আলাদাভাবে ‘ভারপ্রাপ্ত’ হিসেবে তিন ফরম্যাটেই বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন নাজমুল হোসেন শান্ত। তার সেই ‘ভার’ পুরোপুরি মুক্ত হয়েছে। এখন থেকে তিন ফরম্যাটেই বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক তিনি। ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে তাকে পূর্ণকালীন ও তিন ফরম্যাটের অধিনায়ক করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তিনি কৃতী অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের জায়গা নেবেন। গত সোমবার পরিচালকদের বৈঠক শেষে সন্ধ্যায় বিসিবির সভাপতি ও ক্রীড়ামন্ত্রী নাজমুল হাসান পাপন সংবাদমাধ্যমকে নেতৃত্ব ও অন্যান্য বিষয়ে ব্রিফ করেন। তিনি শান্তকে অধিনায়ক করার তথ্য জানানোর পাশাপাশি এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা দেন।
বাংলাদেশের ১৩তম টেস্ট, ১৬তম ওয়ানডে ও ১১তম টি২০ অধিনায়ক শান্ত। তার নেতৃত্বের হাতেখড়ি আগেই হয়েছে। এরই মধ্যে তার নেতৃত্বে ৬টি ওয়ানডে, ৩টি টি২০ ও ২টি টেস্ট খেলেছে বাংলাদেশ। বিশ্বকাপের আগে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হোম সিরিজে প্রথমবার বাংলাদেশ ওয়ানডে দলের নেতৃত্ব পান তিনি। এরপর বিশ্বকাপ চলাকালে সাকিবের অনুপস্থিতিতে শেষ দিকে কয়েকটি ম্যাচে তিনি বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দেন। বিশ্বকাপের পর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে এবং এর পরপর নিউজিল্যান্ড সফরে সীমিত ওভারের দুটি সিরিজে শান্তর কাঁধেই ছিল নেতৃত্বভার। সবক’টি সিরিজেই তার আগ্রাসী নেতৃত্ব নজর কাড়ে সবার। সাবেকরা অনেকেই শান্তকে স্থায়ীভাবে অধিনায়ক করার মত দেন। সেটাই হলো। এবার আর ‘ভারপ্রাপ্ত’ হিসেবে নয়, স্থায়ীভাবেই তিন ফরম্যাটে তিনি বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক হলেন।
২৫ বছর বয়সী শান্ত বাংলাদেশের হয়ে ২৫টি টেস্ট, ৪২টি ওয়ানডে ও ২৮টি টি২০ ম্যাচ খেলেছেন। টেস্টে ৫টি সেঞ্চুরিতে ১ হাজার ৪৪৯ রান এবং ওয়ানডেতে ২ সেঞ্চুরিতে ১ হাজার ২০২ রান করেছেন তিনি। টি২০-তে তার রান ৬০২। গত দুই বছর তিনি ছিলেন ব্যাট হাতে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা পারফরমার।
২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের আগে আফগানিস্তান সিরিজ পর্যন্ত ওয়ানডে দলের অধিনায়ক ছিলেন তামিম ইকবাল। পিঠের পুরনো চোট আর নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্কের পর তিনি না খেলায় এশিয়া কাপ ও পরে বিশ্বকাপে সাকিবকে করা হয় অধিনায়ক। ফলে তিন ফরম্যাটেই সাকিব নেতৃত্ব পান। সাকিব সম্প্রতি মাগুরা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। অবসরের কথা এখনো না বললেও দলের নেতৃত্ব ছাড়বেন, এমন ইঙ্গিত দিয়ে রাখেন আগেই। তাই তার জায়গায় তিন ফরম্যাটেই টাইগারদের নেতৃত্ব পেলেন শান্ত।
পূর্ণকালীন অধিনায়ক হিসেবে শান্তর অভিষেক ঘটবে আগামী ৪ মার্চ সিলেটে। সেদিন শ্রীলংকার বিপক্ষে টি২০ সিরিজ শুরু হবে। সিলেটে তিনটি টি২০ ম্যাচের পর চট্টগ্রামে ১৩ মার্চ শুরু হবে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ। এরপর চট্টগ্রাম ও সিলেটে রয়েছে দুই টেস্টের সিরিজ। এরই মধ্যে টি২০ ও ওয়ানডে সিরিজের জন্য শান্তকে অধিনায়ক করে দলও ঘোষণা করেছে বিসিবি।
সাকিব তিন সংস্করণ মিলিয়ে ১২০ ম্যাচে জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এবার নেতৃত্বে পালাবদল। তার জায়গায় আসছেন শান্ত, যিনি এরই মধ্যে তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ১১ ম্যাচে বাংলাদেশের অধিনায়কত্ব করেছেন।
নিউজিল্যান্ড সফরের দুই সিরিজে ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক শান্তর ডেপুটি ছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। এবার নির্দিষ্ট মেয়াদে দায়িত্ব পাওয়ার পর শান্তর সহঅধিনায়ক কে হচ্ছেন, তা জানাতে সময় চেয়েছে বিসিবি। নাজমুল হাসান পাপন বলেন, ‘সহঅধিনায়ক থাকবে। আপাতত সামনে যেহেতু কয়েকটি সিরিজ আছে, এখানে একটা সমস্যা হলো সবগুলো সিরিজে সব ক্রিকেটার থাকবে কিনা আমরা নিশ্চিত নই। একজন টেস্ট-ওয়ানডেতে আছে, টি২০-তে নাও থাকতে পারে। আমরা মোটামুটি নির্ধারণ করে ফেলেছি, সহঅধিনায়ক কে হবে। তবে নির্দিষ্ট সিরিজে কোন ক্রিকেটার থাকছে, তার ওপর নির্ভর করে এটা পরিবর্তন হতে পারে। এটা আমরা একটু সময় নিচ্ছি।’
পরিবর্তন এসেছে নির্বাচক কমিটিতেও। মিনহাজুল আবেদিন নান্নুর জায়গায় প্রধান নির্বাচক করা হয়েছে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপুকে। কমিটিতে জায়গা হারিয়েছেন সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশারও। আগের কমিটি থেকে জায়গা ধরে রেখেছেন আবদুর রাজ্জাক। এছাড়া নতুন করে কমিটিতে যুক্ত হয়েছেন হান্নান সরকার।
বিসিবির চুক্তিতে ২১ জাতীয় ক্রিকেটার
একই দিন বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয় বিসিবির পরিচালনা পর্ষদ। ঘোষণা করা হয় খেলোয়াড়দের নতুন কেন্দ্রীয় চুক্তি। এ চুক্তিতে রাখা হয়েছে ২১ ক্রিকেটারকে। জাতীয় দলের নিয়মিত পেসার শরিফুল ইসলাম এবারের চুক্তিতে তিন ফরম্যাটেই জায়গা পেয়েছেন। যদিও পেস বোলিংয়ে তার পার্টনার তাসকিন আহমেদ আছেন শুধু ওয়ানডে ও টি২০-তে। তিনি নিজেই টেস্ট থেকে বিরতি চেয়েছিলেন। শরিফুল ছাড়াও তিন ফরম্যাটের চুক্তিতে আছেন সাকিব আল হাসান, লিটন দাস, মেহেদী হাসান মিরাজ ও নাজমুল হোসেন শান্ত।
টি২০ থেকে অবসর নেয়ায় কৃতী ব্যাটার মুশফিকুর রহিমকে শুধু টেস্ট ও ওয়ানডেতে রাখা হয়েছে। ওয়ানডে ও টি২০-এর চুক্তিতে আছেন তাসকিন আহমেদ, তাওহিদ হৃদয়, মুস্তাফিজুর রহমান, হাসান মাহমুদ। প্রথমবারের মতো বোর্ডের চুক্তিতে জায়গা পেয়েছেন হৃদয়। প্রথমবার চুক্তিতে আসা আরেক ক্রিকেটার পেসার তানজিম হাসান সাকিব আছেন শুধু টি২০-তে। তবে জায়গা হয়নি বিশ্বকাপে তামিম ইকবালের জায়গায় খেলা ওপেনিং ব্যাটার তানজিদ হাসানের।
চোটের কারণে বাদ পড়েছেন পেসার এবাদত হোসেন। বাদ পড়েছেন আফিফ হোসেন ও মোসাদ্দেক হোসেন। সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল এবার নেই চুক্তিতে। মাহমুদউল্লাহ আছেন শুধু ওয়ানডেতে। আসন্ন টি২০ বিশ্বকাপে তার জায়গা পাওয়ার গুঞ্জন থাকলেও বোর্ডের চুক্তিতে অবশ্য এ ফরম্যাটে তাকে রাখা হয়নি।
প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটের ৮৫ ক্রিকেটারের চুক্তির তালিকাও অনুমোদন করা হয়েছে এদিন। তারা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাবেন। নতুন এ চুক্তির মেয়াদ শুরু হয়ে গেছে জানুয়ারি থেকেই বিসিবির চুক্তি
তিন সংস্করণে: সাকিব আল হাসান, লিটন দাস, মেহেদী হাসান মিরাজ, নাজমুল হোসেন শান্ত, শরিফুল ইসলাম।
টেস্ট ও ওয়ানডে: মুশফিকুর রহিম।
ওয়ানডে ও টি২০: তাসকিন আহমেদ, তাওহিদ হৃদয়, মুস্তাফিজুর রহমান, হাসান মাহমুদ।
শুধু টেস্ট: মুমিনুল হক, তাইজুল ইসলাম, জাকির হাসান, মাহমুদুল হাসান জয়, সৈয়দ খালেদ আহমেদ, নাঈম হাসান।
শুধু ওয়ানডে: মাহমুদউল্লাহ ও তানজিম হাসান সাকিব।
শুধু টি২০: শেখ মেহেদি হাসান, নাসুম আহমেদ ও নুরুল হাসান সোহান।










