গত বছর শেষ দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে টি২০ বিশ্বকাপে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ। ওই আসর শেষে সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হয় গোটা বাংলাদেশ দল। যদিও সবচেয়ে বেশি তোপের মুখে পড়েন লিটন কুমার দাসসহ কয়েকজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঝড় ওঠে। এ সময় নীরবে নিজেকে পরবর্তী মিশনের জন্য তৈরি করেছেন এই ডানহাতি ব্যাটার। ধৈর্যের ফলও পেয়েছেন দ্রুত। টি২০তে ফ্লপ লিটন সাদা পোশাকে যেন অন্য এক ক্রিকেটার! বিশ্বকাপের পর পরই ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে একটি করে সেঞ্চুরি ও হাফ সেঞ্চুরি এবং একটি ৪৫ রানের ইনিংস খেলেন। বাংলাদেশ দুই ম্যাচে হারলেও হেসেছে লিটনের ব্যাট। এবার নিউজিল্যান্ড সফরেও উজ্জ্বল তিনি। দেশটিতে প্রথমবারের মতো কোনো টেস্ট জয়ে মূল্যবান অবদান রাখেন তিনি।
টেস্টে লিটনের প্রত্যাবর্তন গত বছরের শুরু থেকে। এখন পর্যন্ত ২৯টি ম্যাচ খেললেও সাদা পোশাকে ২০২১ সাল থেকে দারুণ সফলতা পাচ্ছেন তিনি। মাঝের এক বছরেই তিনি করেছেন ক্যারিয়ারের দুটি টেস্ট সেঞ্চুরি। এ সময় ডানহাতি ব্যাটার খেলেছেন ৯টি টেস্ট। ১৫ ইনিংসে ৫২.৬৬ গড়ে করেছেন ৭৯০ রান! যা বিশ্বে উইকেটকিপারদের মধ্যে সর্বোচ্চ গড়। এ সময় ছিল ছয়টি হাফ সেঞ্চুরি। অথচ গোটা ক্যারিয়ারেই তার হাফ সেঞ্চুরি ১১টি। সব শেষ পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ড সিরিজে দুটি দলের শক্তিশালী বোলিং আক্রমণের সামনে দুর্দান্ত লড়াই করে তুলে নেন দুটি সেঞ্চুরি।
নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের পথে মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে তিনি খেলেন ৮৬ রানের দারুণ এক ইনিংস। দ্বিতীয় টেস্টে অন্য ব্যাটাররা যখন ব্যর্থ, তখন লিটন দেখিয়েছেন ‘ওয়ান ম্যান শো’। ১৮৯ মিনিট ক্রিজে দাঁড়িয়ে ১১৪ বলে খেলেন ১০২ রানের ক্ল্যাসিক ইনিংস। এটি দেশের বাইরে টেস্টে তার প্রথম সেঞ্চুরি। ইনিংসটি দেখে মুগ্ধ ধারাভাষ্যকার থেকে শুরু করে ক্রিকেট বোদ্ধারা। নিউজিল্যান্ডের ভয়ংকর সব ফাস্ট বোলারের ওপর কর্তৃত্ব করে উইকেটের চারদিকেই শট খেলেন তিনি। ইনিংসে ১৪ বাউন্ডারির সঙ্গে ছক্কাও হাঁকিয়েছেন একটি।
অবশ্য টেস্টে লিটন যতটাই উজ্জ্বল, অন্য দুই ফরম্যাটে ঠিক ততটাই ফ্লপ। ২০২১ সালে ১১ ওয়ানডেতে ২৩.২৭ গড়ে মাত্র ২৫৬ রান করেন তিনি। হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একটি সেঞ্চুরি (১০২) ছাড়া বলার মতো কোনো ইনিংস নেই। তিন ম্যাচে রানের খাতাই খুলতে পারেননি!
একই বছর টি২০ ক্রিকেটে আরো বিবর্ণ লিটন। ১৬ ম্যাচে ১০ গড়ে করেন ২০৮ রান! এর মধ্যে দুটি ইনিংস শূন্য এবং সাত ইনিংসে দুই অংকের ঘরেও যেতে পারেননি লিটন। ওয়ানডে ও টি২০ মিলিয়ে ২৭ ইনিংসে একটি সেঞ্চুরি ছাড়া কোনো হাফ সেঞ্চুরিরও দেখা পাননি এই স্টাইলিশ ব্যাটার। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে অনুজ্জ্বল লিটন পাঁচদিনের ক্রিকেটে রয়েছেন সেরা ফর্মে।
ক্রাইস্টচার্চের হ্যাগলি ওভালে লিটনের চোখজুড়ানো শটগুলো দেখে গোটা ক্রিকেটবিশ্ব প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়। ভারতের ক্রিকেট বিশ্লেষক হার্সা ভোগলের চোখে লিটন শুরু থেকেই ছিলেন দুর্দান্ত। নিউজিল্যান্ড সফরে লিটনের দারুণ পারফরম্যান্সের পর টুইটারে হার্শা লিখেছেন, মাঝেমধ্যে আপনার ভালো অনুভূতি কাজ করবে, যখন দেখবেন আপনি যাদের নিয়ে বড় কিছু অনুমান করবেন, সেটা ঘটতে যাচ্ছে। কুশল মেন্ডিসকে নিয়ে আমার অনুমান সঠিক ছিল না, কিন্তু লিটন দাসকে নিয়ে আমার অনুমান সঠিক হয়েছে বলেই মনে হয়। শাই হোপকে নিয়ে মিশ্র ফলাফল এসেছে। এখন দেখব কিগান পিটারসেনকে নিয়ে আমার অনুমান কতটা কাজে দেয়।
হার্শা বলতে চেয়েছেন, লিটনকে নিয়ে তার আশাবাদ বাস্তবের পথে হাঁটছে। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটার কিগান পিটারসেনও ভারতের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে দারুণ খেলেছেন।
লিটনের মাঝে বিশ্বমানের ব্যাটিংয়ের ছায়া খুঁজে পান মুুমিনুল হক। বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক বলেন, লিটন টেকনিক্যালি অনেক সাউন্ড। লিটনের ব্যাটিং দেখলে তো মনে হয় ও অনেক বেশি সময় পায়। বিশ্বমানের খেলোয়াড়দের মতো। ব্যাটিং দেখতে খুব ভালো লাগছিল। আমরা সবাই খুব খুশি হয়েছি। এ বছরে টানা দুই সিরিজে দুটি সেঞ্চুরি করেছে সে, দলের সবাই খুশি। আমিও খুব উপভোগ করেছি ওর ব্যাটিং।
পাকিস্তান সিরিজে ভালো পারফর্ম করার পর নিউজিল্যান্ডের মাটিতে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ে মূল্যবান অবদান রাখেন লিটন। পরের টেস্টেও তিনি উজ্জ্বল ছিলেন। সাদা পোশাকে লিটনের এ রাজসিক ব্যাটিং এবার ওয়ানডে ও টি২০ ক্রিকেটেও দেখার অপেক্ষা।










