বাংলাদেশ সময় গতকাল সকালে মেক্সিকোর গুয়াদালাহারার এস্তাদিও গুয়াদালাহারা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘এ’-এর ম্যাচে পিছিয়ে পড়েও ঘুরে দাঁড়ানোর যে সক্ষমতা দক্ষিণ কোরিয়া দেখিয়েছে, তা তাদের ট্যাকটিক্যাল পরিপক্বতারই প্রমাণ। দীর্ঘ সময় বলের দখল ধরে রেখে প্রতিপক্ষকে নিজেদের কাঙ্ক্ষিত ছন্দে খেলতে বাধ্য করা এবং সুযোগমতো দ্রুত ট্রানজিশনে আঘাত হেনে ম্যাচ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখা—সব ক্ষেত্রেই দক্ষিণ কোরিয়া ছিল স্পষ্টতই এগিয়ে।
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের ফুটবল দর্শনের পার্থক্য স্পষ্ট ছিল। দক্ষিণ কোরিয়া বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে ধৈর্যের সঙ্গে আক্রমণ গড়ার চেষ্টা করেছে। কোরিয়ানরা ৪-৩-৩ ছকে খেললেও আক্রমণের সময় সেটি প্রায়ই ২-৩-৫ আকার ধারণ করছিল। দুই ফুলব্যাক ওপরে উঠে গিয়ে মাঠের প্রস্থ বাড়াচ্ছিলেন, আর মাঝমাঠের একজন খেলোয়াড় নিচে নেমে এসে বল বণ্টনের দায়িত্ব নিচ্ছিলেন।
চেক প্রজাতন্ত্র অবশ্য রক্ষণে সুশৃঙ্খল ছিল। ৪-২-৩-১ কাঠামোয় মাঝমাঠ ঘন করে তারা লি কাং-ইনের মতো সৃজনশীল খেলোয়াড়কে লাইনের মাঝখানে জায়গা নিতে দেয়নি। ফলে বলের দখল দক্ষিণ কোরিয়ার হলেও প্রথমার্ধে পরিষ্কার গোলের সুযোগ খুব বেশি তৈরি হয়নি। অন্যদিকে প্যাট্রিক শিককে কেন্দ্র করে চেকরা দ্রুত পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করছিল। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সেন্টার ব্যাকরা ভাসমান বলে আধিপত্য দেখিয়ে সে হুমকি বেশির ভাগ সময়ই সামলে নেন।
গোলশূন্য প্রথমার্ধের পর ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় ৫৯ মিনিটে। দীর্ঘ থ্রো-ইন থেকে পাওয়া পরিস্থিতিতে লাদিস্লাভ ক্রেইচির শক্তিশালী হেডে এগিয়ে যায় চেক প্রজাতন্ত্র। যদিও তখন পর্যন্ত মাঠের নিয়ন্ত্রণ দক্ষিণ কোরিয়ার হাতেই ছিল। তবু সেট-পিসে দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ইউরোপিয়ানরা লিড আদায় করে নেয়।
পিছিয়ে পড়ার পর দক্ষিণ কোরিয়ার কৌশল বদলায়। ধীরগতির পাসিং ছেড়ে দ্রুতগতির ফুটবলে চলে যায়। মাঝমাঠে হোয়াং ইন-বম আরো সামনে উঠে খেলতে শুরু করেন এবং বল পেয়ে দ্রুত টার্ন নিয়ে চেক মিডফিল্ড ও ডিফেন্সের মাঝের ফাঁকা জায়গা কাজে লাগান।
যার ফল আসে ৬৭ মিনিটে। লি কাং-ইনের চমৎকার থ্রু পাস থেকে সুযোগ পেয়ে হোয়াং ইন-বম দুর্দান্ত ফিনিশে সমতা ফেরান। গোল শোধ করেই আক্রমণের গতি আরো বাড়ায় দক্ষিণ কোরিয়া। উইঙ্গার ও ফরওয়ার্ডদের ঘন ঘন পজিশন বদল চেক রক্ষণকে আরো বিভ্রান্ত করে তোলে।
শেষ পর্যন্ত জয়সূচক গোল আসে ৮০ মিনিটে। চেক প্রজাতন্ত্র আক্রমণে উঠে আসায় তাদের ফুলব্যাকের পেছনে বিশাল জায়গা তৈরি হয়েছিল। সেই ফাঁকা অঞ্চল লক্ষ্য করে দ্রুত পাল্টা আক্রমণ চালায় কোরিয়ানরা। হোয়াং ইন-বমের নিচু ক্রস থেকে বদলি খেলোয়াড় ও হিয়ন-গ্যু কাছের পোস্টে নিখুঁত ফিনিশ করে দলকে এগিয়ে দেন।
শেষদিকে চেকরা লম্বা বল, থ্রো-ইন এবং সেট-পিসের ওপর নির্ভর করে সমতায় ফেরার চেষ্টা চালায়। তবে দক্ষিণ কোরিয়া তখন ৪-১-৪-১ রক্ষণাত্মক ব্লকে নেমে এসে মাঝমাঠের জায়গাগুলো বন্ধ করে দেয়। গোলরক্ষক কিম সিউং-গিউর একটি গুরুত্বপূর্ণ সেভও তাদের জয় নিশ্চিত করতে সহায়তা করে।
ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল কৌশল বদলে নেয়ার সক্ষমতা। বলের দখল ধরে রেখে ম্যাচের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করা, পিছিয়ে পড়ার পর আক্রমণের গতি বাড়ানো এবং শেষ পর্যন্ত পাল্টা আক্রমণে প্রতিপক্ষের জালে বল জড়ানো। ম্যাচের পর দুই কোচের প্রতিক্রিয়াতেও মাঠের চিত্রই প্রতিফলিত হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার কোচ হং মিয়ং-বো জানান, ম্যাচের আগে তিনি খেলোয়াড়দের দুটি বার্তা দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত হাল না ছাড়া এবং সবাই মিলে ইউনিট হিসেবে খেলা। তার ভাষায়, ‘মাঠে কিংবা বেঞ্চে, সবাইকে এক দল হিসেবে খেলতে হবে।’ অন্যদিকে চেক কোচ মিরোস্লাভ কৌবেক স্বীকার করেন, ‘ভালো দলই জিতেছে। আমরা লড়েছি কিন্তু আমাদের আরো সৃজনশীল হতে হবে।’










