দলবদলের বাজারে কোটি কোটি ডলার খরচ করা হয়েছে, উড়িয়ে আনা হয়েছে বড় নামের কোচ। তবে কিছুতেই পতন ঠেকানো যাচ্ছে না এভারটনের। একের পর এক হারে চলতি ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ টেবিলে ১৯তম স্থানে নেমে গেছে ক্লাবটি। ধারাবাহিক ব্যর্থতায় সম্প্রতি ছাঁটাই করা হয়েছে ইংলিশ কোচ ফ্রাংক ল্যাম্পার্ডকে। এ মুহূর্তে ক্লাবটি বিক্রির কথাও উঠেছে।

সমর্থকরা ক্লাব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন। এমন পরিস্থিতিতে ক্লাবটি বিক্রির গুঞ্জন উঠলেও তা অস্বীকার করেছেন মালিক ফরহাদ মশিরি। তিনি বলেছেন, সমর্থকদের কষ্টটা তিনি বুঝতে পারছেন এবং তাদের হূদয় জয় করতে যা কিছু করা প্রয়োজন তিনি করবেন। মশিরি বলেন, ‘এ ক্লাবটি বিক্রি করা হচ্ছে না, কিন্তু আমরা শীর্ষ বিনিয়োগকারী খুঁজছি, যারা আমাদের সাহায্য করতে সমর্থ হবেন। আমি একাই এটা করতে পারি, তবু আমি এভারটনে শীর্ষ ও ভালোমানের বিনিয়োগকারী আনতে চাই। আমরা এর কাছাকাছি রয়েছি।’

তিনি আবারো বলেন, ‘এ মুহূর্তে ক্লাবটি বিক্রি করা হবে না। বৈশ্বিক পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো ও বাণিজ্যিক উন্নয়নের চেষ্টা করা হবে। ক্রীড়ায় বিনিয়োগ করে এমন বহু স্পেশালিস্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের এ মুহূর্তে এভারটনে প্রয়োজন।’

বর্তমান ফর্ম অব্যাহত থাকলেও ক্লাবটি হয়তো পরবর্তী মৌসুমে দ্বিতীয় বিভাগে (ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপ) খেলবে, যখন কিনা ইংল্যান্ডের অন্যতম ঐতিহ্যবহুল ক্লাবটির নতুন ওয়াটারফ্রন্ট স্টেডিয়াম উদ্বোধন করা হবে। ৬৯ বছর ধরে ইংল্যান্ডের শীর্ষ লিগে টানা খেলে যাওয়ার পর এবার অবনমনের শঙ্কায় এভারটন। অস্তিত্বের প্রশ্নে তাই ক্লাবটি ল্যাম্পার্ডকে বরখাস্ত করতে বাধ্য হয়। তাই আবার নতুন কোচের খোঁজে এভারটন।

ফরহাদ মশিরি অন্তত ৭৮ কোটি ডলার খরচ করে ক্লাবটির অতীত গৌরব ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিলেন, যখন কিনা ক্লাবটি প্রতিটি শিরোপার জন্য লড়াই করত। এ নিয়ে এভারটন সমর্থক ও লেখক জিম কিগান এপিকে বলেন, ‘আমরা আশা করেছিলাম, একজন বিলিয়নেয়ার এসে আমাদের সব সমস্যার সমাধান করে দেবেন। কিন্তু দিনশেষে দেখলাম, এটি বরং অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সমস্যাই তৈরি করেছে। কোনো একজন লটারি জয়ের পর যেভাবে স্বর্ণের দোকানে টাকাগুলো উড়িয়ে দেয়, এভারটনও হয়তো সেভাবে টাকাগুলো মাটি করেছে। তারা জানে না হয়তো, এটি কীভাবে খরচ করতে হয়।’

সর্বশেষ ১৪ ম্যাচের মধ্যে ১১টিতেই হেরেছে এভারটন, এ সময় টফিসরা জিতেছে মাত্র একটি ম্যাচ। গত শনিবার ওয়েস্টহ্যামের কাছে ২-০ গোলে হারের পরই শেষ হয়ে যায় ল্যাম্পার্ড অধ্যায়। ল্যাম্পার্ডকে তার মেয়াদের এক বছর পূর্তির সপ্তাহখানেক আগে বরখাস্ত করা হয়! টফিসরা পরের ম্যাচ ৪ ফেব্রুয়ারি ঘরের মাঠে খেলবে লিগ লিডার আর্সেনালের বিপক্ষে। তাই সামনে আরো কঠিন পরীক্ষা লিভারপুল শহরের দলটির।

ল্যাম্পার্ড আসার আগেই টফিদের পতন শুরু হয়। আশির দশকে এভারটন ছিল ইংল্যান্ডের অন্যতম সফল ক্লাব, যারা ওই সময় দুটি লিগ শিরোপাসহ এফএ কাপ ও ইউরোপিয়ান কাপ, উইনার্স কাপ জয় করে। সব মিলিয়ে তারা ১৫টি বড় শিরোপা জয় করেছে, যদিও ১৯৯৫ সালে এফএ কাপ জয়ের পর গুডিসন পার্কে আর কোনো শিরোপা যায়নি।

যদিও ২০১৬ সালে মশিরির আবির্ভাবে এভারটনে আশা জাগে। তিনি ক্লাবটির ৪৯.৯ শতাংশ শেয়ার কিনে ক্লাবটিতে বিনিয়োগ করতে থাকেন। তার আশা ছিল, এভারটন আবারো শীর্ষ লিগের বড় দলগুলোর সঙ্গে লড়াই করবে। যদিও তার অধ্যায়ে হতাশাই সঙ্গী হয় সমর্থকদের।

মশিরির সময়ে ষষ্ঠ কোচ হিসেবে ছাঁটাই হলেন ল্যাম্পার্ড। এ পরিসংখ্যানই বলে দেবে, তার সময়ে গুডিসন পার্কে কতটা অস্থিরতা বিরাজমান রয়েছে। ল্যাম্পার্ডের আগে রবার্তো মার্তিনেজ, রোনাল্ড কোম্যান, স্যাম অ্যালারডাইস, মার্কো সিলভা ও রাফায়েল বেনিতেজ বরখাস্তের শিকার হন।

তার সময়ে ২০২১ সালে নিয়োগ পেয়েছিলেন ইতালির কোচ কার্লো অ্যানচেলত্তিও। ইউরোপের অন্যতম সফল এ কোচকে নিয়োগ করেই মশিরি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি কী চান। যদিও এভারটন ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদকে বেছে নেন বলেই হয়তো খারাপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি অ্যানচেলত্তিকে। রিয়ালে গিয়ে তিনি লা লিগা ও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা জিতেছেন।

অ্যানচেলত্তি ছাড়া ছাঁটাইয়ের শিকার হওয়া অন্য কোচদের নিয়োগ দেখেই অনুমান করে নেয়া যায় যে ব্রিটিশ-ইরানি ব্যবসায়ী এভারটন ক্লাবে সফলতা এনে দিতে প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তিনি অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেননি।

এর মধ্যে লিভারপুলের সাবেক কোচ বেনিতেজের নিয়োগকে বিতর্কিত ও ভুল হিসেবে দেখছেন জিম কিগান। তিনি বলেন, ‘যে কোচকে এরই মধ্যে সমর্থকরা ঘৃণা করেন, তাকে কে নিয়োগ দেবে? কাজেই এটা ছিল ভুল নিয়োগ। কারণ, এভারটনিয়ান হিসেবেই আমরা লিভারপুলকে ঘৃণাভরেই দেখি।’

২০১৬ সালে মশিরির বিনিয়োগকে স্বাগত জানিয়েছিলেন এভারটন চেয়ারম্যান বিল কেনরাইট। তিনি ওই সময় বলছিলেন, ‘বিস্তর খোঁজাখুঁজির পর আমরা এমন সহযোগীকে পেয়েছি যিনি ক্লাবটিকে সামনে এগিয়ে নিতে সমর্থ হবেন।’

সমর্থকদের চাওয়া পূরণ হয়নি। ২০১৭ সালে সপ্তম স্থান নিয়ে লিগ শেষ করে এভারটন, যা ছিল ওই সময় দলের সেরা পারফরম্যান্স। গত মৌসুমে নাটকীয়ভাবে অবনমন থেকে বেঁচে যায় এভারটন। শেষ ম্যাচে ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ৩-২ গোলের জয় তুলে নেয় এভারটন, যা তাদের অবনমন থেকে বাঁচিয়ে দেয়।

গতবার এভারটনকে শীর্ষ লিগে টিকে থাকতে সাহায্য করেন ল্যাম্পার্ড। কিন্তু এবারো অবনমন ঝুঁকিতে থাকায় বিদায় নিতে হলো ইংলিশ গ্রেটকে।