উডি অ্যালেন

ভাষান্তর: বর্ণালী সাহা

খবরটা যখন পেলাম তখন আমি ওভেইদোতে— স্পেনের উত্তরাঞ্চলের ছোট্ট সুন্দর একটা শহর, যেখানে একটি ছবির শুটিং করছিলাম। বার্গম্যান আর নেই। আমাদের দুজনেরই বন্ধু ছিল এমন একজন আমাকে ফোনের মেসেজ মারফত খবরটা পৌঁছে দিল ছবির সেটে। বার্গম্যান একবার আমাকে বলেছিলেন, তিনি রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে মরতে চান না; আর ঘটনাস্থলে না থাকার কারণে শুধু এতটুকু আশা করতে পারি যে, যাওয়ার সময় তিনি তেমন একটা মড়াটে আবহাওয়াই পেয়েছেন, যেমনটা পেলে ডিরেক্টরের কার্যসিদ্ধি হয়।

যারা শিল্পীর সত্তাকে নিয়ে একটা রোমান্টিক ধারণা পোষণ করেন এবং শিল্প সৃষ্টিকে পবিত্র কিছু মনে করেন, তাদের আমি আগেও বলেছি, দিন শেষে আপনার আর্ট আপনাকে বাঁচাবে না; যত মহতী কাজই আপনি ফাঁদুন না কেন (ভুললে চলবে না বার্গম্যান আমাদের দিয়ে গেছেন অসাধারণ মাস্টারপিস ছবির সম্ভার), তা আপনাকে সুরক্ষা দেবে না তেমন একটা ব্যাঘাত থেকে— ‘দ্য সেভেনথ সিল’ ছবির শেষ দৃশ্যে সবান্ধব নাইটের দরজায় ভাগ্যবিড়ম্বিত টোকা পড়ার ফলে যে ব্যাঘাত ঘটেছিল। আর তাই বার্গম্যান, যিনি ছবির জগতে মরজগতের মহান কবিতা লিখে গেছেন, তিনিও নিজের জীবনের বাজিতে অনিবার্য পরাজয় ঠেকাতে পারলেন না জুলাইয়ের এক গ্রীষ্মদিনে। চলে গেলেন আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রকার।

আর্টকে আমি ঠাট্টা করে ডেকেছি আঁতেলদের ধর্মবিশ্বাস, মানে পরলোকের ব্যাপারে এক অভিলাষী আস্থার মতো। আমি বলব যে, জনতার মননে আর হূদয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে নিজের বাসায় বেঁচে থাকা বরং ভালো। অতি অবশ্যই বার্গম্যানের সব ছবি বেঁচে থাকবে এবং জাদুঘরে বা টিভিতে বা ডিভিডিতে দেখা হবে কিন্তু তাকে যতটুকু চিনতাম, এটা তার জন্য খুবই নগণ্য পারিশ্রমিক। আর আমি নিশ্চিত যে তার করা প্রতিটা ছবির বিনিময়ে যদি একটা করে বাড়তি বছর তিনি বেঁচে থাকার জন্য পেতেন, তিনি বেজায় খুশিই হতেন। এতে তিনি হাতে পেতেন মোটামুটি ৬০টি বাড়তি জন্মদিন— আরো আরো ছবি করার জন্য; কী অসামান্য সৃজনশীল আউটপুট হতো সেটা! আমার মনে একটুও সন্দেহ নেই যে, বাড়তি সময়টা পেলে তিনি ওভাবেই সেটা ব্যয় করতেন— একমাত্র ওই কাজই, যেটা তিনি সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন— ছবি বানাতে।       

কাজ করে যাওয়ার প্রক্রিয়াটার মধ্যে আনন্দ পেতেন বার্গম্যান। তার ছবি কেমন সাড়া জাগাল, তা নিয়ে সামান্যই কেয়ার করতেন। যখন প্রশংসা পেতেন, তার ভালো লাগত কিন্তু একবার আমাকে যেমন বলেছিলেন, ‘আমার করা কোনো ছবি যদি ওদের ভালো না লাগে, সেটা আমাকে বিচলিত করে, ধরো ৩০ সেকেন্ডের জন্য।’ বক্স অফিসের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে তার আগ্রহ ছিল না, যদিও প্রযোজক-পরিবেশকরা তাকে ছবি মুক্তির প্রথম উইকএন্ডের বেচাবিক্রির হিসাব জানাতে ফোন করতেন; যা কিনা তার এক কান দিয়ে ঢুকে আরেক কান দিয়ে বেরিয়ে যেত। তিনি বলতেন, ‘এদের অতি-আশাবাদী ভবিষ্যদ্বাণী মাঝ-সপ্তাহ বরাবর শূন্যের কোটায় নেমে আসবে।’ সমালোচকদের প্রশংসা তিনি উপভোগ করতেন কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও সেটার প্রয়োজন বোধ করতেন না; আর যদিও তিনি চাইতেন দর্শকরা তার কাজ উপভোগ করুক, তাদের জন্যও তিনি খুব সহজ ছবি বানিয়ে যাননি। 

তার পরও যারা তার ছবি বুঝতে চেয়েছেন, তারা সেই চেষ্টার প্রতিদান পেয়েছেন। যেমন— ‘দ্য সাইলেন্স’ ছবির দুই নারী যে আসলে একই নারীর দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী সত্তা, এটা আপনি যখন ধরতে পারবেন, তখন এমনিতে দুর্বোধ্য এ ছবিটাও অনির্বচনীয়ভাবে আপনার সামনে নিজেকে মেলে ধরবে। অথবা ‘দ্য সেভেনথ সিল’ কিংবা ‘দ্য ম্যাজিশিয়ান’ দেখার আগে আপনার যদি ডেনিশ দর্শনের ওপর দখল থেকে থাকে, তা নিঃসন্দেহে কাজে দেবে। কিন্তু তার গল্প বলার সহজাত গুণ এমন বিস্ময়কর ছিল যে, কঠিন বিষয়বস্তু দিয়েও তিনি দর্শককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতে পারতেন। কতবার ছবি শেষে বেরিয়ে যাচ্ছে এমন লোকের মুখে শুনেছি, ‘ঠিক বুঝলাম না কী দেখলাম, কিন্তু একেকটা ফ্রেম দেখে যেন রুদ্ধশ্বাস হয়ে আটকে গেলাম!’

নাটকীয়তার সঙ্গে সখ্য ছিল বার্গম্যানের, মঞ্চেও খুব বড় মাপের পরিচালক ছিলেন। কিন্তু সিনেমায় তার কাজ শুধু থিয়েটারের বোধ দিয়ে পূর্ণ ছিল না; চিত্রকলা, সংগীত, সাহিত্য আর দর্শন থেকেও তিনি নিয়েছেন প্রচুর। মানবতার গভীরতম উদ্বেগের ভেতর ঢুকে পড়ত তার কাজ, বেশির ভাগ সময়ই সুগভীর কবিতার ভাষায় তা রূপ পেত সেলুলয়েডে। জীবনের নশ্বরতা, প্রেম, শিল্প, ঈশ্বরের নীরব ভূমিকা, কঠিন মানবিক সম্পর্ক, ধর্মীয় সন্দেহবাদিতার যন্ত্রণা, ব্যর্থ বিয়ে, মানুষের একে অন্যের সঙ্গে ভাব প্রকাশের ব্যর্থতা। অথচ লোকটার চরিত্র ছিল উষ্ণ, আমুদে, কৌতুকে ভরা; নিজের অতুল শক্তিমত্তার ব্যাপারে নিরাপত্তাহীন, নারীদের মোহের জালে আবিষ্ট। তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে কখনো মনে হতো না, হঠাৎ কোনো ভয়াবহ, ভীতিকর, জলদগম্ভীর মহাপ্রতিভাধর ব্যক্তির সৃজনশীলতার মন্দিরে ঢুকে পড়েছি; যিনি এ নৈরাশ্যময় দুনিয়ায় মানুষের দুর্ভাগ্য বিষয়ে সুইডিশ সুরে জটিল ভুয়োদর্শন আউড়াবেন। বরং এমন হতো: ‘উডি, একটা ফালতু স্বপ্ন দেখলাম। ছবি বানাতে একটা সেটে গিয়ে হাজির হয়েছি কিন্তু কোথায় ক্যামেরাটা বসাব, ভেবে পাচ্ছি না। বিষয় হচ্ছে, আমি তো জানি, আমি এ কাজে বেশ ভালো। আর এ কাজ করেও যাচ্ছি বছরের পর বছর। এসব নার্ভাস স্বপ্ন তুমিও কি দেখো?’ কিংবা ‘আচ্ছা এমন একটা ছবি বানালে কেমন হয় বলো তো, যেখানে ক্যামেরা এক ইঞ্চিও নড়বে না। আর অভিনেতারা ফ্রেমের ভেতরে শুধু ঢুকবে আর বের হবে? নাকি লোকে হাসবে?’

একজন জিনিয়াসের সঙ্গে ফোনে এমনতর কথা হলে কেউ আর কী বলবে? আমার মনে হয়নি আইডিয়াটা খুব ভালো ছিল, কিন্তু তার হাতে পড়লে বোধহয় সেটা বিশেষ কিছুই হতো। আর কিছু না হোক, অভিনেতাদের গভীর মনস্তত্ত্বের ভেতর ঢুকে যাওয়ার মতো যে রকম ভাষা তিনি আবিষ্কার করেছিলেন, সেই ভাষা সনাতনী কায়দায় ফিল্ম মেকিং শিখেছে যারা, তাদের কাছে অস্বাভাবিক শোনাত। ফিল্ম স্কুলে বরাবরই মুভমেন্টের ওপর জোর দেয়া হতো (পঞ্চাশের দশকে আমি নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটিতে ফিল্মে মেজর করছিলাম, ওখান থেকে খুব দ্রুতই আমাকে বের করে দেয়া হয়েছিল)। চলচ্চিত্র হচ্ছে ‘চলৎ-চিত্র’, চলমান চিত্র আর ক্যামেরাকে চলতে হবে— এমনটাই শিক্ষার্থীদের শেখানো হতো। আর শিক্ষকরা ঠিকই বলতেন।

কিন্তু বার্গম্যান ক্যামেরা তাক করতেন লিভ উলম্যানের মুখে কিংবা বিবি অ্যান্ডারসনের মুখে, সেভাবেই রেখে দিতেন, আর সেই ক্যামেরা নড়তও না; সময় কেটে যেত, আরো আরো সময় কেটে যেত আর একটা অদ্ভুত অবাক করা ব্যাপার ঘটত, যা কিনা কেবল তার শক্তিরই একান্ত পরিচয়। দর্শককে চরিত্রের ভেতর পুরোদস্তুর ঢুকে যেতেই হতো, আর এতে একঘেয়ে লাগত না; বরং উত্তেজনা জাগত।

তার সব উদ্ভট অভ্যাস এবং দার্শনিক ও ধর্মীয় নেশাগ্রস্ততা সত্ত্বেও বার্গম্যান ছিলেন গল্প বোনার এক সহজাত কারিগর। তার মাথায় শুধু নিটশে বা কির্কেগার্ডের আইডিয়াগুলোকে নাটকীয়তা দান করা ছাড়া আর কিছু না থাকলেও তিনি বিনোদন না দিয়ে পারতেন না। তার সঙ্গে লম্বা সময় ধরে ফোনে কথা হতো আমার। তিনি যে দ্বীপে থাকতেন, সেখান থেকে এ ফোনালাপের ব্যবস্থা করতেন। সেখানে যেতে তার নিমন্ত্রণ আমি কখনো গ্রহণ করিনি। কারণ প্লেনে করে ওখানে যাওয়াটা আমার কাছে ভেজাল মনে হতো। একটা ছোট্ট বিমানযোগে রাশিয়ার কাছের এক ছিটেফোঁটা দ্বীপে যাব, তাও আবার আমার কল্পনায় এক বাটি দই দিয়ে লাঞ্চ করার জন্য— এ বিষয়টাই আমার কাছে উপাদেয় লাগত না। আমরা সবসময় সিনেমা নিয়ে আলাপ করতাম এবং অবশ্যই আমি তাকে বেশির ভাগ কথা বলতে দিতাম। কারণ তার চিন্তা ও আইডিয়াগুলো শুনতে পাওয়াকে আমি সৌভাগ্য বলে মনে করতাম। তিনি প্রতিদিনই নিজের জন্য ছবি দেখার আয়োজন করতেন এবং কখনই দেখতে ক্লান্তি বোধ করতেন না। সব রকমের ছবি— নির্বাক, সবাক। ঘুমানোর আগে এমন কোনো ছবির টেপ চালিয়ে দেখতেন, যেটা তাকে চিন্তা করতে বাধ্য করত না এবং তিনি তার উদ্বিগ্নতাকে শিথিল করতে পারতেন, কখনো সেটা হতো কোনো জেমস বন্ড ফিল্ম।

ফেলিনি, আন্তোনিয়নি, বুনুয়েল— এসব বড় সিনেমা রূপকারের মতো বার্গম্যানেরও সমালোচক ছিল। কিন্তু কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে এ সব শিল্পীরই ছবি সারা পৃথিবীর লাখো দর্শককে নাড়া দিয়েছে। নিঃসন্দেহে যেসব ব্যক্তি ছবি সবচেয়ে ভালো বোঝেন, যারা কিনা ছবি বানান— পরিচালক, লেখক, অভিনেতা, সিনেমাটোগ্রাফার, এডিটর— সবাই সম্ভবত বার্গম্যানের ছবিকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধার জায়গায় রাখেন। এতগুলো দশক ধরে এত আগ্রহভরে তার স্তুতি গেয়েছি দেখে অনেক পত্রিকা-ম্যাগাজিনের লোকই দেখি তিনি মারা যাওয়ার পর আমার মন্তব্য বা সাক্ষাত্কার নিতে ফোন করল। যেন এ নিষ্ঠুর সংবাদের পরে জোরগলায় তার মহৎ কাজের প্রশংসা করা ছাড়া সত্যিকার অর্থে কাজের কিছু আমার যোগ করার আছে। 

কীভাবে তিনি আমাকে প্রভাবিত করেছিলেন? ওরা জানতে চাইল।

তিনি আমাকে প্রভাবিত করতে পারতেন না, আমি বললাম। তিনি ছিলেন জিনিয়াস আর আমি জিনিয়াস নই। আর জিনিয়াসের প্রতিভা শেখা যায় না কিংবা তার ম্যাজিক হাতবদলও হয় না।

যখন বিশাল চলচ্চিত্রকার হিসেবে নিউইয়র্কের আর্ট হাউজে বার্গম্যানের উত্থান ঘটেছিল, তখন আমি এক তরুণ রম্যলেখক আর নাইট ক্লাবের কমেডিয়ান। আমার মতো কারো কাজ কি কখনো গ্রাউচো মার্কস বা ইংমার বার্গম্যানের মতো মানুষ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে?

কিন্তু একখানা জিনিস আমি তার কাছ থেকে নিতে পেরেছি। এমন একটা জিনিস, যেটা প্রতিভা, এমনকি মেধার ওপরও নির্ভরশীল নয়; কিন্তু এমন কিছু, যেটা চাইলে শেখা যায় এবং যেটার বিকাশ ঘটানো যায়। আমি সেই জিনিসটার কথা বলছি, যেটাকে আমরা কাজের ক্ষেত্রে প্রায়ই কথায় কথায় নীতিবোধ বলে থাকি কিন্তু যেটা আসলে সোজাসাপটা ডিসিপ্লিন।

তার দৃষ্টান্ত থেকে আমি শিখেছি, যেকোনো মুহূর্তে আমার সাধ্যের শ্রেষ্ঠ কাজটা দিতে চেষ্টা করতে এবং কখনই হিট আর ফ্লপের নির্বোধ দুনিয়ার কাছে হার না মেনে কিংবা চিত্রপরিচালকের চাকচিক্যময় ভূমিকায় নিজেকে সমর্পণ না করে শুধু একটা ছবি বানিয়ে যেতে এবং তার পরের ছবিটার দিকে এগিয়ে যেতে। বার্গম্যান তার জীবদ্দশায় প্রায় ৬০টি ছবি বানিয়েছেন, আমি বানিয়েছি ৩৮টি। মানের দিক দিয়ে তার উচ্চতা যদি ছুঁতে না-ও পারি, হয়তো সংখ্যার দিক দিয়ে তার ধারেকাছে যেতে পারব।