এ বছর ইংমার বার্গম্যানের জন্মশতবার্ষিকী। তিনি সিনেমায় স্বপ্ন দেখতেন, আঁকতেন, চিন্তা করতেন, রহস্য সমাধান করতেন এবং বেদনায় আর্দ্র হতেন, যা সাধারণত একটা থ্রিলারের আকর্ষণ ও ওয়ালটজ নাচের লালিত্য ধারণ করত। সেলুলয়েড কী করতে পারে, সেটা যদি একটু জানতে চান কিংবা পর্দার পেছনে যে বিপুল মেধার কর্মযজ্ঞ লুকিয়ে থাকে সেটা যদি পরিমাপ করতে চান, তাহলে বার্গম্যানকে আপনার জানতে হবে।

অতীতকে যারা ভালোভাবে দেখার শক্তি রাখেন, তারা বার্গম্যানের সিনেমা দেখতে দেখতে নানা কিছুর মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে পারবেন। হিরোইন (১৯৫৫) সিনেমার অস্থিরচিত্ত নায়িকা হ্যারিয়েট অ্যান্ডারসন একজন বয়স্ক মানুষের বাসায় অনেকগুলো পুরনো গ্রামোফোন রেকর্ড খুঁজে পান। সারি থেকে একটি রেকর্ড তুলে নিয়ে তিনি সেটার টাইটেল জোরে বলে থাকেন, ‘সারাব্যান্ড’ ও ‘ব্যাক’ (যদিও তার উচ্চারণ ছিল ‘ব্যাচ’)। শোনার পর সঙ্গে সঙ্গে দর্শকের মন কয়েক সেকেন্ডের জন্য এগিয়ে গিয়ে স্মরণ করবে বার্গম্যানের অরেকটি ছবি ক্রাইজ অ্যান্ড হুইসপারকে (১৯৭২), যেখানে শোকাবহ একটি সারাব্যান্ড শোনা যাবে, সেটা ব্যাকের পঞ্চম সেলোর একটি সুর। এটি বাজে সিনেমার একটি মিলনের দৃশ্যে। এ সারাব্যান্ডের আবার দেখা যায় বার্গম্যানের শেষ জীবনের একটি কাজে। ২০০৩ সালে সুইডিশ টেলিভিশনের জন্য তার তৈরি করা টেলিভিজুয়ালটির নামই ছিল সারাব্যান্ড।

যিনি বার্গম্যানের একটি ছবিও দেখেননি, তিনিও হয়তো সেই মানুষটির কথা জানবেন, যিনি মৃত্যুর সঙ্গে দাবা খেলেছিলেন (দ্য সেভেনথ সিল এমনটা দেখিয়েছিলেন বার্গম্যান)। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিজের গাঁয়ে ফিরছিল এক নাইট। পথিমধ্যে সে দেখা পায় স্বয়ং মৃত্যুর এবং তার সঙ্গে শুরু হয় তার দাবা খেলা।

সামার ইন্টারলিউড (১৯৫১) সিনেমায় একজন বয়স্ক নারী আর এক পাদ্রির মাঝে রাখা এক দাবার বোর্ড। কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল দুই প্রেমিক-প্রেমিকা। সেই বৃদ্ধার কথা ছিল, ‘আমি বাঁচতে খুব ভালোবাসি আর তাই আমি তোমাদের অনেকের চেয়ে বেশি বেঁচেছি।’

দ্য ভার্জিন স্প্রিং (১৯৬০) সিনেমাটি সেরা বিদেশী সিনেমার ক্যাটাগরিতে একাডেমি অ্যাওয়ার্ড জিতে নিয়েছিল। সিনেমাটি চতুর্দশ শতকে সুইডেনের একটি ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ১৯৬৩ সালের উইন্টার লাইট সিনেমাটি এক পাদ্রিকে নিয়ে। এখনো সিনেমা দুটো বড় পর্দায় দেখার পর এখনো দর্শকরা আবিষ্ট হয়ে পড়েন, নাটকীয়তা পরিণত হতে থাকলে দর্শকের উত্তেজনাও বাড়তে থাকে।

শুরু থেকেই বার্গম্যান তার সিনেমায় যতটা সম্ভব কম সংলাপ ব্যবহার করেছেন। থার্স্ট (১৯৪৯) সিনেমার উদ্বোধনী মিনিটে একটি ক্যামেরাকে হোটেলের এক বদ্ধ কামরায় ঘুরিয়েছেন একটি মেয়ের পেছনে— মেয়েটি ধূমপান করছে, দাঁত মাজছে, সংবাদপত্র পড়ার চেষ্টা করছে এবং তার ঘুমন্ত সঙ্গীকে জাগানোর ব্যর্থ চেষ্টা করছে। তখন পর্যন্ত দর্শক তার সম্পর্কে কিছুই জানে না। কিন্তু ক্যামেরার এই ঘুরে বেড়ানোকে ধন্যবাদ, কারণ আমাদের যতটুকু দরকার, সেটা আমরা জেনে গেছি। কক্ষটা চিড়িয়াখানার একটা খাঁচা হতে পারে। সিনেমা এগোতে থাকলে আপনি অপেক্ষা করতে শুরু করবেন। তারপর ক্যামেরা হঠাৎ একটি চরিত্রের মুখ দেখাবে, যখন সেই চরিত্রটি কোন সংকটে পতিত হতে যাচ্ছে, এতে কি সবকিছু পরিষ্কার হলো, নাকি রহস্য আরো ঘনীভূত হচ্ছে? বার্গম্যান আমাদের বলেছেন, যখন আমরা কোনো চিন্তা বা স্মৃতি দিয়ে তাড়িত হই, তখন সত্যিই তা হয়, যেমনটা হয় কারো হাতে চড় খাওয়ার মধ্য দিয়ে। ওয়াইল্ড স্ট্রবেরিজে আমরা দেখি, আমরা কেবল একজন বুড়ো মানুষকে দেখি না যে এ সিনেমার মনোযোগের মূল কেন্দ্র, তার আশপাশে সব যেন অন্ধকার, মনে হবে একটা স্পটলাইট যেন তার ওপর আলো ফেলছে।

বার্গম্যানের সিনেমার স্মরণীয় দিকটি হচ্ছে অস্থিরতা আর বিদ্রোহকে ধারণ করা, যা এখনো স্থায়ী হয়ে আছে। এখানে আমরা বার্গম্যানের রহস্যের কিছু নিশানা খুঁজে পাই। তাকে কেন গির্জাসংশ্লিষ্ট বা ধর্মীয় দিক থেকে সংকীর্ণ মনে হয় না? জন্মসূত্রে বার্গম্যান বেশ দূরের মানুষ, একই সঙ্গে সেকেলেও। তিনি এসেছিলেন এক ছোট নর্ডিক জাতি থেকে, যা ধীরে ধীরে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র হয়ে উঠছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে তিনি মানুষের ব্যক্তিজীবনকে গভীর অভিনিবেশসহকারে পর্যবেক্ষণ শুরু করেন। তার সিনেমায় মানুষের মনের নানা টানাপড়েন ও ঈশ্বরের ধারণা নিয়ে কাজ করেছেন। তার সব চরিত্রই শ্বেতাঙ্গ; তাদের অনেকেই সমাজের উঁচুতলার মানুষ; অনেকে এসেছেন থিয়েটারজগৎ থেকে। তাদের বেশির ভাগের কথোপকথনের ভাষা সুইডিশ। তো এমন চরিত্রদের কাজকর্ম কিংবা তাদের বেদনাকে আমরা পাত্তা দেব কেন? কেন এসব চরিত্র আজো প্রতিধ্বনিত হতে থাকে? (কেউ হয়তো দুর্দান্ত স্ক্রিউবল কমেডি সিরিজ নিয়েও এমনটা বলতে পারেন। সিনেমাগুলোয় ধনী ও দায়িত্বহীনদের নানা রঙ্গ দেখা যায়। সেগুলোর প্রতিধ্বনি আজো রণিত হয়।) প্রশ্নের একটা উত্তর হতে পারেন এমন: জার্মান কম্পোজার ও সংগীতজ্ঞ ইয়োহান সেবাস্তিয়ান বাখ ও তার চেলো কম্পোজিশনগুলোর কথা চিন্তা করুন। সেগুলো আজো মানুষ আবেগ নিয়ে নিরলসভাবে বাজিয়ে যাচ্ছে। যুগ যুগ পার হয়ে গেলেও সেগুলো মিলিয়ে যায়নি। বার্গম্যানের তল খুঁজে পেতে আপনাকে যার কাছে যেতে হবে, তিনি হয়তো পাবলো কাসালজ (স্প্যানিশ চেলো কম্পোজার)। আরেকটি উত্তর পাওয়া যাবে বার্গম্যনের ফ্যানি অ্যান্ড আলেক্সান্ডার (১৯৮২) সিনেমার এক থিয়েটার ম্যানেজারের সংলাপে:

আমার একমাত্র প্রতিভা হচ্ছে, আমি এ থিয়েটারের দেয়ালের ভেতরে থাকা ছোট্ট দুনিয়াটাকে ভালোবাসি। এ ছোট্ট দুনিয়ায় যারা কাজ করে, তাদের আমি খুব পছন্দ করি। বাইরের দুনিয়াটা অনেক বড়। অনেক সময় ছোট্ট দুনিয়া বাইরের বড় দুনিয়াটাকে প্রতিফলিত করতে পারে। তখন সেই ছোট দুনিয়াটা দিয়ে বড়টাকে অনেক ভালোভাবে বুঝতে পারি।

বার্গম্যান ছিলেন এমনই এক মাস্টার, যিনি এমন সব প্রতিফলন দেখাতে পারতেন। এতটাই ভালোভাবে পারতেন যে, তার সিনেমা দেখে আপনি ধৈর্যহারা হবেন, উশখুশ করতে থাকবেন। বিশেষত তার যেসব সিনেমা আমাদের আজকের দিনেও যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক। বার্গম্যানের বেশির ভাগ সিনেমাই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু সাহসিকতায় সেগুলো অনন্য। ৯০ মিনিটে এমন করে মনে হয় খুব কম পরিচালকই তৈরি করতে পেরেছেন। ভীতিকর আওয়ার অব দ্য উলফ (১৯৬৮) একেবারে দেড় ঘণ্টার সিনেমা। থ্রু আ গ্লাস ডার্কলি (১৯৬১) ১ মিনিট কম আর ক্রাইজ অ্যান্ড হুইসপার ১ মিনিট বেশি। পারসোনার দৈর্ঘ্য মাত্র ৮৩ মিনিট, কিন্তু পুরো সিনেমাটা মনে ধারণ করতে আপনার হয়তো জীবনের অর্ধেকটা কেটে যাবে। টুকরো টুকরো ন্যারেটিভ, এর আধুনিক কৌশল সমৃদ্ধ বার্গম্যানের সিনেমা আপনি একা একা দেখলে আলসেমি বোধ করবেন; মনে হবে যেন কাজগুলোকে টেনে লম্বা করা হয়েছে। বার্গম্যান মারা গিয়েছিলেন ২০০৭ সালে ৭৯ বছর বয়সে। তার অর্জনের কুহেলিকা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিপক্ব হয়েছে।

ইংমার বার্গম্যান আধুনিক পরিচালকদের মধ্যে অন্যতম। একই সঙ্গে তার সিনেমায় প্রচুর কৌতুক দেখা যায়। উডি অ্যালেনের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়তো এতে ভূমিকা রেখেছে। এখানে উল্লেখ্য যে, অ্যালেন আমেরিকার শ্রেষ্ঠ বার্গম্যানভক্ত। বার্গম্যানের সিনেমায় দার্শনিক চিন্তার গভীর প্রভাব দেখা যায়। কিন্তু তার পরও তার কাজ একসময় দর্শককে কৌতুক উপহার দেয়।

দ্য সাইলেন্স সিনেমাটি নির্বাক নয় আবার বেশি সংলাপও নেই। কোনো সাধারণ আদান-প্রদানের অভাবে সারা জীবন পাশাপাশি বাস করা মানুষগুলোর মধ্যেও যে দারুণ দূরত্ব রয়ে যেতে পারে, সেটা দেখিয়েছেন এ সিনেমায়। বার্গম্যানের সিনেমা হচ্ছে একটি ডাবল থিয়েটার। তিনি ইবসেনের একজন উত্তরাধিকারী। তিনি মানুষের যন্ত্রণা ও আবেগের ক্ষতগুলো পরিমাপ করতে পারেন। একই সঙ্গে তিনি বেকেটেরও উত্তরাধিকারী। তিনি আধারে ঢাকা প্রতীকীবাদী, তিনি মেটাফোরের জন্য মনস্তত্ত্বকে পদদলিত করেছেন, যা বাস্তবতার পর্দাকে চিরে অস্তিত্ববাদী যন্ত্রণাকে তুলে এনেছে। বার্গম্যানের এ দ্বৈত সত্তার ফল হচ্ছে সিনেমা বনাম থিয়েটার। উত্তেজনায় ভরা দ্য সাইলেন্স সিনেমায় পরিবার ও সমাজ, শিল্প ও রাজনীতি, কামনা ও ভালোবাসা, আত্ম ও অন্য বিষয়গুলো তার আধুনিকতা এবং একই সঙ্গে প্যারোডির উপযোগিতাকে প্রকাশ করেছে। আন্দ্রে তারকোভস্কি ১৯৬০ থেকে আশির দশক ধরে তৈরি করেছেন প্রতীকীবাদী ক্লেশের সিনেমা। এর কারণ ছিল, তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নে বাস করেছেন ও কাজ করছেন। আর এ ক্লেশ তখন সেখানকার স্থানীয় উপাদান। তাই সিনেমাগুলোয় এ ক্লেশ দেখানোটা ছিল স্বভাবিক। কিন্তু বার্গম্যান তো কাজ করেছেন সুইডেনে— সেটা তো নিরাপদ, রাজনৈতিকভাবে নমনীয় জায়গা— এমন জায়গাতেও ক্লেশ খুঁজে পেয়েছেন তিনি। তিনি যন্ত্রণাকে তীব্র করে উপস্থাপন করেছেন।

বার্গম্যান সিনেমা তৈরি করেছেন তার ব্যক্তিগত নীতি-অবস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে। তিনি নারীকে আবেগ, বিস্ময়, প্রশংসা, কামনা— নানা দৃষ্টিতে দেখেছেন। তার অকপট আগ্রহ তার নিজের অকপট যুক্তি ও নৈতিকতা নিয়ে তার নিজের সন্দেহের সঙ্গে মিলে গেছে। খ্রিস্ট ধর্ম ও ফ্রয়েডের প্রেক্ষিত থেকে তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেছেন, নিজেকে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন। সামরিক আগ্রাসন, স্বৈরশাসন ও আণবিক সংহারের যুগে তিনি অস্তিত্বের চ্যালেঞ্জ দিয়ে প্রতিসৃত হয়েছেন। এখানে আমরা বার্গম্যানের একটি স্ববিরোধী সত্তার সন্ধান পাই। সাধারণভাবে তাকে দারুণ আত্মকেন্দ্রিক শিল্পী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এখানে দেখা যাচ্ছে, তিনি নিজেকে প্রশ্ন করছেন, নিজেকে শাস্তি দিচ্ছেন।

বার্গম্যানের রোমান্টিক ড্রামা সামার ইন্টারলিউডে শুরুর দিকে একটি সংক্ষিপ্ত সিকোয়েন্স আছে। একজন বয়স্ক নর্তকী মারি, মঞ্চের পেছনে একটি প্যাকেট পান, যার ভেতরে ছিল একটি পুরনো ডায়েরি। বার্গম্যান নোটবুকের ওপর সুপারইম্পোজের মাধ্যমে এক সুদর্শন তরুণের ছবি দেখান।  ঠিক এর পরই সুপ্ত এক মানসিক ধাক্কা সেই নর্তকীকে আঘাত করে। মারি যখন থিয়েটার ছাড়ছেন, তখন তার পকেটে থাকা অদৃশ্য, অজানা লেখাগুলো যেন বোমার কাঁটার মতো টিক টিক করছে। থিয়েটার থেকে বেরিয়ে মারি স্টকহোম শহরে হাঁটতে থাকে। তারপর এক ফেরিতে করে একটা দ্বীপে গিয়ে কিছুটা স্বস্তি পায়। ফ্লাশব্যাকে ফুটে ওঠে অনেক আগে তার এক প্রেমের স্মৃতি। ডায়েরিটা তার সেই তরুণ প্রেমিকের। এরপর মারির মনস্তত্ত্ব দেখাতে বার্গম্যানের ক্যামেরার নানা কারিকুরি দেখা যায়। সেই তরুণ-তরুণীর প্রেমের জয়গান করতে গিয়ে বার্গম্যান দেখিয়েছেন শিল্পের উৎসব।

বার্গম্যান সামার উইথ মনিকা নির্মাণ করেছিলেন ১৯৫৩ সালে। একজন তরুণের প্রেক্ষিত থেকে দেখানো একটা প্রেমের গল্প। বার্গম্যানের এ ছবিটি ফরাসি নিউ ওয়েভ ও স্বাধীন সিনেমার টেমপ্লেটের মতো কাজ করেছে। বার্গম্যান সিনেমাটা একটা উপন্যাস থেকে রূপান্তর করেছিলেন। সিনেমায় দেখা যায়, হ্যারি নামের এক নিঃসঙ্গ ও দ্বিধাগ্রস্ত এক কিশোর শ্রমিককে। এই হ্যারির সঙ্গে পরিচয় হয় সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র ১৭ বছরের এক কিশোরীর। সে কাজ করত এক মুদি দোকানে, কিন্তু তার চোখে ছিল অনেক বড় স্বপ্ন। অন্যদিকে সে হ্যারিকে প্রেমে প্রলুব্ধ করে। দুজনই কাজ ছেড়ে দিয়ে জঙ্গলে চলে যায়, সিনেমাটা পরিণত হয় তারুণ্যের প্রেমের এক ক্ল্যাসিক গল্পে। হ্যারিয়েট অ্যান্ডারসন রূপায়িত করেছিলেন মনিকার চরিত্রটি, যে যৌনতায় সংকোচহীন, উদ্দাম। প্রকৃতির বিপুল ঐশ্বর্যের মধ্যে দেখা যায় এদের প্রেমলীলা। এখানে বলা প্রয়োজন যে, সূর্য, আকাশ আর সাগর নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন। এবার মনিকা গর্ভবতী হয়ে পড়েন। বাড়িতে ফিরে মনিকা এক রকম সুইডিশ মাদাম বোভারি হয়ে পড়েন। হলিউড সিনেমায় যেমনটা দেখা যায় যে, একজন নারী প্রেমের জন্যই বেঁচে আছেন, তেমনটাই হয়ে ওঠে মনিকার জীবন। তবে তার পরও বার্গম্যান তাকে কোনো উচ্ছন্নে যাওয়া নারী হিসেব দেখাননি, বরং তাকে দেখিয়েছেন প্রকৃতির এক আশ্চর্য ও শিল্পের স্পন্দন হিসেবে।

১৯৬৫ সালে ইংমার বার্গম্যান তার সিনেমার ক্রুদের ফারো দ্বীপে নিয়ে যান। এটা ছিল বাল্টিক দ্বীপে একটা সুইডিশ সমরিক ছাউনি। বার্গম্যানদের উদ্দেশ্য ছিল পারসোনা সিনেমার শুটিং। সিনেমায় একজন নার্স আর তার রোগীর গল্প নিয়ে। নার্সটি কথা বলেন, রোগী নীরব। ধীরে ধীরে দুজনের আত্মপরিচয় একে অন্যের মধ্যে লীন হতে শুরু করে। সুসান সোনটাগ বলেছিলেন, ‘পারসোনা অবশ্যই বেশির ভাগ দর্শককে খোঁচাবে, তাকে হতবুদ্ধি করে দেবে।’

১৯৬৩ সালের জানুয়ারিতে বার্গম্যান রয়্যাল ড্রামাটিক থিয়েটারের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন। পদটি সামলানো তখন বেশ কঠিন ছিল। কারণ পুরো প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে শুরু করার দরকার হয়েছিল। নিজেকে বেশ একটা ঝামেলাপূর্ণ পরিস্থিতিতে আবিষ্কার করেন বার্গম্যান। কিন্তু নিজের সিনেমার কাজকেও তিনি অবহেলা করতে পারছিলেন না। ফলত ভয়ানক পরিশ্রম যায় তার। ফলস্বরূপ ডাবল নিউমোনিয়া ও পেনিসিলিনের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হন তিনি। ১৯৬৫ সালের বসন্তে তাকে রয়্যাল হসপিটালে ভর্তি করা হয়। এখানেই হাসপাতালের বেডে শুয়ে তিনি পারসোনার চিত্রনাট্য লিখতে শুরু করেন। বার্গম্যানের কথায়, ‘আমি আমার হাতকে সৃষ্টিশীল কাজে অব্যাহত রাখতে চেয়েছিলাম।’

হাসপাতালে শারীরিক ও মানসিকভাবে খারাপ এক পরিস্থিতিতেই তিন শিল্পের ভূমিকা ও নিজের কাজকে প্রশ্ন করতে শুরু করেন।

বার্গম্যান তার ইমেজেস: মাই লাইফ ইন ফিল্মে লিখেছেন:

‘পেশাগত জীবনের প্রতি আমার কোনো বিতৃষ্ণা নেই। আমি কিছুটা খেপাটে মানুষ, কিন্তু সেটা কোনোভাবেই আমার পেশাগত জীবনে প্রযোজ্য নয়। নিজের ভেতরে থাকা দানবগুলোকে বেঁধে রাখার সামর্থ্য আমার আছে। এবং আমি তাদের আমার দরকারমতো কাজে লাগাতে পারি। একই সঙ্গে তারা আমার ব্যক্তিগত জীবনকে যন্ত্রণা দিতে থাকে।’

একই সময় বার্গম্যান ইরাসমুসু পুরস্কারে ভূষিত হন (চার্লি চ্যাপলিনের সঙ্গে)। অসুস্থতার কারণে তিনি পুরস্কার গ্রহণ করতে যেতে পারেননি। আমস্টারডামে তার একটি লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনানো হয়। এটা ছিল হাসপাতালে বসে শিল্প সম্পর্কে তার উপলব্ধির সারসংক্ষেপ।

পারসোনা সৃষ্টি নিয়ে বার্গম্যান প্রথম নোটটি লিখেছিলেন ১৯৬৫ সালের ১২ এপ্রিল:

‘নিরাশা, বেদনা ও কান্না পরিবর্তিত হয়ে মানুষের আনন্দের শক্তিশালী প্রকাশে পরিণত হয়।

আমি এ সিনেমার মাধ্যমে নতুনভাবে শুরু করতে চাই।’

পারসোনা ছিল বার্গম্যানের ক্যারিয়ারে একটা সুবাতাস। তিনি নিজেই যেমনটা বলেছেন যে, একটা নতুন শুরু। এ নোটবুকে আরেকটু এগোলে কিছু শব্দ পাওয়া যায়, যা সিনেমাটার সঙ্গে খুব সম্পর্কযুক্ত: ‘টক টু ইচ আদার’, ‘ইরোটিসিজম’, ‘টেস্টিমোনি’, ‘ফেসিয়াল স্টাডিজ’ ইত্যাদি। পারসোনার মূল দুই নারী চরিত্রকে অনেক সময় একটিই ভাবা হয়। এ বিশ্লেষণের পেছনে উপযুক্ত কারণও আছে। খোদ বার্গম্যানই বলেছেন, ‘আমি মনে করি, এটা একই আত্মার বিভিন্ন স্বরের সমন্বয়।’

ইংমার বার্গম্যানের ওয়াইল্ড স্ট্রবেরি সিনেমাটা সবেচেয়ে বেশি নকল হয়েছে, দ্য সেভেনথ সিল নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্যারোডি হয়েছে। আর সবেচেয়ে বেশি লেখালেখি, বিশ্লেষণ হয়েছে পারসোনা সিনেমাটা নিয়ে। বার্গম্যানের আর কোনো সিনেমা এত বেশি সমালোচনা ও একাডেমিক বিতর্কের জন্ম দিতে পারেনি। অনেক সমালোচক এটিকেই বার্গম্যানের জীবনের সেরা কাজ বলে মনে করেন। পারসোনা নিয়ে বার্গম্যান নিজেই বলেছেন:

পারসোনা আমার জীবনকে রক্ষা করেছিল। এটা একটুও বাড়িয়ে বলা নয়। এ সিনেমাটা তৈরির শক্তি যদি আমি না পেতাম, তাহলে আমি স্রেফ ভেসে যেতাম। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই প্রথমবারের মতো আমি সিনেমার বাণিজ্যিক সাফল্য নিয়ে মাথা ঘামাইনি। আমি পারসোনায় আমার সাধ্যের সব দিগন্তকে স্পর্শ করেছি। পারসোনা ও ক্রাইজ অ্যান্ড হুইসপারে কাজ করতে গিয়ে আমি শব্দহীন কিছু রহস্যকে স্পর্শ করেছি, যা সিনেমা ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যমে আবিষ্কার সম্ভব নয়।’

—দ্য নিউইয়র্কার অবলম্বনে