‘বাইরের পাপড়িরা পোড়ায় ভেতরের পাপড়িদের
বিজয় ফাটার শব্দ ধরে ধরে আমরা আগাই
শব্দরাই তৈরি করে সূর্যমুখীদের বিষদ বিস্তার
বিষদে যেতে যেতে ভিনসেন্ট ভাঙে ফুলদানির নিষাদে’
—চয়ন খায়রুল হাবিব
গঘের শিল্পসাধনাকে ব্যক্তিসমগ্র থেকে আলাদা করে দেখলে ভুল হবে। ১৮৯২ সালেই শিল্পীর মৃত্যুর দুই বছরের মধ্যে নেদারল্যান্ডসের শিল্পী রিশার্ড এন রোলান্ড হলসট এ মর্মে ভ্যান গঘভক্তদের সতর্কবার্তা দিতে চেয়েছিলেন যে ‘এখানে আমরা সেই দুটি বিপজ্জনক শিখর দেখতে পাচ্ছি, যাদের কিনারে ঠোক্কর খেয়ে ভ্যান গঘ বিষয়ে যথার্থ মূল্যায়ন বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে। আর সত্যিই তো, এ দুটি শিখর অনেক লেখকের স্বকপোলকল্পনা, যারা তার শিল্পের পরিগ্রহণ, তার ব্যক্তিপ্রকৃতির সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছেন, তার উত্তাল সত্তা ও তজ্জনিত ফলাফলের সঙ্গে তাকে একাকার করেই দেখেছেন। ফলত ভ্যান গঘের প্রণীত শিল্প তার জীবনের বিষাদ নাট্যের দৃষ্টান্ত বলে প্রতিপন্ন হয়েছে। এমনকি অবিশেষজ্ঞের কাছেও পুরো ব্যাপারটা হয়ে উঠেছে অপ্রকৃতিস্থ একজন মানুষের রোগনিদানের অভিজ্ঞান।’ ১
অদ্যাবধি নিয়তি বিধায়ক সমালোচকদের ব্যবহারিক নিরিখে ভিনসেন্টকে মূলত উন্মার্গগামী বলে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তার শিল্পকর্মকে সেই উেকন্দ্রিকতারই অপরূপ প্রতিন্যাস হিসেবে দেখানোর উৎসাহে এতটুকু ভাটা পড়েনি। এভাবেই চিত্রকলা ইতিহাসের দুর্জয় এ স্রষ্টাকে নিয়ে ইতিহাসের একেকটি ভ্রান্ত-অভ্রান্ত বিচ্ছিন্ন মোজেইক জড়ো করে মিথ বা কিংবদন্তি মথিত করেছে।
আমাদের বোধশক্তির অসীম সম্ভাবনাময় মহাবিশ্বের কোন দ্রাঘিমায় অধ্যুষিত ভিনসেন্ট এর মিস্টিকপনা? তার জীবনে বিদারক নিঃসঙ্গ একক যাত্রার উত্তর পথের বাঁকে বাঁকে তৈরি হয়েছে আলেখ্য সিরিজ, যা তিনি মমতাভরে এঁকে তুলেছেন। এ যাত্রার একেকটি মোড় পেরোনো তাত্পর্য খারিজ করে অবিনশ্বর সে সময় ও তার সৃজন স্রষ্টাকে বুঝতে পারার চেষ্টা ষোলআনা পণ্ডশ্রম হতে বাধ্য। কার্যত মানুষ-শিল্প-স্রষ্টা এ তিন আয়ুধের কোনো একটিকে খারিজ করা মানে সমগ্র ভিনসেন্ট খারিজ হয়ে যায়। ফলে এসব বোঝাবুঝির মাঝখানটায় কোনো তালগোল পাকানো অনুমান তথা প্রথাবাহিত ক্লিশেগুলোর অস্বস্তিকর অধিষ্ঠান ভ্রান্ত মোজেইকের স্ফারিত ফাটলটাকেই দেখিয়ে দেয়, অবান্তর অপলাপের আলাপ ঘটে।
শিল্পসংবেদন নিয়ে শিল্পসাধনার অনুপুঙ্খ শিলান্যাস করলে মিথ কিংবদন্তির রাজ্য পেরিয়ে আমরা জড়ো হতে পারি শিল্প রেওয়াজের সেই দিনানুদৈনিকতায়, যা কিনা ভিনসেন্টকে নিয়ে গিয়েছে অর্জিত চরিতার্থতার দিকে। আরাধ্য দুরূহ ব্রত ঘিরে বিস্তার অমোঘ বিচক্ষণ শিল্পবুদ্ধির প্রকটতা, স্বপ্ন প্রয়াণের সাধ সিদ্ধির। সেখানে সাধারণ্যের উপাদেয় আরোপিত কিংবদন্তি, রহস্য মহিমা, যখন অনেক বেশি আলোচিত তখন ব্যক্তি ভিনসেন্টের অস্বস্তিকর অধিষ্ঠান হয়। অথচ বিপরীতে আমাদের বোধশক্তির অসীম সম্ভাবনাময় মহাবিশ্বের শিল্প সংস্কারকের যুগ অন্বিষ্ট বৈপ্লবিক প্রবর্তনা হিসেবে আবির্ভূত হন।
বিরল প্রজাতির শিল্পী, যিনি নিজ আচরিত শিল্পধর্মের অনুসারী ও স্বকীয় ধারণাসঞ্জাত অভিনিবেশেই নিজস্বতার বয়ান হাজির করেছেন, যা শিল্পীর একান্ত সহজাত ও মজ্জাগত স্ববিরোধের সৌন্দর্যেও দীপ্যমান। তার স্বভাবের এ চোরাটানেই তাকে নিয়ে আলোচনার সব প্রসঙ্গপরিধি আভাসিত হয়ে আছে। সে আভাসেই ধ্যানীর সঙ্গে বীক্ষা ও বীক্ষণ ঠাহর করা সহজতর।
‘সেই বুঝি সত্তার ভেতর জুড়ে পবনবিরতি
কালো ডিঙি বেয়ে গেল উজ্জ্বল স্মৃতির ভাটিটানে’ ২
আমরা কবুল করি, এই দীর্ঘ বেঁচে থাকা, মরণ একটি অনির্দেশ্য মহত্বের দ্বারা আক্রান্ত। মৃত্যুর ঢাকনা সরিয়ে যেন নগ্ন হাতে ছুঁয়ে থাকেন স্বয়ং ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ। যন্ত্রণার সমাচার কখনই তিনি চিৎকার করে শোনাননি। এমনকি অস্তিত্বের উন্মত্ততায়ও তিনি জুড়ে দেন নরম ডানা। যন্ত্রণাকে রঙে নিনাদে কোরাসে অনুবাদ তর্জমা করে নিজেকে ধন্য ও নন্দিত করার খায়েসে।
শিল্পবিবেকি জিজ্ঞাসাজাগর সমাচার বয়েছেন গোটা জীবৎকালজুড়ে, আত্মসন্ধানের তাগিদও কম ছিল না। শিল্পপ্রাণ মহান মানবহূদয়ের গহনে লুকিয়ে থাকে, মানুষই তিয়াস ও আশঙ্কার একেকটি সংবেদী অথচ চিত্র রচনার নির্ভীক প্রগাঢ় অভিপ্রায়।
আবেগের প্লাবনে আত্মসম্ভ্রম খুইয়েও তাকে সংযত থেকে পূর্ণমাত্রায় সচেতন থেকে তিনি চিত্রে বুলিয়ে দিয়েছেন সুভদ্র শিল্পী স্বভাবের নীল-হলুদ রঙ।
অনেকেরই মতে, গঘ জীবনের শেষ দিকে ‘পাগল’ হয়ে উঠেছিলেন! পাগলামির সেই অনিয়ন্ত্রিত অবস্থা থেকে এ মরমি চিত্রকর নির্মাণ করেছেন সৌম্য বিবেকি মন্ত্রণার মন্ত্র। গঘ হয়তো চেয়েছিলেন সমসময়ের বিশ্বপট ছাড়িয়ে উত্তর যুগে তার আপন জীবনের সাক্ষ্য দিতে, অনেকটা সংগ্রামী বিদ্রোহী পুরোহিতের ধরনে। তিনি তার দৈব শিল্পগুণে নির্মাণ করে তুলতেন সম্মোহনবলয়। তার চিত্রের পরতে পরতে ছড়ানো শিল্পময় সংযত আকস্মিক ভাবাবেগ, মিতব্যয়ী অথচ অমোঘ মন্ত্রময়তার ছায়া।
এ মন্ত্র দিয়ে তিনি সমাজ ও জগতের কোনো পারমার্থিক উপকার করতে চাননি। চেয়েছিলেন প্রতিবেশের শিল্পরূপকে একটি সংহত ভাবকল্পে শিল্পায়তনে তুলে ধরতে।
মনজুড়ে ভ্যান গঘ। অথচ আরো কত ছবি যে দেখার আছে! ক্যানভাস-জোড়া উজ্জ্বল রঙ আর বলিষ্ঠ রেখায় ধরা এক অন্যতর শরীরী ভাষা।
‘কখনো কখনো অনির্বচনীয় অনেক কিছু থাকে, সমস্ত প্রকৃতিটা যেন মনে হয় কথা বলতে চায়; এ জিনিসটা সবাই দেখতে পায় না, অনুভব করতে পারে না। যার চোখ আছে, কান আছে, হূদয় আছে তার জন্যই ঈশ্বর এ সৌন্দর্য করে রেখেছেন। এ কারণেই আমার মনে হয় একজন শিল্পী সুখী, সে যা দেখে তার একটুখানিও প্রকাশ করতে পারলে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়।
আমি আমার কাজের মধ্যে এমন কিছু খুঁজে পেয়েছি, যার ভেতর আমার হূদয় ও আত্মা সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত থাকতে পারে এবং যা আমার বেঁচে থাকা অর্থময় করে, অনুপ্রাণিত করে।’
গঘ যাপন মানচিত্র ধরে সমবেত পদচারণা আমাদের উন্মথিত করে, তার অসুখী পরান একটুখানি স্বীকৃতির তিয়াসায় দরদি আদল খুঁজতে ঘুরে বেড়ায়, মানুষের মনে তার সে রণন বুঝি ফুরোয় না। ফলে দূরের মানুষ ও তার আত্মপরিচয়ের ঠিকানা খুঁজে কাছে চলে আসে।
গঘের ছবি প্রকৃতির নানা বর্ণালীতে ছাপিয়ে নেয়া মনছাপ ছবি। শিল্পের বিকল্পবীক্ষা রচনা করতে থাকা ছবি। এ মুক্তালীলার মধ্য দিয়েই অচলায়তন থেকে বেরিয়ে এসে পথের মধ্যেই শিল্পীর যথার্থ মানুষ হয়ে ওঠা।
জীবনব্যাপী নিরন্তর যুঝে চলার পর সামান্য স্বাচ্ছন্দ্যও কি গঘের অভিপ্রেত অথবা প্রাপণীয় ছিল না? সেই পাত্তাহীন মানে পাত্তা না পাওয়া ও না দেয়ার সময়ের যাপন-চিত্রটা কেমন ছিল ভ্যান গঘের? কিন্তু এ ছবিটাই আমরা যদি দেখি আজকের দিনে না দাঁড়িয়ে তার সমকালে, ভ্যান গঘের জীবৎকালে? ঠিক উল্টো ছবিটাই তো দেখব আমরা। কেউ বিশেষ পাত্তা দেয়নি শিল্পী হিসেবে বা মানুষ হিসেবেও। যে সম্মান তিনি পাচ্ছেন মরণোত্তর, সেই সম্মানের কণামাত্র তিনি যদি পেতেন তার জীবৎকালে, তবে হয়তো চিত্রশিল্পের ইতিহাসটাও অন্য রকম লেখা হতে পারত।
আর্থিক দুর্দশার পরোয়া না করেই সৃষ্টিধর্মিতার প্রণোদনায় শিল্পনিরীক্ষায় মগ্ন থাকেন। কেননা যা অগ্রাহ্য করলে অনৈতিহাসিকতার নজির রাখা হবে। কবুল করে নিয়েও চৈতন্য উন্মিলিত করার দায় যেন ক্যানভাসে আছড়ে পড়ছে। ফলে মৃত্যুদিনকেও সৃষ্টি সুখের উল্লাসে গণ্য করেছেন।
গঘ কি ভেবেছিলেন, ‘যেন আমাকে কেউ একদিন হাস্যকর মৃত্যুর উচ্ছৃঙ্খল ব্রতচারী বলে চিহ্নিত না করে’?
‘সেইজন মেরুনরঙা তারা ভোরে, ডুবে গেল ডিঙি,
তার পরে ঝুঁকে থাকে শান্ত এক সবুজ প্রশাখা;
রুপালি মেঘের থেকে ঝরে পড়া আফিঙের ফুল।’ ৩
ভিনসেন্ট আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছেন যে জীবনযাপনটাই আসল। শিল্পের প্রতি ভালোবাসাটাই অবশেষে জয়ী হয় জীবনের কাছে। আসলে শিল্পচর্চা আর জীবন এ দুটোকে আলাদা করতে পারছিলেন না তিনি। শিল্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবন মিলেমিশে একাকার। জীবনযাপন আর শিল্পযাপন ভ্যান গঘের কাছে একই রকম অর্থ বহন করেছিল।
জয়তু ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ!
১ প্রমা, এপ্রিল জুন ১৯৯৫
২ মৃত্যুর সাতকোরাস, গেয়র্গ ট্রাকল
অনুবাদ: অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত






