পয়লা পদচ্ছাপ

আদিকালের পূর্ববঙ্গ বা আজকের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে ওলন্দাজ কোম্পানি বা ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রথম সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক তৎপরতা লক্ষ করা যায় ১৬৩৬ সালে। অবশ্য, তার অন্তত ২০ বছর আগে থেকেই হুগলির চিনসুরা থেকে চট্টগ্রাম—বাংলার নানা অঞ্চলে ওলন্দাজদের আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য বিস্তারের চেষ্টা নজরে আসে। পূর্ব বাংলার ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের কথা বলা যায়, সতেরো শতকের প্রথম দশকে সেখানে আরাকানিদের সঙ্গে মিলে ওলন্দাজরা অনানুষ্ঠানিক দাস ব্যবসায় নেমেছিল এমন তথ্যও মেলে। যা হোক, প্রথম দফায় ওলন্দাজ কোম্পানির যে ছয়জন প্রতিনিধি ঢাকায় এসেছিলেন তাদের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর ছিল না। হুগলি থেকে তারা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সেখানেই ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন ও জেলে বন্দি হন। সেখানে আচ্ছামতো পেটানোও নাকি হয়েছিল। পরে তাদের শিকলবন্দি অবস্থায়ই ঢাকাগামী জাহাজে তুলে দেয়া হয়। বন্দি অবস্থায় ঢাকা আসার পর এমন ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে ঢাকার নায়েবে নাজিম ও শাসকগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ সদস্যদের দামি উপহার দেন তারা। মূল্যবান উপঢৌকন প্রদানের এ উদ্যোগ কাজেও দেয়, তাদের মুক্তি মেলে। তবে উপহারের বিনিময়ে ছাড়া পাওয়ার পেছনে খরচ হয়েছিল খুব। পাশাপাশি গায়ের শেকল ছাড়াতে কামারকে এবং লাঠির আঘাতে হওয়া শরীরের জখম সারানোর জন্য বদ্যিকেও পারিশ্রমিক দিতে হয়েছিল ওলন্দাজদের। এত কিছু করে ঢাকায় আসার পর সেই শহর ছাড়ার সময়েও তাদের প্রচুর পয়সা ব্যয় করতে হয়। কারণ ফেরার জন্য কোনো নৌকা তাদের সঙ্গে ছিল না। অগত্যা নতুন নৌকা কিনে তাতে আবার ১২ জন মাঝিমাল্লা নিয়োগ দিতে হয়। ওলন্দাজ কোম্পানির ওই ছয় প্রতিনিধির এ বিড়ম্বনাময় ঢাকা সফরে খরচ হয়েছিল মোট সে আমলের ১ হাজার টাকা। এতসব কাণ্ডের পর ১৬৩৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় নবাবি দপ্তরের সঙ্গে ওলন্দাজ কোম্পানির বাণিজ্য সংযোগ-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল অবশ্য।

কিন্তু এত উদ্ভট কিসিমের ঝক্কি পোহানোর পর যে চুক্তি হলো তাতে যে ওলন্দাজ কোম্পানির মনষ্কাম পুরোপুরি পূর্ণ হয়েছিল, তাও বলা যায় না। ওলন্দাজ বণিকরা তখন দাস ব্যবসার ব্যাপারে বেশ আগ্রহী হলেও ঢাকার নায়েবে নাজিমের সঙ্গে হওয়া চুক্তির দলিলে এ কথা স্পষ্ট করে বলে দেয়া হয়েছিল যে ডাচ কোম্পানি এখান [ঢাকা] থেকে কোনোভাবেই কখনো দাস খরিদ করতে পারবে না। ফলে বিদেশে বিক্রির উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে দাস কেনার সম্ভাব্য স্বপ্ন তাদের অধরাই থেকে গিয়েছিল বলে ধারণা করি। এমনকি ওলন্দাজরা স্থানীয়দের ভৃত্য হিসেবে নিয়োগ দেয়ার অধিকারও পায়নি। সম্ভবত চট্টগ্রামের ওলন্দাজদের দাস ব্যবসার খবর তখন ঢাকার কর্তৃপক্ষের কানেও এসেছিল। আর যথারীতি চুক্তির মধ্যে তারই প্রতিফলন দেখা গেছে।

ঢাকায় বাণিজ্যের বিস্তার

১৬৩৬-এ চুক্তি সই হলেও ওলন্দাজ কোম্পানি ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন এক যুগেরও বেশি সময় পর, ১৬৫০ সালের দিকে। ইতিহাসবিদ সুশীল চৌধুরী ও অনিরুদ্ধ রায়ের মতে আনুমানিক সতেরো শতকের পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকে ওলন্দাজ কোম্পানি প্রথম ঢাকায় একটি বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। তবে এ বাণিজ্য কুঠির স্থান সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। এর বছর কয় পর ১৬৬৬ সালে ঢাকায় একটি আঞ্চলিক দপ্তর স্থাপনের জন্য ওলন্দাজ কোম্পানির দেনদরবারের খবর মিলছে যদিও। ডাচ কোম্পানির কাগজপত্র থেকে ঢাকায় বাণিজ্য বিস্তারের লক্ষ্যে তাদের নানামুখী প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য কার্যক্রমের একটা চিত্র ফুটে ওঠে। স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত দেশীয় ব্যক্তিদের নিজেদের অনুগত ফড়ে বানিয়ে তোলার একটা তৎপরতা ছিল সে-সংক্রান্ত তথ্য দলিলপত্রেই রয়েছে। ফড়েগিরি করার বিনিময়ে এসব স্থানীয় ‘সিক্রেট এজেন্ট’ পেতেন টাকাপয়সা ও দামি উপহার। ১৬৭৬ সালে ঢাকার আদালতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা রাজনন্দলাল যেমন নায়েবে নাজিমকে ওলন্দাজদের স্বার্থে একটি সিদ্ধান্ত নিতে প্ররোচিত করেছিলেন। ‘সিক্রেট এজেন্ট’ ছাড়াও প্রকাশ্যে ঢাকার স্থানীয়দের অনেকেই ওলন্দাজ কোম্পানিতে উঁচু পদে চাকরি করতেন। ডাচ অধ্যাপক এফএফজেএম ফ্লোরাস জেরাডস ওলন্দাজদের নথি ঘেঁটে এ রকম এক দেশীয় কর্ম গঙ্গারামের কথা তুলে এনেছেন। ঢাকার ডাচ ফ্যাক্টরিতে সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করা গঙ্গারাম পরে সেই শাখার উকিল হিসেবে পদোন্নতি পান। গঙ্গারামের প্রায় প্রতিদিনের কাজ ছিল ঢাকার নবাবি দরবারে গিয়ে হাজিরা দেয়া। বহিরঙ্গে সালাম-আদাব জানানোর উদ্দেশ্য দেখানো হলেও আদতে এমনটা করার কারণ ছিল শাসকের মন ভজিয়ে বাণিজ্যের সুবিধা করা। তবে রাজনন্দলাল হোক বা গঙ্গারাম—ওলন্দাজ ব্যবসায়ীদের কাছে প্রকৃতপক্ষে কেউই শেষমেশ পুরোপুরি বিশস্ত বলে গণ্য হতেন না। তাদের কর্মকাণ্ড যদি ওলন্দাজ কোম্পানির কাজে গতি আনত, তাহলে তারা প্রশংসা পেতেন। আর উল্টোটা হলে বা বিদেশী ‘মনিব’দের সঙ্গে দ্বিমত করলে সবার সামনে ধমকানো না হলেও আড়ালে নথিপত্রে তাদের বিষয়ে নেতিবাচক ও ভর্ত্সনাময় মন্তব্য লিখে রাখা হতো। ডাচ কোম্পানির লোকজনের সঙ্গে ঢাকার স্থানীয় অধিবাসীদের মারামারিও ঘটনার কথাও নথিপত্রে উল্লেখ আছে।

যা হোক, নানা রকম গুপ্ত ও প্রকাশ্য উদ্যোগের মারফত ঢাকায় ওলন্দাজ কোম্পানি নিজেদের ব্যবসার বিস্তার ঘটিয়ে চলছিল। আঠারো শতকের গোড়ার দিকেই ঢাকার মধ্যে তাদের কার্যক্রম ব্যাপকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে দাঁড়ায়। ওই সময় ঢাকা নবাবগঞ্জে বুড়িগঙ্গার তীরে তাদের একটি বড় কুঠি তৈরি হয়ে গিয়েছিল; ডেমরা, রূপগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জে ছিল গুদাম। ঢাকার এ কর্মযজ্ঞের দেখাশোনা করতেন একজন রেসিডেন্ট অফিসার। ওলন্দাজরা ব্যবসা করতে আসায় ঢাকার বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছিল, সন্দেহ নেই। ঢাকা থেকে মুখ্যত মসলিন কাপড় রফতানি করত ওলন্দাজ কোম্পানি। এ রফতানির বড় একটা অংশই যেত এখনকার জাপান ও ইন্দোনেশিয়া অঞ্চলে। বিশেষ করে সতেরো শতকের শেষার্ধ থেকে ঢাকার মানসম্পন্ন সুতির কাপড়ের চাহিদা খুব বেড়েছিল। ওই সময় ওলন্দাজদের বস্ত্র বাণিজ্যেরও তাই রমরমা হয়। এর মাঝে আজকের খামারবাড়ি এলাকায় তারা একটি বাগানবাড়িও তৈরি করে। ঢাকায় একসময় ওলন্দাজরা মদ তৈরি ও সংরক্ষণের ব্যবসাও শুরু করে। প্রথমে এখানে মদ প্রধানত ইউরোপ ও পারস্যে রফতানি করার উদ্দেশ্য উৎপাদন হতো। কিন্তু পরে প্রশাসনযন্ত্রের ও সমাজের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ কি সুসম্পর্ক রক্ষার খাতিরে তাদের মদ খাইয়ে বাগে আনার জন্যও তারা বাড়তি মদ উৎপাদন শুরু করে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের মুফতে এ সুরা সরবরাহের বিষয়টি এতটাই বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গিয়েছিল যে রফতানির জন্য রাখা মদের ভাণ্ডারেও একদিন টান পড়ে। অগত্যা উপায় না দেখে কোম্পানি স্থানীয়দের জন্য মদ উৎপাদন সীমিত করার আদেশ দিতে বাধ্য হয়।


রাজশাহীতে ওলন্দাজদের রেশম কুঠি

ঢাকার বাইরে পূর্ববঙ্গে বড় ওলন্দাজ বসতি নির্মিত হয় রাজশাহী অঞ্চলে। রাজশাহীর সঙ্গে হুগলির যোগাযোগ ভৌগোলিক কারণেই ঢাকার চেয়ে সহজ ছিল। আনুমানিক আঠারো শতকের গোড়ার দিকে ওলন্দাজরা রাজশাহীতে পুরোদমে ব্যবসা শুরু করে। রেশম উৎপাদনে রাজশাহী অঞ্চলের বিশেষ খ্যাতি বরাবরই। এ কারণে রেশম থেকে সুতা তৈরি ও রেশম ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য এখানে ওলন্দাজ কোম্পানি একাধিক কুঠি তৈরি করার উদ্যোগ নেয়। রাজশাহী শহরে পদ্মা নদীর তীরে প্রায় একই সময় (কেউ কেউ অবশ্য মনে করেন সময়টা আঠারো শতকের মাঝামাঝি) তারা একটি ফ্যাক্টরি স্থাপন করে। রাজশাহী শহর ও জেলার অন্যত্র অবস্থিত বাকি সব ওলন্দাজ কুঠির তুলনায় এটি আকৃতিতে সবচেয়ে বড় হওয়ায় লোকমুখে এর নাম দাঁড়িয়ে যায় ‘বড় কুঠি’। সম্ভবত রাজশাহীর প্রথম ওলন্দাজ স্থাপনা এ বড় কুঠিই। দুই তলার এ ভবন এক ডজন কক্ষে বিভক্ত। রয়েছে একাধিক দীর্ঘ বারান্দা। দ্বিতীয় তলায় একটি সভাকক্ষের উপস্থিতি দেখে বোঝা যায় যে রেশম বাণিজ্য-সংক্রান্ত নানাবিধ ‘অফিশিয়াল’ আলাপ-আলোচনা এখানেই হয়তো কোম্পানির কর্তারা মিলে করতেন। আর নিচতলা ছিল কার্যত গুদামঘর। কোম্পানির কার্যক্রম পরিচালনা ও রেশমদ্রব্য মজুদ রাখার জন্য বড় কুঠি বেশির ভাগ সময় ব্যবহূত হলেও এটি প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। বিরূপ সময়ে যুদ্ধ বেধেটেধে গেলে স্থানীয় ওলন্দাজরা সেখানে যাতে নিরাপদে আশ্রয় নিতে পারেন, তেমন ব্যবস্থা বড় কুঠিতে করা হয়েছিল। বড় কুঠির ছাদে ও নিচে বেশ কটি কামান রাখা হতো তখন। যাতে উপযুক্ত সময়ে গোলা ছুড়ে শত্রুকে রুখে দেয়া যায়। বস্তুত বড় কুঠি যেন ছিল রাজশাহীর ওলন্দাজদের কাছে এক বিকল্প দুর্গবিশেষ। একটা সংশয়ী প্রশ্ন অবশ্য জাগে, এ রকম প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হতো কি শুধুই যুদ্ধ বা হামলার আশঙ্কায়? ওই সময় দামি রেশম, সুতা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড হেতু আসা অর্থ ছিনিয়ে নেয়ার জন্য সশস্ত্র ডাকাতদের আনাগোনার আশঙ্কাও কি সেখানে কামান তৈরি রাখার একটা কারণ হতে পারে? কে জানে!

বড় কুঠি ছাড়াও রাজশাহী শহরের মতিহার, বোয়ালিয়া, বিনোদপুর ও শিরোইল এলাকায় এবং জেলার বিড়ালদহ, নন্দনপুর, অচিনঘাট, মুলাডুলি প্রভৃতি অঞ্চলে ওলন্দাজ কোম্পানির কুঠি ছিল। ১৭৮১ সালে রাজশাহীর সারদায় দুই আকৃতির দুটি রেশম কারখানা বা কুঠি তারা স্থাপন করে, যা এখান বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির সম্পত্তি ও প্রশিক্ষণকেন্দ্রের অংশ।

পূর্ববঙ্গের অন্যান্য জায়গার বদলে রাজশাহীকেই নিজেদের ব্যবসার বিস্তার ঘটানোর জন্য ওলন্দাজরা কি তাহলে বেছে নিয়েছিল? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া সহজ নয়। তবে রাজশাহী অঞ্চলে ওলন্দাজ কুঠির আধিক্য দেখে ধারণা করা যায়, এখানকার রেশম চাষ উপযোগী অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ ডাচ কোম্পানিকে আকৃষ্ট করেছিল।

রাজনীতির মারপ্যাঁচে ডাচ কোম্পানি

নবাবি আমলে পূর্ববঙ্গে বাণিজ্য বিস্তার করতে আসার পর ডাচ কোম্পানির কর্তারা এটা হাড়ে হাড়ে বুঝেছিলেন যে এখানে ব্যবসা করতে গেলে যেমন স্থানীয় পর্যায়ে দেশীয় ব্যক্তিদের মধ্যে নিজেদের ‘নেটওয়ার্ক’ তৈরি জরুরি তেমনি নবাবি দরবারের রাজনীতির সঙ্গে বোঝাপড়াও আবশ্যিক। ঢাকার শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে ওলন্দাজদের যৌথ রাজনৈতিক তৎপরতার প্রথম প্রকাশ দেখা যায় ১৬৬২-এর জানুয়ারিতে সুবেদার মীর জুমলার আসাম অভিযানের সময়। ওই সময় মীর জুমলা ঢাকার ডাচ কুঠির কর্তাদের কয়েকজন ওলন্দাজ সেনাকে নিজের দলে পাঠানোর অনুরোধ করেছিলেন। সেইমতো তার যোদ্ধাবাহিনীতে কয়েকজন ওলন্দাজ সেনাও সরবরাহ করা হয়। এছাড়া তাকে ওলন্দাজ কোম্পানির তরফ থেকে যুদ্ধজাহাজ ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জামও দেয়া হয়েছিল। ১৬৬৫ সালের ডিসেম্বরে শায়েস্তা খানের ‘মগ ধাওনী’ নামে খ্যাত চট্টগ্রামে মগবিরোধী নৌ অভিযানে ওলন্দাজ কোম্পানির সহযোগিতার আরেকটি চমত্কার নিদর্শন দেখা যায়। আগেই বলেছি, এ মগরা কয়েক দশক আগেও দাস ব্যবসায় ওলন্দাজ কোম্পানির সহায়কের ভূমিকা পালন করেছিল। রাজনীতির মারপ্যাঁচে নিজেদের পূর্ব অবস্থান আচমকা পরিবর্তনের এ ঘটনা সত্যিই কৌতূহলোদ্দীপক। ওলন্দাজ কোম্পানি নৌ অভিযানের আগ দিয়ে আরাকানে নিজেদের বাণিজ্য কুঠি গুটিয়ে ফেলে, কর্মচারীদের সরিয়ে নেয় ও নিজেদের আরাকানগামী জাহাজগুলোকে উল্টোদিকে ফিরিয়ে আনে। ‘মগ ধাওনী’ অভিযানকে বেগবান করার জন্য কোম্পানির যোদ্ধাসমেত দুটি জাহাজও চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল। কিন্তু জাহাজদ্বয় যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছল যখন তখন দেখা গেল যে তার আগেই শায়েস্তা খাঁ চট্টগ্রাম সফলভাবে নিজের দখলে নিয়ে নিতে পেরেছেন।

তবে ডাচ কোম্পানি এসব সহযোগিতার বিনিময়ে আদতে ব্যবসায়িক স্বার্থসিদ্ধি চরিতার্থই করতে চাইত। পুরো বিষয়টার মধ্যে কোনো আন্তরিকতা কাজ করত না। আড়ালে নবাবের কর্তৃত্ব নিয়ে তারা উষ্মাই প্রকাশ করত। অন্যদিকে ঢাকার নবাবি কর্তৃপক্ষও ওলন্দাজদের এ স্ববিরোধিতা বিষয়ে সচেতন ছিল। ডাচ কোম্পানির হাতে যাতে তামা ও মরিচ ব্যবসা না যায়, সে সম্পর্কে ১৬৮৫ সালে দরবারি সিদ্ধান্ত নেয়ার উদাহরণটি এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য।

বিপর্যয় ও বিলুপ্তি

পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলাজুড়ে ইংরেজ কোম্পানির ক্রমেই একতরফা প্রভাব বিস্তারের কারণে পূর্ববঙ্গে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অবস্থা দিনকে দিন ভঙ্গুর হয়ে পড়ছিল। ১৭৮১ সালে ইংরেজরা আচমকা হামলা চালিয়ে ঢাকার ওলন্দাজ কুঠি দখল করে নেয় এবং কুঠির প্রধান ব্যবস্থাপককেও বন্দি করে। ১৮২৪ সালের জুনে অ্যাংলো-ডাচ চুক্তির পর ওলন্দাজ কোম্পানির সব সম্পত্তি ইংরেজদের হাতে চলে আসা এবং ১৮২৫-এর জুনে আনুষ্ঠানিকভাবে ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিলুপ্তির কারণে পূর্ববঙ্গে তাদের অস্তিত্ব আক্ষরিক অর্থেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

অবশ্য এখনো ঢাকা কি রাজশাহীর কোনো প্রান্তে ডাচ কোম্পানির স্মৃতিটুকু চাইলে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আজকের মিটফোর্ড হাসপাতালের দিকে তাকালে মনে পড়তে পারে, হাসপাতালটি আদিকালে ওলন্দাজদের রেখে যাওয়া কুঠিতেই স্থাপিত হয়েছিল। পুরান ঢাকার নারিন্দার সিমেট্রিতে খুঁজলে পাওয়া যাবে ঢাকার ওলন্দাজ কুঠির একদা প্রধান উইলিয়াম কার্কম্যান ও কুঠির কর্মকর্তা এমজি গ্লাসের শিশুকন্যা এলিজা হেরিয়েট গ্লাসের সমাধি। রাজশাহীর পদ্মাপারে ঘুরতে জীর্ণ দশা উপেক্ষা করে ইতিহাসের উত্তাপ নেয়া যেতে পারে বড় কুঠির ভাঙাচোরা সিঁড়িতে হেঁটে।

 

মুহিত হাসান: নন-ফিকশন লেখক