মানুষটার মৃত্যুর আগে তার বউয়ের প্রেমিক কাদিরের মনে হয়, ‘একটি সত্য ওর জেনে যাওয়া উচিত, প্রায় দুই বছর বয়সী যে নাহিনের ছোট্ট নরম হাত নিয়াজ ধরে রেখেছে, সে তার সন্তান নয়।’

আমি কাদির। শাকিলার স্বামী নিয়াজ আমার বন্ধু। বন্ধুত্বের বয়স প্রায় দেড় যুগ।

নিয়াজের ৩৫ বছর বয়সী চোখের দৃষ্টি নাহিনের মুখের ওপর স্থির। বিরূপ দৃশ্যের মধ্যে শিশুমুখ প্রায় ভাবান্তরহীন। এ অবস্থার মধ্যে পড়ে শিশু কী ভাবতে পারে, তার ব্যাখ্যা বড়রা যেভাবে করে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা ভুল হয়। মনে করা যাক, নিয়াজের মৃত্যুর তিন-চারদিন পর, যদি সে মারা যায়, নাহিনকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমার গুড্ডি যখন তুমার হাত ধরে তুমার মুখের দিক তাকায়েছিল তখন তুমার কী মনে হচ্ছিল?’ প্রশ্নটি শোনার পর নাহিন হয়তো প্রশ্নের অর্থই বুঝবে না। তাকে আবার জিজ্ঞেস করা হবে, কেন না বড়রা কোনো প্রশ্ন শিশুকে একবার করে হিসাবমাফিক উত্তর না পেলে মনে করে, তাদের পরাজয় হচ্ছে। দ্বিতীয়বার প্রশ্নটি করার পর নাহিন উত্তর দেয়, উত্তর দেয়ার সময় চোখ কুঁচকায়, যেন সেই সময়ের স্মৃতিকে চোখড়াচ্ছে, মুহূর্ত পরে চোখের দৃষ্টি স্থির করে তাকায় আমার দিকে এবং বলে, ‘লাল গাড়িটা কি তখন ঘুরছিল?’  

নাহিন তার বাবাকে বাবা না বলে কেন ‘গুড্ডি’ বলে ডাকে, তা শাকিলা, ঘটনার তিনদিন পর, তখন ও আমার বাহুবন্ধনে, ওর গ্রীবায় চুমু দিচ্ছিলাম, বলেছিল।

এক বন্ধের দিনের সন্ধ্যায় রান্নাঘরে শাকিলা চা করছিল, তাকে চমকে দেয়ার জন্য নিয়াজ পেছন দিক থেকে বেড়ালের ধরনে হেঁটে গিয়ে নিঃশব্দে রান্নাঘরে ঢোকে। শাকিলা টের পায়নি। সে বউয়ের গ্রীবায় চুমু দেয় এবং অবাক হয়, শাকিলা চমকে ওঠেনি, যেন বউ জানত। চুমু উপভোগ করতে থাকে। নিয়াজ তখন ভালোবাসার একটা ছোট কামড় দেয়। শাকিলা বলে, ‘এখন গুণ্ডামি ছাড়ো।’ নিয়াজ যখন রান্নাঘরের দিকে আসছিল, বাবার পেছন পেছন এসেছিল নাহিন। নিয়াজ খেয়াল করেনি, পুত্র পিতাকে অনুসরণ করছে, পুত্র তো ড্রইংরুমে ব্যাটারিচালিত লাল গাড়িটার চলা দেখছিল। শাকিলার বলা তিনটি শব্দের মধ্যে নাহিনের মনে ‘গুণ্ডামি’ নয় ‘গুড্ডি’ আটকে যায়। শিশুরা তাদের নিজের কমিউনিকেশনের জন্য নতুন শব্দ তৈরি করে। ‘গুণ্ডামি’ আর ‘গুড্ডি’র ধ্বনিত্বত্ত কেউ কেউ জানতে পারেন।

২.

মৃত্যুর আগে প্রতিটি মানুষ, সেজন বিপুল সম্পদের মালিক বা গরিব হোক না কেন, তার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার ও সম্পত্তির ভবিষ্যতের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকায়। নিশ্চয়তা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে ঘুরপাক খায় নিয়াজের চোখ। মনে করা যেতে পারে, তখন নাহিনের মুখের মধ্যে নিয়াজ খুঁজছিল এক আশার বাস্তবতা। আশা নিয়ে বেশি কথা বলা ভালো নয়।

নিয়াজের চোখের স্থিরতার মধ্যে থেকে নিঃশব্দে ঝরে পড়ছে কান্না। নাহিন নির্বিকার। গুড্ডি তার দিকে তাকিয়ে কেন কাঁদছে, সঠিক কারণ বোঝার বয়স শিশুর হয়নি। তবে সে তার ডান হাতটা বাবার ঠাণ্ডা ডান হাতের মুঠো থেকে একবার বের করার চেষ্টা করে। ডান হাত ধরা কি মানুষকে বেশি আস্থা দেয়? হতে পারে। বাবার হাতটা, নাহিনের হাতের নড়াচড়া টের পেয়ে, যেন শেষ অবলম্বন, আরো একটু জোরে আঁকড়ে ধরে। নাহিন কী ভেবে বাম হাত দিয়ে পরম আদরে গুড্ডির চোখ মুছে দেয়। হয়তো তার স্মৃতির দৃশ্যে আছে, যখন মা বকা দিত, সে কাঁদত, তার কান্নার সময়, ওইভাবে তার চোখ মুছে দিত গুড্ডি। নাহিনের চোখের দিকে কেউ তাকালে বুঝতে পারবে— ও কিছু একটা নিয়ে বেশ চিন্তিত। হতে পারে সে অনুমান করতে পারছে, তার বাবার খুব অসুখ। হতে পারে সে চিন্তা করছিল, তার ব্যাটারিচালিত লাল গাড়িটা ঘুরছিল কিনা।

৩.

রাত ৯টা। শহরের এক নাম করা হাসপাতালের কেবিনের বিছানায় নিয়াজ শুয়ে আছে। উত্তর দিকে মাথা, পা দক্ষিণে। শাকিলা আর নাহিন পশ্চিমে। আমি পুবে। আমার আর শাকিলার মাঝখানে নিয়াজের নিঃসাড় শরীর। মুখোমুখি বসলে যা হয়, আমি আর শাকিলা মাঝেমধ্যে পরস্পরের চোখ দেখছি, মুখ দেখছি।

         মনের সভ্যতা বলে একটি কথা আছে। অসভ্যতা বলেও একটি কথা আছে। এ অবস্থার মধ্যে নিয়াজের মুখের দিকে ঝুঁকে পড়া, বোধহয় শাকিলা কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে চাইছিল, আমার চোখ পড়ে ওর স্তনের বিভাজিকা রেখায়, তখন ওইখানে আমার ইচ্ছে হয়েছিল চুমু দিতে। ইচ্ছেটা হতেই নিজেকে বলি: ‘রিপু সভ্য হও।’

কিছুক্ষণ আগে পারুল, আমার বউ, বাসায় চলে গেছে। বাসায় গিয়ে মেসেজ করেছে: ‘রাত করো না, জেগে থাকব।’  মেসেজটি আমি দেখালাম শাকিলাকে। তার মন ভালো নেই। ভালো থাকার কথাও নয়। ‘প্রতি রাতেই তোমাকে তার দরকার?’ শাকিলা দাঁত কামড়ে বলেছিল। কণ্ঠ উঁচু ছিল না। মৃত্যুমুখী নিয়াজ শুনে চমকে উঠেছিল। বোঝেনি। বোঝার কথা নয় কী বলল তার বউ। আমি কেবিনের বাইরে গিয়ে শাকিলাকে মেসেজ করলাম: ‘তোমার চাহিদা থাকলে ওর থাকবে না?’ আমি হাসপাতালের আটতলার করিডোরের জানালার সামনে এসে দাঁড়াই। দৃষ্টি নিচের রাস্তায়। ট্রাফিক জ্যামে আটকে থাকা গাড়িগুলোর দিকে। অপেক্ষা করছি, পারুল হয়তো একটা উত্তর পাঠাবে। আবার লিখলাম: ‘এই সময়ে আমরা এইসব ভাবছি কেন?’ আমি যে কিছুক্ষণ আগে ভেবেছি সে কথা মনে এল না। মনে হলো: ‘মৃত্যু আর যৌনতার মধ্যে কোনটার জয় হয়?’

৪.

শাকিলাকে কিছুক্ষণ আগে ডাক্তার বলে দিয়েছে, ‘আজ রাতটা যাবে কিনা সন্দেহ।’ আত্মীয়দের খবরটা জানানো হয়েছে। আত্মীয়রা চলে আসার আগেই আমার মনে হয়, সত্য কথাটি নিয়াজের জেনে যাওয়া ভালো। শাকিলা একবার কোনো জরুরি কাজে আত্মীয়স্বজন আসার আগেই যদি বাইরে নার্সদের অথবা ডাক্তারের রুমে যায়, তখনই বলা ভালো হবে। শিশু নাহিন কথাটি শুনলেও বুঝতে পারবে না তার প্রিয় কাদির কাকু গুড্ডিকে কী বলল। ‘তার সন্তান নয়’, এ কথা শোনার পর নিয়াজ কি প্রশ্ন করবে, যদি তার কথা বলার শক্তি থাকে, ‘আমার নয় তবে কার?’ তখন আমার উত্তর হবে: ‘নাহিন আমার সন্তান।’ বলার পর আমার মনে হতে পারে, ‘মানুষ পিতৃত্বের অধিকার পেতে চায় কেন? উত্তরাধিকারের প্রতি মানুষের আকাঙ্ক্ষা কখনো শেষ হবে না। আমি কেন একটি সন্তান চাই, কারণ আমি জানি।’

আমার কোনো সন্তান নেই। সমস্যাটি পারুলের। অনেক পরীক্ষার পর বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আমাকে পারুলের সামনেই বলেছেন: ‘আপনার স্ত্রীর ভ্রূণ তৈরি হতে না হতেই নষ্ট হয়ে যায়। তবে আমরা আশা ছাড়ব না। প্রতিদিন উন্নত হচ্ছে চিকিৎসাবিজ্ঞান। হতাশ হবেন না।’

৫.

হঠাৎ কেন যে কথাটি মাথায় এল, মৃত্যুর আগে সত্যটি নিয়াজের জেনে যাওয়া উচিত। সত্যটা বারবার আমাকে জেরা করছে। আমি শাকিলার মুখ দেখছি। আমি তো জোর করে শাকিলাকে শয্যায় নিইনি, আমাদের মধ্যে প্রেম হয়েছে, দুজন দুজনকে ভালোবাসি। বারবার মনে হচ্ছে, একটি সত্য জেনে বন্ধু মরে যাক। সত্য ও মিথ্যা জেনে মরলে ক্ষতিই-বা কী, লাভই-বা কী?’ আমি এ প্রশ্নের উত্তর জানি না। শাকিলা কয়েকবার জিজ্ঞেস করেছে: ‘কী নিয়ে চিন্তা করছ, আমাকে বলো?’ প্রশ্ন এড়িয়ে গেছি। বন্ধু প্রিয় কিন্তু প্রেম বন্ধুত্বের কোনো শর্ত মনে রাখে না, মানে না। আমি কি নিজেকে এ কথা বলে নিজের থেকে পালানোর একটা আপাত পথ খুঁজছি?

৬.

একদিন শাকিলা আর আমি, সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিল, অফিসের কী একটা কাজে নিয়াজ ছিল কক্সবাবাজারে, শারীরিক প্রেমে ভিজে যাচ্ছিলাম। ব্যস্ততার একপর্যায়ে, নারীর মনোরঞ্জনে এবং নারীকে নিজের জন্য পেতে পুরুষ কী কী বলে তার একটা উদাহরণ, যা খুব কার্যকর, বলেছিলাম। ‘নারীর সঙ্গে পরিচয়ের দু-একদিনের মধ্যে বলতে হয়, আপনি আসলে বুদ্ধিমতী, আপনার বুদ্ধিকে শ্রদ্ধা করতেই হবে।’ কিন্তু পরের সিদ্ধান্তটি পুরুষ বিশ্বাস করে, নারীকে কখনো বলে না, ‘নারী মাত্রই ছাগল পর্যায়ের।’ সেই বৃষ্টির রাতে শাকিলা বলেছিল, ‘হ্যাঁ, মনে পড়ছে তুমি প্রথম আলাপের দিন আমাকে এ কথা বলেছিলে আর আমি খুব খুশি হয়েছিলাম, আগে কেউ আমার যে ভালো বুদ্ধি আছে বলেনি, নিয়াজও কখনো বলেনি।’ শাকিলা হেসে বলেছিল, ‘এই ডান স্তনে চুমু দাও।’ মৃত্যুমুখী নিয়াজের পাশে বসা শাকিলার মুখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো আমার মনে পড়ছে।

মনে পড়া কথার জন্য আমার ঠোঁট নড়ে, যেন বিড়বিড় করছিলাম। ভ্রু-পল্লব নাচিয়ে শাকিলা বলতে চাইল: ‘কিছু বলবে?’ কিছুক্ষণ আগে মেসেজ ও কথাপর্বে যা হলো, মনে হয় তার জন্য শাকিলা নিজেকে দোষী মনে করেছে। ভ্রু-পল্লব নাচিয়ে কথা জিজ্ঞেস করা, হতে পারে, দোষ মোছার ডিভাইন পলিসি।

৭.      

শাকিলা আর কাদিরের মধ্যে একটা রহস্যময় গোপন সম্পর্ক আছে, তা অনুমান করত, সন্দেহ করত নিয়াজ কিন্তু কখনো ওদেরকে প্রশ্ন করেনি। এসব ক্ষেত্রে প্রশ্ন করার জন্য প্রত্যক্ষ প্রমাণ লাগে। নাহিনকে দেখে, বন্ধুদের আড্ডার মধ্যে দু-একজন হাসতে হাসতেই নিয়াজের সামনেই বলেছে, ‘নিয়াজের চেহারার সাথে নাহিনের চেহারার একটুও মিল নেই, মিল আছে কাদিরের থুতনি ও নাকের সাথে।’ কথাটি শুনে নিয়াজ হেসেই বলেছে, ‘মনে হয় আমার বন্ধুর প্রেমে পড়েছে আমার বউ, সবসময় কাদিরের কথা মনে করে জন্যে ছেলে দেখতে হয়েছে কাদিরের মতো, দোস্, সাবধান করে দিচ্ছি, এদিক তাকালে তোর বউকে নিয়ে বান্দরবানে চলে যাব।’ হাসতে হাসতে সবার সামনে কাদিরের বউ পারুল জিজ্ঞেস করেছে নিয়াজকে, ‘বান্দরবানে কেন, আরো সুন্দর জায়গা আছে না?’ কথায় ও কাজে চটপটে নিয়াজের উত্তর ছিল: ‘মানুষের পূর্বরূপ ছিল বানর, মহান চিন্তাবিদ ডারউইনের তত্ত্ব মাথায় রাখতে হবে, বানরের কাছে গেলে বিপদ কম। উত্তরাধিকারকে বান্দরবানের বানররা দেখে রাখবে, কী বলিস কাদির?’ কথার সময় নাহিন সামনে এল, নিয়াজ আড়চোখে একবার কাদির, একবার নাহিনের মুখ দ্রুত দেখেছে। ওদের থুতনি ও নাকের সাদৃশ্য আছে।

৮. 

‘শাকিলার আড়ালে নিয়াজকে সত্যটা বলা কি ঠিক হবে? কথাটি শোনার পর ও কি খুব রিঅ্যাক্ট করবে?’ কথাটি শোনার পর পরই এক মুহূর্তেই নিয়াজ একটা অস্ফুট আর্তনাদ করতে পারে, ‘কী কী ব ল লি’, যা নাহিন বুঝবে না, বলেই মরে যেতে পারে। আবার এমনও হতে পারে, ডাক্তারের ও অসুখের সব হিসাবনিকাশ উল্টে গেল, নিয়াজ কথাটি শোনার পরই সুস্থ মানুষের মতো জেগে উঠল এবং বলল: ‘আমি জানতাম।’ যদি সত্যি নিয়াজ বলে এবং তার পাশে বসে থাকা নাহিন বাবার কথাটি শোনার পর তার বাবাকে শিশুসুলভ কৌতূহলে জিজ্ঞেস করে: ‘কী জানো গুড্ডি?’ প্রশ্নটা শুনে নাহিনের হাতটা ছেড়ে দিয়ে অসুখে শুকিয়ে যাওয়া, নেতিয়ে পড়া তর্জনী তুলে যদি নিয়াজ তার ছেলেকে ভেঙে পড়া ফ্যাসফেসে কণ্ঠে বলে: ‘তোমার কাদির কাকু তোমার বাবা, আমি না।’ এ কথাটি শোনার পর নাহিন হয়তো একবার তাকাবে কাদিরের দিকে, একবার নিয়াজের দিকে। এক বিমূঢ়তা কিছুক্ষণের জন্য শিশুর চোখের দৃষ্টিকে অবাক করে দিতে পারে। এবং তার মনে হতে পারে, কাদির কাকু কি তাকে লাল গাড়ি কিনে দেবে?

তখন কাদির কী করবে? কিন্তু কাদির তো শুধু নিয়াজের কানে কানে বলবে: ‘নাহিন তোর সন্তান নয়।’ মৃত্যুপথের মানুষ নিয়াজ, ক্লান্ত অসুস্থ স্বরে ‘আমি জানতাম’ বলার পর যদি বলে, ‘কাদির, বন্ধু আমার, তুই-ই নাহিনের বাবা, আমি জানি, আমি শাকিলাকে বলব।’ তখন শাকিলা কী করবে? শাকিলা বলতে পারে, ‘মিথ্যে কথা। কাদির ভাই এখান থেকে বের হয়ে যান। প্রত্যেক মা জানে, সন্তানের বাবা কে।’ শাকিলা কথাটি বলে নিজেকে বলবে: ‘যে মানুষটা মরে যাচ্ছে, তার কাছে সত্য আর মিথ্যার কী দাম?’ 

এমনও হতে পারে, কথাটি শোনার পর কাদিরের মুখের দিকে নিয়াজের শূন্যতাভরা চোখ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে পারে। হয়তো কোনো কথা বলার সব শক্তি তখন বোবা হয়ে যাবে। যদি তা-ই হয়, কাদির নিজেকে বলতে পারবে— একটি সত্য জানার পর বন্ধুর মৃত্যু হলো।

শাকিলার হাত থুতনিতে। কনুই নিয়াজের কোমরের কাছে। মুখের ওপর সাদা আলো। মুখটা বিষণ্ন। চোখ কাঁদছে না। যখন তখন কাঁদতে পারে। কাদিরের ইচ্ছে হয়, শাকিলার মুখ পানি দিয়ে ধুয়ে দিতে। যদি ওর মুখ প্রসন্ন দেখায়, কাদিরের ভালো লাগবে। ‘এখন কেন আমার ইচ্ছে হচ্ছে ওকে আদর করতে?’

কেন আমাদের শারীরিক উদ্যোগ পর্বের মধ্যে যেসব কথাবার্তা হতো, হাসি-ঠাট্টা হতো, এখন মনে পড়ছে?

‘তুমি কামসূত্র ভালো মতো পড়েছ’— শাকিলার কথা শুনে কাদির, ‘শুধু পড়িনি, অনুশীলনও করেছি।’

 শাকিলা, ‘তা তো বুঝতেই পারি।’ 

কাদির, ‘নিয়াজকে দেখে কোনো মেয়ে বলবে না, ও চাহিদা পূরণ করতে পারে না।’

‘না না, ও পারে কিন্তু তোমার মতো শিল্পকলা জানে না।’ শাকিলার কথাগুলো শেষ হতেই কাদির বলত, ‘পৃথিবীর মধ্যে জীবিত শ্রেষ্ঠতম শিল্পকর্ম হচ্ছে নারী; তার সেবা, পরিচর্যা যে পুরুষ জানে না, সে উত্তম পুরুষ নয়।’

‘এখন আর তত্ত্ব বলো না।’ শাকিলা হাসত।

৯.

নাহিনের হাতের মধ্যে নিয়াজের হলদেটে আঙুল কেঁপে ওঠে। নাহিন ডাক দেয়, ‘গুড্ডি।’ ছেলের ডাক শুনে মানুষটার দুই চোখ ভিজে যায়। চোয়াল বেয়ে অশ্রু পড়ে। শাকিলা একটি সাদা ভেজা তোয়ালে দিয়ে নিয়াজের চোয়ালে গড়িয়ে পড়া কান্না, খুব যত্নে, যেন ব্যথা না পায়, মুছে দেয়।

কান্না মুছে দেয়ার দৃশ্য দেখে কাদিরের মনে পড়ে, প্রায় আড়াই বছর আগে শাকিলার বুকের ওপর মাথা রেখে সে কেঁদেছিল এবং তখন শাকিলা খুব যত্নে তার চোখ আর চোয়াল মুছে দিয়ে চুমু খেয়েছিল। কান্নার কারণ ছিল: মা হতে পারবে না, সেজন্য প্রায় প্রতি রাতে কাদিরের বুকের ওপর মাথা রেখে পারুল কান্নাকাটি করে। পারুলের কান্না কাদিরকে কাঁদায়। শাকিলা শুধু সান্ত্বনা দিত কাদিরকে: ‘চিকিৎসা তো চলছে, আল্লাহ মুখ তুলে তাকাবেন।’ যদিও কোনো পুরুষকে কাঁদতে দেখলে শাকিলার হাসি পায়। 

নিয়াজের ঠাণ্ডা চোখ এমনভাবে ঘুরছে যেন ঘরের সবকিছু, এ মরজগতের ভালো ও মন্দ পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার আগে, দেখে যেতেই হবে। দেখার কোনো বিকল্প নেই। দৃষ্টি কখনো নাহিন, কখনো শাকিলা, কখনো দেয়ালের ক্যালেন্ডারের দিকে, কখনো ঘূর্ণায়মান ফ্যানের দিকে, যেন তাকে মৃত্যুর পর কোনো এক চিররহস্যকে বলতে হবে, ঘরের কোথায় কী ছিল। দু-একটি কথাও বলছে। কথা অস্পষ্ট। কেউ শুনলে বুঝবে স্বরও কাঁদে।

নিয়াজের ঠোঁট নড়ছে। নাহিনের হাত ছেড়ে হাত বাড়ায় কাদিরের দিকে। হাত কাঁপছিল। কাদির নিজেই হাত বাড়িয়ে প্রেমিকার স্বামীর হাত ধরে। ‘কিছু বলবি, বল?’                                                                                                     

নিয়াজ কিছুই বলে না। কাদিরের হাতটা শক্ত করে ধরে। হাত উষ্ণ। মৃত্যুর আগে জীবনের উষ্ণতা শেষবারের মতো অনুভব করতে নিয়াজের ভালো লাগে। কাদিরের হাতের শিরার মধ্যে একটা অচেনা ঠাণ্ডার ক্ষীণ স্রোত বয়ে যায়। কাদিরের একবার মনে হয়, নিয়াজ কি এখন বলবে, ‘শাকিলাকে তুমি দেখো, আমি জানি নাহিন তোমার ছেলে।’ “যে বন্ধু ‘তুই’ বলত, সে এ সময় কেন ‘তুমি’ বলবে? নিয়াজ মরে যাওয়ার আগে বন্ধুকে তুমি বলে একটা দূরত্ব তৈরি করে যাবে না তো?’

‘কিছু বলবে?’ প্রশ্নটি করে শাকিলা। তার ডান কান নিয়াজের মুখের কাছে নিয়ে যায়। একটা দীর্ঘশ্বাসের উষ্ণ বাতাস শাকিলার মুখে লাগে। নিয়াজের শুকনো ঠোঁটে মৃদু হাসি দেখা যায়। চোখ থেকে অশ্রু গড়ায়।

কাদিরের মনে হয়, নাহিনকে নিয়ে কেবিনের বাইরে যাওয়া উচিত। শাকিলার ইচ্ছে হতে পারে, মৃত্যুর আগে নিয়াজকে চুমু দেয়ার। প্রেমিককে চুমু দেয়ার জন্য সামনে পড়ে আছে অনেক দিন।

নাহিন তার লাল গাড়িটার চাবি দিল। কেবিনের মেঝের ওপর ঘুরছে।