ইউরোপের লিগ ফুটবলে এক ক্লাব থেকে আরেক ক্লাবে খেলোয়াড়দের নাম লেখানোর সুযোগ থাকে প্রাক-মৌসুমের গ্রীষ্মকালীন দলবদলে ও মধ্য মৌসুমের শীতকালীন দলবদলে। এখন চলছে গ্রীষ্মকালীন দলবদল। ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালি ও জার্মানিতে ১ সেপ্টেম্বর এবং ফ্রান্সে ৩০ আগস্ট শেষ হবে গ্রীষ্মকালীন দলবদল। এরই মধ্যে স্প্যানিশ লা লিগা, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, ইতালিয়ান সিরি-এ ও ফ্রেঞ্চ লিগ ওয়ান শুরু হয়ে গেছে। গ্রীষ্মের দলবদলের মধ্যে শীর্ষ তিনটির গন্তব্য স্প্যানিশ লা লিগা। কিলিয়ান এমবাপ্পে ও এনদ্রিক নাম লিখিয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদে, হুলিয়ান আলভারেজ ম্যানসিটি ছেড়ে যোগ দিয়েছেন অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদে। দেখে নেয়া যাক, এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য দলবদল।
কিলিয়ান এমবাপ্পে
একেবারেই বিনা ফিতে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়টিকে পেল রিয়াল মাদ্রিদ! যাকে কিনতে একটি সময় ২০০ মিলিয়ন ইউরো নিয়েও তৈরি ছিল রিয়াল মাদ্রিদ, তাকে কিনা শেষ পর্যন্ত কিনতে কোনো পয়সাই লাগল না। এখানে অবশ্য এমবাপ্পের বড় ভূমিকা রয়েছে। তিনি আগে রিয়ালের সঙ্গে কথা রাখতে পারেননি, হয়তো তারই প্রতিদান দিলেন। প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের (পিএসজি) সঙ্গে সর্বশেষ চুক্তি নবায়ন তিনি করেননি। চুক্তির শেষ মৌসুম শেষে ‘ফ্রি এজেন্ট’ হয়ে পড়েন। তাই তাকে বিক্রি করে কানাকড়িও পেল না প্যারিস জায়ান্টরা। এরপর রিয়ালের সঙ্গে চুক্তি হয়ে গেল তার।
বিশ্বসেরা ফরোয়ার্ডকে স্কোয়াডে পেয়ে গেল বর্তমান ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নরা। রিয়ালের আক্রমণভাগ আগে থেকেই শক্তিশালী, এখন এমবাপ্পেকে নিয়ে তা হয়ে উঠবে পরাক্রমশালী। হয়ে উঠবে সত্যিকারের ‘তারকাপুঞ্জ’।
তবে দলবদল ফি না লাগলেও খেলোয়াড়টিকে সাইনিং ফি হিসেবে রিয়ালকে গুনতে হবে ১০০ মিলিয়ন ইউরো। তার মানে, এটা একেবারেই ‘ফ্রি ট্রান্সফার’ না। এরপরও রিয়াল অখুশি নয়। কারণ, এমবাপ্পের মতো সুপারস্টারকে ১০০ মিলিয়ন ইউরোতে পাওয়া কম কথা নয়। অন্যদিকে, ১৮০ মিলিয়ন ইউরোয় কিনেও শেষ পর্যন্ত খেলোয়াড়টির দলবদল থেকে কোনো পয়সা পেল না পিএসজি।
এনদ্রিক
ব্রাজিলিয়ান সেনসেশন এনদ্রিক যোগ দিয়েছেন ইউরোপের সেরা ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদে। সদ্যই ১৮ বছরে পা দেয়া এ বিস্ময় খেলোয়াড়কে ব্রাজিলের পালমেইরাস থেকে সই করিয়েছে রিয়াল। তার জন্য ৭২ মিলিয়ন ইউরো খরচ করেছে লস ব্লাঙ্কোসরা। ২০২৩ সালেই ব্রাজিলের ভবিষ্যতের সুপারস্টারকে খুঁজে পায় রিয়াল। যদিও বয়স ১৮ না হওয়ায় তাকে সই করাতে পারছিল না। অবশেষে ২১ জুলাই ফিফার শর্ত পূরণ করে তাকে দলভুক্ত করে নেয় মাদ্রিদ জায়ান্টরা। তিনি এখন রিয়ালে খেলবেন ৯ নম্বর জার্সি পরে। খেলবেন স্বদেশী ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রদ্রিগো আর ফরাসি সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে একই দলে!
মনে হতেই পারে, তার মতো এক টিনএজ খেলোয়াড়কে কিনতে বড্ড বেশি টাকা খরচ করে ফেলেছে রিয়াল। যদিও বয়সের তুলনায় সে একটু বেশিই পরিপক্ব। এরই মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলে শীর্ষ লিগে ৫০-এর বেশি গোল করে ফেলেছেন। ব্রাজিল জাতীয় দলেও যে ক’টি ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছেন তাতেই ঝলক দেখিয়েছেন। এবার রিয়ালের বিখ্যাত জার্সিতে ইউরোপের ক্লাব ফুটবল মাতানোর অপেক্ষায় তিনি।
হুলিয়ান আলভারেজ
চলতি দলবদলের অন্যতম আলোচিত চুক্তি। ৭৫ মিলিয়ন ইউরোয় ম্যানসিটি থেকে আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ড হুলিয়ান আলভারেজকে কিনে নেয় স্প্যানিশ ক্লাব অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ। এটা চুক্তি ও ফি উভয় দিক থেকে ‘ব্লকবাস্টার’। অ্যাডস-অন মিলে শেষ পর্যন্ত চুক্তির অংক পৌঁছতে পারে ৯৫ মিলিয়ন ইউরোয়। আর্জেন্টিনা ও ম্যানসিটির হয়ে আলো ছড়ানো এ ফরোয়ার্ড অংকটা প্রায় নয় ডিজিটের কাছাকাছি নিয়ে গেলেন। সেটিই হওয়ার কথা। যেকোনো কোচের জন্য স্বপ্নের মতো এক খেলোয়াড়। গত মৌসুমে সিটির মোট ২০ গোলে অবদান রেখেছেন তিনি। আর্লিং হালান্ডকে যেমন বল সাপ্লাই দিয়েছেন, তেমনি নিজেও গোলপোস্ট খুঁজে নিয়েছেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে। তার প্রতিপক্ষের বক্সের আশপাশে তেজোদ্দীপ্ত পদচারণা আর ‘কখনই হাল না ছাড়া’ মানসিকতায় মুগ্ধ হয়েই নিজ দলে টেনে নিয়েছেন তার স্বদেশী কোচ দিয়েগো সিমিওনে।
ডগলাস লুইজ
ইংলিশ ক্লাব অ্যাস্টন ভিলা থেকে ইতালির জুভেন্টাসে নাম লিখিয়েছেন ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড ডগলাস লুইজ। তাকে কিনতে তুরিন জায়ান্টদের খরচ পড়েছে ৫০ মিলিয়ন ইউরো। কোনো সন্দেহ নেই যে তাকে হারানোটা অ্যাস্টন ভিলার জন্য বিরাট এক ধাক্কা। গত মৌসুমে তিনি ক্লাবটির হয়ে দুর্দান্ত পারফর্ম করেছেন, সমর্থকরাও তাকে নিয়ে গলা ফাটিয়েছেন। লন্ডনের এ ক্লাবটিতে তিনি ছিলেন ২০১৯ সাল থেকে। যদিও ‘প্রফিট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি’ (পিএসআর) পূরণ করতে গিয়ে তারা দলের সেরা খেলোয়াড়টিকে বিক্রি করে দিল। ৫০ মিলিয়ন ইউরো ফি পেলেও তার চেয়ে বরং ক্লাবের ক্ষতিটাই বড়। অন্যদিকে, ৫০ মিলিয়ন ইউরোয় তার মাপের একজন স্ট্রাইকার পেয়ে খুশিই হয়েছেন জুভেন্টাসের নতুন কোচ থিয়াগো মোত্তা। তার ধারণা, তুরিনে একটি ব্র্যান্ড হয়ে উঠবেন লুইজ।
সের্জিনো দেস্ত
জন্ম নেদারল্যান্ডসে, খেলেন যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলে। ডাচ ক্লাব আয়াক্স থেকে ২০২০ সালে তাকে কিনে নেয় বার্সেলোনা। কাতালানদের হয়ে ৫১ ম্যাচ খেলার পর ২০২২-২৩ মৌসুম ইতালির এসি মিলানে ও গত মৌসুম ডাচ ক্লাব আইন্দহোফেনে ধারে খেলতে পাঠানো হয় ২৩ বছর বয়সী এ ফুলব্যাককে। নেদারল্যান্ডসে তিনি দারুণ পারফর্ম করেছেন। এপ্রিলে চোটে পড়ায় মৌসুমের শেষ দিকে খেলতে পারেননি। কোপা আমেরিকাও খেলা হয়নি যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে। দেস্তকে এবার পাকাপাকিভাবে সই করাল আইন্দহোফেন। এ খেলোয়াড়টিকে ‘ফ্রি ট্রান্সফার’ হিসেবে দলে টানায় কোনো ফি দিতে হয়নি ডাচ ক্লাবটিকে।
মিশেল ওলিসে
২০২৩
সালে হ্যারি কেনকে টটেনহাম থেকে নিয়ে লাভবান হওয়া বায়ার্ন মিউনিখ আরেকবার ইংলিশ ফুটবল থেকে খেলোয়াড় কিনল। এবার মিশেল ওলিসে। ক্রিস্টাল প্যালেস থেকে ৬০ মিলিয়ন ইউরোয়
ওলিসেকে দলভুক্ত করেছে বায়ার্ন। ফরাসি উইঙ্গারকে বিক্রি করে ক্রিস্টাল প্যালেস হয়তো খুশিই। কারণ, তাকে বিক্রি করে ক্লাবটি তাদের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ফি পেয়েছে।
হিরোকি ইতো
জার্মান বুন্দেসলিগায় গত মৌসুমে ছিল চমকের পর চমক। লেভারকুসেন প্রথমবারের মতো লিগ শিরোপা জিতেছে। স্টুটগার্ট হয়েছে রানার্সআপ, খেলতে চলেছে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে। এরপরও তারা সেরা খেলোয়াড়দের ধরে রাখতে পারছে না। ২৫ বছর বয়সী ডিফেন্ডার হিরোকি ইতো স্টুটগার্ট ছেড়ে নাম লেখালেন বায়ার্ন মিউনিখে। তার মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হারানো স্টুটগার্টের জন্য বড় এক ধাক্কাই। তিনি একই সঙ্গে লেফট ব্যাক ও সেন্টার ব্যাক পজিশনে খেলতে সমর্থ। তার দল গত মৌসুমে মাত্র ৩৯ গোল খেয়েছে। বাম পায়ের খেলোয়াড়টির পারঙ্গমতায় মুগ্ধ হয়েই তাকে দলভুক্ত করল বাভারিয়ানরা। দলবদল ফি ২৩ মিলিয়ন ইউরো।
সাভিও
ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার সাভিও ফরাসি ক্লাব ট্রয়েস থেকে দুই মৌসুম ধারে খেলেছেন পিএসভি ও জিরোনায়। এবার তাকে দলে টানল ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ চ্যাম্পিয়ন ম্যানচেস্টার সিটি। দলবদল ফি ৪০ মিলিয়ন ইউরো। গত মৌসুমে নয় গোল করেছেন, অ্যাসিস্ট করেছেন ১০ গোলে এবং জিরোনাকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তুলতে সাহায্য করেছেন। তিনি উভয় উইং ধরে খেলতে সমর্থ বলেই পেপ গার্দিওলার মনে ধরেছে। আর তৃতীয় বিভাগের দল ট্রয়েস তাকে ৪০ মিলিয়ন ইউরোয় বিক্রি করে হয়তো মহাখুশি। কেননা এ অর্থ দিয়ে তারা দলটিকে গুছিয়ে নিতে পারবে।
এছাড়া দানি ওলমো ৬০ মিলিয়ন ইউরোয় লিপজিগ থেকে বার্সেলোনায়, ডমিনিক সোলাঙ্কি ৫৫ মিলিয়ন ইউরোয় বোর্নমাউথ থেকে টটেনহ্যামে, পেদ্রো নেতো ৫১.৪ মিলিয়ন ইউরোয় উলভারহ্যাম্পটন থেকে চেলসিতে, আলভারো মোরাতা ১৩ মিলিয়ন ইউরোয় অ্যাটলেটিকো থেকে এসি মিলানে, লেনি ইয়োরো ৬২ মিলিয়ন ইউরোয় লিল থেকে ম্যানইউতে, আমাদু ওনানা ৫০ মিলিয়ন ইউরোয় অ্যাস্টন ভিলা থেকে এভারটনে, মুসা দিয়াবি ৫০ মিলিয়ন পাউন্ডে অ্যাস্টন ভিলা থেকে আল ইত্তিহাদে, রিকার্ডো কালাফিওরি ৪০ মিলিয়ন ইউরোয় বোলোনা থেকে আর্সেনালে, মাতিয়াস সুলে ২৬ মিলিয়ন ইউরোয় জুভেন্টাস থেকে রোমায়, রবিন লে নরমান্ড ৩৪.৫ মিলিয়ন ইউরোয় সোসিয়েদাদ থেকে অ্যাটলেটিকোয়, জাভি সিমন্স ধারে পিএসজি থেকে আরবি লিপজিগে, নিকলাস ফুলক্রুগ ৩১.৪ মিলিয়ন ইউরোয় বরুশিয়া থেকে ওয়েস্টহ্যামে, হোয়াও নেভেস ৭০ মিলিয়ন ইউরোয় বেনফিকা থেকে পিএসজিতে, ম্যাথিস ডি লিট ৪৫ মিলিয়ন ইউরোয় বায়ার্ন মিউনিখ থেকে ম্যানইউতে নাম লিখিয়েছেন।










