ইতালো কালভিনো
ভাষান্তর: মাহমুদ আলম সৈকত
সকালের দিকে একটা নির্দিষ্ট সময়ে, কয়েদিদের স্ত্রীরা জড়ো হতে থাকে আর জানালার দিকে মুখ করে শুরু হয় ওদের উঁকিঝুঁকি মারা। একদম উপরের তলা থেকে কয়েদিরা ঝুঁকে ঝুঁকে নানা রকমের প্রশ্ন-উত্তরের পর্বে হাজির হয়; কয়েদি আর তাদের স্ত্রীদের মধ্যে যে ব্যবধান তা ওরা হাত বাড়িয়ে ছুঁতে চায় যেন। এ হোটেলটার তেমন কোনো বিশেষত্ব নেই, মাত্র কয়েক দিন আগেই হোটেলটাকে কয়েদখানা আর সৈন্যদের ব্যারাক হিসেবে বদলে নেয়া হয়েছে, বাড়িটায় লোহার বড় বড় গারদ আর উঁচু দেয়াল না থাকায় স্বাধীনতা হরণের যে ব্যাপারটা আছে, তা ঠিক জুতসই হয়ে ওঠেনি। কয়েদিদের মধ্যে যে বিষয়টি নিয়ে চাপা গুজগুজানি চলে, যা কিছুটা বাইরে থেকে টের পাওয়া যায় বটে, তা হলো নিচে যে বাগান আছে তার সঙ্গে তাদের দূরত্ব। অবশ্য এ তাদের নিয়তিই, কেননা যাদের এই কয়েদখানায় আনা হয়েছে, তাদের জন্য এটি এমন একটি দেশ, যে দেশ থেকে তারা আর কোনোদিনই ফিরতে পারবে না।
প্রায়ই দেখা যায়, জানালায় জড়ো হওয়া কয়েদিদের মধ্য থেকে কেউ একজন পিছু হটে হাঁক পাড়ছে: ‘ফেরারি! ফেরারি! নিচে তোমার বউ অপেক্ষা করছে!’ যাকে ডাকা হলো, সে তখন মুখে ফ্যাকাসে হাসির আভা ফুটিয়ে ভিড়াক্রান্ত জানালার দিকে নিজেকে ঠেলে দেয়।
কখনো জানালার কাছে যাওয়া হয়নি দিয়েগোর, তার পরিবার অনেক দূরে থাকে, হয়তো যুদ্ধে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে। ভালো কিংবা খারাপ খবর, নানা কল্পনা, নানা পূর্বাভাসের দোলায়মানতায় এরই মধ্যে সে ব্যতিব্যস্ত, কেননা নিচের বাগান উজিয়ে সেসব এন্তার ছড়িয়ে পড়ছে এদিক-সেদিক। তার স্নায়ু ফালিফালি হয়ে গেছে। নিজেকে স্রোতে ভাসিয়ে দিয়েছে— চাই সে দুর্ভাগ্যই হোক কিংবা অলৌকিক পরিত্রাণ, সেটার আশা সে এখনো ছাড়েনি। ছেলেবেলায় গ্রীষ্মের ছুটিতে সে বহুবার সমুদ্র আর বালিয়াড়ির কাছে বেড়াতে গিয়েছে, সেই সমুদ্র আর বালিয়াড়ির জন্য তার হূদয় আজো আনচান করে। গ্রীষ্মকাল মানুষকে অলস আর অকেজো বানিয়ে তুললেও এখানকার বসন্ত এই প্রথম তাকে বেশ খাটিয়েছে, অবশ্য খাটাখাটুনি প্রায় শেষের দিকে।
কিন্তু সময়টা ছিল স্নায়ুতে ছড়ানো তীব্র উত্তেজনার এক জাল, এমন এক ধাঁধার মতো, যা হাজার রকমের রূপ ধরে হাজির হতে পারে, যেগুলোর সব ক’টাই অর্থহীন। নিঃসহায়ভাবে, কয়েদিরা, যাদের প্রায় সবাইকেই পাকড়াও করা হয়েছে রাস্তাঘাট থেকে, ঠেলে দেয়া হয়েছে লিনোলিয়ামে মোড়া হোটেলের খালি কামরাগুলোয়, যেখানে কেবল হিমশীতল জলে ভাসমান সাদা ঠোঁটওয়ালা বেসিন আর দাঁত বের করা হাসিতে কুটোপাটি হচ্ছে হাইকমোডের দল।
দিয়েগোকে যেদিন বন্দরের কাছাকাছি এক কারাগার থেকে এ হোটেলে স্থানান্তর করা হলো, তার আগের দিন, যেখানে সে গোটা একটা দিন আর রাত পার করেছে অন্য কয়েদিদের সঙ্গে, সম্ভবত ওদের অনেকেই এখন মৃত। নিজেকে এ রকম এক হোটেলে বহাল তবিয়তে আবিষ্কারের ব্যাপারটা তার কাছে কবর খুঁড়ে লাশ তুলে আনার মতোই, এই যে চারপাশে এত গমগমে পরিবেশ তাতে সহজেই অনবহিত থাকা যায়, ভাগ্যকে সুপ্রসন্ন বলাই যায়। সে বেশ আমোদেই আছে, এখানে এসে ভিড়ের ভেতর মাইকেলকে খুঁজে পেয়েছে, ওরা একসঙ্গেই ধরা পড়েছিল। প্রায় চব্বিশ ঘণ্টা পেরিয়ে একে অন্যকে পুনরায় খুঁজে পেয়ে ওরা দারুণ খুশি। মাইকেলের খসখসে ওভারকোটের ওপর হাত বুলিয়ে, নিজের বুকের কাছে ঘেঁষে আসা ওর টেকো বড়সড় মাথাটায় হাত বোলাতে বোলাতে বেশ আশ্বস্ত বোধ করল দিয়েগো। বেঁচেবর্তে থাকা ক’টা দাঁত মেলে খ্যাকখ্যাক করে একটা দুর্বল হাসি হাসল মাইকেল, জিজ্ঞেস করল, ‘কী বলিস দিয়েগো, ওই নািসদের একটার ওপর চড়াও হব নাকি?’
ডিয়েগো জবাব দিল, ‘আলবৎ! শুধু একটা কেন? গোটা থার্ড রাইখের ওপরই চড়াও হব চল।’
‘তারবাদে ভন রিবেনট্রপের ওপর?’
‘হুম। এমনকি ভন রিবেনট্রপ, এমনকি ব্রশিস, এমনকি ড. গোয়েবলসের ওপরও চড়াও হব।’
উত্কণ্ঠা তাড়াতে, সেই সঙ্গে নিজেদের সস্তা রকমের কৌতুক নকশায় পাওয়া হাসির দমক লুকাতে ওরা ঠাণ্ডা একটা রেডিয়েটরের পেছনে হামাগুড়ি মেরে সেঁধিয়ে পড়ল (অথচ ওরা জানেও না যে, ওদের সঙ্গে আটক কয়েদিদের অনেককেই ওরা ইত্যবসরে হাপিস করে দিয়েছে), যেন দীর্ঘ বছর পর জেলখানা থেকে ছাড়া পেয়েছে এমনই মনে হতো লাগল দিয়েগোর কাছে।
বন্দরের কাছে যেখানে আগের কয়েদখানাটা, সেটা একসময় একটা পুরনো দুর্গ ছিল। এখন ওখানে জার্মান বিমানবিধ্বংসী সেনাদলের ঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছে। ওদের যে কামরাটায় গাদাগাদি করে পোরা হয়েছিল সম্ভবত সেই কামরাটা ব্যবহূত হতো জার্মান সৈন্যদের শাস্তি দেয়ার কাজে। মানে নানা অপরাধে অপরাধী সৈন্যদের শোধনাগার হিসেবে। কামরাটার দেয়ালে এক জার্মান সমকামী সৈন্যের করা দেয়ালচিত্র, নিচে লেখা, ‘বন্ধু আমার, আমি আজ এখানে একা একা ধুঁকছি অথচ তুমি কত দূরে। তুমি কাছে থাকলেই আমি সবচেয়ে সুখী থাকি বন্ধু।’
ছোট্ট ওই কুঠরিতে (ওটাকে কুঠরি বলাই শ্রেয়) থাকতাম বিশজন। মেঝেতে এক সারিতে শোবার ব্যবস্থা। শিকারির পোশাক পরা সাদা দাড়ি-চুলের এক বুড়োও ছিল কামরায়, অন্য এক কয়েদির বাবা। রাতের বেলায় বেশ কয়েকবার ধড়মড়িয়ে উঠে শুয়ে থাকা শরীরগুলোকে মাড়িয়ে কামরার কোনার দিকে ছুটত মুতবার জন্য। কোনায় একটা ছোট স্টিলের কৌটা আছে। মরচে ধরে কৌটাটার বেহাল দশা। বুড়োর মুততে যাওয়া মানেই মেঝেতে নদী ছোটা! দেখতে নেকড়ের মতো এক কয়েদি জান্তব চিত্কারে ফেটে পড়ে, বাইরে রক্ষীদের পালাবদলের শব্দ প্রতিধ্বনি ছড়ায় দেয়ালে দেয়ালে।
কামরার ঘুলঘুলিটার লোহার শিকগুলোর ওপারে নজরে আসে দূরের খাড়া পাহাড়ের চূড়া, সারা রাত ধরে শোনা যায় পাথরে আছড়ে পরা ঢেউয়ের গর্জন, যেন তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে ছড়িয়ে পড়ছে রক্তের ঢেউ, যেন মগজে আছড়ে পড়ছে ফেনিল চিন্তার ঢেউ। এবং একযোগে সবার ভাবনায় সেই কোণ বা মোড়, যে কোণ বা মোড় বা পথের বাঁকে ওরা আর ফিরতে চায় না বেঁচে থাকা অবধি, যেখান থেকে ওদের পাকড়াও করে আনা হয়েছে। রাস্তার একটা সেনাচৌকি থেকে বাঁচতে মাইকেলকে সঙ্গে নিয়ে দিয়েগোও এমন একটা চিপা গলিতে নেমেছিল, কিন্তু কপাল খারাপ হলে যা হয়, সটান গিয়ে সামনাসামনি পড়ল একদল সৈন্যের সামনে। সৈন্যদের কাছ থেকে প্রায় তিন মিটার দূরে ছিল ওরা, ওখানেই দাঁড়িয়ে পড়ার আদেশ এল, কোনো ট্যাঁ-ফো চলবে না। যেন ওদের সামনে শুরু হতে চলেছে একটা জমাটি চলচ্চিত্র।
অনুভূতি আর প্রতিরূপের শিকল মনের ভেতর জপমালার মতো চক্রাকারে ঘুরছে, বারবার বলছে যে গল্পটা এ রকম না হয়ে অন্য কোনো রকমের হতে পারতই না, এই যেমন সে শুয়েছিল দেয়ালচিত্রটির খুব কাছ ঘেঁষে, অন্ধকারে বারবার মুততে যাচ্ছে বুড়োটা কিংবা এই যে এখন, ডাই করা জঞ্জালের এক ফাঁকে গুঁজে শুয়ে আছে সে, জীবন-মৃত্যুর মাঝমাঝি আটকে আছে, আশপাশে অধোবদনে ঘুরছে অন্যরা।
প্রতিদিনই ওদের মধ্য থেকে কিছুসংখ্যক কয়েদিকে নির্বাচন করা হয়, হয় মৃত্যুর পরোয়ানা মাথা পেতে নিতে কিংবা জীবন ফিরে পাওয়ার পত্র নিয়ে। রোজ সকালে একতাড়া কাগজ হাতে নিয়ে হাজির হয় সার্জেন্ট আর সাপের খোলসের মতো খসখসে চামড়াওয়ালা এক অফিসার, যারা হাতে কাগজ পায় তারাই মুক্তি পায়। মুক্তি পেয়ে নিচের বাগানে ওরা স্ত্রী-সন্তান-পরিজনদের আলিঙ্গনে সিক্ত হয়, এগোতে থাকে মূল ফটকের দিকে, তাদের চলে যাওয়ার পথে লেগে থাকে অনেক ঈর্ষাতুর দৃষ্টির ছায়া।
সন্ধ্যায়, হোটেলের মূল ফটক দিয়ে ভেতরে ঢোকে সশস্ত্র সৈন্যবোঝাই একটা ধূসর রঙের ভ্যানগাড়ি। ফের সার্জেন্ট এবং সাপের চামড়াটা আসে, এসেই কিছু নাম ধরে ডাকে, তারপর ওদের টেনেহিঁচড়ে তোলা হয় ভ্যানে। পরদিন ভোরে যখন সেই মানুষগুলোর খোঁজে তাদের স্ত্রী বা পরিজনরা আসে, না পেয়ে, ব্যারাক অফিসের এক কামরা থেকে আরেক কামরায় ছোটাছুটি করতে লাগে। নিষ্ফল সেই আহাজারি, কেউই সেই নিখোঁজ লোকগুলোর হদিস বাতলাতে পারে না। তখন হয়তো অন্যান্য স্ত্রী-পরিজন বলাবলি করে যে, গতকাল রাতে বন্দরের ওদিকটায়, ফাঁকা মাঠের দিকে থেকে গুলির শব্দ শুনেছে ওরা।
দিয়েগো ও মাইকেলের জন্যও মাত্র দুটি বিকল্প পথ: জীবন অথবা মৃত্যু। হয় ওদের কাগজপত্র বৈধ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে এবং সেক্ষেত্রে ওরা হয়তো রাইখের ওপর চড়াও হওয়ার স্বপ্নটা টিকিয়ে রাখবে, কোনো কোনো সন্ধ্যায় বন্ধুদের সঙ্গে গোপন ডেরায় গুলবাজির তোরে হাসির ফোয়ারা ছোটাবে। অথবা নিয়তি হতে পারে ধূসর ভ্যানগাড়ি, গাড়িটি ধীরে ধীরে পেরিয়ে যাবে শহরের ধসে পড়া বাড়িগুলোর জঞ্জাল মাড়িয়ে, কোনো এক মাঠের উদ্দেশে।
প্রত্যেক বন্দি যেদিন প্রথম এই হোটেলে আসে, ঠিক সেই সময় সাপের চামড়া ওদের বেশ ভালো করে পরখ করতে থাকে, কারণ বাইরে দাঁড়ানো কোনো বন্ধুকে যদি এদের কেউ চিনতে পারে সেই আশায়। ছেলেছোকরার মতো আঁটোসাঁটো উর্দি পরা, ঠোঁটে লালাভেজা হাসি, ঘামে ভেজা হাত কচলাতে কচলাতে সে হেঁটে বেড়ায় ধরে আনা বন্দিদের দঙ্গলে। ফ্যাকাসে মুখাবয়ব, ঠাণ্ডায় নাক আর চোখের কোণ লালচে, চুমড়ানো গোঁফেও লেগেছে সেই লালচে আভা। ধরে আনা বন্দিদের জীবন কিংবা মৃত্যুর ফয়সালাকারী হিসেবে, ওদের শ্বাস-প্রশ্বাস যেন ওর হাতের মুঠোয় পোরা এমন ভাবাবেগে চিকচিক করতে থাকে ব্যাটার চোখ।
এসবই সাপের চামড়াওয়ালার কাছে তুরীয় বিজয়ের মুহূর্ত, কিন্তু এসব মুহূর্ত প্রায়ই নিদারুণ যন্ত্রণার রঙিন রঙে রাঙানো। যখনই সে বারান্দায় বা হলঘরে হাজির হয়, দেখা যায় সহকর্মীদের অনেকেই আশপাশে হাজির হয় তার নাম ‘তুল্লিও, তুল্লিও’ রবে, ভিড় করে দাঁড়ায় নানাজনের মুক্তির তদবির নিয়ে। সে তখন তার সহকর্মীদের অভিসন্ধি আর অভিসন্ধির পেছনে তীব্র ঘৃণার দিকে অবজ্ঞাভরে তাকায়। বলে, ‘গাড়ল ভেবেছ আমাকে! এই যে এখন আমাকে এত তেল মারছ, কাল ঠিকই মওকামতো পিঠে ছুড়ি বসাবে।’
এ রকমই এক তল্লাশির সময়, মাইকেলের সামনে এসে দাঁড়ায় তুল্লিও। জিজ্ঞেস করে, ‘আমাদের বোধহয় এর আগেও দেখা হয়েছে?’ দৃষ্টিতে একরাশ বিস্ময় মেখে কাঁধ ঝাঁকিয়ে না বোধক মাথা নাড়ল মাইকেল, যদিও শিরদাঁড়া বেয়ে কনকনে ঠাণ্ডা একটা জলের ধারা ঠিকই নেমে গেল।
হাঁটুতে হাত রেখে টাইলসের মেঝেতে বসা দিয়েগো, পাশেই জানালার দিকে তাকিয়ে বসা মাইকেল। সে তার স্ত্রীর অপেক্ষায় আছে, স্ত্রী গেছে লুসিয়ানো আর এসএসের দোভাষীর অফিসের দিকে। আসলে একটা রফায় আসতে চাইছে মাইকেল-দিয়েগো, যাতে করে এখান থেকে দ্রুত মুক্তি মেলে। মাইকেলের বউ স্বামীর চাইতে বয়সে বেশ ছোটই, যাকে বলে বালিকা-বধূ। মসৃণ কালো চুলের কেয়ারির ভেতর, তার চোখ ধূসর-মেঘাচ্ছন্ন কিন্তু মুখাবয়বে দৃঢ়-কঠিন ছাপ, হালকা-পুলকা শরীরে একটা চনমনে ব্যাপার তাতে ঈষৎ বেগুনি রঙের খাটো স্কার্ট দুর্দান্ত মানিয়ে গেছে। তাকে দেখলে আপনার ভেতর নিশ্চিতভাবেই অনুতাপ জন্মাবে, জীবন আসলে যে রকম মানে ধরুন— বেদনাদায়ক এবং অশ্লীল, সে রকমই কেননা জীবনে আসলে শান্তি নেমে আসার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। দিয়েগো ভাবে, এ রকম একজন নারীর সঙ্গে নরম রোদেলা কোনো দেশে দেশান্তরী হতে পারলে, এমন দেশে, যে দেশে কোনো অন্যায়-অবিচার নেই, মানে জীবনটা জমে ক্ষীর হয়ে যেত আর কী!
‘আমরা এখান থেকে মুক্তি পেলে, এসব ঝুটঝামেলা থেমে গেলে, এ হোটেলটা যখন পর্যটকদের জন্য আবার খুলে দেবে, আমি সপ্তাখানেকের জন্য এখানে থাকতে আসব।’ মাইকেলের কোনো রা নেই। দিয়েগো ফের বলতে লাগল, ‘এসে ঠিক এইখানে, যেখানে আমি এখন বসে আছি সেই জায়গাটায় দুহাত মেলে দাঁড়িয়ে কয়েক পাক ঘুরে নেব। তখন নিশ্চয় এখানে অনেক সম্মানিত লোকজনের আনাগোনা থাকবে, হয়তো কেউ কেউ আমাকে পাগলও ঠাউরাবে।’
মাইকেলের দৃষ্টি তখনো জানালায় সাপটে আছে। খানিক পর মুখ ঘুরিয়ে হেসে বলল, ‘তোর কি রুটি চাই? আমার বউ কয়েকটা নিয়ে এসেছে। তুই রেখে দে, ওই যে সৈন্যটার হাত দিয়ে পাঠাচ্ছে।’ কথাগুলো এত দ্রুত বলল সে, যেন সময়টা এই মুহূর্তেই পালিয়ে যাচ্ছে!
‘তোর বউ কি ফিরে এসেছে? কী বলল?’
চোখে চোখ না রেখে ছাদের দিকে তাকিয়ে মাইকেল উত্তর দিল, ‘শোন দিয়েগো, আমার জবাব আমি পেয়ে গেছি। সাপের খোলস আমার দণ্ড ঘোষণা করে দিয়েছে। লুসিয়ানো সেটা আমার বউকে বলেছে। বউটা নিচে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে।’ খুব হালকা চালে কথা ক’টি জানিয়ে দিল মাইকেল। আর শব্দগুলোর ভেতর এমন একটা সরলতা ছিল, যেটার ভয়ই ওরা দীর্ঘদিন ধরে পাচ্ছিল, যে ভয়টি যুগপত্ভাবে অমোঘ এবং অনিবার্য।
পাতলুনের পকেটে হাত লুকিয়ে দ্রুতবেগে হলঘরের দিকে পা চালাল মাইকেল। ভারী চোখের পাতার নিচে তার চোখ দুটো ঢাকা পড়েছে। চলতি পথে পাশ থেকে দু-একজনের কুশল জিজ্ঞাসায় সে যেন কোনো অতল থেকে নিজেকে ফিরিয়ে আনছে, অবাক হয়ে বুঝতে চাইছে যে, তার কাছে ঠিক কী জানতে চাওয়া হচ্ছে। হয়তো সে এসবের কোনো মানেই খুঁজে পাচ্ছিল না, হয়তো যা ঘটতে চলেছে তার জন্য সে নিজেকে প্রস্তুত করছে।
ত্রস্তে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মাইকেলের পিছু নিল দিয়েগো। দিয়েগো ভাবছিল, মৃত্যুর দিকে মাইকেলের এই পদক্ষেপের ঘোর হয়তো অন্য বন্দিদের অনবধনতায় বাধা পেতে পারে। কেননা তাদের একটিমাত্র জিজ্ঞাসাই, মাইকেলের এই ধ্যান ভাঙিয়ে যে জীবনে সে বেঁচে ছিল সেই বেঁচে থাকার প্রতি মরিয়া করে তুলতে পারে। দিয়েগো জানে, মৃত্যু অভিমুখে হলঘরের দিকে এই হাঁটা বড়জোর হাজারখানেক কদমের। এই মিছিল মাইকেলের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার মিছিল, নিজের কবরের উদ্দেশেই হাঁটছে এক মৃত মানুষ।
মাইকেলকে দেখতে দেখতে ওর মধ্যে নিজেরই প্রতিফলন খুঁজে পেল দিয়েগো। তারই বয়সী এক কমরেড, সামান্য কিছু দোষত্রুটি বাদ দিলে সে নিপাট ভালোমানুষ, কিছুটা ভীতু, দলের সঙ্গে কিছুটা খাপছাড়াভাবে যুক্ত। মাইকেলের স্লোগান দেয়ার ভঙ্গি নিয়ে প্রায়ই ঝগড়া বাধিয়ে দিত ওরা, সে চাইত না এতে কোনো ভুলচুক হোক, স্বতঃসিদ্ধ থাকার চিরকালীন দাবির মতোই আর কি!
মাইকেল হাঁটছে হলঘরের দিকে, ওভারকোটের পকেটে হাত, কাঁধের ওপর থ্যাবড়ে বসে গেছে গোলগাল মাথা, বড় বড় চোখের পাতাওয়ালা দৃষ্টি হারিয়ে গেছে, যেন ঘটনার আকস্মিকতায় চোখ দুটো সরে গেছে অন্য কোথাও। তিনদিনের না কামানো দাড়ি, ওভারকোটে ঢেকে পেরিয়ে যাচ্ছে দ্রুত লয়ে, প্রকৃতির এক অমোঘ টানে, দিয়েগোর মনে হলো: মৃত্যুর পরও মাইকেলের এই হন্টন জারি থাকবে, যেন আগামীকালও সে এখানে অবস্থান করবে, জার্মান সৈন্যদের অশ্লীল খিস্তিখেউড় শুনবে— হয়তো ওই জানালার প্রান্তঘেঁষে হাঁটবে, ধীর পদক্ষেপে অবাক নীরবতা নিয়ে শ্যাম্পেনের তেপায়া টেবিলটার দিকে এগিয়ে যাবে, পেরিয়ে যাবে নিষ্প্রভ ক্রিসমাস ট্রি আর তাতে লাগানো ক্ষয়াটে ক্রুশগুলো, উদোম স্তন আর ঊরু বোঝাই ঠাণ্ডা কুঠরি, যা জার্মান সৈন্যদের পাশবিকতার চিহ্ন নিয়ে বোবা চিত্কারে জর্জরিত। যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও এই মর্ত্যে তার হাঁটা জারি থাকবে। তখনো পয়সাওয়ালাদের মনে শান্তি নেমে আসবে না, ঘরে ঘরে নেমে আসবে না সুখ। যে টেবিলে ঘিরে বসে পরিকল্পনা হয় শান্তি কিংবা যুদ্ধের, যেখানে মানুষের মানবিকতাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়, যেখানে অনিষ্টকারী ভগবানদেরই জয়জয়কার, সেখানে, সেখানেই বারবার ফিরে আসবে প্রতি সন্ধ্যায় বন্দরের খাঁড়িতে নিহত হওয়া মানুষদের ছায়া।
কয়েদিদের মধ্যে কে একজন বলল যে, জার্মানরা কাকে যেন ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে, দিয়েগো দেখতে পেল বন্দরের রাস্তায় একটা ল্যামপোস্টে মাইকেলই ঝুলছে, তার এ-ও মনে হলো আশপাশের সবাই-ই এই কুকর্মের সঙ্গে যুক্ত, আর এটি এমন এক বিরামহীন পাপ, যা তাদের জীবনের সব আনন্দ হটিয়ে দিয়েছে, তদুপরি এই দুর্ঘট সময়ের শেষ মুহূর্ত ইস্তক ঘটে চলবে।
জলের যে ঘূর্ণিতে মাইকেল অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল সেখানে তার ওভারকোটটা ভিজে চুপচুপে হয়ে ভাসছে, কোটের প্রসারিত হাতা দুটো ক্রুশ কাঠের মতোই দেখাচ্ছে। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে লাল বয়াটা ভাসছে, বয়ার ঘণ্টাধ্বনি যেন অপরাপর মৃত কমরেডদের ডেকে ফিরছে। জলের তলায়, বয়ায় লাগানো মোটা ইস্পাতের দড়িটা যেখানে নোঙর ফেলেছে, মাইকেলের গর্দান সেখানে আটকে গেছে। অথচ মাইকেলের খোলা চোখ তাকিয়ে আছে তীরের দিকে, বাষ্পরুদ্ধ দৃষ্টি, যেন সহসাই দু’ফোঁটা জল মিশে যাবে সমুদ্রে। শিকারির পোশাক পরা বুড়োটা উঠে দাঁড়াল, ছরছর শব্দে মুততে লাগল। উপচানো নদী বইছে, কী ভালো কী মন্দ সবাই-ই সেই নদীতে নিমজ্জমান। বুড়োটার নেতিয়ে পড়া লিঙ্গটা যেন সব পুরুষের লিঙ্গে প্রতিস্থাপিত হয়েছে আর গোটা পৃথিবীকে ভাসিয়ে দিচ্ছে। কেবল সাপের খোলস এই ডুবন্ত পৃথিবী থেকে পালাতে চাইছিল দূরে, কিন্তু প্রতিটি কফিনই ছিল তার হাতে খুন হওয়া মানুষের লাশে বোঝাই। তার চারপাশে ভিড় বাড়ছে, বানের জলে তাকে ডুবিয়ে দেবে ওরা।
সেদিন বিকালে ধূসর ভ্যানগাড়িটা আসতে দেরি করছিল, বোধহয় আজ আর ওটা আসবে না এই ভেবে ওরা কিছুটা নিশ্চিন্ত বোধ করল। মুখ ভার করে জানালায় দাঁড়িয়ে ভ্যানটার জন্য অপেক্ষা করছিল মাইকেল। উল্টো একে একে চারটা পর্যটকবাহী বাস ঢুকল হোটেল চত্বরে। সমবেতদের ভেতর নানা জিজ্ঞাসা, কেউ কেউ ক্ষোভে ফেটে পড়ল। নামের তালিকা হাতে সার্জেন্টের উদয়, অন্য অনেক নামের পাশাপাশি তালিকায় দিয়েগো ও মাইকেলের নামও ডাকা হলো।
কয়েদিদের চারটা ভাগে ভাগ করে বাস চারটায় তোলা হলো। মাইকেল আর ডিয়েগো এবারও একই বাসে ঠাঁই পেল, গুজগুজানি-ফিসফিসানি অব্যাহত রইল বাসেও, কে যেন হঠাৎই বলে উঠল, ‘মারাসি, হারামির দল আমাদের মারাসি জেলখানায় নিয়ে যাচ্ছে।’ কিন্তু এ বাক্যটি ডিয়েগো আর মাইকেলের কাছে স্বস্তিদায়ক মনে হলো, কেননা তাতে করে আরো ক’টা দিন বেঁচে থাকতে পারবে ওরা।
মাইকেলের খসখসে ওভারকোটের প্রান্তভাগে আঙুল বোলাতে লাগল দিয়েগো, ধমনিতে ফের সবেগে রক্তোচ্ছ্বাস। বলল, ‘বলেছিলাম না ব্যাটা লুসিয়ানো একটা বোকাপাঠা। বলেছিলাম কিনা বল?’
মাইকেল ভাঙা রেকর্ডের মতো বারবার বলতে লাগল, ‘সব বোকাচোদা, এঁ?’ ঠোঁটে ঝুলছে স্মিত হাসি, যেন কৌতুকটা বেশ রসালো হয়েছে।
বাদবাকি কমরেডরাও বুঝে ফেলেছিল, কপালে যা-ই থাকুক, হিংস্রতা-কান্না-মুক্তি যা-ই থাকুক, রুটি ভাগ করে খাওয়ার মতো বেঁচে থাকার এই রক্তাক্ত স্বাদ ওদের পেতেই হবে। এখন থেকে তিক্ত-কঠিন জীবনেই তাদের বসবাস হতে যাচ্ছে, আর্তচিত্কারে ভরা মারাসির অন্ধকার টানেলে কিংবা আরো উত্তরের জনমানবহীন ব্যারাকে, যতক্ষণ না তারা ফিরে আসে।






