নবান্নের এ দেশে কার্তিকের পরে আসে অগ্রহায়ণ। বাঙালি জীবনে হেমন্তের দ্বিতীয় মাসখানি ভরা ক্ষেতের মধুর হাসিতে আজো চির অমলিন হয়ে আছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতে অগ্রহায়ণের এ পরিচয় পাই আমরা। রবি ঠাকুর অবশ্য এ গান রচনা করেন আরো অনেক আগে। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে। এর ঠিক দেড় যুগ আগের এক অগ্রহায়ণে ধরার বুকে আসেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। বর্ষপঞ্জির হিসাবে দিনক্ষণ ৩ অগ্রহায়ণ, ১২৯৫ বঙ্গাব্দ (হালের সরকারি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী খ্রিস্টাব্দে দিনটি হওয়ার কথা ১৭ নভেম্বর, ১৮৮৮। তবে তিনি নিজে দিনটি ২০ নভেম্বর পালন করতেন। এখনো এভাবেই পালিত হয়। তারই পারিবারিক সূত্র থেকে মিলেছে এ তথ্য)। সেই সময়ের ত্রিপুরা, তারপরের কুমিল্লা, হালের চাঁদপুরের পাইকারদী গ্রামে জন্ম নেয়া নাসিরউদ্দীন কালক্রমে হয়ে উঠবেন বাঙালির প্রগতি চিন্তার একজন পথিকৃৎ, বোধের মুক্তির অন্যতম দিশারি।
বাঙালি মুসলিম সমাজের গোঁড়ামি, কুসংস্কার, অন্ধতার বিপরীতে আলো ছড়িয়ে দিতে প্রকাশ করবেন ‘সওগাত’ নামে একটি সচিত্র সাহিত্য পত্রিকা। যার সম্পাদক, প্রকাশক, প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কালের ইতিহাসই বদলে দেবেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। কেননা সওগাতের মতো এক পাটাতনের কারণেই অবিভক্ত বাংলায় কাজী নজরুল ইসলাম, বেগম রোকেয়া, শামসুন্নাহার মাহমুদ, সুফিয়া কামালদের নব নব চিন্তা আর ভিন্নমত প্রকাশের কাজটি সম্ভবপর হয়।
সচিত্র মাসিক পত্রিকা হিসেবে সওগাতের যাত্রা কলকাতায় ১৩২৫ বঙ্গাব্দের অগ্রহায়ণে (নভেম্বর/ডিসেম্বর, ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দ)। দেশভাগের ফেরে ঢাকায় স্থানান্তর হয়ে নবপর্যায়ের সূচনাও আরেক অগ্রহায়ণেই। সেটা ৩৪ বছর পর ১৩৫৯ বঙ্গাব্দে (১৯৫২ সালের নভেম্বর/ডিসেম্বর)। ১৪২৫ বঙ্গাব্দ তথা ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে অবিভক্ত সওগাত তাই শতবর্ষী।
যাত্রা তার কলকাতায়
মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনরা ছিলেন পাঁচ ভাই-বোন। একজন মারা গিয়েছিলেন। সংসারে আর ছিলেন মা। আর দশজনের মতোই ছিল নাসিরের ছেলেবেলা। কিন্তু অকালে পিতার মৃতুতে সব উলটপালট হয়ে যায়। এ বিষয়ে তার স্মৃতিচারণা, ‘আমি তখন ম্যাট্রিক পাস করিনি। ওই নজরুলের যে অবস্থা, আমারও অনেকটা তা-ই হয়েছিল। ও যেখানে গিয়ে থেমেছিল, আমিও সেখানে গিয়েই থেমেছিলাম। ম্যাট্রিক, এখনকার এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার ঠিক আগেভাগে হঠাৎ করেই বাবা মারা গেলেন। পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান হওয়ায় তখন এমন একটা মুশকিলে পড়ে গেলাম যে, সংসার চলবে কী করে, কে চালাবে আমাদের— এ ভাবনা গভীরভাবে পেয়ে বসল।’
কৈশোরকালেই পেশাজীবনে প্রবেশ করতে হলো নাসিরউদ্দীনকে। প্রথমে করলেন সুপারির ব্যবসা। দ্বিতীয় দফায় কাজ পেলেন স্টিমার স্টেশনে সহকারী হিসেবে। তার কাজ ছিল টিকিট বিক্রি করা এবং টিকিট সংগ্রহ করে সেগুলো জমা দেয়া। তারপর বীমা খাতে চাকরি নিলেন। জীবনে এল সচ্ছলতা। কিন্তু মনে শান্তি নেই। অর্থ নয়, বিত্ত নয়, নাসিরের মাথায় কেবল সাহিত্য ভাবনা। সমাজ থেকে কুসংস্কার দূর করার তাড়না। কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করতেই হবে। মুসলমান সমাজ থেকে একটা পত্রিকা বের করতে পারলেই মিলবে প্রগতিশীল ভাবনাচিন্তা প্রকাশের দারুণ এক জায়গা। ‘পত্রিকা প্রকাশের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ১৯১৭ সালে চাঁদপুর ছেড়ে কলকাতা রওনা হলাম’— লিখেছেন নাসির।
বিশাল মহানগর কলকাতায় তার কোনো আত্মীয়স্বজন ছিল না। মেছুয়া বাজারে ফরিদপুরের একজন থাকতেন। আমির হোসেন খান, সাহিত্যের নিবিড় পাঠক। নাসির গেলেন তার কাছে। তিনি আশ্রয় দিলেন, প্রশ্রয় দিলেন। পত্রিকা প্রকাশে কাদের কাছে যেতে হবে, সে উপদেশও দিলেন। কিন্তু মুসলিম যাদের কাছেই যান, তারা শুনে পিছিয়ে পড়েন। হিন্দুদের কাগজের মতো গল্প-উপন্যাস নিয়ে ছবিটবি দিয়ে পত্রিকা বের করতে রাজি নন কেউ। তাই বিফল মনোরথে নাসির ফিরে এলেন চাঁদপুরে। কিছুদিন কাটিয়ে আবার কলকাতায়। পত্রিকা বের করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নানাজনের সঙ্গে দেখা করলেন, কথা বললেন। শেষে যার সঙ্গে পরিচয় হলো, তিনি ব্যারিস্টার আব্দুল রসুল। তিনি সব শুনে বললেন, ‘সাহিত্য পত্রিকা মুসলমান সমাজ থেকে আরো ৫০ বছর আগেই বের হওয়া উচিত ছিল।’
তার পরামর্শেই নাসিরউদ্দীন বিলেতি ম্যাগাজিন আর প্রবাসীসহ আরো কিছু সাময়িকী দেখলেন, পড়লেন। এরপর নিজে পরিকল্পনা করলেন। মেজাজে ও মননে আধুনিক একটি পত্রিকা করবেন। ছবি থাকবে। মুক্তচিন্তার মানুষ লিখবেন। কিন্তু পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পাওয়ার আগেই চিরবিদায় নিলেন ব্যারিস্টার আব্দুল রসুল। তাকে স্মরণ করে পরে নাসির লিখেছেন, ‘মি. রসুলকে হারালেও তিনি যে উৎসাহ দিয়ে গেছেন, তা আমার চলার পথে যথেষ্ট সহায়ক ছিল।’
যেভাবে নামকরণ
বিশ শতকের প্রথমার্ধে মুসলমানরা পত্রপত্রিকার আরবি নাম রাখত। যেমন— আল-এছলাম, হাফেজ, মোহাম্মদী, নবনূর ইত্যাদি। নাসির এ ধরনের নাম থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলেন। এমন নাম রাখবেন, যা সর্বজনগ্রহণযোগ্য হয়। পাতার পর পাতা অভিধান দেখলেন। অতঃপর ‘সওগাত’ শব্দখানি পেয়ে গেলেন বাংলা অভিধানেই। যেখানে লেখা ছিল, আন্তরিকতার সঙ্গে কিছু উপহার দেয়া হচ্ছে ‘সওগাত’। এ শব্দখানির আদি উেসর দাবিদার অবশ্য তুর্কি ভাষার ভাণ্ডার।
নাম খুঁজে পাওয়ার স্মৃতিচারণা করে ‘সওগাত’ প্রতিষ্ঠাতা লিখেছেন, “আমি শত শত নাম লিখে কত যে কাগজ নষ্ট করেছি, তার ইয়ত্তা নেই। একদিন রাতে বসে লেখা নামগুলো একে একে কাটতে লাগলাম। শেষ পর্যন্ত ‘সওগাত’ নামটা রয়ে গেল। বাংলা অভিধানেও নামটা খুঁজে পেলাম। পরদিন আমার পরিচিত একজন শিক্ষিত উর্দুভাষীকে এ নামের কথা জানালাম। তিনি হেসে বললেন: এর চেয়ে ভালো নাম আর হতে পারে না। খুব আন্তরিকতার সঙ্গে উপহার দিলে তা হয় সওগাত, আর আপনি একান্ত আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠকসমাজ তথা জাতিকে উপহার দিচ্ছেন সাহিত্যের সওগাত।’’
সাহিত্যিক বন্ধুদের নামটি জানালেন নাসির। তা সবাই পছন্দ করে। নামটির প্রশংসা পেয়েছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও।
সওগাত ও রবীন্দ্রনাথ
প্রথম সংখ্যা প্রকাশ হওয়ার পর রবীন্দ্রনাথের হাতে পত্রিকা দিতে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে যান ‘সওগাত’ সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। নিজ হাতে পত্রিকা তুলে দেন কবির হাতে। প্রথমে কিছু না বলে বারকয়েক পত্রিকাটি আগাগোড়া দেখেন। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘সৌন্দর্য-সূর্যের প্রতি’ ও কুমুদরঞ্জন মল্লিকের ‘হাফেজ’ কবিতা দুটি পড়েন। পড়ার পর খোশ মেজাজে রবি ঠাকুর জানতে চাইলেন, পত্রিকাটির এত সুন্দর নাম রেখেছে কে?
নাসির জবাবে বললেন, বহু চিন্তা করে সবার গ্রহণযোগ্য হবে বলে নামটি আমিই নির্বাচন করেছি।
তখন কবি বললেন, তোমার রুচিবোধ প্রশংসার যোগ্য। মুসলমান সমাজের বর্তমান অবস্থায় তাদের মধ্য থেকে যে এরূপ সুন্দর একখানা মাসিক পত্রিকা বের হতে পারে, এটা আমার ধারণা ছিল না। আজ পর্যন্ত তোমাদের এ ধরনের কোনো মাসিক পত্রিকা আমার হাতে আসেনি। আশা করি, তোমার প্রচেষ্টা সার্থক হবে।
এ পর্যায়ে নাসির কবির কাছে লেখা চান। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তখন শান্তিনিকেতনের অর্থসংস্থানে লেখার স্বত্ব বিশ্বভারতীকে দান করেছেন। তাদের মাধ্যমে লেখা নিতে হবে, পারিশ্রমিকও তারাই নেবে। কিন্তু বিশ্বভারতীকে টাকা দেয়ার মতো সঙ্গতি তখনো সওগাতের হয়নি। তাই পত্রিকার প্রশংসায় খুশি হলেও লেখা পাবেন না বলে মন খারাপ করে ফিরলেন নাসির। কিন্তু চার-পাঁচদিন পর বিশ্বভারতীর মনোগ্রাম আঁকা খামে বিশ্বকবির চিঠি পেলেন। পেলেন কবিতা। চিঠিতে কবি লিখেছেন, বিশ্বভারতীকে টাকা দিয়ে আমার লেখা নেয়া সম্ভব নয় বলে সেদিন তুমি খুব নিরাশ হয়ে ফিরে গিয়েছিলে। তাই একটা কবিতা পাঠালাম। আশা করি তোমার ভালো লাগবে। এর জন্য টাকা দিতে হবে না।
সওগাতকে দেয়া রবি ঠাকুরের সেই কবিতার নাম ‘পথের সাথী’। এটি সওগাতের দ্বিতীয় সংখ্যার (প্রথম বর্ষ, দ্বিতীয় সংখ্যা, পৌষ ১৩২৫) প্রথম পৃষ্ঠায় মুদ্রিত হয়। নাসিরের মত হচ্ছে, কবিতাটি সওগাতকে উদ্দেশ করেই রচিত। এর চারটি চরণ এমন— ‘ঘরের লোকে কেঁদে কইল মোরে,/ ‘‘আঁধার পথ চিনবে কেমন করে’’/ আমি কইনু, ‘‘চল্ব আমি নিজের আলো ধরে/ হাতে আমার এই ত আছে বাতি।’’
সওগাতকে রবি ঠাকুর আপন মনে ঠাঁই দিয়েছিলেন। তাইতো স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়েই সওগাতের দ্বিতীয় বর্ষ প্রথম সংখ্যার (অগ্রহায়ণ ১৩২৬) জন্য ‘সওগাত’ শিরোনামেই একটি ছোট্ট রচনা পাঠিয়েছিলেন। যার শেষাংশ এমন—
ছেলে কাঁদো কাঁদো সুরে বললে, ‘সওগাত পাব না?’
‘যখন দূরে যাবি তখন সওগাত পাবি।’
‘আর যখন কাছে থাকি তখন তোর হাতের জিনিস দিবিনে?’
মা তাকে দু’হাত বাড়িয়ে কোলে নিলেন; বললেন, ‘এই ত আমার হাতের জিনিস!’
প্রথম সংখ্যা
মুসলমান সমাজকে প্রগতির পথে আনতে মুসলিমদের সাহিত্যচর্চা, সাহিত্যপাঠ জরুরি— এমন ভাবনা থেকেই সওগাতের উদ্যোগ। কিন্তু শুরুতেই ধাক্কা। মুসলমান চিত্রশিল্পী মিলল না। বাধ্য হয়ে প্রচ্ছদপটের জন্য শিল্পী গণেশ ব্যানার্জির দ্বারস্থ হলেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। তখন প্রগতিপন্থী মুসলিম লেখকসংখ্যাও সীমিত। তাই হিন্দু ধর্মাবলম্বী কবি-সাহিত্যিকদেরও টানতে হলো। সওগাতের জন্য লিখলেন জলধর সেন, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মানকুমারী বসু, কুমুদরঞ্জন মল্লিক। প্রথম সংখ্যাতেই ছিল আরএস হোসেন নামে বেগম রোকেয়ার কবিতা ‘সওগাত’, আর প্রবন্ধ ‘সিসিম ফাক’। কায়কোবাদ, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, শাহাদাৎ হোসেন, আবদুল গফুর মুসলিম লেখকদের প্রতিনিধিত্ব করেন। ‘বর্তমান বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্যিকগণের সংক্ষিপ্ত পরিচয় (সচিত্র)’ শিরোনামে লেখেন এম নাসিরউদ্দীন।
তবে লেখার চেয়ে সওগাত প্রথমেই আলোচনায় আসে সচিত্র হওয়ার কারণে। এর আগে কেউ আর বাংলার মুসলিম সমাজ থেকে ছবিসমেত কোনো সাহিত্য পত্রিকা বের করতে সাহস করে ওঠেননি। তাই সওগাত নিয়ে শুরুতেই আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। প্রগতিশীল সমাজ তাকে দারুণভাবে গ্রহণ করে। চট্টগ্রামে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির তৃতীয় অধিবেশনে আমন্ত্রণ পান। এ সমিতির সম্মেলনের ছবি সংগ্রহে একজন আলোকচিত্রী ভাড়া করেন। কিন্তু উপস্থিত অনেকেই নিজের ছবি তুলতে রাজি নন। কেউ কেউ রাজি হলেন। নাসির নিজেও ছিলেন শেরওয়ানি-পাজামা পরে। পরের সংখ্যা সওগাতে সম্মেলনের সচিত্র প্রতিবেদন লেখেন তিনি। এমনিতে খুব একটা তিনি লিখতেন না। কাগজের সম্পাদক হিসেবেও প্রথমদিকে তার নাম ছিল না। প্রথমদিকে গুটি কয়েক সংখ্যায় সম্পাদক হিসেবে নাম ছিল আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদের। নাসির নিজের পরিচয় দিতেন জেনারেল ম্যানেজার বলে। পরে সাহিত্যবিশারদ তাকে বলে-কয়ে সম্পাদক হিসেবে নাম লেখাতে রাজি করান।
কলকাতায় দ্বিতীয় অধ্যায়
সওগাত টানা বের হয়নি। শুরুর পর বিরতি পড়ে। তৃতীয় বর্ষ পঞ্চম সংখ্যার পর (এপ্রিল ১৯২২) এটি বন্ধ হয়ে যায়। ক্রমাগত আর্থিক লোকসানই এর কারণ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধাক্কায় ঊর্ধ্বমুখী বাজার। সবকিছু মিলিয়ে একপর্যায়ে নাসির ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। পত্রিকা বন্ধ করে আবার বীমা কোম্পানির এজেন্সি নেন কলকাতায়ই। বছর চারেক লাগে আর্থিক সক্ষমতা পেতে। এরপর আবার নতুন কলেবরে সওগাত বের করেন। আগের প্রকাশনার ধারাবাহিকতা রেখে চতুর্থ বর্ষ প্রথম সংখ্যা আষাঢ় ১৩৩৩ (জুন ১৯২৬) দিয়ে নবপর্যায়।
এ সময়ে এসে সওগাত জমে ওঠে। প্রগতিশীল মুসলিম লেখকদের প্রাণকেন্দ্র হয়ে যায়। এদের মধ্যে ছিলেন এস ওয়াজেদ আলী, মোহাম্মদ শামসুদ্দিন, গোলাম মোস্তফা, মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ শাহাদাৎ হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে নববর্ষে বের হয় ‘বার্ষিক সওগাত’। এর প্রথম সংস্করণ দুই সপ্তাহে সব বিক্রি হয়ে যায়। পাঠক চাহিদা মেটাতে হয় তৃতীয় সংস্করণ করে। এমন যখন জনপ্রিয়তা, তখন ‘সওগাত সাহিত্য মজলিশ’ যাত্রা করে, যা মূলত সাহিত্যামোদীদের আড্ডাশালা। এর আসর বসত প্রথমে ৮২ কলুটোলা স্ট্রিটের পত্রিকা দপ্তরেই। এরপর তা চলে যায় ১১ ওয়েলসলি স্ট্রিটে। সেখানে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন পরিবার নিয়েই ওঠেন। দোতলা বাড়ির নিচে করা হয় নিজস্ব ছাপাখানা।
এ অধ্যায়ের প্রথম সংখ্যা থেকে নজরুলই সওগাতের প্রধান লেখক। সেখানে বের হয় তার বিখ্যাত কবিতা ‘সর্বহারা’। তার আগেই অবশ্য তিনি বাংলা সাহিত্যজগতে আলোচিত নাম হয়ে উঠেছেন। তবে আর্থিক সমস্যার সুরাহা হয়নি। তাই তো ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের মার্চে অ্যালবার্ট হলে ‘নজরুল সাহায্য রজনী’ আয়োজিত হয় সওগাত সম্পাদকের উদ্যোগে। পরে নজরুল কাজও নেন সওগাতে।
নজরুল: সওগাতের ঘরের মানুষ
বিশ শতকের তৃতীয় দশকে অঙ্কশাস্ত্রে এমএ ক্লাসের কৃতী ছাত্রী ফজিলাতুন্নেসার প্রতি কাজী নজরুল ইসলামের প্রণয় গোপন কোনো বিষয় ছিল না। তবে একপর্যায়ে বিপরীত দিক থেকে সাড়া না পেয়ে বিরহকাতর হয়ে পড়েছিলেন কবি। এমনি সময়ে সওগাতের সঙ্গে যুক্ত হন নজরুল। এ পত্রিকায় ফজিলাতুন্নেসা ‘শুধু দুদিনের দেখা’ নামে একটি গল্প পাঠিয়েছিলেন। নজরুল গল্পটি সংশোধন করেছিলেন ‘দুদিনের দেখা’ নামে। সংশোধনের আগে ও পরে গল্পকারের সম্মতি চেয়ে চিঠি দেন কবি। কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি।
ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে নজরুলের শেষ দেখাও সওগাতের দপ্তরে। কৃতী এ ছাত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। তাই ১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বরে সরকারি বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিলাত যাবেন। মুসলমান সমাজের এক নারীর এ অর্জনে বসে থাকতে পারেননি মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। ‘সওগাত’ থেকে করা হয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। এ আয়োজনে নজরুল একটি গান করেন, যার শিরোনাম ‘জাগিলে পারুল কিগো’।
নজরুলের সাহিত্যজীবন তো বটেই, ব্যক্তিজীবনের সঙ্গেও সবটা মিলে দারুণভাবে জড়িয়ে আছে ‘সওগাত’। তার সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ কীভাবে, তার বিবরণ দিয়েছেন সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। তিনি লিখেছেন, ‘সওগাত প্রকাশিত হওয়ার পর পরই নজরুল করাচি থেকে লেখা পাঠাতে শুরু করেন— প্রচুর লেখা। লেখার সঙ্গে থাকত চিঠি। এসব লেখা আর চিঠির মধ্য দিয়েই নজরুলের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ঘটে। এর আগে নজরুল ইসলামের নাম বা তার পরিচয় এর কোনো কিছুই আমার জানা ছিল না।’
সওগাতের মানমতো না হওয়ায় প্রথম দিকে তার পাঠানো লেখা মুদ্রিত হয়নি। নবীন লেখকের কাঁচা লেখার পরিণতি বরণ করতে হয় সেগুলোকে। সওগাতে নজরুলের প্রথম প্রকাশিত লেখা ‘বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী’। গল্পটি ছাপা হয় ১৩২৬ বঙ্গাব্দের জ্যৈষ্ঠে (সংখ্যা ৭, বর্ষ ১) ২১। এটা নজরুলের প্রথম মুদ্রিত লেখাও বটে।
সওগাত শুধু নজরুলের প্রথম লেখাই ছাপেনি, পরে তার সাহিত্য, জীবন আর জীবিকার জন্য নানাভাবে পাশে থাকে। কৃষ্ণনগরে তিনি পরিবার নিয়ে অর্থকষ্টে পড়েন। এ কথা শুনে সওগাত সম্পাদক তাকে কলকাতা আনার ব্যবস্থা করলেন। ১৫০ টাকায় চাকরি দিলেন। কাজ কেবল সওগাতে থাকা, লেখা আর সাহিত্যিকদের সঙ্গে আড্ডা দেয়া। গান লেখার জন্য বরাদ্দ হলো সওগাতেরই হলঘর। সপরিবারে নজরুল কলকাতায় চলে এলেন। এসে উঠলেন হাসির গানের লেখক নলিনীকান্ত সরকারের বাড়িতে। পরে নজরুল চলে আসেন সওগাতের পাশের দুই কামরার একটা ফ্ল্যাট। এটা ১৯২৬ সালের ঘটনা।
সবটা মিলে সওগাত ছিল নজরুলের এক অভয়ারণ্য, অভয়াশ্রম। সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সঙ্গে তার রসায়নে অনুঘটকের কাজ করেছেন খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন। সে সময় মঈনুদ্দীন একদিকে নজরুলভক্ত, অন্যদিকে সওগাতের সাহিত্যকর্মী, মানে সেখানে লেখালেখি করে, সময় দিয়ে সাহিত্যে হাত পাকাচ্ছেন। বাউণ্ডুলে কবি নজরুলকে ধরেবেঁধে লেখা আদায় করে নিতেন তারা। এ নিয়ে খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীনের একাধিক স্মৃতিচারণা আমরা পাই। একদিনের ঘটনা নিয়ে মঈনুদ্দীনের বিবরণ: ‘‘তখন নজরুলের ধারাবাহিক উপন্যাস মৃত্যুক্ষুধা নিয়মিত ‘সওগাতে’ বের হচ্ছে। উপন্যাসের পরবর্তী অংশ ও একটি গানের বিশেষ প্রয়োজন। না দিলে নির্দিষ্ট সময়ে ‘সওগাত’ বের হবে না। নজরুলকে ধরে আনা হলো। তখন বেলা আন্দাজ ১১টা। প্রথমে চা ও পান-জর্দা দিয়ে তাকে তুষ্ট করার চেষ্টা করলাম। এরপর দুপুরে একত্রে আহার করলাম। আহারের পর তাকে বললাম, আপনার উপন্যাসের পরবর্তী অংশ ও গান না পেয়ে ছাপার কাজ বন্ধ আছে। এ দুটি পেলেই কাগজ বেরিয়ে যাবে। কাগজ-কলম এনে দিচ্ছি। লিখতে বসুন। নজরুল গম্ভীরভাবে বললেন, ‘আজ একটা জরুরি কাজ রয়েছে, এক্ষুনি আমাকে বের হতে হবে। কাল এসে লিখে দেব।’ আমি মনে মনে ভাবলাম, নিশ্চয়ই কোনো আড্ডায় যাবেন দাবা খেলতে। গান আর দাবা খেলার নামে নজরুল ছিলেন পাগল। এখন ছেড়ে দিলে আবার কখন লেখা পাব কে জানে? বিশেষ করে ‘সওগাত’ বের হতে বিলম্ব হয়ে যাচ্ছে। আমি কবিকে একটা আলাদা কামরায় নিয়ে গেলাম এবং কাগজ-কলম সব দিয়ে বললাম, এবার লিখতে আরম্ভ করুন। লেখা হয়ে গেলে ডাকবেন। এই পান-জর্দাও রেখে গেলাম।
নজরুল যেন একটা বিপদে পড়লেন। আমি বাইরে থেকে কামরার দরজায় তালা বন্ধ করে দিলাম; শুধু শিকল বন্ধ করলে যদি কেউ খুলে দেয় এই ভয়ে। নিরুপায় হয়ে তিনি কতকটা লিখলেন, কিন্তু যাওয়ার জন্য ছটফট করতে লাগলেন। একটু পরই চিৎকার করে বলে উঠলেন। শুনছেন? আমি পায়খানায় যাব। দরজাটা একটু খুলে দিন। শিশুসুলভ তার কথা। পাশের হল কামরায় আমি কাজ করছিলাম। এগিয়ে এসে বললাম, ভেতরে এক কোণে ‘কমোড’ আছে, সেখানে যান। কবি আবার চিৎকার করে বললেন, কমোডে যাওয়ার অভ্যাস আমার নেই। মেহেরবানি করে দরজাটা খুলে দিন। আমি বললাম, বিপদে পড়লে মানুষ কত জায়গায়ই গিয়ে থাকে, কমোড তো ভালো ব্যবস্থা। কবিকে বলতে শুনলাম, কি লোকের পাল্লায় পড়েছি রে, আল্লাহ!
বেলা তখন প্রায় ৫টা। কবি ঘরের ভেতর থেকেই আবার উচ্চকণ্ঠে বললেন, আমার লেখা শেষ হয়েছে, বিশ্বাস না হয় দেখে যান। তার কথার ধরনে বুঝলাম, লেখা শেষ হয়েছে। এবার দরজাটা খুলে দিলাম। আমি মনে করেছিলাম, তিনি বুঝি খুব বিরক্ত হয়েছেন। কিন্তু তার মুখে বিরক্তির লেশমাত্র নেই। লেখাসহ হাসতে হাসতে বের হয়ে এলেন। বললেন, খুব ভালো লেখা হয়েছে, পড়ে শোনাব? আমি বলরাম, চলুন, আগে চা খেয়ে নেয়া যাক। ৫টা বেজে গেছে।... আমি আনেকবার অনেক উপায়ে আটকে রেখে নজরুলকে দিয়ে কবিতা-গান লিখিয়ে নিয়েছি। তিনি কিন্তু সেজন্য মনে কিছু করতেন না; বরং আনন্দের সঙ্গে কবিতাগুলো আবৃত্তি করতেন, গানগুলো সুর দিয়ে গাইতেন।’’
প্রথম লেখা তো বটেই, কাজী নজরুলের মোট ৮০টি লেখা ছেপেছে ‘সওগাত’। তার সৈনিক জীবনের যখন অবসান হয়, করাচি থেকে কলকাতায় পা রাখেন, প্রথম আসেন এ পত্রিকার দপ্তরেই। সৈনিকের পোশাকে কবিকে দেখে চমকে ওঠেন সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। সম্পাদককে নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘আমি কাজী নজরুল ইসলাম, বাঙালি পল্টন ভেঙে দিয়েছে, তাই করাচি ছেড়ে চলে এলাম, আপনি সওগাতে আমার প্রথম লেখা ছেপেছেন, সে কথা ভুলিনি, সবার আগে আপনার সঙ্গেই দেখা করতে ইচ্ছে হলো।’ এই যে শুরু, এভাবে সওগাতের ঘরের মানুষ হয়ে ওঠেন নজরুল।
সওগাতের ঢাকাই পর্ব
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ। ভারত খণ্ডন। বাংলা ভাগ। বাঙালির জন্য প্রতিকূল এক সময়। ধর্মীয় চেতনার তখন জয়কার। হয় বিতাড়নে, নয় স্বেচ্ছায় হিন্দুরা পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমে যাচ্ছে। একই পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিমদের একটি অংশ কলকাতা থেকে ঢাকামুখী। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন পূর্ব বাংলার মানুষ। এ বেলায় আর উল্টোস্রোতে নাও ভাসাতে পারলেন না। তবু আরো তিন বছর কাটিয়ে দিলেন কলকাতায়। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে আর পারলেন না। ঢাকার পাটুয়াটুলির বিজয়া প্রেসের মালিকের প্রেস-বাড়ির সঙ্গে নিজের প্রেস-বাড়ি বিনিময় করেন।
মে মাসে সওগাতের দপ্তর, সওগাত প্রেসের কলকাতার ঠিকানা ছেড়ে আসে ঢাকায়। নাসিরউদ্দীন এসেই দেখেন, বাংলা ভাষার ওপরও আঘাত আসছে। আমাদের নিজের বর্ণমালাও নাকি ছাড়তে হবে! বাংলা লিখতে হবে আরবি হরফে। বিক্ষুদ্ধ নাসির সাফ সাফ জানিয়ে দিলেন, ‘এরূপ অস্বাভাবিক কিছু ঘটলে আমি আর সওগাত বা সওগাত প্রেস কোনোটাই পরিচালনা করব না।’
সওগাত আর এগোচ্ছে না। বাংলা ভাষা সুরক্ষার সংগ্রামে উত্তাল ঢাকা। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের মাঝের দিক। হাসান হাফিজুর রহমানের নেতৃত্বে একদল তরুণ সাহিত্যিক দেখা করলেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সঙ্গে। কলকাতার সাহিত্য আন্দোলনে সওগাত যে ভূমিকা রেখেছে, ঢাকায়ও পত্রিকা আর তার দপ্তর সেভাবে সক্রিয় থাকবে, এ অনুরোধ হাসানদের। আবার উৎসাহ পেলেন নাসির। বঙ্গাব্দ ১৩৬০ অগ্রহায়ণ (খ্রিস্টাব্দ ১৯৫৩ নভেম্বর/ডিসেম্বর) ঢাকায় সওগাতের প্রথম সংখ্যা আলোর মুখ দেখল।
পাকিস্তান পর্বের গোড়ায় ঢাকায় প্রগতিশীল সাহিত্যচর্চায় নেতৃত্বস্থানীয় হয়েই ছিল সওগাত। কিন্তু কলকাতায় এর আলোড়ন যে উচ্চতা পর্যন্ত ছিল, ঢাকায় সেটা আর হয়নি। প্রভাব কমে আসতে থাকে। বিপরীতে নাসির প্রতিষ্ঠিত বেগম পত্রিকা ও বেগম ক্লাব অনেক বেশি আলোচিত হয়। ঢাকায় সওগাত যখন থেকে বের হয়, তার তিন বছর আগেই বেগম বের হতে শুরু করে। এর মানে হচ্ছে, কলকাতা থেকে ঢাকা পর্বে আসতে সওগাতের যে বিরতি, বেগমের বেলায় তা অনেক কম। আরো একটি বিষয় হচ্ছে, সত্তরের দশকের শুরুতে সওগাত বন্ধ হয়ে যায়। তখন সওগাত প্রেস টিকে থাকে বেগম পত্রিকার কারণে। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে বেগম পত্রিকার সম্পাদক নাসির-তনয়া নূরজাহান বেগমের মৃত্যুতে এ প্রেসের চাকাও আর ঘোরে না। তবে সওগাতেরই ফসল বেগম পত্রিকা এখনো বের হয় অন্য ছাপাখানা থেকে। সাপ্তাহিক নয়, মাসিক হিসেবে। এ সময়ে বেগমের সম্পাদক ও প্রকাশক নূরজাহান-তনয়া ফ্লোরা নাসরিন খান শাখী।
আড্ডাশালা: কলকাতার মজলিস, ঢাকার সংসদ
সওগাতে গল্প-কবিতা-প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ করেই কেবল দায় শেষ করতে চাননি মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। তার ইচ্ছে তারও চেয়ে বেশি। সওগাত হবে সাহিত্যচর্চার তীর্থস্থান। যেখানে নবীন-প্রবীণ লেখকরা আসবেন, থাকবেন, আড্ডা দেবেন। কলকাতার সাহিত্য ইতিহাসে এভাবে বড় জায়গা নিয়ে আছে ‘সওগাত সাহিত্য মজলিস’, যার প্রধানতম স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে আমরা পাই খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীনকে। আর এর প্রাণভোমরা ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। ঢাকায় এ দুজনার ভূমিকায় একাই আমরা পরে পাব হাসান হাফিজুর রহমানকে। তিনিই তো ঢাকার ৬৬ নম্বর লয়াল স্ট্রিটে প্রস্তাব নিয়ে যান নাসিরের কাছে। বলেন, ‘‘আপনি কলকাতায় কবি-সাহিত্যিকদের উৎসাহ প্রদানের উদ্দেশে ‘সওগাত সাহিত্য মজলিস’ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং সেখানে কবি-সাহিত্যিকদের সমবেত হওয়ার ও তাদের সাহিত্যালোচনার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।”
হাসানের আগ্রহে কলকাতায় ফেলে আসা আগ্রহ আবার ফিরে পান নাসির। হাসানদের ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’ সওগাতের পাটাতন থেকেই সচল হয়। এভাবে প্রগতিশীল ধারার সাহিত্য পৃষ্ঠপোষণায় ঢাকায়ও মধ্যমণি হয়ে ওঠেন সওগাত সম্পাদক। এখানে হাসান প্রচুর লিখেছেন। অনেককেই লিখিয়েছেন। তাদের কেউ নবীন, কেউবা প্রবীণ।
পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদের সভাপতি ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ফয়েজ আহমদ। সেই সংসদের আড্ডায় দুই শতাধিক সভ্য হাজির হতেন। তাদের একেকজন আগে-পরে বাংলাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির দিকপাল, যেমন— আবুল হোসেন, শওকত ওসমান, আলাউদ্দিন আল-আজাদ, সরদার জয়েনউদ্দীন, ফজলে লোহানী, বদরুদ্দীন ওমর, আনিসুজ্জামান, মুনীর চৌধুরী, শামসুর রাহমান, আশরাফ সিদ্দিকী, খালেদ চৌধুরী, আল মাহমুদ ও সৈয়দ শামসুল হক। সওগাতের কর্মী হিসেবে, সংসদের সভ্য হিসেবে তাতে থাকতেন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। স্মৃতিচারণায় তিনি লিখেছেন, ‘আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ আড্ডা ছিল সওগাতের আড্ডা। পঞ্চাশের দশকের এ আড্ডা ভেঙে যাওয়ার পর বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডা জমে ওঠে।’
সওগাতের সাহিত্য আড্ডা থেকেই অনেকের লেখকজীবনের অভিমুখ উন্মোচিত হয়। এ বিষয়ে সৈয়দ শামসুল হকের বিবরণ, ‘লোহানীর হাত ধরেই সওগাত প্রেসে আমার প্রথম যাওয়া, কোনো সাহিত্যসভায় সেই আমার প্রথম বসা, সংসদের সেসব বৈঠকে তখন লেখকদের এত ভিড় যে পড়ার ইচ্ছে প্রকাশের দু-চার মাসের মধ্যেও ঠাঁই পাওয়া যেত না পাঠের তালিকায়— সভায় গিয়েই দেখি বসে আছেন লোহানী— দূর থেকে দেখিয়ে নাম বলে গেলেন— আলাউদ্দিন আল আজাদ! শামসুর রাহমান! হাসান হাফিজুর রহমান! আবদুল গণি হাজারী! আর ওই যে আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন!’
সওগাত সম্পাদকের আশ্রয়-প্রশ্রয় দারুণভাবে পায় সংসদ। মজবুত ভিত্তি পায়। তাই তো ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে এসে ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’ ঢাকার কার্জন হলে প্রথম সম্মেলন করতে সক্ষম হয়। প্রগতির পক্ষে সওগাত ও তার সম্পাদকের ভূমিকা তখনকার পাকিস্তানি শাসকরা পছন্দ করেনি। পুলিশি তল্লাশির মুখে পড়তে হয় নাসিরকে। প্রগতিশীল সাহিত্যিকরা তখন পাকিস্তানি শাসকদের চোখে বামপন্থী। আর তাদের আড্ডা-আস্তানা তো সওগাতই। তারা সাহিত্যে, দর্শনে, শিল্পে সমাজ বদলের কাজ করে। রক্তচক্ষু থেকে রেহাই পেয়ে যান নাসির। সঙ্গে সঙ্গে তার সওগাত। তিনিও পঞ্চাশের সেই সওগাত দপ্তরে গণদরখাস্ত মেনে নিয়ে হাসানদের দুপুরের খাবার আর তামাকের খরচ জোগান দিতে থাকেন। এখানেই কলকাতা যেনবা ঢাকা। নজরুলদের বদলে প্রশ্রয়ে আছেন হাসানরা।






