২৫ নভেম্বর ১৭৫৯। এদিনের যুদ্ধটি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে সংঘটিত। এ যুদ্ধের সঙ্গে বাংলার ইতিহাসের একটি অংশ এবং ডাচ কোম্পানির নিয়তি জড়িয়ে আছে। সিরাজউদদৌলার সঙ্গে বিশ্ব্বাসঘাতকতা করে মীর জাফর আলী খান বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব হলেন। কিন্তু রবার্ট ক্লাইভের করুণার ওপর তার সিংহাসনের স্থিতি নির্ভর করছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ছাড় দিতে দিতে এক পর্যায়ে বেপরোয়া হয়ে তিনি ক্লাইভের মুঠি থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করেন এবং ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সঙ্গে যোগাযোগের একটি যোগসূত্র স্থাপনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। এ দুই কোম্পানির মধ্যে প্রতিযোগিতা ও বৈরিতা প্রকট হলেও তারা যুদ্ধে লিপ্ত ছিল এটা বলা যায় না। ইংরেজদের বাদ্যের সঙ্গে মীর জাফর আর নাচতে রাজি নন—এটা দৃশ্যমান হয়ে উঠছিল। তিনি ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সহায়তা কামনা করেন এবং ডাচ সৈন্য প্রবেশের অনুমোদন দেন। ওদিকে পলাশীর বিজয়ী বীর কর্নেল ক্লাইভকে ফরাসি বাহিনীর সঙ্গে মোকাবেলা করতে হচ্ছিল। ডাচ নেতারা মীর জাফরের মৌন আতিথ্য এবং ক্লাইভের ব্যস্ততার সুযোগে বাংলা ও সন্নিহিত অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে কৌশলী পদক্ষেপ নেন। তারা চুঁচুড়ায় সাতটি জাহাজ এবং দেড় হাজার ইউরোপীয় ও মালয়ি সৈন্য পাঠালেন। এ সৈন্যরা বাটাভিয়া (এখনকার জাকার্তা) থেকে এসেছে।

রবার্ট ক্লাইভের সঙ্গে এখন কলকাতায় মীর জাফরের বৈঠক চলছে। ডাচ কোম্পানির বাহিনী হুগলি নদীর মোহনায় পৌঁছল। বৈঠকে ক্লাইভ মীর জাফরকে বললেন, ডাচরা বাড়াবাড়ি শুরু করেছে। তিনি হুগলি গিয়ে ডাচদের দ্রুত প্রস্থানের নির্দেশ দেবেন। বৈঠকের পর মীর জাফর জানালেন, একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে তিনিই ডাচদের কিছু বাড়তি সুবিধা দিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তারা চলে যাবে। ধূর্ত ক্লাইভ হিসাব করে ফেললেন। ডাচরা তখন চুঁচুড়ায় সৈন্য জড়ো করতে শুরু করেছে এবং সেখানে একটি সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে, যা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্য হুমকিস্বরূপ। তখন ক্লাইভের হাতে ছিল চারটি জাহাজ। সে সময় ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সৈকতে টহলদানের দায়িত্বে নিযুক্ত অ্যাডমিরাল কর্নিয়ের সাহায্য প্রার্থনা করে দুজন মুখপাত্র পাঠালেন। কিন্তু ডাচরা পথিমধ্যে জাহাজটি অবরোধ করে নিজেদের দখলে নিয়ে নিল। ক্লাইভ বুঝতে পারলেন শিগগিরই তাকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হবে। কারা তার পক্ষে লড়াই করতে আগ্রহী তিনি তাদের সম্মতি আহ্বান করলেন। এই ঘোষণা কার্যত মীর জাফরকে বিব্রতকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিল। ফরাসিদের চন্দননগর ঘাট ১৭৫৭ থেকে ক্লাইভের দখলে। যুদ্ধ তার ক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়। ক্লাইভ নৌপথে সশস্ত্র প্রহরা বাড়িয়ে ৫০০ সৈন্যের একটি বাহিনীর নেতৃত্বে কর্নেল ফ্রান্সিস ফোর্ডকে চন্দননগরের দিকে পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু ফোর্ডকে প্রদান করা তার নির্দেশনা ছিল ডাচদের বরাহনগর ফাঁড়ি থেকে সকলকে উচ্ছেদ করতে হবে এবং ডাচদের চন্দননগরমুখী যে কোনো অভিযান প্রতিহত করতে হবে। ২১ নভেম্বর ১৭৫৯ ডাচ সৈন্যরা হুগলি নদীর উত্তর তীরে অবতরণ করল এবং চুঁচুড়ার দিকে মার্চ এগোতে থাকল। একটি জাহাজ ডাচরা আগেই অবরোধ করায় ব্রিটিশদের হাতে থাকল তিনটি জাহাজ। ভিক্টর অব ডরসেট দ্য ক্যালকাটা এবং দ্য হার্ভউইক। এই তিনটি জাহাজ হুগলির নদীতে ডাচ জাহাজ লক্ষ্য করে এগোতে থাকল। সৈন্যদের নোঙর করিয়ে দিয়ে ডাচ জাহাজগুলো মোহনার দিকে যেতে শুরু করল। ২৩ নভেম্বর ব্রিটিশ বহরের চার্লস উইলসন এই জাহাজগুলো অধিকারে নিতে চেষ্টা করলে ডাচ বহরগুলো হামলার হুমকি দিল।

ক্লাইভ আলটিমেটাম পাঠালেন ডাচদের দখল করা ফাঁড়ি তাদের অবিলম্বে ছাড়তে হবে, নতুবা তাদের চূড়ান্ত পরিণতির জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ডাচরা আলটিমেটাম প্রত্যাখ্যান করে পরদিন ব্রিটিশ নৌবহরের সঙ্গে লড়াইয়ে লিপ্ত হলো। ব্রিটিশ জাহাজ ডিউক অব ডরসেট ডাচ ফ্ল্যাগশিপ ডিসিনজেনকে পরাস্ত করল আর হার্ভউইক ও ক্যালকাটা একটি জাহাজ অবরোধ করে অন্য দুটিকে তাড়া করল। হুগলি নদীর মুখে এসে পলায়নরত জাহাজ দুটিকে অবরোধ করতে সক্ষম হলো।

২৪ নভেম্বর দুপক্ষের গোলন্দাজ বাহিনীর লড়াই শুরু হলো। কর্নেল ফোর্ডের নেতৃত্বাধীন ব্রিটিশ বাহিনী ডাচদের চুঁচুড়ার দিকে ঠেলে দিল। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ থেকে আরো সৈন্য এসে ফোর্ডের বাহিনী ১২০০তে উন্নীত করল। মীর জাফর ১০০ সৈন্যের অশ্বারোহী বাহিনী পাঠালেন, তাদের কাজ ব্রিটিশদের সহায়তার ভান করা; কিন্তু তার গোপন আদেশ ছিল পর্যবেক্ষণ করে শেষ মুহূর্তে বিজয়ীদের সমর্থন করবে।

কর্নেল ফোর্ড তার হাতে বন্দি ডাচ সৈন্যদের কাছে জানতে পারলেন পরদিন বিপুলসংখ্যক ডাচ সৈন্য এবং গোপন সহযোগীরা ডাচ বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। ফোর্ড বিষয়টি রবার্ট ক্লাইভকে জানিয়ে তার নির্দেশ প্রার্থনা করলেন। ক্লাইভের কাছ থেকে বার্তা এল: ডিয়ার ফোর্ড, ফাইট দেম ইমিডিয়েটলি। ক্লাইভের রণাঙ্গন কমান্ড অত্যন্ত স্পষ্ট। ফোর্ড ক্লাইভকে ভালো বোঝেন। চুঁচুড়া ও চন্দন গরের  মাঝামাঝি বিদেরায় তিনি প্রস্তুতি নিলেন। ২৫ নভেম্বর সকাল ১০টায় ডাচ বাহিনী এসে গেল এবং বিদেরা গ্রামের ভেতর দিয়ে মার্চ করে এগোতে থাকে। ফোর্ড তার গোলন্দাজ বাহিনীকে আক্রমণের নির্দেশ দিলেন। গোলন্দাজ আক্রমণের মধ্য দিয়েও ডাচরা এগোতে থাকে। তারা একটি মাঠ পেরিয়ে সামনে সদ্য কাটা একটি খন্দকের সম্মুখীন হলো। ঠিক আগের দিন ব্রিটিশরা এ খাল খনন করেছে। তারা হতভম্ব হয়ে থেমে যেতে বাধ্য হলো। সামনের সৈনিকরা নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, পেছনের সৈন্যরা সামনে এগোনোর জন্য তাদের ঠেলছে। ফোর্ড তার সৈন্যদের আদেশ করলেন কেবল তাদের গুলির রেঞ্জের মধ্যে এলে ডাচ সৈন্যদের গুলি করে শুইয়ে দিতে হবে।

তাদের একমাত্র পথ পালানো এটা বোঝার আগেই ডাচ বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সৈন্য চুঁচুড়া প্রান্তরে লুটিয়ে পড়ে। নবাবের শত অশ্বারোহীকে নির্দেশ দেয়া হয় পলায়নরত ডাচদের হত্যা করার, কিন্তু তারা অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে।

ফোর্ড মনে করলেন, রণাঙ্গন ছেড়ে ডাচদের পলাতন ব্রিটিশদের জন্য পর্যাপ্ত জয়ের সাক্ষ্য দেয় না। তিনি পালানোর জন্য ছুটে যাওয়া প্রত্যেককে হত্যা করার নির্দেশ দেন। ডাচদের জন্য এ পরাজয় ছিল ভয়ংকর এক অভিজ্ঞতা। এ রণাঙ্গন থেকে মাত্র ১৩ জন ইউরোপীয় জীবিত অবস্থায় ফিরতে পেরেছে। কারো বর্ণনায় এ সংখ্যা ১৭।

চুঁচুড়ার এ বিজয় ব্রিটিশদের জন্য সবচেয়ে কনভিন্সিং বিজয়। লর্ড ক্লাইভ মীর জাফরের ভূমিকাটি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন। তিনি তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে নবাবের জামাতা মীর কাশিমের কাছে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য করলেন। তিনি মীর জাফরকে বিভিন্নভাবে অপদস্ত করলেন।

সিরাজউদদৌলাকে মসনদচ্যুত ও হত্যা করার পর যে দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল, চুঁচুড়া যুদ্ধের পর ঠিক তার উল্টোটা ঘটল। মীর জাফরের ক্ষমতা আরোহণের বর্ণনা দিয়েছিলেন চার্লস স্টুয়ার্ট। প্রাসাদের হলঘরের এক পাশের মসনদ থেকে খানিকটা দূরে অপেক্ষা করছিলেন মীর জাফর। কর্নেল ক্লাইভ হাত ধরে তাকে মসনদের কাছে নিয়ে তাতে বসিয়ে দিলেন। রেকাব ভরা স্বর্ণমোহর তাকে উপহার দিয়ে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব হিসেবে আনত মাথায় সম্মান ও অভিনন্দন জানালেন। উপস্থিত সবাই তাকেই অনুসরণ করলেন। তোপধ্বনি ও রণবাদ্যের মাধ্যমে তার সিংহাসন আরোহণের বার্তা জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়া হলো।

রমেশচন্দ্র মজুমদার ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও মীর জাফরের আঁতাত নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন না। রমেশচন্দ্র মনে করেন, ওলন্দাজরাই (ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি) সবাইকে এমন ভাব দেখিয়েছে যে মীর জাফর তাদের প্রতি অনেক সময় সদয়, তাদের অনেক ঘনিষ্ঠ ও তাদের ওপর নির্ভরশীল। ‘ইহাতে ইংরেজদের সন্দেহ হইল যে নবাব তলে তলে ওলন্দাজদের সহায়তা করিতেছিলেন। অনেক ইংরেজের দৃঢ় বিশ্বাস হইল যে নবাবই গোপনে ওলন্দাজের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করিয়া সৈন্য আনার ব্যবস্থা করিয়াছেন। ক্লাইভও নবাবকে এক কড়া চিঠি লিখিলেন যে ওলন্দাজের সহিত মিত্রতা করিলে ভবিষ্যতে তিনি মীর জাফরের সহিত কোনো সম্বন্ধ রাখিবেন না’

শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর এমনকি ইংরেজের কাছে, কর্নেল ক্লাইভের কাছেও বিশ্বাসঘাতক হিসেবেই পরিচিত হয়ে রইলেন। চার্লস স্টুয়ার্ট মীর জাফরের ক্ষমতারোহণের মধ্য দিয়ে তার গ্রন্থ হিস্ট্রি অব বেঙ্গল শেষ করেছেন। ওলন্দাজ পর্ব তিনি উল্লেখ করেননি। গ্রন্থের শেষ পৃষ্ঠায় একটি উদ্ধৃতি দিয়েছেন: সিংহাসনে আরোহণের পর দরবারের একজন রসিক ব্যক্তি মীর জাফরের নাম দিয়েছিলেন ‘কর্নেল ক্লাইভের গাধা’। এ উপাধি নিয়ে তিনি সমাহিত হয়েছেন।

পাদটীকা: মীর জাফর ও ওলন্দাজ কোম্পানির মধ্যে যদি আঁতাত হয়েই থাকত এবং তা যদি চুঁচুড়ার যুদ্ধে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বিজয়ী করত বাংলার ইতিহাসের ধারা হয়তো বদলে যেত।

 

আন্দালিব রাশদী: কথাসাহিত্যিক