ডাচ ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানিকে
দাপ্তরিকভাবে বলা
হতো ইউনাইটেড
ডাচ ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানি,
যা ছিল
অনেক করপোরেট
কোম্পানির একটি
মিলিত রূপ।
করপোরেট কোম্পানিগুলো
নিজেদের ভেতরে
পরস্পরের প্রতিযোগী
হলেও ১৭
শতকের শুরুর
দিকে একত্র
হয়ে ইতিহাসের
সবচেয়ে বড়
কোম্পানি তৈরি
করেছিল। পৃথিবীর
ইতিহাসে ডাচ
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানি ব্যবসার
ক্ষেত্রে ভিন্ন
ভিন্ন কোম্পানির
মধ্যে ভার্টিকল
ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে
বিশ্বব্যাপী পণ্যের
চালান ও
সরবরাহের ক্ষেত্রে
প্রচীনতম নাম,
যা মূলত
আজকের দিনের
বিশ্বায়নের সূচনা
পর্বের কাজ
সমাধা করেছিল।
ভারতীয় মসলা,
ইন্দোনেশিয়ার কফি,
তাইওয়ানের আখ
ও দক্ষিণ
আফ্রিকার ওয়াইন
ছাড়াও আরো
বহু দ্রব্যাদি
উৎপাদন ও
বিক্রির মাধ্যমে
ডাচ ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানি
দীর্ঘদিন ব্যবসায়
টিকে ছিল।
ইতিহাসে ডাচ
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানিকে বড়
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে
ভূমিবিহীন ও
আদর্শসম্বল একটি
দেশ হিসেবে
পাওয়া যায়।
যদিও কোম্পানির
মূল উদ্দেশ্য
ছিল ব্যবসার
মাধ্যমে লাভ
করা, কিন্তু
ক্রমে স্পষ্ট
হয়ে ওঠে
যে এটি
সরকারের মদদপুষ্ট
ও সেনাবাহিনীর
মাধ্যমে পরিচালিত
এক কোম্পানি।
তাই কোম্পানিটি
যতটা না
লাভজনক ছিল
ঠিক ততটাই
ব্যস্ত ছিল
নিজেদের আদর্শ
মানুষের মধ্যে
প্রবেশ করানো
এবং ব্যবসার
সঙ্গে জড়িত
একাধিক দেশের
মধ্যে সাংস্কৃতিক
আদান-প্রদানে।
অর্থাৎ কোম্পানি
আর্থিক উন্নতির
উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত
হলেও দূর
দেশের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে
অবলীলায় মানুষকে
অংশগ্রহণ করিয়ে
একীভূত করতে
সক্ষম হয়।
ডাচ জাহাজ
পৃথিবীর প্রত্যেক
কোণ স্পর্শ
করে কেবল
ব্যবসার খাতিরেই
হয়তো, তবে
তার সঙ্গে
তারা জ্ঞান
ও আদর্শ
আদান-প্রদান
ঘটায়। পৃথিবীব্যাপী
দাপিয়ে বেড়ানোর
কারণেই হয়তো
ডাচ মানুষ
পৃথিবীতে প্রথম
মানচিত্রের ব্যবসায়
নামে।
ডাচদের স্বর্ণযুগে
(১৫৮৮-১৬৭২)
জাতিটি ব্যবসা,
মানচিত্র অঙ্কন,
জাহাজ প্রস্তুত,
সমুদ্রে বিচরণ,
দিকনির্দেশনা ইত্যাদি
বিষয়ে পৃথিবীতে
সবার থেকে
এগিয়ে থাকে।
ওই সময়ের
মধ্যেই তারা
সারা পৃথিবীতে
ভ্রমণ করে
নিজেদের ভাষা
ও সংস্কৃতি
দিয়ে অন্যের
ভাষা ও
সংস্কৃতিতে ছাপ
রেখে আসতে
সক্ষম হয়।
১৬৩৮ সালে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কোরিয়ায় ও জাপানের নাগাসাকির কৃত্রিম দ্বীপ, দেজিমায় ব্যবসা শুরু করে। ফলে সেসব দেশের সংস্কৃতিতে ডাচ সংস্কৃতি ব্যাপক প্রভাব রাখে। এ ব্যবসার ফলে জাপানে আধুনিক ওষুধপত্র সরবরাহ করা সম্ভব হয়। উল্টোদিকে জাপানের নাগাসাকিতে যে কাগজ দাপ্তরিক কাজে ব্যবহার করা হতো, ডাচ কোম্পানি তা আমদানি করে নিয়ে যায়। ডাচ স্বর্ণযুগের শিল্পচর্চায় এ কাগজের বিশেষ গুরুত্ব আছে। ডাচ স্বর্ণযুগের চিত্রশিল্পী রেমব্র্যান্ট ওই বিশেষ জাপানি কাগজে তার বিখ্যাত শিল্পগুলো তৈরি করেন। সাধারণ আঁকিবুঁকি করার জন্যেও তিনি ওই কাগজ ব্যবহার করতেন। অনুজ্জ্বল ও খসখসে পশ্চিমা কাগজের বিপরীতে খানিকটা চকচকে, হলদে আর মসৃণ জাপানি কাগজ ছিল তার পছন্দের। কাগজটির প্রধান উপাদান ছিল মিতসুমাতা গাছের বাকল। অন আরো কিছু গাছের বাকল একসঙ্গে পানিতে ভিজিয়ে আঁশযুক্ত মণ্ড তৈরি করে কাগজটি বানানো হতো। জাপানে এখনো হাতে বানানো এ কাগজের চাহিদা আছে। এ কাগজে গাছের বাকলের আঁশের অস্তিত্ব খালি চোখে দেখা যায়। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জাপানের হাতে বানানো কাগজ নেদারল্যান্ডস ছাড়া ইন্দোনেশিয়া ও তাইওয়ানে রফতানি করত।
রেমব্র্যান্টের শিল্পে
ভারতের মোগল
সাম্রাজ্যের আচার-আচরণ
ও নানা
দৃশ্যকল্প উঠে
এসেছে। সেখানে
ডাচ ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানি
মারফত পাওয়া
শিল্পের জাদুঘরও
আছে, যেখানে
রেমব্র্যান্টের আঁকা
শিল্পকর্ম শোভা
পায়। অথচ
রেমব্র্যান্ট কিন্তু
কখনো ভারতে
আসেননি। কেবল
ভারত থেকে
ডাচ ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানি
বাংলা, মালাবর
সৈকত ও
গুজরাটে ঘাঁটি
স্থাপন করার
সময়ে সেসব
জায়গা থেকে
সংগ্রহ করা
জিনিসপত্র, ছবি,
বইপত্র দেখেই
তিনি মোগল
আমলের মোগল
কায়দায় করা
শিল্পকর্মের প্রতি
আকৃষ্ট হন।
এছাড়া চায়নিজ
ও জাপানি
পোর্সেলিনও সে
সময়ে ডাচ
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানি আমদানি
করে, যাতে
স্বর্ণযুগের আরেক
বিখ্যাত শিল্পী,
জ্যান ভারমির
অঙ্কন করেন।
ব্রিটিশ মিউজিয়ামে
পোর্সেলিনের ওপর
তার বেশকিছু
শিল্প সংরক্ষিত
আছে। অঙ্কনচিত্রগুলো
ভারতীয় পরিবেশ
ও ধর্মের
নানা চিত্রকল্প
তুলে ধরেছে।
১৬১৯ সালে
জাকার্তায় ঘাঁটি
তৈরি করা
কোম্পানিটি জাকার্তা
বাটাভিয়া নামে
পরিচিতি লাভ
করে। তাদের
প্রধান কাজ
ছিল জাভা
এবং তার
কাছের ছোছো
দ্বীপগুলো দখল
করা। ১৭
শতাব্দীর দিকে
তারা তাদের
ব্যবসা ও
আমদানি-রফতানির
কার্যক্রম কমিয়ে
দিয়ে কেবল
ক্ষমতার সাহায্যে
জাভা দখল
করায় মনোনিবেশ
করে। ১৭
শতকের দিকে
কোম্পানিটি ব্যবসায়িক
প্রতিষ্ঠান থেকে
ইন্দোনেশিয়ার কৃষিকাজে
ব্যবহূত উপাদান
প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান
হিসেবে আত্মপ্রকাশ
করে। তার
কিছু পরে
কোম্পানি প্রচুর
দেনার দায়ে
পড়ে দেউলিয়া
হয়ে যায়।
১৭৯৯ সালে
ডাচ সরকার
ইন্দোনেশিয়া থেকে
কোম্পানিকে সরিয়ে
নিতে বাধ্য
হয়।
শ্রীলংকায় পর্তুগিজ
উপনিবেশকারীদের হটিয়ে
ডাচ ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানি
উপনিবেশ তৈরি
করে। শ্রীলংকার
মানুষ তারা
যতদিন টিকবে
ভেবেছিল তার
থেকে অনেক
বেশি দিনব্যাপী
তারা ক্ষমতা
টিকিয়ে রাখে।
বস্তুত ডাচদের
কিছু বংশধর
সেখানে তৈরি
হয়, যারা
বার্ঘারস নামে
পরিচিত। ডাচ
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানি তাদের
১৪০ বছরের
শাসনের মধ্যে
নিজেদের ভাষাকে
শ্রীলংকার প্রধান
ভাষা হিসেবে
প্রচলনের চেষ্টা
করে। কিন্তু
পর্তুগিজরা আগেই
সেখানে সাধারণ
যোগাযোগের জন্য
পর্তুগিজ ভাষা
প্রবর্তন করে
গিয়েছিল, তাই
ডাচদের চেষ্টা
বৃথা যায়।
তবে শ্রীলংকায়
ডাচদের প্রভাব
প্রতিপত্তি কমে
না, বরং
ডাচ-সিলোন
নামে প্রতিষ্ঠানের
উদ্ভব ঘটে।
১৬০৯ সালে
ইংরেজ সমুদ্র
জাহাজের ক্যাপ্টেন
হেনরি হাডসনকে
ডাচ ইস্ট
ইন্ডিয়া কোম্পানি
নিয়োগ করে।
তার নেতৃত্বে
নেদারল্যান্ডসে অবস্থিত
দপ্তর থেকে
স্ক্যান্ডিনেভিয়া ও
রাশিয়া ঘুরে
তারা এশিয়ায়
আসার উত্তর-পূর্ব
পথ খুঁজে
বের করে।
রুট খুঁজে
বের করার
কারণে তা
হাডসন রিভার
নামে পরিচিতি
লাভ করে।
এভাবে বিভিন্ন
সময়ে অস্ট্রেলিয়া,
তাসমানিয়া, নিউজিল্যান্ড
ও কাছাকাছি
আরো বহু
দ্বীপ ডাচ
ইন্ডিয়া কোম্পানি
পরিদর্শন করে
মানচিত্র তৈরি
করে। একইভাবে
দক্ষিণ আফ্রিকাসহ
আশপাশের স্থানে
ভ্রমণ ও
মানচিত্র তৈরির
জন্যও ডাচ
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানির কৃতিত্বের
কথা জানা
যায়।
পৃথিবীতে ব্যাপক
বাণিজ্য বিস্তার
ও বহু
কিছু প্রবর্তনের
পরও ডাচ
ইস্ট ইন্ডিয়া
কোম্পানিকে নিয়ে
সমালোচনার উপলক্ষের
শেষ নেই।
বিভিন্ন ভূখণ্ডে
ঔপনিবেশিক সরকার
প্রতিষ্ঠা, দাসপ্রথার
ব্যাপক চর্চা,
নিপীড়ন, পরিবেশ
দূষণ, বনাঞ্চলে
ধ্বংসযজ্ঞ ও
সাংঘাতিকভাবে স্বৈরাচারী
আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার
ব্যাপারে এ
কোম্পানির কথা
জানা যায়।
একচ্ছত্র আধিপত্য
বিস্তারের পথে
আসার বাধা
তারা চরমভাবে
মোকাবেলা করত।
আফসানা বেগম: কথাসাহিত্যিক





