কলকাতা থেকে ৩৭ কিলোমিটার উত্তরে ভাগীরথী নদীর পশ্চিম কূলে হুগলি জেলা সদর শহরে চুঁচুড়া অবস্থিত। ভাগীরথী নদীকে কেন্দ্র করে চুঁচুড়ার উত্তর ও দক্ষিণে ইউরোপ থেকে বাণিজ্য করতে এসে অনেক দেশ কুঠি বানিয়েছিল যেমন হুগলিতে পর্তুগিজ, চুঁচুড়ায় ওলন্দাজ বা ডাচ, চন্দননগরে ফরাসি, ভদ্রেশ্বরে অস্ট্রিয়ানস, শ্রীরামপুরে দিনেমার বা ড্যানিশ, কলকাতায় ইংরেজসহ আরো কিছু ছোট দেশ। অল্প পরিসর জায়গায় এতগুলো দেশের অবস্থানের জন্য এ অঞ্চলকে লিটল ইউরোপ বলা হয়। চুঁচুড়া থেকে কাছেই ছিল অন্যতম ব্যস্ত বন্দর সপ্তগ্রাম, সে সময় সপ্তগ্রাম বন্দর অবনতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। চুঁচুড়ার পাশেই ওগলিম বা হুগলি বন্দর পর্তুগিজরা তৈরি করেছিল ঠিক তার পরের দিকে।

১৬১৮ খ্রিস্টাব্দে ওলন্দাজরা বাংলায় বাণিজ্য স্থাপনের অনুমতি লাভ করেছিল মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের কাছ থেকে। হুগলিতে পর্তুগিজদের আধিপত্য ধীরে ধীরে বাড়ছিল। কিছুদিন চলার পর পর্তুগিজরা মূল ব্যবসা ছেড়ে গুণ্ডাগিরি ও দাস ব্যবসা শুরু করল। এদিকে জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর পর শাহজাহান দিল্লির মসনদে বসলেন। শাহজাহানের সঙ্গে পর্তুগিজদের সম্পর্ক ভালো ছিল না। পর্তুগিজদের অত্যাচারের জবাব দেয়ার কাজ শুরু করলেন শাহজাহান। কিছুদিনের মধ্যেই হুগলি থেকে পর্তুগিজদের উচ্ছেদ করলেন।

ওলন্দাজদের দেশ হল্যান্ড, ষোড়শ শতাব্দীতে স্পেনের অধীনে ছিল। আমেরিকার স্বর্ণভাণ্ডার পেয়ে স্পেন তখন ক্ষমতার তুঙ্গে। স্পেনের সৈন্যরা হল্যান্ডের ওপর প্রবল অত্যাচার শুরু করলে তারা দেশের উত্তর অংশে সরে গিয়ে আমস্টারডাম বন্দর তৈরি করল। ডাচরা ব্যবসাটা ভালো বুঝত, ১৬০২ খ্রিস্টাব্দে দেশের কয়েকজন বাণিজ্যপতি একযোগে তৈরি করলেন The United East India Company Of Netherlands. বণিকের দল বেরিয়ে পড়ল প্রাচ্যের পথে। প্রাচ্যের পশমের মূল্যবান ভাণ্ডার, স্বর্ণ, মসলা, হাতির দাঁত প্রভৃতির লোভে বিভিন্ন জায়গায় জাহাজ ঘুরতে লাগল। ১৬২৫ খ্রিস্টাব্দে Dutch East India Company প্রতিষ্ঠা হলো। ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে উঠল বাটাভিয়া। ভারতবর্ষে ডাচদের ব্যবসা-বাণিজ্য চলত বাটাভিয়ার মাধ্যমে। ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে হুগলি থেকে পর্তুগিজদের বিতাড়নের খবর পেয়ে ডাচরা আনন্দে লাফিয়ে উঠল। বাংলায় স্থায়ীভাবে ব্যবসা করার লোভে হুগলি বন্দর থেকে কিছুটা দূরে চুঁচুড়ায় এসে ঘাঁটি গাড়ল।


চুঁচুড়া তখন নদীর ধারে জল-জঙ্গলে ঘেরা একটা ছোট্ট গ্রাম। চুঁচুড়ায় তখন চিঁচড়ে নামে এক ধরনের বেতের জঙ্গল ছিল, তা থেকে চুঁচুড়া নামকরণ হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। চুঁচুড়াকে শহর হিসেবে গড়ে তোলে ডাচরা, এরাই শহর চুঁচুড়ার পত্তন করে। ১৬১৮ খ্রিস্টাব্দে জাহাঙ্গীরের সময় বাংলায় বাণিজ্য করার অনুমতি পেয়েছিল ডাচরা। ১৬৩২ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজ পতনের পর ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট শাহজাহান ডাচদের বাণিজ্য কুঠি নির্মাণের অনুমতি দেন। এর পর থেকে ডাচরা শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে। চুঁচুড়ায় একটি বিরাট বাণিজ্য কুঠি নির্মাণ হয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে অষ্টম দশকের সময় তারা দুর্গ নির্মাণ করতে শুরু করেন। ডাচ রাজার নামে দুর্গের নামকরণ হয় ‘ফোর্ট গ্যাসটাভাস বা গুস্তাফ দুর্গ’। দুর্গের প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা এত ভালো ছিল যে ১৬৯৬ খ্রিস্টাব্দে শোভা সিংহ হুগলি দখল করলে পরদিন ডাচরা গোলাবর্ষণ করে বিদ্রোহীদের হটিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল।

এ সময় বহু ইউরোপীয় পর্যটক চুঁচুড়া পরিভ্রমণ করেছিলেন। ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি পর্যটক ক্যোঁৎ দে মোদাভে লিখেছেন, ‘চুঁচুড়া একটি দুর্গ, যা পূর্বে ভারতবর্ষে ইউরোপীয়রা যেভাবে দুর্গ নির্মাণ করত, সেইভাবেই নির্মিত। প্রতিরক্ষা কেন্দ্রগুলি চারটি প্রাকার দ্বারা কোনাকুনিভাবে সুরক্ষিত। পরিখা বলতে তেমন কিছু নেই। দেওয়ালের গায়ে দূরে দেখার উপযোগী গর্ত এবং জানালাকেই এক্ষেত্রে যথেষ্ট মনে করা হয়। বাণিজ্য কুঠির কাছাকাছি ডাচ নাগরিকবৃন্দ চমত্কার বাগানবাড়িতে বাস করেন। কয়েকটি বাড়ি সত্যিই দেখার মত। হল্যান্ডবাসীদেরই ভারতবর্ষে উদ্যান রচনার প্রবর্তক বলা যেতে পারে।’

চুঁচুড়ার ওলন্দাজ প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ সর্বতোভাবে বাটাভিয়ার কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের অধীনে ছিল। খোদ হল্যান্ড থেকেও নির্দেশাবলি আসত। চুঁচুড়ায় ডাচ সরকার গঠিত ছিল একজন ডিরেক্টর বা গভর্নর ও সাতজন সদস্য নিয়ে। গভর্নর রাজকীয় মর্যাদা ও আড়ম্বরের সঙ্গে গুস্তাফ দুর্গের অভ্যন্তরে গঙ্গার তীরে একটি প্রাসাদোপম অট্টালিকায় বাস করতেন। দুর্গ এলাকার ভেতরে ডাচদের সাধারণ বিভাগ ও বিচার বিভাগ ছিল। দুর্গ এলাকার বাইরে নবাব সরকারের ব্যবস্থাই কার্যকর ছিল। ডাচদের অধিকারভুক্ত এলাকা থেকে ১৩ হাজার ১২২ টাকা রাজস্ব আদায় হতো।

ইউরোপের সাদা চামড়ার মানুষ হুগলি নদীর ধারে যারা বসবাস করতেন তাদের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য কারণে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রেষারেষি ছিল। স্বাভাবিকভাবে ডাচদের সঙ্গে ইংরেজ ও ফরাসিদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল। মুর্শিদাবাদের নবাবের সঙ্গে ডাচদের সম্পর্ক কখনো ভালো কখনো মন্দ ছিল। বাংলার নবাব আলীবর্দীর সঙ্গে সরফরাজের লড়াইয়ে ডাচরা সরফরাজের পক্ষ নিয়ে আলীবর্দীর বিরাগভাজন হয়েছিল। ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে সিরাজউদ্দৌলা কলকাতা আক্রমণ করলে ডাচরা নিরপেক্ষ থেকে ইংরেজদের বিরাগভাজন হয়েছিল। ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজরা চন্দননগর আক্রমণ করলে ফরাসি নর-নারীরা ডাচদের দুর্গে আশ্রয় নিলে ক্লাইভের ধমকে ডাচ গভর্নর আদ্রিয়ান বিসডম তাদের বিতাড়িত করতে বাধ্য হন।


ওয়ারেন হেস্টিংস, হলওয়েল, ক্লাইভ ডাচদের শায়েস্তা করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। সে কারণে ১৭৫৯ সালের ২০ নভেম্বর ডাচদের বরাহনগরের কুঠি দখল করেন এবং ২৫ নভেম্বর চুঁচুড়া ও চন্দননগরের মাঝে বিদারায় ডাচদের সঙ্গে ইংরেজদের যুদ্ধ হয়। এতে ডাচরা পরাজিত হয়। ব্রিটিশ ও নেদারল্যান্ডস সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে ডাচরা চুঁচুড়ায় অধিকার ফিরে পায়। ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সেই অধিকার বজায় ছিল। এ বছরেরই ৭ মে ইংরেজ অধিকৃত সুমাত্রার সঙ্গে ডাচ অধিকৃত চুঁচুড়ার হাতবদল হয় এবং চুঁচুড়া ইংরেজ অধিকারে চলে আসে। বাকি ১৯৪৭ পর্যন্ত চুঁচুড়া ইংরেজদের অধীনে ছিল।

ডাচরা মূলত বাণিজ্য প্রসারের উদ্দেশ্যে এখানে এসে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যুদ্ধের অস্ত্র ধরেছিল। তারা চুঁচুড়াকে ঘিরে বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। পর্যটক ট্যাভারনিয়ার চুঁচুড়া পরিদর্শন করে লিখেছিলেন, ইউরোপীয়দের মধ্যে ওলন্দাজরাই বঙ্গদেশে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ব্যবসায় লিপ্ত ছিল। মূলত স্বর্ণ, রেশম, হাতির দাঁত, মসলা প্রভৃতি ব্যবসার আকর্ষণে এসেছিল। সেগুলো তো ছিল, পরবর্তীকালে চুঁচুড়ায় রেশম ও সুতিকে কাজে লাগিয়ে বস্ত্র বয়ন শিল্প আরম্ভ করেছিল বাঙালি তাঁতিদের কাজে লাগিয়ে। বিকল্প বাণিজ্য হিসেবে বারুদে ব্যবহূত সোরার ব্যবসা করে বহু অর্থ উপার্জন করেছিল। চুঁচুড়ায় তারা কৃষিজাত পণ্যের ব্যবসা শুরু করে। ডাচরা তাদের বেশি দৃষ্টি দিয়েছিল মসলা, সুতি কাপড়, কৃষিজাত পণ্য, কোরা রেশম, চীনাবাদাম, সোরা প্রভৃতিতে। ১৭৬৫ সালের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, চুঁচুড়ার উৎপাদনশীল কারখানা ৪৫০টি ও তার লগ্নীকৃত পুঁজি ছিল ১৩ দশমিক ৫ কোটি পাউন্ড।

চুঁচুড়া শহর ছাড়াও ওলন্দাজদের কুঠি ছিল বরাহনগর ও কাশিমবাজারে। বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার রাজধানী মুর্শিদাবাদ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অনেক আগে থেকেই বাংলার বিখ্যাত বাণিজ্যকেন্দ্র কাশিমবাজারের আবির্ভাব হয়েছিল। এ কেন্দ্রকে ঘিরে দেশী ও বিদেশী বণিকরা ভিড় জমিয়েছিল। আনুমানিক ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে ত্রিবেণীর কাছে ভাগীরথীর গতিপথের পরিবর্তন হওয়ার জন্য সরস্বতী নদীতীরের বন্দর সপ্তগ্রামের বাণিজ্য কমতে থাকে। এরপর বাংলার উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণবঙ্গের মধ্যবর্তী স্থানে আনুমানিক ১৬৩১ খ্রিস্টাব্দ থেকে কাশিমবাজার বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধিলাভ করতে শুরু করে। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে বাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে এলে কাশিমবাজারের ব্যবসা-বাণিজ্য বহুগুণ বেড়ে যায়। সপ্তগ্রাম বন্দরের পর কলকাতা বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে ওঠার মাঝে কাশিমবাজার ছিল বাংলার শ্রেষ্ঠ বাণিজ্যকেন্দ্র। কাশিমবাজারে ইংরেজ কুঠি, কাশিমবাজারের কালিকাপুরে ওলন্দাজ কুঠি, সৈদাবাদের ফরাসডাঙ্গায় ফরাসিদের কুঠি, সৈদাবাদের শ্বেতা খাঁর বাজারে আর্মেনীয়দের বাণিজ্য কুঠি ছিল। কলকাতা বাণিজ্যকেন্দ্রের সঙ্গে লড়াই করে ১৮৪১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কাশিমবাজারের ব্যবসা-বাণিজ্য চলেছিল।

কাশিমবাজার থেকে ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে, পূর্ব এশিয়ায় ও ইউরোপের নানা দেশে পণ্যদ্রব্য রফতানি হতো। রেশম ছিল প্রধান পণ্য, নানা রকমের রেশমি কাপড় এখানে তৈরি হতো। এছাড়া সুতির কাপড়, ঘি, লংকা, নীল, মোম, কর্পূর, পারদ, চীনামাটির বাসন, দস্তার সামগ্রী, হাতির দাঁতের জিনিসসহ নানা জিনিসের ব্যবসা চলত।


কালিকাপুর বৃহত্তর কাশিমবাজারের মধ্যেই পড়ে। কাশিমবাজার স্টেশনের কাছেই কালিকাপুর লেভেল ক্রসিংয়ের ধারে ডাচ বা ওলন্দাজ সমাধিক্ষেত্র। এই কালিকাপুর সতেরো ও আঠারো শতকে ডাচদের কুঠি, তাদের ব্যবসাকেন্দ্র ছিল। ১৬৬৩ খ্রিস্টাব্দে ওলন্দাজ কুঠিতে ৭০০ জন তাঁতি সিল্ক বোনার কাজে যুক্ত ছিলেন, এ কথা জানা যায় বন্দর কাশিমবাজার গ্রন্থ থেকে। ব্যবসায় প্রভূত উন্নতির কারণে ডাচরা এখানে বিশাল প্রাসাদ তৈরি করেছিল আঠারো শতকের প্রথম দিকে। কাশিমবাজার বাণিজ্যনগরীর পর থেকে সব কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। ডাচ অস্তিত্ব বলতে টিকে আছে শুধু সমাধিক্ষেত্র। এখানে মোট ৪৭টি সমাধি আছে। সবচেয়ে পুরনো সমাধি হলো ড্যানিয়েল ভ্যানদার ম্যুলের, যিনি ১৭২১ খ্রিস্টাব্দে মারা যান। ড্যানিয়েল প্রায়ত হলে সুউচ্চ দুটি স্তম্ভসহ সমাধিটি নির্মিত হয়। সব সমাধি ১৭২১ থেকে ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে।

কলকাতার কাছে বরাহনগরে ডাচদের ব্যবসাকেন্দ্র ছিল, এখানেও তারা কুঠি বানিয়েছিল। এখান থেকেও ভালো বাণিজ্য তারা করত। বাংলায় তিনটি জায়গায় ভালো ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রভাব নবাবরা ভালো চোখে দেখছিলেন না। ইংরেজদের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাচ্ছিল। ১৭৫৯ খ্রিস্টাব্দের ২০ নভেম্বর ইংরেজদের সঙ্গে ডাচদের বিবাদে ইংরেজরা বরাহনগর দখল করে নেয়। বর্তমানে কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই, শুধু নদীর পাড়ে কুঠিঘাট নামটি থেকে গেছে।

ডাচদের নিদর্শন চুঁচুড়ায় খুব অল্পই আছে। কারণ ১৮২৫ পর্যন্ত ডাচদের থাকার পর তা ইংরেজদের হাতে চলে যাওয়া। চুঁচুড়ায় বর্তমান জেলা আদালত ও প্রশাসনিক অফিসটি ছিল ব্রিটিশ ব্যারাক, এটি ডাচদের গুস্তাফ দুর্গের মালমসলা দিয়ে তৈরি হয়েছিল। অতীতের ডাচ ব্যারাকটি এখন হুগলি মাদ্রাসা। দোতলা এ বাড়িতে সারবন্দি অনেক হলঘর আছে, যা সৈন্যদের জন্য ব্যবহার হতো। বারান্দায় ইউরোপীয় ধরনের ১২টি করে খিলান আছে। প্রবেশপথে ডাচ আমলের দুটি কামান আছে। ডাচ গভর্নরের আবাসটি বর্তমানে বিভাগীয় কমিশনারের আবাস হিসেবে ব্যবহূত হয়। দোতলা অট্টালিকায় বড় হলঘর ও দুদিকে সারিবদ্ধ কক্ষ এবং গঙ্গামুখী বারান্দা আছে। এখান থেকে একটু দক্ষিণে ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত গির্জা ও ঘণ্টা ঘাট ছিল, বর্তমানে তার কোনো অবশিষ্ট নেই। এর পাশেই ছিল ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত পিয়েরে কুলিয়ের সাহেবের বাড়ি, বর্তমানে এখানে হুগলি মহসীন কলেজ রয়েছে। এ সাহেবের স্ত্রী ১৮০৯ সালে মারা যান, তার স্মৃতিতে তালডাঙ্গার কাছে সমাধি মন্দিরটি আছে। এটি ইন্দোডাচ স্থাপত্যের একটি উত্কৃষ্ট নিদর্শন। এটি সুসানা আন্না মারিয়ার সমাধি নামে খ্যাত। সেই সময়ের বিখ্যাত ষণ্ডেশ্বর শিবমন্দির এখনো আছে, ডাচ গভর্নর ওভারবেক ষণ্ডেশ্বর শিবকে একটি ঢাক দিয়েছিলেন, সেটি এখনো ব্যবহার হয়। ১৬৯৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত আর্মেনীয় গির্জাটি এখনো রয়েছে। চুঁচুড়ার ফুলপুকুরের কাছে ডাচ সমাধিক্ষেত্রটি রয়েছে, বর্তমানে স্থানীয় খ্রিস্টানরাও ব্যবহার করে। এখানে ডাচ গভর্নর, তাদের পরিজন, পদস্থ কর্মচারী, সেনাধ্যক্ষ এ সমাধিক্ষেত্রে শায়িত আছেন। বর্তমানে সমাধিক্ষেত্রটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত। এছাড়া ডাচদের আর কোনো জিনিস তেমনভাবে দেখা যায় না।

সেই সময় থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত ভাগীরথী নদী দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে, অনেক সৃষ্টি ধ্বংস হয়েছে। তবু চুঁচুড়া, বরাহনগর ও কাশিমবাজারে কান পাতলে ডাচদের অনেক কথা ফিসফিস করে শোনা যায়।

 

শক্তিপদ ভট্টাচার্য্য: ইতিহাসের শিক্ষক, ভ্রামণিক ও লেখক