অনুবাদ: এম এ মোমেন
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী তখন লন্ডনে। ভারতযাত্রার আগে চার্লস পেট্রাশ ভারতীয় এ নেতার একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিলেন। চার্লস বলেছেন, প্রশ্নগুলো আমার ভারতীয় বন্ধুদের নিয়ে তৈরি করেছি। ১৯৩২-এর এপ্রিলে ‘দ্য লেবার মান্থলি’-তে এটি প্রকাশিত হয়।
প্রশ্ন: আপনার মতে ভারতীয় প্রিন্স, জমিদার, শিল্পপতি ও ব্যাংকাররা কোন পদ্ধতিতে তাদের সম্পদ অর্জন করেছেন?
গান্ধী: এখন তো জনগণকে শোষণের মাধ্যমে।
প্রশ্ন: ভারতীয় শ্রমিক ও কৃষকদের শোষণ না করে তারা কি ধনবান হতে পারতেন?
গান্ধী: হ্যাঁ, একটি পর্যায় পর্যন্ত পারতেন।
প্রশ্ন: সাধারণ শ্রমিক ও কৃষকের শ্রম থেকে যারা সম্পদ তুলে নেন, তাদের কি শ্রমিক-কৃষকের চেয়ে উন্নততর জীবনযাপনের কোনো সামাজিক অধিকার আছে?
গান্ধী কিছু সময় নীরব রইলেন। তারপর বললেন, ‘কোনো অধিকার নেই। আমার সামাজিক তত্ত্বটি হচ্ছে, যদিও আমরা সমান হিসেবেই জন্মগ্রহণ করি এবং সমান সুযোগ দাবির অধিকার আমাদের রয়েছে, কিন্তু আমাদের সবার একই ধরনের সক্ষমতা নেই। প্রাকৃতিক কারণেই এটা অসম্ভব যে আমরা একই আকারের হব, গায়ের রঙ একই হবে, একই রকম বুদ্ধি ধারণ করব; কাজেই এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার যে পার্থিব সম্পদ অর্জনের প্রশ্নে কেউ কেউ অন্যদের চেয়ে অধিকতর যোগ্য হবেন। যারা অধিক অধিক অর্জন করতে সক্ষম, তারা তাদের সক্ষমতা সে পথে চালিত করবেন। তারা যদি আত্মার ডাক শোনেন, তাহলে তারা মানুষের মঙ্গলের জন্য সক্ষমতা কাজে লাগাবেন। তারা কেবল ‘ট্রাস্টি’র বেশি কিছু নন।
মেধাবী মানুষকে আমি আরো অর্জন করতে দেব, তার সামর্থ্য প্রয়োগে বাধা দেব না। তবে তার উৎপাদনের যে উদ্বৃত্ত, তা অবশ্যই জনগণের কাছে ফিরে যাবে— শিশুদের আয় যেমন করে পরিবারের যৌথ তহবিলে যায়। তারা কেবল তাদের অর্জনের ট্রাস্টি। আমাকে হয়তো এ প্রত্যাশায় ভীষণ হতাশ হতে হবে। কিন্তু এ আদর্শই আমি তুলে ধরছি— মৌলিক অধিকারের ঘোষণায় সে কথাই বলা হয়েছে।
প্রশ্ন: বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের জন্য আপনি কি উচ্চতর মজুরি দাবি করবেন?
গান্ধী: একটি আদর্শ রাষ্ট্রে বুদ্ধির জন্য কেউ উচ্চতর মজুরি চাইতে পারেন না। যিনি বেশি অর্জন করবেন, তাকে তা সমাজের স্বার্থে ব্যয় করতে হবে।
আমরা গান্ধীকে বললাম, ভারতে কৃষক ও শ্রমিকদের দারিদ্র্যের কারণ তাদের শ্রমের ফসল জমিদার ও মূলধনদাতা তুলে নেন; সরকারের কাছে যায় অতি সামান্য। তিনি এর সঙ্গে সহমত পোষণ করেন কিনা, জিজ্ঞেস করলে তিনি তা স্বীকার করেন।
প্রশ্ন: সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য এবং নিজেদের ঘাড় থেকে পরজীবী শ্রেণীকে টিকিয়ে রাখার বোঝা নামানোর জন্য ভারতীয় কৃষক ও শ্রমিকরা যে শ্রেণীসংগ্রামে লিপ্ত হয়েছেন, আপনি কি মনে করেন তারা ঠিক কাজটি করেছেন?
গান্ধী: আমি নিজেই তাদের জন্য অহিংস আন্দোলনের পথ করে দিয়েছি।
প্রশ্ন: প্রিন্স, জমিদার, পুঁজিপতি ও তাদের দোসর এবং ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে তাদের বিপ্লবকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
স্বাধীন ভারতে, প্রোটেক্টোরেটের অধীন ভারতে, ডোমিনিয়ন মর্যাদার কিংবা যেকোনো পরিস্থিতির ভারতে তাদের বিপ্লবকে আপনি কীভাবে গ্রহণ করবেন?
গান্ধী: আমার দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে সমাজের সচ্ছল শ্রেণীর যে সম্পদ এখনই রয়েছে, তাদের এর ট্রাস্টিতে রূপান্তর করা। তার মানে তাদের হাতে টাকা থাকবে, আর যারা তাদের এ টাকা আয় করে দিচ্ছেন, তাদের কল্যাণে ব্যয় করা হবে। আর এজন্য তারা একটি ‘কমিশন’ পাবেন।
প্রশ্ন: আপনি এ ‘ট্রাস্টিশিপ’ কেমন করে গঠন করবেন? তাদের প্রণোদিত করে?
গান্ধী: কেবল মুখের প্রণোদনায় হবে না। আমাকে বলা হয়েছে ‘এ কালের শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী।’ এটা সম্ভবত সঠিক নয়। তবে আমি বিশ্বাস করি, আমি একজন অহিংস বিপ্লবী। আমার অস্ত্র হচ্ছে অসহযোগিতা। স্বেচ্ছায় হোক কি বলপূর্বক আদায় করে হোক, কেউই জনগণের সহযোগিতা ছাড়া লাভবান হতে পারবেন না।
এখন আমাদের একটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন: আপনি কি সাধারণ ধর্মঘটকে সমর্থন করবেন?
গান্ধী: সাধারণ ধর্মঘট এক ধরনের অসহযোগিতা। ধর্মঘটকে সহিংস হতে হবে এমন নয়। যদি শান্তিপূর্ণ হয় এবং সব দিক থেকে যুক্তিযুক্ত মনে হয়, আমি এ ধরনের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে সম্মত। নিরুৎসাহিত করা নয়, আমি বরং এ ধরনের আন্দোলনকে উৎসাহিত করব।
আমরা তাকে বলি, তিনি কেমন করে ‘ট্রাস্টি’ পদ্ধতি চালু করবেন, কেমন করেই বা ট্রাস্টিকে কমিশন দেবেন, তা আমাদের কাছে খুব স্পষ্ট নয়।
গান্ধী: তাদের ‘কমিশন’ লাভের অধিকার আছে, কারণ টাকাটা তাদের কাছে। কেউ তাদের ট্রাস্টি হতে বাধ্য করছেন না। ট্রাস্টি হতে আমি তাদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমি সম্পদের সব মালিককে ট্রাস্টি হওয়ার আমন্ত্রণ জানাই, কিন্তু তার কারণ এই নয় যে তারা সম্পদের মালিক; বরং জনগণকে শোষণ করে তারা মালিক হয়েছেন বলেই আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। তবে কমিশন কী হবে তা ঠিক করিনি। তাদের কত পাওয়া উচিত, নিজেরাই হিসাব করে আমাকে জানাবেন। যেমন ধরুন, যার ১০০ টাকা আছে, আমি তাকে বলব ৫০ টাকা রেখে ৫০ টাকা জগণকে দিয়ে দিন। কিন্তু যার ১০ মিলিয়ন টাকা আছে, তাকে বলব শতকরা এক ভাগ রেখে বাকিটা দিয়ে দিতে। কাজেই কমিশন কোনো সুনির্দিষ্ট অংকের হবে না, তাহলে বড় ধরনের অবিচার হবে।
আমরা তার কথা বুঝতে পারলেও তার পরিকল্পনাকে কোনো আদর্শবাদীর মতিবিভ্রমের চেয়ে বেশি কিছু মনে করিনি। তিনি তখনো ‘ন্যায়বিচার’-এর ওপর আস্থাশীল। আমরা তার কথা শুনে হতবাক হই এবং আবার সাক্ষাৎকার চালিয়ে যাওয়ার আগে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তারপর জিজ্ঞেস করলাম:
মহারাজা আর জমিদাররা তো ইংরেজদের সঙ্গে মৈত্রী করে নিয়েছেন, আর আপনি তাদের ‘ট্রাস্টি’ বানাতে চাইছেন। কিন্তু আপনার সর্বোত্তম অনুসারী সাধারণ জনগণ তো মহারাজা ও জমিদারদের শত্রু মনে করে। জনগণ যদি ক্ষমতায় আসে এবং এসব শ্রেণীর অবসান ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তখন আপনার অভিমত কী হবে?
মহাত্মা আমাদের প্রশ্নের জবাব দিলেন, তার শুরুর দিককার কথাগুলো শ্রমিক শ্রেণীভুক্ত ভারতীয় সহযোগীরা— যারা ভারতের পরিস্থিতি অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে জানেন— বললেন গান্ধীর কথা মোটেও যথার্থ নয়।
গান্ধী: বর্তমানে জনগণ জমিদার ও প্রিন্সদের শত্রু মনে করছে না। তবে তারা জনগণের ওপর যে অবিচার করেছেন, সে সম্পর্কে তাদের সচেতন করা দরকার। পুঁজিপতিদের শত্রু ভাবার শিক্ষা আমি জনগণকে দিই না; বরং তাদের বলি পুঁজিপতিরা নিজেদেরই ক্ষতি করে চলেছেন। আমার অনুসারীরা কখনো জনগণকে বলেনি যে ইংরেজ কিংবা জেনারেল ডায়ার খারাপ; বরং তারা তাদের পদ্ধতির ভিকটিম। সে পদ্ধতিকে ধ্বংস করা দরকার, ব্যক্তিকে নয়। সে কারণেই ব্রিটিশ কর্মকর্তারা দণ্ডমুক্ত থেকে জনগণের সঙ্গে থাকতে পারছে, যদিও জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এখন জ্বলে উঠেছে।
প্রশ্ন: আপনি যদি পদ্ধতিতে আক্রমণ করতে চান, তাহলে বলতে হবে ব্রিটিশ পুঁজিপতি ও ভারতীয় পুুঁজিপতির মধ্যে কোনো তফাত নেই। তাহলে আপনার জমিদারদের খাজনা বন্ধ করে দেয়ার পদ্ধতিটি চালু করছেন না কেন?
গান্ধী: জমিদার তো পদ্ধতির একটি হাতিয়ার মাত্র। ইংলিশ সিস্টেমের সঙ্গে একই সঙ্গে দেশীয় জমিদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করার প্রয়োজন নেই। দুটোর মধ্যে তফাত করা সম্ভব। আমরা জনগণকে বলে দিয়েছি যে জমিদারকে টাকা দেয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ এ টাকাটাই সরকার পেয়ে থাকে। জমিদারদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো।
আমরা গান্ধীর সঙ্গে যোগ দিয়ে বেচারা জমিদারদের নিয়তির প্রতি করুণা বর্ষণ করতে পারি, তাহলে বেচারা ইংলিশদের ব্যাপারেও আমাদের একই কাজ করার কথা; কিন্তু ইংরেজদের বেলায় গান্ধীর ন্যায়বিচারের অনুভূতি বিরাজমান বলে মনে হয় না। এ তত্ত্ব অনুযায়ী কেবল নিজ দেশের পুঁজিপতিকে ভালোবাসা যায়।
প্রশ্ন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বার্নার্ড শ এবং অন্যদের মতে, রাশিয়ায় জমিদার, পুঁজিপতি ও অর্থলগ্নিকারীদের অবদমনের সরকার পদ্ধতি হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠা খুব অল্প সময়েই জনগণের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটিয়েছে। ফিরে দেখলে বিপ্লবের সময় রাশিয়া ছিল কৃষিনির্ভর দেশ, এখন ভারতের যে অবস্থা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তা রাশিয়ারই মতন। এ বিষয়ে আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
মহাত্মা দক্ষতার সঙ্গে প্রশ্নটি এড়িয়ে গেলেন।
গান্ধী: প্রথমত অন্যের মতামতের ওপর ভিত্তি করে আমাকে মত প্রকাশ করতে হবে বলে আমি মনে করি না। সে কারণে রাশিয়ার অবস্থা নিয়ে আমি মূল্যায়ন করতে পারছি না। তার ওপর সোভিয়েত নেতারা নিজেরাই যা বলেছেন, বল প্রয়োগ করে সোভিয়েত পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে— সেক্ষেত্রে এটা চূড়ান্তভাবে সফল হবে কিনা, এ নিয়ে আমার ঘোরতর সন্দেহ রয়েছে।
প্রশ্ন: কৃষক ও শ্রমিকদের নিজেদের নিয়তি নির্ধারণের চূড়ান্ত ক্ষমতা তাদের হাতে তুলে দিতে আপনি কী কর্মসূচি নিয়েছেন?
গান্ধী: আমার কর্মসূচি কংগ্রেসকে বিস্তারিতভাবে জানিয়েছি। ... এতে অন্যায় ও শোষণ প্রতিরোধ করতে তাদের অভূতপূর্ব জাগরণ ঘটবে।
আমরা জানি গান্ধী যন্ত্রের শত্রু। প্রশ্নটা এভাবে সাজালাম:
যন্ত্র বলতে আপনি কী বোঝেন? চরকা কি যন্ত্র নয়? যন্ত্রের মধ্যেই কি শোষণ অন্তর্নিহিত, নাকি মারণযন্ত্রের ব্যবহার পদ্ধতি একে শোষণের হাতিয়ারে পরিণত করে?
গান্ধী: চরকা এবং এ ধরনের হাতিয়ার অবশ্যই যন্ত্র— এখান থেকেই মেশিন সম্পর্কে আমার সংজ্ঞা বের করে নিতে পারেন। আমি বলতে চাই, মেশিন পদ্ধতির অপব্যবহারই বিশ্বজুড়ে শ্রমিকশ্রেণীর শোষণের জন্য দায়ী।
প্রশ্ন: আপনি জনগণকে শোষণ করা বন্ধ করার কথা বলেছেন, তার মানে দাঁড়ায় পুঁজিতন্ত্রের বিলোপ। আপনি কি পুঁজিতন্ত্রকে দমন করতে চান? তাহলে পুঁজিপতিদের অতিরিক্ত সম্পদ থেকে বঞ্চিত করতে আপনি কি প্রস্তুত রয়েছেন, যাতে তারা নতুন একটি পুঁজিতান্ত্রিক উদ্যোগ গ্রহণে বাধাপ্রাপ্ত হয়?
গান্ধী বিষণ্ন হাসি দিয়ে জবাব দিলেন।
—আমি যদি ক্ষমতায় আসি তাহলে অবশ্যই পুঁজিতন্ত্রের বিলোপ ঘটাব, কিন্তু পুঁজি বিলুপ্ত করব না। এখান থেকে ধরা যায়, আমি পুঁজিপতিদের বিলুপ্ত করব না। আমি এটা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছি যে মূলধন ও শ্রমের সুষ্ঠু সমন্বয় ঘটানো সম্ভব। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমি তা বাস্তবায়ন হতে দেখেছি। একটাতে তা সত্য হলে সবগুলোর ক্ষেত্রেই সত্য হবে। আমি পুঁজিকে মন্দ ভাবি না; মেশিন সিস্টেমকে যেমন মন্দ মনে করি, তার চেয়ে বেশি কিছু নয়।
তারপর আমরা ধর্মীয় বিষয়ের দিকে গেলাম এবং গান্ধীকে বললাম, হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের মধ্যে একটা সমস্যা রয়ে গেছে। তিনি তা সুনির্দিষ্টভাবেই স্বীকার করে নিলেন। আমরা জানতে চাইলাম, এটা কি জনগণের জন্য বড় কোনো সমস্যা? যদি তাই হয়, এর সুরাহা কেমন করে হবে বলে তিনি মনে করেন— রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিতে হবে, নাকি সমঝোতা করতে হবে?
গান্ধী: আমি মনে করি না জনগণের কাছে এটা খুব বড় মাত্রার কোনো সমস্যা। রাজনৈতিক পদক্ষেপে এর সমাধান হবে না; সমঝোতার মাধ্যমে তা করতে হবে। যতক্ষণ না জীবনের মৌল নীতিকে স্পর্শ করছে, সমঝোতাই জীবনের নির্যাস।
প্রশ্ন: ফেডারেল ভারতে প্রিন্সদের স্বায়ত্তশাসিত শাসনকর্তা হিসেবে রেখে দেয়ার পর প্রজারা যদি ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ার জনগণের মতো মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার দাবি করে, জন-আইন অমান্যতার আশ্রয় নেয়, তাদের দাবি পূরণ করতে গণঅভ্যুত্থান ঘটে, তাহলে কি অভ্যুত্থান চাপা দিতে প্রিন্সদের সাহায্য করার জন্য ফেডারেল বাহিনী পাঠাবেন? এক্ষেত্রে আপনার কী মনোভাব?
গান্ধী: আমার যদি ক্ষমতা থাকে, যেমন করে যেভাবেই হোক গণঅভ্যুত্থান চাপা দিয়ে আমি কখনো সে ক্ষমতার ব্যবহার করব না। আমি মনে করি, জন-আইন অমান্য আন্দোলন মানবসত্তার স্থায়ী বিধান; যা সম্পূর্ণভাবে সহিংসতার স্থান দখল করে নেয়। সহিংসতা জন্তুর আইন।
প্রশ্ন: এটা কি সত্য, জনগণের সে আন্দোলন থেকে আপনি সমর্থন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন যে আন্দোলনে জনগণ প্রিন্সদের কাছ থেকে সেই অধিকার চায়, যে অধিকার ব্রিটিশ ভারতে আপনি চান ব্রিটিশের কাছ থেকে?
বিস্মিত হয়ে গান্ধী আমাদের দিকে তাকান এবং জানান, রিপোর্টটি মিথ্যে।
আমরা তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তার মতে ‘স্বাধীনতা’ ও ‘সাম্রাজ্য বিষয়ে সহযোগিতার সমতা’র মধ্যে পার্থক্য কী? এ প্রশ্নে তিনি বলেন, দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে আবার নেইও। একটি সাম্রাজ্যের দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ভালোভাবে সাম্রাজ্য বিষয় প্রশ্নে অংশীদার হতে পারে। তবে স্পষ্টতই ভারতের পরিস্থিতি ভিন্ন। ভারত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে একটি রাষ্ট্র, যদি রাষ্ট্রগুলোর সংঘ থাকতে হয়, সমতার প্রশ্নে ভারত ও ব্রিটেনকে সমান শক্তির ওপর দাঁড়াতে হবে, সাম্রাজ্যের অবসান ঘটবে।
আমরা প্রতিবাদ করলাম, তিনি সাম্রাজ্যের ভেতর যে ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ইকুয়ালিটি’র কথা বলেছেন, লাহোর কংগ্রেসে তা উচ্চারিত হয়নি।
গান্ধী: কংগ্রেসে তা বলে লাভ নেই, বিভিন্ন ভাষণে এ ধারণা দেয়া হয়েছে।
প্রশ্ন: আপনার এ অ্যাসোসিয়েশন অব ইকুয়ালিটির ধারণা কি ভাইসরয় প্রত্যাহারের কথা বলে?
গান্ধী: সাম্রাজ্যের ধারণাটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে কিন্তু ‘রয়্যালটি’ সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হবে কিনা, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা আমার পক্ষে অসম্ভব। গ্রেট বিটেনের রাজা আর ভারতের রাজা থাকবেন না, এ সময় আমি এ কথা বলতে অপারগ।
প্রশ্ন: ভারতের তরুণরা বিশ্বাস করেছেন একটি স্বাধীন ভারতের জন্য লড়াই করা হচ্ছে, যেখানে কোনো রাজা থাকবে না। লাহোর কংগ্রেসে স্বাধীনতা ঘোষণার পর কলকাতায় আবার সমঝোতার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এখন ব্রিটিশ রয়্যালটি রয়ে যাবে— এ কথা তরুণদের বলা কি বাজে রাজনীতি নয়?
গান্ধী অবিচলিত থেকে বললেন, অবিশ্বাস ও সন্দেহের কোনো কারণ নেই। এ প্রশ্ন যদি তাকে করাচিতে জিজ্ঞেস করা হতো, একই উত্তর দিতেন।
প্রশ্ন: বেশ তাহলে আপনার সঙ্গে লাহোর কংগ্রেসের বিরোধিতাকারী মালব্যের তফাত কোথায়?
গান্ধী: পার্থক্য হচ্ছে মালব্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে একটি সুযোগ দিতে চাইছেন, আমি চাইছি না।
(পণ্ডিত মদন মোহন মালব্য বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন, দুবার ভারতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছেন। তিনিও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একজন বরেণ্য নেতা)
প্রশ্ন: আপনি কি কিং জর্জ এবং তার পূর্বসূরিদের ভারতে জবরদখলকারী বিবেচনা করেন?
গান্ধী: আমি মানি কিং জর্জ ও গ্রেট ব্রিটেন ভারতে জবরদখলকারী।
আমরা তারপর তাকে জিজ্ঞেস করলাম, যে দেশ শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, সেই দেশ কি দুর্বল জাতিকে শোষণ করে গড়ে ওঠা সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে থাকতে পারে?
গান্ধী: এটা অসম্ভব। ভারতে ব্রিটিশ সরকার অবলুপ্তির জন্য আমি আমার একান্ত সমর্থন দিয়ে যাব। তেমনি দেব ধনতান্ত্রিক পদ্ধতি অবলুপ্ত করতে, তবে পুঁজি ও পুঁজিপতিদের হটিয়ে দিতে নয়। দুর্বল জাতিগুলোকে শোষণ করা যদি বন্ধ না করে, আমরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে সহযোগিতা করতে অস্বীকার করব। সাম্রাজ্যবাদী শোষণ অবশ্যই শেষ হতে হবে। সহযোগিতা হতে হবে ঐচ্ছিক, প্রয়োজনে অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে সম্পর্কচ্যুতির স্বাধীনতা ভারতের থাকবে।
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী শক্তি, দ্বিধা, দ্বৈধতা এবং উপমহাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে তার ভূমিকা অনেকখানি স্পষ্ট করে তোলেন।






