গত বছর অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ফিফা উইমেন্স ফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে শিরোপা উৎসব করে স্পেনের নারীরা। ১১ মাস পর বার্লিনে আজ আরেকটি ইংল্যান্ড-স্পেন ফাইনাল। ছেলেদের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনাল। আজও লা রোজাদের উৎসব, নাকি ইউরোপ জয়ের আনন্দে বিভোর হবেন কেন, বেলিংহাম, সাকারা? স্পেন চতুর্থ আর ইংল্যান্ড প্রথম ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপার লক্ষ্যে খেলবে।

১৭তম ইউরোতে এখন পর্যন্ত টুর্নামেন্টের সেরা দল স্পেন, আর ইংল্যান্ড শেষ মুহূর্তের গোলে নিজেদের রক্ষা করে ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। স্পেনের বড় ভরসা হয়ে উঠেছেন এখন ১৬ বছর বয়সী উইঙ্গার লামিনে ইয়ামাল আর ২১ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড নিকো উইলিয়ামস। ইয়ামালের জাদুকরী পারফরম্যান্সে ভর করেই সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে দিয়েছে স্পেন। ইংলিশদের ভরসাও একঝাঁক তরুণ। রিয়াল মাদ্রিদ তারকা জুড বেলিংহাম, আর্সেনাল তারকা বুকায়ো সাকা, ম্যানসিটির ফিল ফডেন ইংল্যান্ডকে ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্ব এনে দিতে আজ জীবন বাজি রেখেই হয়তো খেলবেন।

বর্তমান ফর্ম যদি স্পেনের পক্ষে কথা বলে, তবে ইংল্যান্ডের পক্ষে থাকবে রেকর্ড। ১৯২৯ সাল থেকে চলে আসা দ্বৈরথে এখন পর্যন্ত ২৭ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছে দুটি দল। এর মধ্যে ইংল্যান্ডের ঝুলিতেই বেশি জয়। তাদের ১৪ জয়ের বিপরীতে স্পেনের জয় ১০টি। বাকি তিনটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। দুই দলের প্রথম দেখা ১৯২৯ সালে।

ইংলিশ-স্প্যানিশ লড়াইয়ের মধ্যে প্রীতি ম্যাচই বেশি। এখন পর্যন্ত ১৯টি প্রীতি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছে তারা। এছাড়া বিশ্বকাপে দুটি, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে চারটি ও উয়েফা নেশনস লিগে দুটি ম্যাচে মুখোমুখি হয় ইউরোপের দুই শীর্ষ ফুটবল জাতি।

বিশ্বকাপে দুইবার মুখোমুখি হয়ে স্পেন একটি ম্যাচ জিতেছে, বাকিটি ড্র হয়। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে তেলমো জারার একমাত্র গোলে ভর করে ইংল্যান্ডকে হারায় স্পেন। ১৯৮২ সালের বিশ্বকাপে দুই দলের লড়াইটা গোলশূন্য ড্র থেকেছে। এরপর বিশ্বকাপে দুই দলের আর কখনই দেখা হয়নি।

ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে রেকর্ডটা ইংলিশদের পক্ষে। চারবারের মুখোমুখিতে তারা প্রতিবারই জিতেছে। ১৯৬৮ সালের ইউরোতে ১-০ গোলে ও ২-১ গোলে, ১৯৮০ সালের ইউরোতে ২-১ গোলে এবং সর্বশেষ ১৯৯৬ সালের ইউরোতে গোলশূন্য ড্র হওয়ার পর টাইব্রেকারে ৪-২ গোলের জয় পেয়েছে ইংল্যান্ড। ইউরোতে ৪-০-তে এগিয়ে থাকা ইংলিশরা আজ কি ৫-০ করে ফেলবে, নাকি ১-৪ করবে ছন্দময় ফুটবল খেলে চলা স্পেন?

এছাড়া, উয়েফা নেশনস লিগে দুই দল দুবার মুখোমুখি হয়, যার একটি স্পেন ও একটি ইংল্যান্ড জিতেছে। দুই দলের সর্বশেষ লড়াইটাও নেশনস লিগে। ২০১৮ সালের ১৫ অক্টোবর স্পেনের সেভিয়ায় অনুষ্ঠিত ম্যাচে ৩-২ গোলের জয় তুলে নেয় ইংল্যান্ড। রহিম স্টার্লিং দুটি ও মার্কাস র‍্যাশফোর্ড একটি গোল করে জিতিয়েছেন ইংল্যান্ডকে। স্পেনের হয়ে গোল করেন পাকো আলকাসার ও সার্জিও রামোস। দুই দলের গোলদাতা এ চারজনের কেউই এবারের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপে নেই।

১৯৬৪ সালে প্রথমবার ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা জয় করে স্পেন। দেশটির সোনালি প্রজন্মের তারকা জাভি হার্নান্দেজ, আন্দ্রে ইনিয়েস্তা, ইকার ক্যাসিয়াসদের হাত ধরে ২০০৮ ও ২০১২ সালে টানা দুটি ইউরোপিয়ান মুকুট জিতে নেয় লা রোজারা। এ দুটি শিরোপার মাঝে ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ মুকুট জয়ের গৌরবও অর্জন করে স্পেন। আজ শোকেসে আরেকটি বড় শিরোপা যোগ করার হাতছানি লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যদের।

স্পেন চতুর্থবারের মতো ইউরোপ জয়ের পরিকল্পনা করলেও তাদের সেই পরিকল্পনা ভন্ডুল করার ছকই হয়তো কষছেন গ্যারেথ সাউথগেটের দল। তারা যে প্রথম শিরোপার স্বপ্নে বিভোর। ২০২১ সালে ঘরের মাঠ ওয়েম্বলিতে ইতিহাস গড়ার কাছাকাছি চলে গিয়েছিল সাউথগেটের দল। যদিও তীরে এসে তরী ডুবেছে ইংলিশ নাবিকদের। টাইব্রেকারে তারা হেরে বসল রবার্তো মানচিনির ইতালির কাছে।

সেই দুঃখ ভোলার সুযোগও দ্রুতই ইংলিশদের সামনে চলে এসেছে। সেমিফাইনালে বদলি খেলোয়াড় ওলি ওয়াটকিনস শেষ মিনিটে গোল করে ইংল্যান্ডকে ফাইনালে তুলেছেন। টানা দ্বিতীয়বার ইউরোর ফাইনাল খেলতে চলা থ্রি লায়ন্সরা আজ সুযোগটা কাজে লাগাতে মরিয়া হবেন।   

সাউথগেট বলেই আশায় বুক বেঁধে আছেন ইংলিশ সমর্থকরা। ইংলিশ ফুটবল যখন বড় আসরে কোনো আশাই আর দেখছিল না তখন দলের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করতে পেরেছেন সাউথগেট। আট বছরের অধ্যায়ে তার অধীনে ইংল্যান্ড ২০১৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল, ২০২১ ইউরোর ফাইনাল, ২০২২ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল ও ২০২৪ ইউরোর ফাইনালে উঠেছে। এ কোচের ওপর তাই ইংলিশদের প্রত্যাশার চাপও ক্রমেই বাড়ছে। তার হাত ধরেই ৫৮ বছরের শিরোপাখরা ঘোচাতে মরিয়া ইংলিশরা।