মেয়েদের সাফ ফুটবলে এখন পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ দল ভারত। আগের পাঁচ আসরের মধ্যে পাঁচবারই তারা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। বাংলাদেশের সেরা অর্জন রানার্সআপ ট্রফি। ২০১৬ সালের শিলিগুড়ি আসরের ফাইনালে স্বাগতিক ভারতের কাছে হেরে হতাশ হয় বাংলাদেশ। এবার সাবিনা খাতুনদের সামনে প্রথমবারের মতো শিরোপা জয়ের হাতছানি। শিলিগুড়ির দুঃখ কি ঘুচবে কাঠমান্ডুতে?

নেপালে চলমান আসরে গ্রুপ পর্ব থেকে সেমিফাইনাল—প্রতিটি ম্যাচে দশরথ রঙ্গশালা স্টেডিয়ামের সবুজে ফুল ফুটিয়েছেন বাংলাদেশের কিশোরী-তরুণীরা। তাদের সামনে একে একে পর্যুদস্ত হয়েছে মালদ্বীপ, পাকিস্তান, ভারত ও ভুটান। স্বপ্নপূরণের পথে সামনে এখন একটাই বাধা—আগামীকাল স্বাগতিক নেপালকে হারানোর চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জে উতরে গেলেই দক্ষিণ এশিয়ার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব নিয়ে দেশে ফিরবেন সাবিনা, মারিয়া, কৃষ্ণা আর স্বপ্নারা।

কয়েক বছর ধরে বয়সভিত্তিক ফুটবলে একাধিক শিরোপা সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশের কিশোরীরা। তারাই এখন জাতীয় দলের হয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন। এ দলের মারিয়া মান্দা, কৃষ্ণা সরকার, সিরাত জাহান স্বপ্না, আঁখি খাতুন, তহুরা, মনিকা চাকমা বয়সভিত্তিক দলের হয়ে দেশকে একাধিক শিরোপা এনে দিয়েছেন। এসব তারকাই এখন বাংলাদেশ জাতীয় দলেরও কাণ্ডারি। তারাই সুন্দর পাসিং ফুটবলের পসরা সাজিয়ে শক্তিশালী ভারত থেকে শুরু করে অন্যদের বড় ব্যবধানে হারিয়েছেন। মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে তারা বুঝিয়ে দিচ্ছেন, এবার শিরোপা নিয়ে দেশে ফিরতে প্রস্তুত তারা এবং ২০১৬ আর ২০২২ সালের বাংলাদেশ দল মোটেও এক নয়।

শিলিগুড়ি আসরে দুর্দান্ত খেলে ৫ গোল করা স্বপ্না এবারো করেছেন ৪ গোল। ২১ বছর বয়সী স্ট্রাইকার দুই আসরের তুলনা করে বললেন, ২০১৬ সালে যখন ফাইনাল খেলেছিলাম, তখন আমরা অনেক ছোট ছিলাম। এরপর আস্তে আস্তে বড় হয়েছি, বয়সভিত্তিক পর্যায়, জাতীয় দলের হয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছি। এ সময়ে সিনিয়র টিমে খেলার একটা অভিজ্ঞতাও হয়েছে, এটাই পার্থক্য।

এবার গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশ খেলেছে মালদ্বীপ, পাকিস্তান ও ভারতের সঙ্গে। মালদ্বীপকে ৩-০ ব্যবধানে হারিয়ে পথচলা শুরু বাংলাদেশের। দ্বিতীয় ম্যাচে পাকিস্তানকে ৬-০ গোলে উড়িয়ে দেন সাবিনারা। সাফের পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ভারতের বিপক্ষে আগে কখনই কোনো ম্যাচ জিততে পারেনি বাংলাদেশ নারী দল। তাই শঙ্কা ছিল, ভারতকে কি হারাতে পারবেন সাবিনা, কৃষ্ণারা। কিন্তু গোলাম রব্বানী ছোটনের এ দলটি এমনই দুর্বার যে প্রতাপশালী ভারতকে কোনো পাত্তাই দিল না! ভারতকে ৩-০ গোলে হারিয়ে ‘এ’ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে সেমিফাইনালে নাম লেখায় বাংলাদেশ।

গ্রুপ পর্বে ভারতকে হারানোর একটা সুবিধা হয়েছে বাংলাদেশের। সেমিফাইনালে স্বাগতিক নেপালকে এড়াতে সমর্থ হয় লাল-সবুজরা। তাতে কাজটাও হয়ে পড়ে সহজ। গত শুক্রবার ভুটানকে নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলায় মেতে ওঠেন বাংলাদেশের তারকারা। ৮-০ গোলের বিশাল জয়ে ফাইনালের টিকিট কাটে ছোটনের দল। এ ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন সাবিনা। বাকি ৫ গোল করেন ৫ জন ভিন্ন খেলোয়াড়।

বাংলাদেশের বড় শক্তি এবার একটি টিম হয়ে ওঠা। ২৮ বছর বয়সী অধিনায়ক সাবিনা খাতুন ছাড়া বাকি প্রায় সবাই বয়সভিত্তিক দলে দীর্ঘদিন একসঙ্গে খেলছেন বলে তাদের মধ্যে বোঝাপড়াটাও দারুণ। তাই তো রক্ষণ থেকে শুরু করে মধ্যমাঠ ও আক্রমণভাগ সর্বত্রই দারুণ ছন্দ থাকে। এর সুফল হিসেবে প্রচুর গোলও আদায় করে নিতে পারছেন তারা। এখন পর্যন্ত ৮ গোল করে চলতি সাফে ১ নম্বরে অবস্থান করছেন সাবিনা। এছাড়া ৪ গোল করে যুগ্মভাবে দুইয়ে বাংলাদেশের স্বপ্না ও ভারতের অঞ্জু তামাং। এছাড়া গোল পেয়েছেন বাংলাদেশের কৃষ্ণা (২টি), ঋতুপর্ণা চাকমা (২টি), মাসুরা পারভিন (২টি), মনিকা চাকমা (১টি) ও তহুরা খাতুন (১টি)।

সবচেয়ে বেশি আত্মবিশ্বাসী সাবিনা। শিলিগুড়িতে ৮ গোল করা এ স্ট্রাইকার এবারো ৮ গোল করে সবার শীর্ষে। দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়া এই তারকা বলেছেন, এবার যেভাবে জয় পাচ্ছি, এটাই উন্নতি এবং সাফল্য বলতে পারেন। শিলিগুড়িতে যখন এই মেয়েরা খেলেছিল, তখন তো তারা অনেক ছোট ছিল, ১৩-১৪ বছর বয়সী ছিল। তারা বড় হয়েছে, দিন দিন উন্নতি করেছে। আমার মনে হয়, যেভাবে সবকিছু হচ্ছে, এভাবেই যদি হতে থাকে, তাহলে মেয়েরা দেশকে আরো ভালো কিছু দিতে পারবে। মেয়েদের খেলাতেই সেটা পরিষ্কার হয়ে উঠেছে, শিলিগুড়ি বা বিরাটনগরের তুলনায় আমাদের মেয়েরা এখন টেকনিক্যালি, ট্যাকটিক্যালি, ফিজিক্যালি কতটা ভালো। টুর্নামেন্ট শুরুর আগের সংবাদ সম্মেলনেও আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলেছিলাম, যতগুলো দল আছে, তাদের মধ্যে আমাদের মেয়েরা ফিজিক্যালি সবচেয়ে ফিট।