৩০ মার্চ, ১৯৫৫। নয়াদিল্লির কনস্টিটিউশন ক্লাব আয়োজিত সংগীত সম্মেলনের শেষ বিষয়টি ছিল রবি শঙ্কর ও অন্নপূর্ণা দেবীর যুগলবন্দি উপস্থাপনা। অন্নপূর্ণার রাগশ্রীর মাধ্যমে সেদিনের অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল। মন্দ্রসপ্তকে আলাপ শুরু করেন অন্নপূর্ণা। রবি শঙ্কর ক্ষণে ক্ষণে মধ্যসপ্তকে টোকা দিচ্ছিলেন। কিছু সময় বাদে রবি শঙ্কর মন্দ্রসপ্তকে নেমে এসে খারাজ তারে বিশ্রাম নিতে থাকেন। চাকারি আর তারাফের দুটো তার অনুরণন সৃষ্টি করে। এর পর পর রবি শঙ্কর ও অন্নপূর্ণা অতুলনীয় মীরখণ্ডী কেতায় বিস্তার শুরু করলেন। অন্নপূর্ণা এত যত্নে অতি কোমল রিশাব বা অতি কোমল দৈবাত শুরু করেছিলেন, মনে হচ্ছিল যেন অপার্থিব কিছু একটা ঘটতে চলেছে। রবি শঙ্করও রাগের প্রচলিত একটা রূপ তুলে ধরছিলেন। কিন্তু এসব সত্ত্বেও অন্নপূর্ণা যেন নৈপুণ্য ও স্বাভাবিকতার বিচারে তাকে ছাপিয়ে যাচ্ছেন বলেই মনে হচ্ছিল।

অন্নপূর্ণার সংগীত নিয়ে বহু কিংবদন্তি চালু রয়েছে। অনেকেই বলেন, বাবা তাকে লোকজনের সামনে বাজাতে নিষেধ করেছিলেন, যাতে রবি শঙ্করের বাদন শ্রোতাদের কানে নিষ্প্রভ না ঠেকে। হয়তোবা মেয়ে জামাইয়ের প্রতি স্নেহবশেই এসব বলেছিলেন বাবা। অন্য কেউ কেউ বলেন, বাবা আলাউদ্দীন খাঁর কাছে তালিম নেয়ার সময় অন্নপূর্ণা রবি শঙ্করকে রেয়াজে সাহায্য করতেন।

সেদিন সন্ধ্যার অনুষ্ঠানের পর শ্রোতাদের ভেতর গুঞ্জন শুরু হয়েছিল। শ্রোতাদের রায় অন্নপূর্ণাকে মুকুট ভূষিত করে। অন্নপূর্ণা এরপর আর প্রকাশ্যে বাজিয়েছিলেন কিনা আমার জানা নেই।

অনুষ্ঠান শেষে অন্নপূর্ণা ও রবি শঙ্কর বাড়ি ফিরে যান। হেঁশেলে ঢোকেন অন্নপূর্ণা। শুভ (ওদের ছেলে) পেন্সিল আর স্কেচ বুক নিয়ে ব্যস্ত ছিল। স্নান শেষে তরতাজা হয়ে বেরিয়ে আসেন রবি শঙ্কর। অস্বাভাবিক রকম গম্ভীর ছিলেন তিনি। রাতের খাবারের সময় রবি শঙ্কর বুকের ভার লাঘবের চেষ্টা করলেন।

‘দ্বৈত অনুষ্ঠানগুলোয় তাল মেলাতে কিছু ঝামেলার মুখোমুখি হচ্ছি আমি...,’ চাপাতি ছেঁড়ার সময় বললেন তিনি।

‘কী ধরনের ঝামেলা?’ অন্নপূর্ণা জানতে চাইলেও তার কণ্ঠে আগ্রহের অভাব ছিল। যেন স্বামী কী বলতে যাচ্ছেন, আগেই টের পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

‘আমি তোমাকে বোঝানোর চেষ্টা করে আসছি যে অবস্থা পাল্টে যাচ্ছে। পালাবদলের হাওয়া বইছে। আমাদের অবশ্যই তাল মেলাতে হবে, নয়তো পিছিয়ে পড়ব।’

‘এ কথা বলছ কেন? এ কথা কেন?’

‘খুবই সহজ ব্যাপার। সংগীতে আমাদের অবশ্যই আধুনিক ছোঁয়া আনতে হবে।’

‘বুঝলাম না।’&dquote;&dquote;

‘ঠিকই বুঝতে পারছ। ইচ্ছা করে না বোঝার ভান করছ। আমাদের বিয়ের সেই প্রথম দিন থেকেই দেখে আসছি, নিজেকে পাল্টানোর কোনো চেষ্টাই করোনি তুমি।’

‘যেমন?’ কিঞ্চিত বিদ্রূপের ছোঁয়া কণ্ঠে নিয়ে জানতে চান অন্নপূর্ণা।

‘অনুষ্ঠানের জন্য আমি চেয়েছিলাম তুমি সাজগোজ করো। কিন্তু তুমি স্রেফ শাড়ি ছুড়ে ফেলেছ, অলঙ্কারও সরিয়ে রেখেছ। কী অদ্ভুত!’

‘অনেকদিন ধরে এসব কথা চলছে। ভেবেছিলাম যথেষ্ট হয়েছে। কেন অযথা আবার এসব কথা তুলছ? তোমার কথায় পাত্তা না দেয়ার অভিযোগ তুললে আমি কী বলেছিলাম মনে নেই তোমার? বলেছিলাম তোমার কথা আমি শুনব, রঙচঙা শাড়ি আর গয়না গায়ে দেব, কিন্তু সেক্ষেত্রে তোমারও নিজেকে বদলাতে হবে। তোমাকে আমার প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে হবে।

‘তোমার পক্ষে কথা রাখা সম্ভব হয়নি। আমি সব রকম সমঝোতা করেছি, আর এখন তুমি কিনা আমাকেই দোষারোপ করছ। আমাকে জিদ্দি বলার আগে নিজের কথা একটু ভেবে দেখো। যাকগে, বাদ দাও। আজ এখানে এসব কথা বলতে এলে কেন সেটাই ভাবছি।’

অন্নপূর্ণার কণ্ঠের কঠোরতা আর মেজাজের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন রবি শঙ্কর। তার যেটা বলার বললেন তিনি।

‘জানি, কোনো লাভ নেই’— বললেন তিনি। ‘তুমি জীবনেও যুক্তি মানোনি আর মানবেও না। তুমি সেকেলে। স্কুল মিস্ট্রেস, আইবুড়ো মেয়েদের মতো একগুঁয়ে। জীবনের সমস্ত ভালো জিনিসগুলোকে তুচ্ছ মনে করো।’

এ ধরনের কথাবার্তায় খানিকটা স্বস্তি পেয়ে খেই ধরলেন তিনি: ‘শোনো অনু, এভাবে বাজাতে পারব না আমরা। আসলে শিল্পীদের উচিত শ্রোতাদের জন্য চলতি স্বাদ সৃষ্টি করা। সাহিত্যে যেমন কবি কিংবা ঔপন্যাসিকরা নতুন কায়দা আর বাগ্ধারা সৃষ্টি করে প্রকাশ্যে পাঠে স্বাদ বদলের চেষ্টা করে যাচ্ছে। আমরা সবসময় পুরনোকে আঁকড়ে থাকলে লাভ হবে না।

‘সময় বদলে যাচ্ছে। আমরা মহারাজাদের আমলে নেই, যখন জীবন ছিল শিথিল ম্যাড়মেড়ে। এখন জীবন অনেক দ্রুত আর জটিল। সুতরাং তোমার বিলম্বিত মীঢ়ের দিন ফুরিয়ে গেছে। এখন হয়তো হাততালি আর তারিফ পাবে তুমি, কিন্তু...

‘বাবার কাছে যতটুকু শিখেছি, আমি তা-ই বাজাচ্ছি। তিনি আমাদের ধ্রুপদাঙ্গ আলাপ শিখিয়েছেন। আমি প্রতিটি স্বরে টান দিই, আলাপে আনন্দ পাই। বদলে যাওয়া সময়ের চাহিদা কী জানি না।’

‘কিন্তু...,’ বাদ সাধার চেষ্টা করলেন রবি শঙ্কর।

‘যা-ই ঘটুক, আমি বাবার সংগীতই বাজাতে চাই। সারা জীবন তা-ই বাজাব। আমি এক ইঞ্চিও পিছু হটব না’— বললেন অন্নপূর্ণা।

‘জানি। জানি। সংগীতে অনুভূতি যোগ করতে পারো তুমি। একটা স্বরে লেগে থেকে সম্পূর্ণ সুর বের করে আনো। সবাই সেটা জানে। সুরবাহারের সৌন্দর্য তো এটাই। সেতার এক ধরনের হীনম্মন্যতায় ভুগছে। তবু আমার মনে হয়, পুরনো দুনিয়া আঁকড়ে থাকায় কোনো লাভ নেই। সময়ের সঙ্গে এগোনো উচিত। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।’

অন্নপূর্ণার জানা ছিল, তার সঙ্গে তর্ক করা বৃথা। টনটনে সময়জ্ঞানওয়ালা মানুষ রবি শঙ্কর। তিনি যা ঠিক করবেন, সেটাই তার পক্ষে সেরা হবে। তিনি কেবল ভিন্নমত পোষণ করতে পারেন।

স্থির চোখে রবি শঙ্করের দিকে তাকিয়ে রইলেন অন্নপূর্ণা, যেন রবি শঙ্কর কথা বন্ধ না থামিয়ে মনের ভাব বিশদ বলে ফেলেন।

‘এটা সেতারের যুগ। তাই সুরবাহারের বদলে সেতারই আমার পছন্দ। যেমন এখন খেয়ালের সময়, ধ্রুপদ নয়।’

রবির কথার জবাব দিতে ইচ্ছা করল না অন্নপূর্ণার। মনে হলো, তিনি প্রবল প্রশংসা পাওয়ায় রবি শঙ্কর হয়তো হীনম্মন্যতায় ভুগছেন। ওদের সম্মিলিত পাঁচ কি ছয়টি যুগলবন্দির কনসার্ট পারফরমার এবং বাদক হিসেবে রবি শঙ্করের চেয়ে সেরা প্রমাণ করেছে তাকে।

অন্নপূর্ণার স্বেচ্ছায় নিজেকে লোকচক্ষুর অন্তরালে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছার কথা তখন জানা ছিল না রবির। উত্থান ঘটছিল তার। সমঝদাররা মহান শিল্পী হিসেবে তার তারিফ করছিলেন। সুরবাহারও তার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছে। কারণ সেতারের চেয়ে ঢের কঠিন বাদ্যযন্ত্র এটা, ভারি ও সংগীতের বিচারে সন্তোষজনক।&dquote;&dquote;

রবি যথার্থই ঈর্ষাতুর ছিলেন। তাই স্ত্রীকে দিয়ে প্রকাশ্যে না বাজানোর শপথ করিয়েছিলেন। এ ঘটনার অনেক ভাষ্য রয়েছে, বেশির ভাগই কল্পিত।

অন্নপূর্ণা অবশ্য আমার কাছে তাকে দিয়ে রবির এ ধরনের শপথ করানোর প্রয়াসের চেয়েও মারাত্মক কিছু ঘটার কথা বলেছেন। কিন্তু সেটা কাউকে না জানানোর কথাও বলেছেন তিনি।

‘আমার মৃত্যুর সময় সেটা আমার সঙ্গেই যাবে’— জোরের সঙ্গে বলেছেন তিনি।

স্বামী-স্ত্রী অভিন্ন পেশায় থাকলে এমনটা ঘটতে বাধ্য। এটা পুরুষের অহম।

রবি শঙ্করের বেলায় এটা আরো প্রবল ছিল। তিনি ছিলেন উচ্চাভিলাষী, অহঙ্কারী, অন্য কাউকে তার জগতের নিয়ন্ত্রক হতে দেয়ার পাত্র ছিলেন না।

সত্যিই তিনি সূর্য ও আকাশের বুকে একা জ্বলতেই ভালোবাসতেন। তাই হয়তো তিনি অন্নপূর্ণাকে প্রকাশ্য বাদন থেকে সরিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

 

[স্বপন কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত অ্যান আনহার্ড মেলোডির নির্বাচিত অংশ]

রূপান্তর: শওকত হোসেন