোনয়ন পাওয়া আদৌ বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল না। ও খুবই পছন্দ করেছিল এটা। এটা চায়নি ও, কিন্তু পেয়েছে এবং ওর কল্পনার চেয়ে ভালো ছিল সেটা।

নিজের লেখার ওপর ইংমারের আস্থা থাকাটা উত্তেজনাকর ছিল। আপনি কারো সঙ্গে কথা বলার সময় একটা নির্দিষ্ট কেতায় বিশেষ কোনো উত্তর আশা করে থাকলে তাতে কোনো মজা নেই। জবাবটা কী হবে না জেনেই কাউকে ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলতে পারা অনেক উত্তেজনাকর। ইংমার কখনই ‘তোমার ব্যাখ্যা ভুল’ বলতে যেত না। ইংমার কোনো ব্যাখ্যা দেয় না, হূদয় থেকে বের করে আনে। ইবসেন অত বেশি ভাগ্যবান ছিলেন না। অভিনেত্রী অভিযোগ তোলার পর আ ডল’স হাউজের পুরো সমাপ্তিটুকুই বদলে ফেলতে বলা হয়েছিল তাকে...

কিন্তু ইংমার কখনো একটা শব্দও বদলায়নি। সত্য যেই বলুক সেটা সত্যি। ওর জানা ছিল সেটা। ফ্যানি অ্যান্ড আলেক্সান্দারের কাজ ফিরিয়ে দেয়া আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল। আমাকে ও বলেছিল ওটা একটা কমেডি। ম্যাক্সও তাই করেছে। আমি অভিনয়ে রাজি না হওয়ায় আমার ভূমিকা নতুন করে লিখেছে ও। সম্ভবত ওর কাছ থেকে পাওয়া আমার সর্বসেরা ভূমিকা। এক বছর ধরে ওর ছবির শুটিং ও সম্পাদনা করার ওই সময়ই প্রথমবারের মতো বন্ধু ছিলাম না আমরা। আমাকে ‘মিস উলম্যান’ উল্লেখ করে চিঠি লিখেছে ও। বিশ্রী ছিল সেটা। কাজ শেষ হওয়ার পর আমাকে দেখতে যেতে বলেছে। ওর পাশে বসে ক্রমাগত কেঁদেছি আমি। স্টকহোম আর্কাইভ থেকে শুনেছি, ওর ওই সময়ের পাণ্ডুলিপির বেশকিছু জায়গাতেই ‘লিভের ওপর রেগে আছি!’ লিখে রেখেছে ও।

প্রশ্ন: আমি বরাবরই আপনাকে সিনেমার বিরাট শ্রোতা মনে করে এসেছি। বার্গম্যানের ছবির কিছু শক্তিশালী মুহূর্ত কেবল শোনা থেকেই আপনার তরফ থেকে এসেছে। অটাম সোনাটায় পিয়ানোয়। সিনস ফ্রম দ্য ম্যারিজে এরলান্ড জোসেফাইন আপনাকে তার ভালোবাসার কথা বলার সময়। প্যাশন অব আনার সেই অবিশ্বাস্য দৃশ্যের কথা। স্মৃতিকথায় আপনি আবেগ ফুটিয়ে তুলতে নিজস্ব অভিজ্ঞতা কাজে না লাগানোর কথা বলেছেন। তো আপনার কৌশল সম্পর্কে সামান্য কিছু বলবেন?

উলম্যান: আমি চরিত্রাভিনেত্রী নই। স্রেফ একটা নাক জুড়ে নিতে বা তৃতীয় রিচার্ড বনতে পারি না। এখনো আমি লিভ ও আমার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাচ্ছি, আমার ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসতে দিচ্ছি তাদের। কোনোভাবে আমি এটা ব্যাখ্যা করতে পারব না। অন্য অভিনেতাদের কৌশল আছে। অনেক বছর আগে একজন সাক্ষাত্কার গ্রহণকারী এসেছিল, তাকে আমার অভিনেত্রী বলেই মনে হয়েছে। কিন্তু আমাকে সে বলেছে, আমি অভিনেত্রী নই, স্রেফ চলমান মানবীয় আবেগ। হয়তো আমি তাই। জানি না। তবে অভিনেতাকে এমনই হতে হয়। একমাত্র এখানেই নিজেকে নিরাপদ ও সুস্থ মনে হয়।

প্রশ্ন: সেসব চরিত্র এর চেয়ে ভিন্ন হতে পারত না?

উলম্যান: আমার মধ্যে প্রচুর ক্ষোভ আছে, আমার অনেক খারাপ জিনিসও আছে। অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারিনি এমন অনেক কিছু। যখন একদম একা থাকি, তখন আমার আত্মার ভেতর অনেক কিছু ঘটে যায়। প্রচুর পড়াশোনা করি আমি, বহু লোকের সঙ্গে মিশি, আমার সঙ্গে সম্পর্কহীন সব ছবি দেখি। দুজন পুরুষ পরস্পরকে ভালোবাসছে। এমনকি আমার অভিজ্ঞতার বিষয় না হলেও দেখামাত্র এসব বুঝতে পারি।প্যাশন অব আনায়, যেখানে আমি সর্বক্ষণ মিথ্যা কথা বলছি, ইংমারকে বলেছিলাম, আমি কখনো মিথ্যা কথা বলিনি। মিথ্যা অবশ্যই বলি, কিন্তু ওকে সেটা বলিনি। তো আনাকে নিয়ে ছবিটা বানাল ও, যে কিনা প্রচুর মিথ্যা বলে। একটা ক্লোজ-আপ দৃশ্য আছে সেখানে, আমার মনে হয়, ওই সময় পর্যন্ত দীর্ঘতম দৃশ্য ছিল ওটা ওর। ৮ মিনিটের মতো হবে। মিথ্যা কথা বলার ব্যাপারটা ওর জানা থাকায় আমার চোখ-মুখ লাল হয়ে ওঠার কথা জানা ছিল না আমার। স্রেফ ক্যামেরা চালু রেখেছে ও, ক্যামেরা ভিন্ন কোথাও যাওয়ার কথা ছিল যেখানে, সেখানেও ক্লোজআপ চালিয়ে গেছে। আমি একটা চালুনি। অনেক অভিনেত্রীই এ রকম। ব্যাখ্যা করা কঠিন।

প্রশ্ন: বার্গম্যান নেই, অথচ আপনাকে চরিত্র খুঁজে পেত হবে, এটা নিশ্চয়ই বিশেষভাবে কঠিন। প্রসঙ্গটা তোলার জন্য দুঃখিত, কিন্তু সবে লস্ট হরাইজন দেখেছি আমি।

উলম্যান: হা-হা। একে অভিনয় বলে না! হলিউড ছিল ওটা! ওখানকার অন্য অভিনেতাদের বেলায়ও একই। এটা অভিনয় ছিল না। কী ছিল জানি না, তবে ব্যাপারটা মজার ছিল। মনে হয় একমাত্র আমিই মজা পেয়েছি। আমি জানি বার্ট বাখারাখের নার্ভাস ব্রেকডাউন হয়েছিল। আমার কাছে স্রেফ অ্যাডভেঞ্চার ছিল। ফর্টি ক্যারেটের ব্যাপারটাও একই। কীভাবে ওই অভিনয় করতে পারতাম আমি? আমার বয়স ছিল ৩০ বছর, বলতে গেল ইংরেজি বলতে পারতাম না। কিন্তু আমার ৪০ বছর হওয়ার কথা ছিল। অভিজাত নিউইয়র্কার, ২০ বছর বয়সীর তরুণের প্রেমে পড়ছি, কিন্তু আমার সঙ্গে সমবয়সী সুদর্শন অভিনেতাকে জুড়ে দিয়েছিল ওরা।

সবকিছু ভুল ছিল। একটা হলিউডি ছবিতে লিভ অভিনেত্রী হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু ভীষণ রকম মিসকাস্ট ছিলাম আমি, ওখানে কোনো সত্যি ছিল না। কিন্তু ওই একই বছর জিন হ্যাকম্যানের সঙ্গেও একটা চিত্রনাট্য পেয়ে যাই। সেটারও চিত্রনাট্য ভালো ছিল না, কিন্তু দারুণ সময় কেটেছিল। লস্ট হরাইজনে আমি যাই করি, হলিউডি ছবিতে ছিলাম আমি, জিন কেলির সঙ্গে নাচতে হয়েছে, আমার ছাড়া আর কারো ভুল ছিল না সেটা।

প্রশ্ন: আপনার কখনো উডি অ্যালেনের সঙ্গে কাজ না করাটা বিস্ময়কর। একটা সময়ে আপনারা ডেটিং করছিলেন, তাই না?

উলম্যান: ইংমারের নাগাল পেতেই আমার সঙ্গে ডেট করেছিল সে। আমরা ডেটিং করিনি, স্রেফ ডিনারে গেছি। ওর সবকিছু জুড়ে ছিল ইংমার। ওদের মিটিংয়ে কি হয়েছিল শুনেছেন?

প্রশ্ন: শুনেছি, তবু আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই।

উলম্যান: আমরা ডিনারে গেলাম, তখন অ্যালকোহল খায়নি সে। তবে আমি খেয়েছি। সারাক্ষণ ‘ইংমার’,‘ইংমার’, ‘ইংমার’ চলছিল। আমি বললাম, ‘ইংমার আমার আ ডল’স হাউজ দেখতে আসতে চায়।’ তখন তার মুখে কেবল, ‘হায় খোদা, ওর সঙ্গে দেখা করতে পারব মনে করো?’ তো ইংমারকে ওর দ্বীপে ফোন করে বললাম, ‘উডি অ্যালেন তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায়, আমি ব্যবস্থা করব?’ আ ডল’স হাউজের ম্যাটিনি শো দেখতে এসেছিল ও। পরদিনই চলে যাওয়ার কথা ছিল। পিয়েরে হোটেলে ছিল ও, স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। দেখা করতে রাজি হলো ও। তো উডির সঙ্গে পরের দফা ডিনারে আমি বললাম, ‘ইংমার সত্যিই তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে।’ তো নাটক শেষে থিয়েটারের বাইরে অপেক্ষায় ছিল উডি, লিমুজিনে করে আমাকে হোটেলে নিয়ে গেল। এত নার্ভাস ছিল যে, রীতিমতো কাঁপছিল। ওর আদর্শ ছিল ইংমার, সত্যিকারের আদর্শ। উডি সম্ভবত ইংমারেরও আদর্শ ছিল। কিন্তু ইংমার সেটা কখনো মুখে আনেনি। আমাকে এলিভেটরে করে উপরে নিয়ে দরজায় নক করল ও। উডি আর ইংমার স্রেফ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ছিল।

টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলাম আমরা। কেউ একজন খাবার পরিবেশন করছিল। খোদার কসম খেয়ে বলছি, কথা বলেনি ওরা। বার্গম্যানের স্ত্রী আর আমার মধ্যে তেমন একটা মিল ছিল না। তো আমরা খাবার নিয়েই আলাপ করছিলাম। আর দুজন পুরুষ স্রেফ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ছিল। খাবার শেষে উডি বলল, ‘থ্যাঙ্কু, মিস্টার বার্গম্যান,’ তারপর বিদায় নিলাম আমরা। বাইরে এসে উডি আমাকে বলল, ‘তোমাকে ধন্যবাদ, লিভ, কত বড় সম্মান!’ বাড়ি ফিরে ইংমারকে ফোন করলাম, সে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ লিভ, কত বড় সম্মান!’ আমি যতদূর জানি, ওরা আর কখনো আলাপ করেনি। প্রতিভারা নিজেদের বেলায় বড্ড সতর্ক থাকে। দুজনের দেখা হলে আপনাকে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হয়।