ফুটবল আমাদের সমাজে শুধু একটি খেলা নয়, এটি তরুণদের স্বপ্ন, আবেগ এবং ঐক্যের প্রতীক। এ আবেগকে ইতিবাচক শক্তিতে রূপান্তর করাই ইউসিবির লক্ষ্য। আমরা বিশ্বাস করি, দীর্ঘমেয়াদি এবং পরিকল্পিত সহায়তার মাধ্যমে ফুটবলের ভিত্তি শক্ত করা সম্ভব, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরো দৃঢ় করবে।

বাংলাদেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর প্রতি মানুষের ভালোবাসা এবং তরুণ খেলোয়াড়দের অসীম সম্ভাবনা। দেশের প্রতিটি প্রান্তে ফুটবলের প্রতি যে আগ্রহ দেখা যায়, তা যেকোনো উন্নত ফুটবল জাতির জন্য ঈর্ষণীয় হতে পারে। তবে দুর্বলতার জায়গা হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি, মানসম্মত অবকাঠামোর অভাব এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচের সীমাবদ্ধতা। এই তিনটি বিষয় উন্নয়ন করতে পারলে বাংলাদেশের ফুটবলের ভিত্তি অনেক বেশি শক্তিশালী হবে।

বিশ্বকাপের উন্মাদনাকে দেশের ফুটবল উন্নয়নে কাজে লাগানো সম্ভব এবং এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণও বটে। বিশ্বকাপ চলাকালীন দেশে যে আগ্রহ, আলোচনা এবং অংশগ্রহণ তৈরি হয়, সেটিকে যদি পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে সেটি হতে পারে ফুটবল উন্নয়নের বড় চালিকাশক্তি। স্কুল পর্যায়ে ফুটবল কার্যক্রম, বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট, স্থানীয় লিগের সম্প্রসারণ এবং সারা দেশে ট্যালেন্ট হান্ট প্রোগ্রামের মাধ্যমে এ উন্মাদনাকে বাস্তব প্রতিভা তৈরির প্লাটফর্মে রূপান্তর করা সম্ভব।

ফুটবল উন্নয়নে সরকার, ফেডারেশন ও করপোরেট খাত—তিন পক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তার ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। সরকার অবকাঠামো উন্নয়ন ও নীতিগত সহায়তা দিতে পারে, ফেডারেশন মাঠপর্যায়ের ব্যবস্থাপনা ও কৌশলগত পরিকল্পনার দায়িত্ব নিতে পারে, আর করপোরেট খাত পেশাদারত্ব, অর্থায়ন ও ব্র্যান্ডিং সহায়তা দিতে পারে। এ তিন পক্ষ একসঙ্গে কাজ করলে ফুটবলের সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।

এক্ষেত্রে সরকার ও বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কাছে আমাদের প্রত্যাশা হলো স্বচ্ছতা, ধারাবাহিক উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং বিশেষ করে বয়সভিত্তিক ফুটবলে আরো জোর দেয়া। পাশাপাশি ঘরোয়া লিগকে আরো শক্তিশালী ও প্রতিযোগিতামূলক করা এবং জাতীয় দলের জন্য নিয়মিত আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।

আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ একদিন ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারবে। তবে এজন্য প্রয়োজন শুধু স্বপ্ন নয়, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, সুপরিকল্পিত রোডম্যাপ ও ধারাবাহিক উন্নয়ন। সঠিক পথে এগোতে পারলে এক-দেড় দশকের মধ্যে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের উপস্থিতি একটি বাস্তব সম্ভাবনায় পরিণত হতে পারে।

ফুটবল আমার ব্যক্তিগত জীবনেরও একটি গভীর আবেগের অংশ। আমি ব্রাজিলের সমর্থক। ১৯৭৮ সালে প্রথম বিশ্বকাপ দেখার অভিজ্ঞতা আজও স্পষ্টভাবে মনে আছে। তখন টেলিভিশন সহজলভ্য ছিল না—আমরা বন্ধু-পরিবার মিলে দলবেঁধে খেলা দেখতাম। সেই সময়ের বিশ্বকাপ দেখা শুধু খেলা দেখা ছিল না, বরং এক ধরনের সামাজিক উৎসব, যেখানে আনন্দ, উত্তেজনা আর একসঙ্গে থাকার অনুভূতি মিশে থাকত।

১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপ আমার জীবনের এক ভিন্ন ধরনের স্মৃতি বহন করে, যা একই সঙ্গে আনন্দের এবং বেদনার। সে সময় আমি লেখাপড়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে অবস্থান করছিলাম। আশ্চর্যের বিষয়, বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছিল একেবারে কাছেই, আর বোস্টনেও একাধিক ম্যাচ হয়েছিল। কিন্তু তখন আমি সীমিত স্কলারশিপের টাকায় জীবন চালাতাম। বিশ্বকাপের টিকিটের যে মূল্য ছিল, তা আমার পক্ষে কোনোভাবেই বহন করা সম্ভব হয়নি। ফলে এত কাছে থেকেও মাঠে গিয়ে খেলা দেখা আমার জন্য সম্ভব হয়নি।

এ ঘটনা আজও আমাকে ভাবায়। বিশ্বকাপের উত্তেজনা, স্টেডিয়ামের গর্জন—সবকিছুর এত কাছে থেকেও শুধু আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তা দেখতে না পারার যে আফসোস, সেটি এখনো হৃদয়ে রয়ে গেছে। বিশ্বকাপ এলেই সেই স্মৃতি আবার ফিরে আসে, আর একটি নীরব বেদনার মতো আমাকে তাড়া করে ফেরে।

আমার প্রিয় দল ব্রাজিল, তাই স্বাভাবিকভাবেই চাইব ব্রাজিলই বিশ্বকাপ জিতুক এবং আমার প্রেডিকশনও সেটাই। প্রিয় খেলোয়াড় হিসেবে আমি রোনালদিনহোর কথা সবসময়ই বলি—তার অসাধারণ স্কিল এবং খেলার সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে। বর্তমান খেলোয়াড়দের মধ্যে কিলিয়ান এমবাপ্পের গতি, তীক্ষ্ণতা এবং আক্রমণাত্মক ভঙ্গি আমাকে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে।

ইউসিবি বিশ্বাস করে, খেলাধুলা কেবল বিনোদন নয়, বরং এটি জাতি গঠন, তরুণদের সক্ষমতা উন্নয়ন এবং একটি শক্তিশালী ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম ভিত্তি।

ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি