রজার ফেদেরারের হাত ধরে টেনিসের আধুনিক ব্র্যান্ডিং দেখেছে বিশ্ব। আমেরিকান তারকা পিট সাম্প্রাস ১৯৯০-এর দশকে খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছলেও পরবর্তী সময়ে তাকে ছাপিয়ে যান ফেদেরার। ধ্রুপদী টেনিস খেলে তিনি টেনিসপ্রেমীদের হূদয়ে জায়গা করে নেন। অসংখ্যবার ছুরির নিচে যেতে না হলে হয়তো টেনিসকে আরো আলোকিত করতে পারতেন ‘ফেড এক্সপ্রেস’।
কিন্তু চোট তা হতে দিল না। ইতি টানতে হলো কোর্ট থেকে। অবসরের ঘোষণা দিলেন টেনিস রাজা ফেদেরার। আগামী শুক্রবার থেকে রোববার লন্ডনে লেভার কাপই রজারের বিদায়ী টুর্নামেন্ট হয়ে থাকবে। সদ্য সমাপ্ত ইউএস ওপেনে শেষ ম্যাচ খেলেন নারী টেনিসের কিংবদন্তি সেরেনা উইলিয়ামস। এবার ফেদেরারের বিদায়ের ঘোষণা।
২০২০ সালে দুটি অস্ত্রোপচারের ধাক্কা সামলে ফিরেছিলেন আবার। ২০২১ সালে উইম্বলডনের কোয়ার্টার ফাইনালে হুবার্ট হারকাজের কাছে হেরে বিদায় নেয়ার পর তৃতীয়বার হাঁটুকে নিতে হয় ছুরির নিচে। এত কিছু শুধুই কোর্টে ফেরার জন্য। কোর্টে কত যুদ্ধেই তো জয়ী হলেন, শরীরী যুদ্ধও জয় করেছিলেন, কিন্তু শরীরের সঙ্গে সবসময় জোরজবরদস্তি চলে না।
টেনিসের কোটি সমর্থকের জন্য তার বিদায়ের ঘোষণাটা বিষাদেরই। তবু চলে যাওয়ার সময় হয়েছে বৈকি। কেননা সুইস গ্রেটের বয়স এখন ৪১। আবার শরীরও মনের প্রতিকূলে হাঁটছিল। অবশ্য বিদায় নিলেও তিনি এই খেলার অন্যতম কিংবদন্তি আর নক্ষত্র হয়ে জ্বলবেন। ক্যারিয়ারে ২০টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতেছেন। তার চেয়েও বেশি ২২ বার গ্র্যান্ড স্ল্যামজয়ী রাফায়েল নাদাল আর নোভাক জোকোভিচ জিতেছেন ২১ বার। তবু টেনিসের ‘রাজা’
ফেদেরার।
ফেদেরারের সার্ভ কিংবা নিখুঁত ফোরহ্যান্ড যেন একেকটা শিল্প। একজন ক্রীড়াবিদকে পরিপূর্ণতা দেয়, এমন সব শিষ্টাচারে যেন পূর্ণ ফেদেরার। পারফরম্যান্স, ধ্রুপদী খেলার স্টাইল, অর্জন, আর আচরণ—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন টেনিসের রাজা। তাই তো তাকে খুঁজে ফিরেছে বাণিজ্যিক জগৎও। স্বচ্ছ ভাবমূর্তিকে পুঁজি করেই তিনি এনডোর্সমেন্ট থেকে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ উপার্জন করেছেন।
সম্রাটের প্রস্থানে উইম্বল্ডনের সেন্টার কোর্টের সবুজ ঘাসও ঔজ্জ্বল্য হারাবে। রাফায়েল নাদালের (১৪ বার) যেমন আছে ফ্রেঞ্চ ওপেনের দুর্গ জয়ের গৌরব, তেমনি ফেদেরারের গর্ব উইম্বল্ডন। উইম্বল্ডনে সর্বোচ্চ আটটি শিরোপা জেতার রেকর্ড তারই দখলে। উইম্বলডন মানেই যেন ফেদেরার, আর ফেদেরার মানেই যেন উইম্বল্ডন। তার অবসরের ঘোষণায় দুটিই রঙ হারাবে।
ক্যারিয়ারে ১০৩টি শিরোপা জিতেছেন ফেদেরার। তার চেয়ে বেশি ১০৯টি শিরোপা জেতার রেকর্ড আছে কেবল সাবেক আমেরিকান খেলোয়াড় জিমি কনোর্সের।
২০০৩ সালে উইম্বল্ডনে মার্ক ফিলিপোসিসকে হারিয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জেতেন। বছর শেষ করেন ৭৮ ম্যাচ জিতে।
ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ হাজার ২৫২টি সিঙ্গেল ম্যাচ জেতার রেকর্ড ফেদেরারের। খেলেছেন ১ হাজার ৫২৬ ম্যাচ। ২২৩ ডাবলসে জিতেছেন ১৩১ ম্যাচ। সর্বোচ্চ ১ হাজার ২৭৪টি সিঙ্গেল ম্যাচ জিতেছেন জিমি কনোর্স। সবচেয়ে বেশি টানা ২৩৭ সপ্তাহ র্যাংকিংয়ের ১ নম্বরে থাকার রেকর্ড রয়েছে ফেদেরারের। তিনিই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি টানা পাঁচবার উইম্বল্ডন (২০০৩-২০০৭) ও ইউএস ওপেন (২০০৪-২০০৮) শিরোপা জিতেছেন।
ফেদেরার একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে এক ক্যালেন্ডারে তিনবার (২০০৬, ২০০৭ ও ২০০৯ সালে) চারটি গ্র্যান্ড স্ল্যামেরই ফাইনাল খেলেছেন। ক্লে কোর্ট, হার্ড কোর্ট ও গ্রাস কোর্টে অন্তত ১০টি করে ট্রফি জেতা একমাত্র খেলোয়াড়ও তিনি। ক্যারিয়ারের সেরা সময় ২০০৩ থেকে ২০১০। এ সময় তিনি ১৬টি গ্র্যান্ড স্ল্যাম জেতেন। ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে সবশেষ গ্র্যান্ড স্ল্যামের স্বাদ পান তিনি।
টেনিসে দ্বৈরথ ছিল ফেদেরার-নাদালের। স্বয়ং চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীও কখনো চাননি এ দিনটা আসুক। টুইটারে নাদাল লিখেছেন, প্রিয় রজার, আমার বন্ধু ও প্রতিদ্বন্দ্বী। এ দিনটা যদি কখনো না আসত! ব্যক্তিগতভাবে আমার জন্য ও বিশ্বজুড়ে থাকা এ খেলার মানুষদের জন্য আজ বেদনার দিন। যখন আমাদের কথা হয়েছিল, তখনো বলেছিলাম, এখনো বলছি, এতগুলো বছর তোমার সঙ্গে কাটানো, কোর্টে এবং কোর্টের বাইরে অসংখ্য অসাধারণ মুহূর্ত আমার জন্য শুধু আনন্দের নয়, বরং সম্মানেরও।










