আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক খেলা ছেড়ে অন্য খেলায় ক্যারিয়ার গড়ার বহু উদাহরণ রয়েছে। কেউ কেউ ঈশ্বর প্রদত্ত মেধার কারণে একাধিক খেলায় দক্ষতা প্রদর্শন করতে পেরেছেন। কেউবা আবার শুধুই শখের বসে এক খেলা ছেড়ে অন্য খেলাকে বেছে নিয়েছেন।
এলিস পেরি
অস্ট্রেলিয়ার ৩২ বছর বয়সী ক্রীড়াবিদ এলিস আলেক্সান্ডার পেরি, যিনি জাতীয় ক্রিকেট দল ও ফুটবল দলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ফুটবল ছেড়ে দিলেও এখনো ক্রিকেটটা খেলে যাচ্ছেন। ১৬ বছর বয়সে ফুটবল ও ক্রিকেটে জাতীয় দলে অভিষেক। তিনিই সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে অস্ট্রেলিয়া জাতীয় দলে খেলেছেন। এছাড়া প্রথম অস্ট্রেলিয়ান হিসেবে আইসিসি ও ফিফা বিশ্বকাপে খেলার অনন্য কীর্তি গড়েছেন।
২০০৭ সালের ২২ জুলাই ডারউইনে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে পেরির। তখন তার বয়স ১৬ বছর ৮ মাস। এর মধ্য দিয়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ার সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার হন। এর পরের মাসেই অস্ট্রেলিয়ার হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলেও অভিষেক ঘটে পেরির! ২০০৭ সালের ৪ আগস্ট হংকং স্টেডিয়ামে স্বাগতিক হংকংয়ের বিপক্ষে অভিষেক হয় পেরির। অভিষেক ম্যাচে মাঠে নামার দ্বিতীয় মিনিটেই গোল করেন তিনি।
ক্রিকেটে অসংখ্য বিশ্বকাপ খেলা পেরি ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার অনন্য অভিজ্ঞতাও লাভ করেন। ২০১১ সালে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত আসরে তিনি ‘মাতিলদা’খ্যাত দলের হয়ে খেলার জন্য ডাক পান। নরওয়ের বিপক্ষে বদলি হিসেবে খেলেন। আর কোয়ার্টার ফাইনালে সুইডেনের বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার একমাত্র গোল করেন পেরি। ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া ১-৩ গোলে হেরেছে।
২০১৪ সাল থেকে শুধু ক্রিকেটই খেলে যাচ্ছেন এবং ব্যক্তিগত ও দলগত অর্জনে এখন তিনি দেশটির ইতিহাসে অন্যতম সফল নারী ক্রিকেটার। একজন নিখাঁদ অলরাউন্ডার পেরি টপ অর্ডার ব্যাটার ও ফাস্ট বোলার। প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টি২০-তে ১ হাজার রান ও ১০০ উইকেট শিকারের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। টেস্টে অস্ট্রেলিয়ান নারী হিসেবে সর্বোচ্চ ২১৩ রানের ইনিংস খেলার গৌরবের অধিকারী তিনি।
অস্ট্রেলিয়ার পুরস্কার ‘রাচায়েল হেইহো ফ্লিন্ট অ্যাওয়ার্ড’ ও ‘ বেলিন্ডা ক্লার্ক অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছেন তিনবার করে। ২০১০ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত এক দশকে উইজডেনের চোখে সেরা পাঁচ ক্রিকেটারের একজন নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
ফাবিয়ান বার্থেজ
উইকিপিডিয়ায় লেখা—ফাবিয়ান বার্থেজ একজন ফরাসি রেসিং ড্রাইভার, যিনি সাবেক পেশাদার ফুটবলার, খেলতেন একজন গোলকিপার হিসেবে। যদিও তিনি ফুটবলার হিসেবেই বেশি খ্যাত। অবসরের পর বেছে নিয়েছেন রেসিং খেলা। কৃতী গোলকিপার হিসেবে খেলেছেন ফ্রান্স জাতীয় দল ছাড়াও তুলুজ, মার্সেই, মোনাকো, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ও নঁতের জার্সিতে। ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের বিশ্বকাপজয়ী দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন বার্থেজ। জিতেছেন ২০০০ সালের ইউরো শিরোপা ও ২০০৩ সালের ফিফা কনফেডারেশনস কাপ।
সমান তিনটি করে বিশ্বকাপ ও ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে খেলেছেন বার্থেজ। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছেন। ২০০৭ সালে ফুটবল থেকে অবসর নেন বার্থেজ। চৌকস এ গোলকিপার দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাতে ভালোবাসেন, তাই ২০০৮ সালে তিনি মোটরস্পোর্টকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেন। সেই থেকে চারটি লেম্যানস রেসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। এছাড়া পোরশে ক্যারেরা কাপ, টিএইচপি স্পাইডার কাপ, ফ্রেঞ্চ জিটি চ্যাম্পিয়নশিপ, ক্যাটারহাম সিগমা কাপসহ অসংখ্য ইভেন্টে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
অ্যাশলে বার্টি
পেরির মতোই আরেক সব্যসাচী খেলোয়াড় অস্ট্রেলিয়ার অ্যাশলে বার্টি। ক্রিকেট ও টেনিসের পর এবার তিনি গলফে ক্যারিয়ার গড়ার পরিকল্পনা করছেন। জুনিয়র টেনিসে ঈর্ষণীয় ক্যারিয়ার তার। র্যাংকিংয়ের দুইয়ে উঠেছেন, ২০১১ সালের উইম্বলডনে গার্লস এককের শিরোপাও জিতেছেন। ক্যাসি ডেলাকুয়াকে নিয়ে একাধিক গ্র্যান্ড স্লামে দ্বৈতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তিনি। যদিও হঠাৎই টেনিস থেকে ছুটি নেন তিনি। বিগ ব্যাশের অভিষেক আসরে ব্রিসবেন হিট দলের হয়ে টি২০ ক্রিকেট খেলবেন বলে তিনি টেনিসটা ছেড়ে দেন। যদিও ওই সময় ক্রিকেটে আনুষ্ঠানিক কোনো অনুশীলন করা হয়নি তার। ফিরে আসেন ২০১৬ সালে। পরের বছর মালয়েশিয়ান ওপেন জয়ের মধ্য দিয়ে টেনিস বিশ্বে আলোতে আসতে শুরু করেন। ২০১৯ সালে ফ্রেঞ্চ ওপেন, ২০২১ সালে উইম্বলডন ও ২০২২ সালে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জয় করেন বার্টি। ২০২২ সালে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জয়ের পর ২৩ মার্চ হঠাৎ এক ঘোষণায় তিনি টেনিস থেকে অবসর নেন এবং নারীদের এককে র্যাংকিংয়ে ১ নম্বরে থাকা অবস্থায়। সব মিলিয়ে তিনি ১১৪ সপ্তাহ র্যাংকিংয়ের ১ নম্বরে ছিলেন।
উসাইন বোল্ট
স্প্রিন্ট কিংবদন্তি উসাইন বোল্ট ১০০, ২০০ মিটার স্প্রিন্ট ও ১০০ মিটার রিলেতে বর্তমান বিশ্ব রেকর্ডধারী। আটবারের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন বোল্ট প্রথম স্প্রিন্টার হিসেবে টানা তিনটি অলিম্পিকে (২০০৮, ২০১২ ও ২০১৮) স্প্রিন্ট ডাবল (১০০ ও ২০০ মিটার) জয়ের গৌরব অর্জন করেছেন। তবে অলিম্পিক ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ মিলিয়ে তিনি অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন রেকর্ড গড়েন।
অ্যাথলেটিকসের পাঠ চুকিয়ে তিনি ফুটবলে নাম লেখান এবং সেটি কোনোমতেই শখের বশে নয়। ২০১৭ সালে স্প্রিন্টের স্পাইক রেখে দিলেও তিনি ফুটবল বিশ্বে পথচলা শুরু করেন। ফুটবল স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে ২০১৮ সালের ২১ আগস্ট অস্ট্রেলিয়ার সেন্ট্রাল কোস্ট মেরিনার্সে অনুশীলন শুরু করেন। তখন তার বয়স ৩২ বছর। ৩১ আগস্ট সেন্ট্রাল কোস্ট সিলেক্ট টিমের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে অভিষেক ঘটে তার। ১২ অক্টোবর অ্যামেচার ক্লাব ম্যাকআর্থার সাউথ ওয়েস্ট ইউনাইটেডের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে মূল একাদশে স্থান পান এবং দুই গোল করেন। মাল্টার ক্লাব ভ্যালেটা তাকে দুই বছরের চুক্তির প্রস্তাব দিলেও তিনি তা ফিরিয়ে দেন। তাকে মেরিনার্স চুক্তির প্রস্তাব দেয়। যদিও ২০১৮ সালের নভেম্বরে আট মাসের অধ্যায় শেষে তিনি মেরিনার্স ছেড়ে যান। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে বোল্ট সিদ্ধান্ত নেন তিনি আর খেলবেন না এবং বলেন, ‘ক্রীড়ায় তার ক্যারিয়ার শেষ।’
মাইকেল জর্ডান
বাস্কেটবলের কিংবদন্তি মাইকেল জর্ডান। কেউ হয়তো বলবেন, লেব্রন জেমস কোনোভাবেই জর্ডানের চেয়ে কম নন। কিন্তু জর্ডানের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। টানা তিনটি এনবিএ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের পর ১৯৯৩ সালে বেসবলের নিচু লিগে নাম লেখানোর সিদ্ধান্ত নেন জর্ডান। এটা তিনি বাবার ইচ্ছাতেই করেন। বাবা চাইতেন তার ছেলে একদিন মেজর লিগ বেসবলে খেলবে। বাবার ইচ্ছাপূরণে তিনি শিকাগো হোয়াইট সক্স দলে নাম লেখান। খেলেছেন বার্মিংহাম ব্যারনস ও স্কটডেল স্করপিয়ন্সের হয়েও। কিন্তু এনবিএর জর্ডান যেন বেসবলে অচেনা। এনবিএর সুপারস্টার বেসবলে সেভাবে অবস্থান তৈরি করতে পারছিলেন না। ১৯৯৫ সালের ১৮ মার্চ বেসবল থেকে অবসর নিয়ে আবার ফেরেন এনবিএ লিগে। তিনি দুই শব্দে ফেরার ঘোষণা দেন, ‘আমি ফিরছি’। নাম লেখান সেই শিকাগো বুলসেই, যে দলের হয়ে খেলেছেন ১৯৮৪ সাল থেকে। ২০০১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ওয়াশিংটন উইজার্ডের হয়ে খেলে তিনি অবসর নেন।










