মেজর লিগ সকারের (এমএলএস) প্লে-অফ শুরু হলো মেসি-ম্যাজিকে। গোল্ডেন বুট হাতে পেয়েছেন ম্যাচের আগেই। তারপর শুরু প্রথম ম্যাচ, আর সেখানেই জোড়া গোল করে ইন্টার মায়ামিকে দারুণ জয় এনে দিলেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। এমএলএসের ইস্টার্ন কনফারেন্সের সেরা তিন ম্যাচের প্রথমটিতে ন্যাশভিল এসসিকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল মেসির মায়ামি।
ম্যাচ শুরুর আগে ইন্টার মায়ামির জন্য ছিল এক বিশেষ মুহূর্ত। গত মৌসুমের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে লিওনেল মেসির হাতে গোল্ডেন বুট ট্রফি তুলে দেন এমএলএস কমিশনার ডন গারবার। পুরস্কার গ্রহণের পর মাঠে ফিরেই যেন প্রতিপক্ষকে মেসির বার্তা—তার জাদু এখনো চলছে।
মাত্র ১৯ মিনিটের মাথায় জাদুকরী গোল! সতীর্থের পাস থেকে ডি-বক্সের মধ্যে ডাইভিং হেডে গোল করেন ৩৮ বছর বয়সী মেসি। হেডে মেসির গোল তুলনামূলকভাবে কম বলে এমন দৃশ্য কিছুটা অপ্রত্যাশিতই ছিল। তবে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র বা শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ করে যাওয়ার মতো মেসি যে প্রত্যাশার মানবীয় মানদণ্ডকেও কখনো কখনো মুচকি হেসে উড়িয়ে দেন, সেটা তো নতুন নয়! বিরতির পর দ্বিতীয়ার্ধেও বজায় থাকে মায়ামির দাপট। ম্যাচের ৬২ মিনিটে মায়ামির হয়ে দ্বিতীয় গোলটি আসে। আর এ গোলের কারিগরও সেই মেসি! ডানদিকে ইয়ান ফ্রেকে পাস দেন এলএমটেন। ফ্রে বলটি বক্সে চিপ করে পাঠান, আর সেই বল হেডে জালে জড়ান তাদেও আলেনদে।

ম্যাচের শেষ দিকে অতিরিক্ত সময়ের ৯৬ মিনিটে আসে মেসির দ্বিতীয় গোল। ডি-বক্সের মধ্যে বলটি ডিফেন্ডারদের পায়ে লেগে অপ্রত্যাশিতভাবে আনমার্কড মেসির সামনে চলে আসে। ঠাণ্ডা মাথায় বলটি জালে ঠেলে দেন রোজারিওর ফুটবল-বিস্ময়। স্কোর দাঁড়ায় ৩-০। ১০১ মিনিটে ন্যাশভিলের হয়ে একটি গোল শোধ করেন হানি মুখতার। সেটি ম্যাচের শেষ শট হওয়ায় ৩-১ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ইন্টার মায়ামি।
এই বড় জয়টি ইন্টার মায়ামির জন্য আরো একটি কারণে বিশেষ। কারণ এর ঠিক আগের দিনই ক্লাব ঘোষণা করেছে যে মেসির সঙ্গে তাদের তিন বছরের চুক্তি নবায়ন হয়েছে। ফলে মেসি তার চল্লিশের কোটাতেও এ ক্লাবেই থাকতে পারেন। তিন বছরের চুক্তির ফলে ২০২৮ সাল পর্যন্ত মায়ামির হয়ে খেলে যাবেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এ মহাতারকা। এই চুক্তি আর পরদিনের জাদুকরী পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়ে মেসি জানিয়ে দিলেন, আগামী বছরের ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপের জন্যও তিনি পুরোপুরি তৈরি।
মেসির হাতে গোল্ডেন বুট তুলে দেয়ার পর এমএলএস কমিশনার ডন গারবার বলেন, ‘আমরা কখনো কল্পনাও করিনি যে লিও এই ক্লাব, এই শহর এবং এই লিগের জন্য এমন কিছু করতে পারবেন। তিনি মেজর লিগ সকারের গতিপথ পাল্টে দিয়েছেন। তার আরো তিন বছর থাকা আমাদের জন্য আরেকটা উপহার। মেসি হলো ইউনিকর্নদের ইউনিকর্ন। তার চিন্তা, তীব্রতা আর জেতার ইচ্ছা তাকে ফুটবল ইতিহাসের সেরা করে তুলেছে।’
নতুন চুক্তিই কি মেসিকে আরো উদ্দীপ্ত করেছে? মেসি যেমন মায়ামিতে শান্তি খুঁজে পেয়েছেন, তেমনি ইন্টার মায়ামিও তাকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ফুটবলে একটা আলোড়ন তুলতে পেরেছে। মেসির আগমনের পর তাদের রাজস্ব আয় বছরে দ্বিগুণ বেড়েছে। মেসির গোলাপি রঙের ১০ নম্বর জার্সি বিক্রি, ম্যাচের টিকিট বিক্রি, বিজ্ঞাপন মিলিয়ে বছরে তাদের আয় এখন দেড় বিলিয়ন ডলার! তাকে দিয়েই নতুন স্টেডিয়াম ‘মায়ামি ফ্রিডম পার্ক’ উদ্বোধন করতে চান ইন্টার মায়ামি। স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা হবে ২৫ হাজার, নান্দনিক স্টেডিয়ামটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হবে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে।
মেসিকে আরো তিন বছরের জন্য পেয়ে মেজর লিগ সকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও খুশি। তিনি এ ফুটবল লিগটিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। গত মৌসুমে লিগের মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার (এমভিপি) হয়েছেন, এবারো তিনি ফেভারিট। এমএলএসের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে দুবার এমভিপি জিততে চলেছেন মেসি। ১৯৯৭ ও ২০০৩ সালে দুবার এমভিপি হয়েছিলেন প্রেকি।
এ মৌসুমে ২৯ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছেন মেসি। এছাড়া ১৯টি অ্যাসিস্ট মিলিয়ে ৪৮টি গোলে অবদান রেখেছেন তিনি, যা রেকর্ডের চেয়ে একটি কম। ২০১৯ সালে কার্লোস ভেলা মোট ৪৯ গোলে অবদান রেখেছিলেন।
এ মৌসুমে মোট পাঁচ ম্যাচে একাধিক গোল করেছেন মেসি, যা মেজর লিগ সকারে প্রথম কীর্তি। এছাড়া সব মিলিয়ে ১০ ম্যাচে একাধিক গোল করেন, যা আরেকটি রেকর্ড। আগের রেকর্ডটি ছিল আট ম্যাচের। ইন্টার মায়ামির মালিক জর্জ ম্যাস বলেন, ‘একটি আইকনিক ক্লাব হিসেবে বেড়ে ওঠার প্রতিশ্রুতি আমরা সমর্থকদের কাছে করেছি। আবেগ, কঠোর পরিশ্রম আর নিবেদন ক্লাবটির স্বপ্নপূরণের পাথেয়। সেই সঙ্গে লিওর ২০২৮ সাল পর্যন্ত চুক্তি সই অসাধারণ এ শহরটির জন্য আশীর্বাদ।’
এটা নিশ্চিতভাবেই মেসির ক্যারিয়ারের শেষ পেশাদার চুক্তি। ২০০৪ সালে ১৭ বছরের কিশোরের যাত্রা হয়েছিল স্প্যানিশ লা লিগায়। সেই থেকে তিনি দীর্ঘ যাত্রায় হয়ে ওঠেন বার্সেলোনার কিংবদন্তি। ২০২১ সাল পর্যন্ত বার্সার জার্সিতে খেলে সম্ভাব্য সবকিছুই জিতেছেন তিনি। ২০২১ সালে নাম লেখান পিএসজিতে, সেখানে দুই মৌসুম খেলে ২০২৩ সালে সবাইকে চমকে দিয়ে পাড়ি জমান ইন্টার মায়ামিতে। তার প্রথম চুক্তির আর্থিক মূল্য ছিল প্রায় ১৫ কোটি ডলার। প্রথম মৌসুমে লিগ কাপ এনে দিয়ে ইন্টার মায়ামির আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন। এখনো দিয়ে চলেছেন।










