ইংমার বার্গম্যান। অনুবাদ: আফসানা বেগম 

‘দ্য ভার্জিন স্প্রিং’ সিনেমাটির চিত্রগ্রহণের সময়ে আমরা উত্তরের প্রদেশ দালারনায় ছিলাম। সেটা ছিল মে মাসের কোনো একদিনের বেশ সকালে, সকাল সাড়ে ৭টা হবে। সেখানকার প্রকৃতি খানিকটা এবড়োথেবড়ো। আমরা দলবেঁধে জঙ্গলের ভেতরে এক লেকের পাশে কাজ করছিলাম। সেখানে ছিল খুব শীত, ৩০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের মতো। তাই খানিক পরে পরে ধূসর আর বৃষ্টিতে লেপা আকাশ থেকে কিছু তুষারকণা মাটিতে পড়ছিল। আমাদের দলের লোকদের গায়ে অদ্ভুত সব পোশাক ছিল। কারো গায়ে রেইন কোট, কারো তেলতেলে প্লাস্টিকের জ্যাকেট, কেউ পরে ছিল আইসল্যান্ডের সোয়েটার, কেউ চামড়ার জ্যাকেট, কেউ পুরনো কম্বল মুড়িয়ে, কেউবা পরে ছিল গাড়োয়ানের কোট কিংবা মধ্যযুগীয় আলখাল্লা। ক্যামেরা যাওয়া-আসা করার জন্য ওই অমসৃণ মাটির উপরে আমাদের লোকেরা প্রায় ৯০ ফুট লম্বা জং ধরা রেলটা বিছিয়েছিল। আমরা প্রত্যেকেই যন্ত্রপাতি হাতে সেটা বসাতে সাহায্য করছিলাম। অভিনেতা থেকে শুরু করে বিদ্যুতের কাজের লোক, মেকআপ ম্যান, স্ক্রিপ্ট পড়ার মেয়েটা, এমনকি শব্দ গ্রহণের লোকেরা— সবাই একই কাজ করছিল। করছিল বলতে গেলে নিজেদের শরীর গরম রাখার জন্য।

হঠাৎ আকাশের দিকে ইশারা করে একজন চিত্কার করে উঠল। পরমুহূর্তেই আমরা ফার গাছগুলোর মাথা থেকে অনেকটা উঁচুতে একটা ক্রেন দেখতে পেলাম। তারপর দেখলাম আরেকটা ক্রেন, তারপর আরো অনেকগুলো। ক্রেনের মাথাগুলো জাঁকালোভাবে আমাদের মাথার ওপর দিয়ে ভেসে বেড়াতে লাগল। আমাদের যার হাতে যা ছিল ফেলে রেখে কাছাকাছি একটা পাহাড়ের উপরে গিয়ে দাঁড়ালাম, যেন ক্রেনগুলো ভালোমতো দেখতে পাই। সেখানে আমরা বহুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম, যতক্ষণ না ক্রেনগুলো পশ্চিমের দিকে এগোলো আর জঙ্গলের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। আর তখন হুট করে আমার মাথায় এল যে, সুইডেনে সিনেমা বানাতে হলে এভাবেই বানানো উচিত।

এ রকম একটা ঘটনা ঘটা স্বাভাবিক যে, আমরা যখন আমাদের পুরনো যন্ত্রপাতি আর সামান্য অর্থের জোগানের জোরে একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি, তখন যা সত্য তা হলো, গাছের সারির মাথায় ভাসমান কতগুলো ক্রেন দেখার লোভে আমরা হাত থেকে সবকিছু ফেলে-ছেড়ে দৌড়ে চলে যেতে পারি।

ছোটবেলা থেকেই সিনেমার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা। উপসালায় আমার দাদার বড়সড় আর পুরনো ধাঁচের একটা অ্যাপার্টমেন্ট ছিল। সেখানকার খাবার টেবিলের নিচে আমি বসে থাকতাম। পাশের বিশাল এক জানালা দিয়ে যে সূর্যের আলো এসে পড়ত, সেই আলোকে ‘শুনতাম’। ঢং ঢং করে গির্জার বেল বেজে উঠত। শব্দের সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের আলো নড়ে অন্যদিকে চলে যেত আর আলোর ‘শব্দও’ যেত বদলে। আমার পাঁচ বছর বয়সে একবার যখন বসন্ত নামানোর জন্য শীত যাই যাই করছিল, ঠিক তখন পাশের অ্যাপার্টমেন্টে পিয়ানো বেজে উঠল। ওই পিয়ানোয় কেবল বলরুমের নাচের সুর বাজত। একমাত্র নাচের সুরই, অন্য কিছু নয়। সেখানকার দেয়ালে ভেনিসের বড় একটি ছবি টাঙানো ছিল। সূর্যের আলো সেই ছবিতে পড়লেই খালের পানি বয়ে যেতে থাকত। উপরের খোপগুলো থেকে কবুতর বের হয়ে ওড়া শুরু করত। ছবির লোকেরা নানা ভঙ্গিতে শব্দবিহীন কথাবার্তা বলত। তারপর বেল বেজে উঠত আবার, তবে উপসালা গির্জা থেকে নয়, ওই ছবির ভেতর থেকে। শেষে ওই অসাধারণ ছবিটি থেকে পিয়ানোর সুরও ভেসে আসত।

আচার্যের বাড়িতে জন্ম নেয়া এবং বেড়ে ওঠা শিশু হলে জন্ম ও মৃত্যুর দৃশ্যের সঙ্গে খুব ছোটবেলাতেই পরিচয় ঘটে। বাবা মানুষের শেষকৃত্যানুষ্ঠান, বিয়ে, খ্রিস্টীয়করণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। ওইসব অনুষ্ঠানে তিনি তাদের উপদেশ দিতেন, ধর্মীয় বক্তৃতা রাখতেন। আমার তাই শয়তানের সঙ্গেও পরিচয় ঘটে ছোটবেলাতেই। আর শিশুমনে শয়তানের ব্যক্তিত্ব নিয়ে নাড়াচাড়া করাটা অভ্যাসে পরিণত হয়। তখন হঠাৎ আমি একটা জাদুর বাতি পেয়ে যাই। সেটা ছিল ছোট একটা ধাতব বাকসো, যার মধ্যে একটা কার্বাইডের বাতি। বলতে গেলে এখনো সেই গরম ধাতুর গন্ধ আমার নাকে লেগে আছে। সেটাতে ছিল বেশ কয়েকটি কাচের স্লাইড, রেড রাইডিং হুড অ্যান্ড দ্য উলফসহ আরো বেশকিছু। নেকড়ে বাঘটা ছিল শয়তান। তার শিং ছিল না কিন্তু লেজ আর লাল মুখ ছিল। অদ্ভুত বাস্তব ছবি অথচ যেন অকল্পনীয়। শিশুমনে শান্তি দেয়ার মতো ফুলঘেরা দেয়ালের সামনে কৌতূহল জাগানো এক শয়তানির দৃশ্য।

আমার বয়স যখন ১০, তখন প্রথম আমার হাতে ফিল্ম প্রজেক্টর এসেছিল, সঙ্গে ছিল তার চিমনি আর বাতি। আমার কাছে সেটা খুবই আকর্ষণীয় আর রহস্যময় মনে হতো। প্রথম যে ফিল্মের মালিক ছিলাম আমি, তা ছিল ৯ ফুট লম্বা আর বাদামি রঙের। সেটা চালালে দেখা যেত, একটা মেয়ে বনভূমির মধ্যে ঘুমিয়ে আছে। তারপর জেগে উঠে সে হাত দুটি মেলে শরীরটা টানটান করে নেয় আর তার পর পরই ডানদিকে মিলিয়ে যায়। সেই ফিল্মটা ছিল ভীষণ সফল একটা ছবি, যা প্রজেক্টর ভেঙে যাওয়ার আগ পর্যন্ত প্রতি রাতে অন্তত একবার প্রদর্শিত হতো। ভাঙার পরে তা আর ঠিক করা হয়নি।

ভাঙাচোরা সেই মেশিনটাই ছিল আমার জন্য প্রথম জাদুর বাকসো। আর আজ এখনো মনে পড়লে আমি সেই শিশুসুলভ উত্তেজনায় ফিরে যাই, যেহেতু সিনেমা মানুষকে ভেলকি দেখানোর উদ্দেশ্যে বানানো, তাই আমি তখন এক জাদুকরই বটে। এ নিয়ে আমি অনেক ভাবতাম। আমি যদি একটা ১ ঘণ্টার সিনেমার সামনে বসে থাকি, তবে মোটামুটি ২৭ মিনিট একেবারে অন্ধকারে নিমজ্জিত হই। এক দৃশ্য থেকে আরেক দৃশ্যে যাওয়ার মাঝখানের অন্ধকারের কথা বলছি। মানুষের সামনে যখন একটা সিনেমা দেখাই, তাদের দৃষ্টিকে ধোঁকা দেয়ার জন্য কখনো আমার নিজের কাছে অপরাধী মনে হয়। এমন একটা যন্ত্র নিয়ে আমি কাজ করি, যা মানুষের সুনির্দিষ্ট দুর্বলতা থেকে সুবিধা নিতে পারে। এমন এক যন্ত্র, যা আমি মানুষের দিকে তীব্র আবেগের ঝড় তোলার উপযুক্ত করে ছুড়ে দিতে পারি, তাকে হাসাতে পারি, পারি ভয়ে কুঁকড়ে দিতে। তাকে খুশি করতে পারি, রূপকথায় বিশ্বাসী করে তুলতে পারি, তাকে ক্ষেপিয়ে পাগল করে ফেলতে পারি, তাকে আঘাত করতে পারি, আনন্দ দিতে পারি, গভীরভাবে নাড়াতে পারি কিংবা কেবলই তাকে তার শোয়ার ঘরে বিরক্তিভরা কয়েকটি হাই তুলতে সাহায্য করতে পারি। এভাবে আমি হয় ঠগবাজ হয়ে উঠি কিংবা হই দর্শক যেখানে পৌঁছতে চায়, সেখানে নিয়ে যাওয়া এক জাদুকর। এমন দুর্মূল্য, এমন নিখুঁত একটা যন্ত্রের মাধ্যমে আমি আমার জাদু দেখাই যে ইতিহাসের যেকোনো চরিত্র তাকে আপন করে পেতে চায়, চায় তার সাহায্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে।

আমার জীবনে সিনেমার আগমন একেবারেই শূন্য থেকে। বলা যায়, হুট করে কিংবা কথায় কথায়। উদ্দেশ্যবিহীন কিছু কথাবার্তা কিংবা উপযুক্ত কোনো পরিবেশের কারণে, তবে তা সত্যিকারের সিনেমার সঙ্গে একেবারেই সম্পর্কহীন। হতে পারে কোনো গানের ছন্দ থেকে, হতে পারে রাস্তার উপরে তির্যকভাবে পড়া কোনো আলোর ছটা থেকে। কখনো কাজের ফাঁকে থিয়েটারে বসে অদেখা কোনো চরিত্র নিয়ে কল্পনার অতীত কোনো দৃশ্য ভাবতে ভাবতে।

এ রকম অনুভূতি ১ সেকেন্ডের চেয়েও কম সময়ের জন্য আসে; এসেই আবার যত দ্রুত এসেছিল, তত দ্রুতই হারিয়ে যায়। তবে মনের উপরে অপূর্ব এক ছাপ ফেলে যায়, যেমনটা হয় সুন্দর কোনো স্বপ্ন থেকে জাগলে। এটা কেবল এক মানসিক অবস্থা, সত্যিকারের কোনো গল্প নয়। কিন্তু ও রকম একটা সাধারণ ছাপ থেকেই অসংখ্য দৃশ্যকল্পের সৃষ্টি হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ওই রঙিন দৃশ্যের অবতারণা হয় বর্ণবিহীন এক অর্ধচেতন অবস্থা থেকে। আমি যদি সেই দৃশ্যগুলো একের পর এক সাজাতে থাকি, খুব যত্ন করে সাজাই, তবে বিরাট এক সিনেমা তৈরি হয়ে যেতে পারে।

প্রাথমিক নিউক্লিয়াস নির্দিষ্ট কেনো আকার পাওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে, এদিক-ওদিকে যাতায়াত করতে করতে কোথাও ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। আবার কাঁপা কাঁপা চোখে সে চারপাশে তাকায়, নিজস্ব ছন্দে চলে ফেরে। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যে কারণে প্রতিটি সিনেমার একটি নির্দিষ্ট চেহারা থাকে। দৃশ্যগুলো তখন সেই চেহারা আর সেই ছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একের পর এক সেজে যায়। প্রথম সেই নিউক্লিয়াসের ধারা বজায় রেখে নিয়ম অনুযায়ী সেগুলো বড় দৃশ্যকল্পের অবতারণা করে।

এখন এই ভ্রূণের মধ্যে কি এতটা ক্ষমতা আছে যে, তা একটি সিনেমা হয়ে ওঠার যোগ্য, এ সিদ্ধান্তটা আমাকেই নিতে হয়। আর তখন আসে এক জটিল আর কঠিন চিন্তার পর্ব। ওই ছন্দ, আবেগ, পরিবেশ, দুশ্চিন্তা, ওই দৃশ্যকল্প, নির্দিষ্ট ধারা আর তার অনুভূতি কী করে শব্দ আর বাক্যে পরিণত করা যায়, কী করে তাকে প্রবহমান একটি কাহিনীর মাধ্যমে পর্দার উপরে ফুটিয়ে তোলা যায়, এটা প্রায়ই অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।

সংলাপ হলো একমাত্র জিনিস, যা যেভাবে বা যে ছন্দে ভাবা হয়েছিল, ঠিক একই ছন্দে বা আবেগে সিনেমায় ফুটিয়ে তোলা যেতে পারে। আবার সংলাপ অনেক সংবেদনশীল বিষয়ও, যার উপরে এক রকমের প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে। লিখিত সংলাপ হলো সুরের স্বরলিপির মতো, সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় দুর্বোধ্য। সেই সংলাপের সরলীকরণ এক রকমের কল্পনাশক্তি আর তীব্র অনুভূতি দাবি করে। এই বিষয়টি বেশির ভাগ অভিনেতার মধ্যে দেখতে পাওয়া যায় না। একজন কিছু সংলাপ লিখে ফেলতেই পারেন, কিন্তু সেগুলোকে ঠিক কী উপায়ে মুখে বলতে হবে, কী ছন্দে, কোন তালে বলা হবে, লাইনগুলোর মাঝখানে কোথায় কতটুকু থামতে হবে, এসব বাস্তব কারণেই তিনি লেখেন না। ততটা বিস্তারিত লিখে রাখলে সেই স্ক্রিপ্ট পড়া দুষ্কর হয়ে দাঁড়াবে। আমি আমার স্থান-কাল-পাত্রকে বোধগম্য আর সরল করে পেশ করতে চাই। কিন্তু সেটা নির্ভর করে চিত্রনাট্য লেখার চাতুর্য আর যে তা পড়বে, তার সংবেদনশীলতার উপরে। সমস্যা হলো, এই দুয়ের কোনোটাই আগে থেকে অনুমান করা যায় না।

কথা বলতে বলতে আমরা এখন এমন ধাপে উপস্থিত হয়েছি, যাকে বলে পূর্ণাঙ্গ রূপ। এক দৃশ্যের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে আরেক দৃশ্যের অবতারণা করা। এই তৃতীয় মাত্রাটি ছাড়া একটি সিনেমা বানানো মানে কেবলই বাতিল জিনিসের সৃষ্টি। সংগীতের স্বরলিপির মতো, ছন্দের ধারণার মতো এই ক্ষেত্রে এমন কোনো কিছু বলার নেই, যা থেকে এই পর্বে সঠিক কোনো ধারণা পাওয়া যাবে। আমার পক্ষে আসলেই অসম্ভব এমন কোনো ধারণা দেয়া যে, একটি সিনেমা শেষ পর্যন্ত কী করে বেঁচে থাকে এবং কী করে মানুষের অন্তরকে আলোড়িত করে।

সংগীতও একইভাবে কাজ করে। এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে শিল্পের সব শাখার মধ্যে কেবল সংগীতের সঙ্গেই সিনেমার গভীর সম্পর্ক আছে। দুটোই সরাসরি আমাদের আবেগকে ছুঁতে পারে, তবে তা বুদ্ধির সহায়তা নিয়ে করে না। আর সিনেমা হলো প্রধানত কেবল ছন্দ। ক্রমাগত বয়ে চলা দৃশ্যাবলির মধ্যে কেবল যাওয়া আর আসা। সেই ছোট্টবেলা থেকেই সংগীত আমার জীবনের প্রধান স্বস্তি আর শান্তির জায়গা। আর প্রায়ই আমি একটা সিনেমা বা একটা নাটককে সংগীতের মতো উপভোগ করি।

বই থেকে সিনেমা বানানো আমাদের বন্ধ করা উচিত। কারণ সিনেমা আর সাহিত্যের মধ্যে বড় একটা পার্থক্য আছে। সাহিত্যের যৌক্তিক কিছু মাত্রা, তার কাহিনী হয়ে ওঠার যোগ্যতা অনেক সময় দৃশ্যকল্পে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে না। আর তারপর সেই সমস্যা সিনেমাটির বিশেষ অংশের বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করে। এছাড়া কোনো সাহিত্যের ভাষাকে সিনেমার ভাষায় পরিণত করতে হলে অশেষ পরিশ্রমের প্রয়োজন। এ প্রক্রিয়ায় বহু জটিলতা পেরিয়ে বেশকিছু ছাড়ও দিতে হয়। যে পরিমাণ সময় ও কর্মক্ষমতা ব্যয় হয়, সেই পরিমাণ সফলতা খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায় কিংবা দেখা যায় সাহিত্যের সঙ্গে তুলনা করলে সিনেমাটি পুরোপুরিই ব্যর্থ।

চিত্রনাট্য লেখার সময়টা কঠিন কিন্তু খুব জরুরি। এটাই আমাকে আমার চিন্তার যৌক্তিকতা প্রমাণে বাধ্য করে। আমি কখনো দ্বিধার মধ্যে পড়ি— একদিকে আমি যা বলতে চাই, তা দৃশ্যের মাধ্যমে বলা সম্ভব কিনা আর অন্যদিকে যা বলতে চাই, তা সম্পূর্ণ স্পষ্টভাবে বলতে হবে। আমার মাথায় রাখতে হয় যে আমি কাজটা কেবল নিজের আনন্দের জন্য বা গুটিকতক মানুষের বিনোদনের জন্য করছি না, আমাকে সাধারণ মানুষের মন জয় করতে হবে। সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়টা বরাবর চিন্তায় রাখতে হয়। তবে এটা ঠিক যে কখনো আমি কেবল নিজের মনের তাড়নায় অদ্ভুত কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি। পরে দেখা যায় সাধারণ মানুষও আশ্চর্যজনকভাবে সবচেয়ে অবাস্তব বা অপ্রচলিত সেই দৃশ্যের ব্যাপারে সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।

সিনেমার দৃশ্য ধারণ যখন শুরু হয়, তখন কোনো না কোনোভাবে আমাদের দলের প্রত্যেকে নিজেদের যাবতীয় অমিল বা বোঝাপড়ার সমস্যা ভুলে এক লক্ষ্যে মিলে যাই, একজন আরেকজনের সঙ্গে তখন অদ্ভুত টান অনুভব করি। কাজের সুন্দর ফলাফলের উদ্দেশ্যে আমাদের সব মনোযোগ তখন একদিকে ধাবিত হয়। তবে এই করতে করতে নিজেদের মধ্যে কখনো ঝামেলা যে বাধে না, তা নয়। তখন নিয়মকানুন অনুযায়ী লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আদেশও লাগে। পরিচালক হিসেবে এটাই আমার প্রধান দায়িত্ব। অথবা এ পর্যন্ত আমার সম্পর্কে যেসব আজেবাজে কথা লেখা হয়েছে, এটা তারই ব্যাখ্যা।

এই পেশায় বেড়ে ওঠার পথে যারা আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাদের মধ্যে একজন হলেন আলফ খোয়েবারি, যিনি আমার প্রথম লেখা চিত্রনাট্য, টরমেন্ট পরিচালনা করেছেন। তার কাছে আমি অনেক কিছু শিখেছি, ঠিক যেমন প্রথম (অসফল) সিনেমা পরিচালনা শেষে শিখেছি (সিনেমা পরিচালক) লাউরেন মার্মস্টেটের কাছে। মার্মস্টেটের কাছে আমি এক অলঙ্ঘনীয় নিয়ম শিখেছি: তুমি তোমার কাজকে নির্লিপ্ত আর স্পষ্টভাবে বিচার করবে। তারপর কাটাছাঁটার ব্যাপারে নিজের কাজের উপরে নিজেই এক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এর পরে বলতে হয় (চিত্রনাট্যকার) হেরবার্ট গারিবিনুইয়াসের কথা। তিনি ছিলেন সেই অল্প কয়েকজন মানুষের একজন, যারা আমার চিত্রনাট্যের উপরে ভরসা করেছিলেন। চিত্রনাট্য নিয়ে আমি বরাবর সমস্যায় ভুগতাম। নাটকীয়তা, সংলাপ আর অভিব্যক্তিসমেত আমার চিত্রনাট্য হয়ে পড়ত নাটকের উপযোগী। তিনি আমাকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে যথেষ্ট উৎসাহ দিয়েছিলেন।

শেষে বলব আমার প্রযোজক, কারহল আনদেরস ডিমলিংয়ের কথা। সিনেমার লাভ-ক্ষতির হিসাবের চেয়েও সৃষ্টিশীল শিল্পীর কাজের সততাকে বেশি মূল্য দেয়ার মতো পাগলামো তার ছিল। তার অনুপ্রেরণায় আমি নিজেও কাজের প্রতি ততটুকু একাগ্র থাকতে পারি, আর এটাই আমাকে কাজ করতে সাহস জোগায়। তবে এই একাগ্রতা সুুইডেনের বাইরে কাজ না করার কারণও আমার। কাজের ব্যাপারে যখনই আমার স্বাধীনতাটুকু হারাব, আমি আর সিনেমা বানাব না। কারণ মেনে নেয়া বা মানিয়ে নেয়ার কোনো দক্ষতা আমার নেই। সিনেমা নির্মাণের জগতে আমার গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার একটাই কারণ, তা হলো আমি সৃষ্টির ব্যাপারে স্বাধীন এবং আপসহীন।

আজকের দিনে একজন পরিচালককে নিচে জাল বিছানো না থাকলেও টাঙানো দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটতে হয়। তিনি একজন জাদুকর হতেই পারেন। কিন্তু মানুষ যদি সিনেমা হলে সিনেমাটি দেখতে না যায় আর প্রযোজক, ব্যাংক বা সিনেমা হলের মালিকের লগ্নির ব্যাপারে মাথা না ঘামায়, তবে প্রযোজক বা ব্যাংক বা সিনেমা হলের মালিককে কেউ জাদু দিয়ে ঠাণ্ডা করতে পারে না। জাদুকরের হাতে তখন হয়তো একটা জাদুর লাঠির অভাব হয়ে পড়ে। অস্বাভাবিক সৃষ্টিশীল সিনেমা জগতে ক্রমাগত সমধর্মী সিনেমা উৎপাদনের কারণে কী পরিমাণ বুদ্ধিমত্তা, চাতুর্য আর সৃষ্টিশীলতার অপচয় হচ্ছে, তা মাঝেমধ্যে আমার হিসাব করতে ইচ্ছা করে। একদিন আমার কাছে যা কেবলই মজা ছিল, আজ সেটাই সংগ্রাম। ব্যর্থতা, সমালোচনা, দর্শকের মুখ ফিরিয়ে নেয়া, সবকিছুই আজকে আগের দিনের চেয়ে অনেক বেশি আঘাত করে। এই সিনেমাজগতের মুখোশ খসে গিয়ে তার নিষ্ঠুরতা আমি দেখে ফেলেছি আর সেটা ভালোমতো দেখতে পেয়ে লাভই হয়েছে আমার।

মানুষ জানতে চায় সিনেমা নিয়ে আমার ভবিষ্যৎ চিন্তাভাবনা কী, কিংবা আমার লক্ষ্য কী। এটা একদিকে যেমন কঠিন, অন্যদিকে বিপজ্জনক প্রশ্ন। আর আমি নানা ছলে প্রশ্নটা এড়িয়ে যাই। কখনো মানুষের অবস্থানের কথা বলি, মানুষের অবস্থানকে আমার চোখে আমি যেমন দেখি, তা তুলে ধরার কথা বলি। আমার উত্তর প্রায় প্রত্যেককেই তৃপ্ত করে। কিন্তু এটা ঠিক নয়। মনে হয় আমার সত্যিকারের লক্ষ্য বর্ণনা করতে পারলে বেশ হতো।

সাঁখ্ত গির্জা নিয়ে প্রাচীন একটা গল্প আছে। গল্পটি হলো কী করে গির্জাটিতে বজ্রপাতের কারণে আগুন লেগে যায় আর তা পুড়ে মাটিতে মিশে যায়। কিন্তু তার ঠিক পরপর গির্জার চারদিক থেকে হাজার হাজার মানুষ পিঁপড়ার সারির মতো ছুটে আসে। ভাঙাচোরা ইমারতের জায়গাতেই তারা আবার গির্জা বানানো শুরু করে। ইমারতটি সম্পূর্ণভাবে তৈরি না হওয়া পর্যন্ত তারা লাগাতার কাজ করতে থাকে। তাদের মধ্যে ছিলেন বাড়ি বানানোতে সিদ্ধহস্ত, শিল্পী, শ্রমিক, জোকার, বিখ্যাত মানুষ, ধর্মযাজক আর শহরের সাধারণ মানুষ। কিন্তু তারা চিরকালের জন্য অপরিচিত থেকে গেলেন। আর তাই আজকের দিনে কেউ জানে না যে সাঁখ্ত গির্জা সত্যিকার অর্থে কে বা কারা নতুন করে নির্মাণ করেছিলেন।

আমার নিজস্ব বিশ্বাস বা অনুমানের কথা যদি বাদও দিই, যেটা আসলে এই বিষয়ে বলতে যাওয়ার জন্য তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়, আমার মত এই যে শিল্পকে যেই মুহূর্তে ধ্যান বা পূজা থেকে পৃথক করে ফেলা হয়, শিল্প তখনই তার সৃষ্টির প্রবাহ থেকে সরে যায়। একটা জীবন ভ্রূণ থেকে শুরু হয়ে একসময় জীবাণু থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নিজস্ব বৃদ্ধির দিকে যেতে থাকে। তারপর তা থেকে আরো নতুন জীবনের উত্পত্তি হয়, তা থেকে আরো। প্রাচীনকালে শিল্পের স্রষ্টা থাকতেন আড়ালে আর তার কাজ হয়ে উঠত সৃষ্টিকর্তার মহিমা। শিল্পের স্রষ্টা বেঁচে থাকতেও বা মৃত্যুর পরে অন্য যেকোনো শিল্পস্রষ্টার চেয়ে বেশি অথবা কম মনোযোগ না পেয়েও অমর হতেন। তার সৃষ্টি হয়ে উঠত অসীম কালের। সত্যি কথা বলতে কি ‘সেরা সৃষ্টি’ বলে তখন কিছু ছিল না। কিছু সৃষ্টি করতে পারার ক্ষমতাকেই বিধাতার দান হিসেবে ধরে নেয়া হতো।

আজকের দিনে মানুষ সৃষ্টির সর্বোচ্চ উত্কর্ষতার মধ্যে বসবাস করছে, সঙ্গে সঙ্গে অর্জন করেছে সৃষ্টির সবচেয়ে কঠিন বিষ। আজ মানুষের ব্যক্তিত্বের উপরে সামান্যতম আঘাত বা অপমানও মাইক্রোস্কোপের নিচে ফেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, যেন অসীম কালের নিরিখে ওই সামান্য অবহেলারও কোনো গুরুত্ব আছে। এখন একজন শিল্পী তার একাকিত্ব, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য আর আত্মনিষ্ঠাকে ধর্মীয় পবিত্রতার মতো মনে করেন। আর এভাবেই আজ আমরা একটি বড় ছাতার নিচে জড়ো হয়েছি, যেখানে দাঁড়িয়ে নিজেদের একাকিত্বের কথা ভেড়ার মতো ব্যা ব্যা করে বলতে থাকি। বলার সময়ে আমরা একজন আরেকজনের কথা শুনি না, বুঝতেও পারি না যে এভাবে মৃত্যু পর্যন্ত আমরা একে অন্যকে ক্রমাগত অবদমন করছি। ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদীরা একে অন্যের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকেন, তবু কেউ কারো অস্তিত্ব স্বীকার করেন না। নিজস্ব উদ্বেগে বিভোর হয়ে নিজের বৃত্তে আমরা এমনই পাক থেকে থাকি যে, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য ধরতে পারি না, বুঝতে পারি না অসত্যের খেয়াল আর বিশুদ্ধের আদর্শের ফারাক।

তাই এখন কেউ যদি জানতে চান যে আমার সিনেমা বানানোর উদ্দেশ্য কী, আমি উত্তর দেব, আমি সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত ভূমির উপরে গির্জা নির্মাণের একজন শিল্পী হতে চাই। পাথরে খোদাই করে আমি একটা ড্রাগনের মাথা কি কোনো ফেরেশতা বা একটা শয়তান কিংবা কোনো সাধু ঋষি তৈরি করতে চাই। কোন মূর্তি বানাব তাতে কিছু যায় আসে না, সৃষ্টির তৃপ্তি আমাকে ঘিরে থাকবে। আমি বিশ্বাসী কিনা, তা আমার মাথায় আসবে না, আমি খ্রিস্টান কিনা, তা নিয়ে ভাবব না, কেবল সমবেত প্রচেষ্টায় নির্মাণাধীন গির্জায় আমি আমার সৃষ্টির সুচারু ছাপ রেখে যেতে চাই।