৪৫ রানে প্রথম সারির ৬ ব্যাটসম্যানকে হারিয়ে নিশ্চিত হারের মুখে পড়েছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। কারণ, তখনো দলের জয়ের জন্য প্রয়োজন আরো ১৭১ রান। ব্যাটার বলতে ছিলেন উইকেটে থাকা আফিফ হোসেন ধ্রুব ও মেহেদি হাসান মিরাজ। এটিই ছিল বাংলাদেশের শেষ ভরসার জুটি।

এমন কঠিন পরিস্থিতিতে খাদের কিনারায় ঘুরে দাঁড়িয়ে দুজনে; লিখলেন দারুণ এক গল্প। দুজনের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে দলকে এনে দিলেন ৪ উইকেটের অবিশ্বাস্য জয়। এ জয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

চট্টগ্রামে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে আগে ব্যাটিং করে বাংলাদেশকে ২১৬ রানের লক্ষ্য দেয় আফগানিস্তান। টস জিতে প্রথমে ব্যাটিং করে ৪৯.১ ওভারে সবকটি উইকেট হারিয়ে ২১৫ রান করে সফরকারীরা। দলের হয়ে সর্বোচ্চ ৬৭ রানের ইনিংস খেলেন নাজিবউল্লাহ জাদরান। জবাবে ৪৮.৫ ওভারে ছয় উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। দলের জয়ে ধ্রুব হয়ে আফিফ খেলেছেন ৯৩ রানের দুর্দান্ত ইনিংস। ওয়ানডেতে নিজের প্রথম হাফসেঞ্চুরিও এটি। মিরাজও তুলে নেন ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় হাফসেঞ্চুরি। ৮১ রান আসে এই অলরাউন্ডারের ব্যাট থেকে।

২১৬ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে উইকেট হারানোর প্রতিযোগিতা শুরু করে বাংলাদেশ। দলীয় স্কোবোর্ডে ৪৫ রান জমা হতেই নেই ৬ উইকেট। তখনো জয়ের জন্য প্রয়োজন আরো ১৭১ রান।
ইনিংসের তৃতীয় ওভারের তৃতীয় বলেই ধাক্কা খায় বাংলাদেশ। ফজল হক ফারুকির লেন্থ বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন লিটন দাস। শুরুতে আম্পায়ার সাড়া দেয়নি। আফগানিস্তান রিভিউ নিলে তাদের পক্ষে যায় রায়। মাত্র ১ রান করেন লিটন। ক্রিজে আসেন নতুন ব্যাটসম্যান সাকিব আল হাসান। একই ওভারের পঞ্চম বলে এলবিডব্লিউর ফাঁদে তামিম ইকবালকেও সাজঘরে ফেরান ফারুকি। প্রথমে আউট দেননি আম্পায়ার। রিভিউ নিলে এটিও আফগানিস্তানের পক্ষে যায়। ৮ বলে ৮ রান করেন বাংলাদেশের অধিনায়ক।

পঞ্চম ওভারের প্রথম বলেই আবারো ফারুকির আঘাত। এলবিডব্লিউ হয়ে ৫ বলে ৩ রান করে আউট হন মুশফিকুর রহিম। রিভিউ নিলেও রক্ষা মেলেনি। এরপর ইয়াসির আলী রাব্বির অভিষেকটা হলো আরো হতাশাজনক। একই ওভারের শেষ বলে ফারুকির বলে বোল্ড হন ইয়াসির। পাঁচ বল মোকাবেলায় কোনো রান নিতে পারেননি তিনি। তাই অভিষেকটা হলো বিস্বাদ!

ক্রিজে সাকিবের সঙ্গী হন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। তখন ১৮ রানে চার উইকেট হারিয়ে ধুঁকছে বাংলাদেশ। এমন সময় দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়ে মুজিব উর রহমানের বলে ড্রাইভ করতে গিয়ে বোল্ড হন সাকিব। ১৫ বলে ১০ রান করেন তিনি। ২৮ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বিপদ আরো বাড়ে স্বাগতিকদের। বোলিং করতে এসেই সাফল্য পেলেন রশিদ খান। দ্বিতীয় বলে ফেরালেন মাহমুদউল্লাহকে। ৮ রান করে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। ক্রিজে আফিফ হোসেনের সঙ্গী হন মেহেদি হাসান মিরাজ। ১৭৪ রানের জুটিতে তারা লেখেন ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।

এর আগে জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে টস হেরে প্রথমে বোলিং পায় বাংলাদেশ। ইনিংসের তৃতীয় ওভারেই পেসার মুস্তাফিজুর রহমান দলকে প্রথম উইকেট তুলে সাফল্য এনে দেন। ১৪ বলে ৭ রানে ফেরান ওপেনার রহমানউল্লাহ গুরবাজকে। দ্বিতীয় উইকেটে ওপেনার ইবরাহিম জারদান ও ওয়ানডাউনে নামা রহমত শাহ মিলে দলকে এগিয়ে নেন ৫৬ রান পর্যন্ত। শরিফুল ইসলামের বলে ইয়াসির আলী রাব্বির তালুবন্দীতে ইবরাহিমকে ফেরালে ভাঙে ৪৫ রানের জুটি। ২৩ বলে ১৯ রান করেন এই আফগান ওপেনার।

অতিথিরা শুরু থেকেই কিছুটা মন্থর গতিতে ব্যাটিং করে। এরপর বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণের সামনে আরো ডিফেন্সিভ হয়ে যায় আফগান ব্যাটাররা। দলীয় শতরান করতে তারা চার উইকেট হারানোর পাশাপাশি খেলেছে ২৭.২ ওভার। ৭৯ রানের মাথায় রহমত শাহকে ৩৪ রানে ফেরান তাসকিন আহমেদ। দলীয় ১০২ রানের মাথায় অধিনায়ক হাসমতউল্লাহ শাহিদির উইকেট তুলে নেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। সাজঘরে ফেরার আগে ৪৩ বলে ২৮ রান করেন হাসমতউল্লাহ।

পঞ্চম উইকেটে নাজিবউল্লাহ ও মোহাম্মদ নবি রানের গাতি বাড়ানোর পাশাপাশি ৬৩ রানের মূল্যবান পার্টনারশিপ গড়েন। নিজের নবম ওভারে এসে নবিকে ফিরিয়ে ব্রেক থ্রু দেন তাসকিন। ব্যক্তিগ ২০ রানে ফেরেন নবি। এরপর গুলবাদিন নায়েবকে ১৭ ও রশিদ খানকে শূন্য রানে ফেরান সাকিব আল হাসান। মুজিব-উর রহমানকেও রানের খাতা খুলতে দেননি মুস্তাফিজ। একপ্রান্ত আগলে ধরে নাজিবউল্লাহ তুলে নেন ওডিআইতে নিজের ১৩তম হাফসেঞ্চুরি। ৮৪ বলে ৬৭ রানের দায়িত্বশীল ইনিংস খেলে শরিফুলের শিকার হন তিনি।

বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে মুস্তাফিজ তিনটি, তাসকিন, সাকিব ও শরিফুল দুটি করে এবং মাহমুদউল্লাহ একটি উইকেট নেন। মেহেদি হাসান মিরাজ উইকেটশূন্য থাকলেও রান দেয়ার দিক থেকে ছিলেন কিপটে। ১০ ওভারে হাত ঘুরিয়ে তিন মেডেনসহ ২.৮০ ইকোনোমিতে দিয়েছেন মাত্র ২৮ রান।

আফগানিস্তান: ২১৫/১০ (৪৯.১ ওভার)
বাংলাদেশ: ২১৯/৬ (৪৮.৫ ওভার)