খেলোয়াড়দের নয়, ছবি তুলতে ভিড় জমেছিল এক সমর্থককে ঘিরে। মাথায় বিশাল কালো সোমব্রেরো, মুখে চেনা হাসি—হেক্টর চাভেজ, যাকে সবাই চেনে ‘কারামেলো’ নামে।

মেক্সিকোর ফুটবলপ্রেমীদের কাছে তিনি শুধু একজন সমর্থক নন, বরং প্রতীক। জাতীয় দলের জার্সি, বিশাল টুপি আর অবিচল উপস্থিতি তাকে এমন এক পরিচিত মুখে পরিণত করেছে, যাকে অনেক সময় জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মতোই জনপ্রিয় মনে হয়। ৬৪ বছর বয়সী এ সমর্থক এবার অংশ নিচ্ছেন তার একাদশ বিশ্বকাপে। আর পাশে রয়েছেন তার ২১ বছর বয়সী ছেলে হেক্টর চাভেজ জুনিয়র, যিনি ‘কারামেলো জুনিয়র’ নামেই পরিচিত।

বাবা-ছেলের মাথায় একই ধরনের বড় সোমব্রেরো, তাতে বড় অক্ষরে লেখা তাদের ডাকনাম। ফলে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে তাদের খুঁজে পাওয়া কখনই কঠিন নয়।

কারামেলোর বিশ্বকাপযাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮৬ সালে। সেবারই সর্বশেষ বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল মেক্সিকো। চাভেজ জানান, জাতীয় দলের প্রথম ম্যাচ তিনি দেখেছিলেন ১৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে। আর একই বছরের ৩ জুন বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শুরু হয়েছিল তার বিশ্বকাপ দর্শকজীবন।

এরপর কেটে গেছে চার দশক। কিন্তু আবেগে ভাটা পড়েনি। বরং সময়ের সঙ্গে বেড়েছে পথচলা। দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল মেক্সিকোর হয়ে তার দেখা ৫৪৩তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। শুধু বিশ্বকাপ নয়, প্রীতি ম্যাচ কিংবা অন্য যেকোনো টুর্নামেন্ট—যেখানেই খেলুক ‘এল ত্রি’, সেখানেই হাজির হওয়ার চেষ্টা করেন তিনি।

চাভেজের ভাষায়, ‘মেক্সিকোর সমর্থকরা বিশ্বের সেরা সমর্থকদের একটি। তারা সবচেয়ে বেশি ভ্রমণ করে, সবচেয়ে রঙিন পরিবেশ তৈরি করে। ঐতিহ্য, পরিচয় আর গর্ব—সবকিছুই আছে তাদের মধ্যে। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি যে এখনো জাতীয় দলের পাশে থাকতে পারছি, আর আমার ছেলেও সেই পথ ধরে হাঁটছে।’

এবারের বিশ্বকাপে আসাটা তার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। কারণ এ বিশ্বকাপকে তিনি ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল আসর বলে মনে করেন। ‘আমার অনেক বন্ধু এবার আসতে পারেনি। তারা সাধারণত আমার সঙ্গে ম্যাচ দেখতে যায়। কিন্তু টিকিটের দাম এত বেশি যে তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। আমাদেরও সঞ্চয় ভাঙতে হয়েছে। পরিবারের সমর্থন ছাড়া এখানে আসা সম্ভব হতো না। আমরা অনেক পরিশ্রম করেছি, তবেই এখানে পৌঁছতে পেরেছি’, বলেন তিনি।

বিশ্বকাপে কারামেলোর জনপ্রিয়তা যেমন ব্যাপক, সমালোচনাও তেমনি কম নয়। অনেকের অভিযোগ, তিনি জাতীয় দলের চেয়ে নিজের প্রচারণাতেই বেশি মনোযোগী। গত সপ্তাহে মেক্সিকো সিটিতে কলম্বিয়া ও উজবেকিস্তানের ম্যাচ চলাকালে মাঠে নিজের টুপি ছুড়ে দিয়ে বিতর্কও তৈরি করেছিলেন তিনি।

তবে এসব সমালোচনাকে খুব একটা গুরুত্ব দেন না কারামেলো কিংবা তার ছেলে। কারামেলো জুনিয়রের ভাষায়, মানুষ যদি সমালোচনা করে, তাহলে বুঝতে হবে আপনি কিছু একটা করছেন। আমরা এসব নিয়ে বেশি ভাবি না। যারা আমাদের ভালোবাসে, তাদের সমর্থনই আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে কারামেলো অবশ্য একা নন। প্রায় প্রতিটি দেশেরই এমন কিছু ‘সুপারফ্যান’ আছে, যারা জাতীয় দলের সঙ্গে একাকার হয়ে যান। স্পেনের মানুয়েল কাসেরেস, যিনি ‘মানোলো এল দেল বোম্বো’ নামে পরিচিত ছিলেন, চার দশকের বেশি সময় স্পেনকে অনুসরণ করেছেন। ব্রাজিলের ক্লোভিস আকোস্তা ফার্নান্দেস, ‘গাউশো দা কোপা’ নামে পরিচিত, বিশ্বকাপের এক কিংবদন্তি সমর্থকে পরিণত হয়েছিলেন। কঙ্গোর মিশেল এনকুকা এম্বোলাদিঙ্গাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত মুখ।

তবে কারামেলোর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ অন্য জায়গায়। তার মতে, বিশ্বকাপ ক্রমেই সাধারণ সমর্থকদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে গ্যালারির প্রাণও কমে যাচ্ছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচের পর তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমি সেই সমর্থকদের মিস করি, যারা পুরো ৯০ মিনিট গান গায়, স্লোগান দেয়, দলকে উজ্জীবিত করে। খেয়াল করেছেন, গ্যালারিতে “‍মেক্সিকান ওয়েভ”ও ঠিকমতো উঠছিল না? কারণ সেই নিবেদিতপ্রাণ সমর্থকরা এখানে নেই। আর তারা নেই কারণ এ টিকিটের দাম তাদের নাগালের বাইরে।’

দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ শেষে যখন দর্শকরা স্টেডিয়াম ছাড়ছিলেন, তখনো ছবি তোলার জন্য কারামেলোকে ঘিরে ভিড় ছিল। ৬৪ বছর বয়সী এ সমর্থক অবশ্য তাতে খুব একটা বিচলিত নন। তার চোখ এখন মেক্সিকোর পরের ম্যাচে। চার দশক আগে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেটি এখন ছেলের হাত ধরে নতুন প্রজন্মে পৌঁছেছে। বিশ্বকাপ বদলেছে, টিকিটের দাম বেড়েছে, গ্যালারির চেহারাও পাল্টেছে। কিন্তু বিশাল সেই কালো সোমব্রেরো পরে মেক্সিকোর পতাকা হাতে কারামেলো এখনো একই রকম। জাতীয় দলের পেছনে ছুটে চলা এক নিরলস সমর্থক। যিনি বিশ্বাস করেন, ফুটবলের আসল শক্তি গ্যালারির আবেগেই লুকিয়ে আছে।