ডালাসের গ্র্যান্ড প্রেইরি স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় লাল-সবুজের উৎসব হলো। সেই উৎসবের ঢেউ লাগে বর্ণিল গ্যালারিতে, আর তা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে দোলা দিয়ে যায় বিশ্বব্যাপী টাইগার সমর্থকদের হৃদয়ে-হৃদয়ে। গতকাল তাসকিন আহমেদ, মুস্তাফিজুর রহমান, রিশাদ হোসেন, তাওহীদ হৃদয় আর লিটন দাস বুক চিতিয়ে লড়ে বিশ্বকাপে ২ উইকেটের দারুণ এক জয় এনে দিয়েছেন বাংলাদেশকে। এ জয়ে নবম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে শুভসূচনা হলো টাইগারদের। উজ্জ্বল হলো সুপার এইটে খেলার সম্ভাবনাও।
বাংলাদেশের জন্য এটা বিরাট স্বস্তিরও জয়। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এর আগে দুবার শ্রীলংকার মুখোমুখি হয়ে টাইগাররা দুবারই হেরেছে। তার ওপর সম্প্রতি আইসিসির সহযোগী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সিরিজ হেরে বড় এক ধাক্কা খায় নাজমুল হোসেন শান্তর দল। গতকালও দুর্দান্ত বোলিংয়ের পর লংকানদের বিপক্ষে ম্যাচটা কঠিন করে তোলেন দলের টপ অর্ডার ব্যাটাররা। তখনই ত্রাতা হলেন তরুণ তাওহীদ হৃদয়। তার ঝড়ো ব্যাটিংয়ের পর মাহমুদউল্লাহর ‘কুল’ ফিনিশিং বাংলাদেশকে এনে দেয় ২ উইকেটের জয়।
নিউইয়র্কে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে বিধ্বস্ত হওয়া শ্রীলংকা গতকাল ডালাসে আগে ব্যাট করতে নেমে তাসকিন আহমেদ, মুস্তাফিজুর রহমান ও রিশাদ হোসেনের আক্রমণের মুখে পড়ে। পেস ও স্পিনের সাঁড়াশি আক্রমণে এ তিনজন তুলে নেন সিংহলিজদের ৮ উইকেট। তরুণ পেসার তানজিম সাকিবও দারুণ বোলিং করেন। বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ের মুখে লংকানরা ৯ উইকেটে মাত্র ১২৪ রান তুলতে সমর্থ হয়।
১২৫ রানের সাদামাটা টার্গেট তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের টপ অর্ডারের সেই চিরচেনা রূপ। সৌম্য সরকার, তানজিদ হাসান তামিম ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর বিদায় দলের ২৮ রানের মধ্যেই। ততক্ষণে ষষ্ঠ ওভার চলছে। তখনই নায়কের আগমন। যেন ‘এলেন, দেখলেন, জয় করলেন’। ২৩ বছরের তরুণ তাওহীদ হৃদয়। নামে হৃদয়, খেললেনও হৃদয় দিয়ে। দলের প্রয়োজনের মুহূর্তে ১টি চার ও ৪টি ছক্কায় ২০ বলে ৪০ রানের টর্নেডো ইনিংস খেলে টাইগারদের বুকের ওপর থাকা জগদ্দল পাথরটাও নামিয়ে দিলেন হৃদয়।
লিটন দাসকে নিয়ে চতুর্থ উইকেটে ৩৮ বলে ৬৩ রান যোগ করেছেন হৃদয়। এ জুটিটাই ব্যবধান গড়ে দিয়েছে। এর মধ্যে হৃদয় একাই করেন ৪০ রান, ১৮ রান লিটনের। হৃদয় দলীয় ৯১ রানে আউট হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ আরো চারটি উইকেট হারিয়েছে। তখন ঘোর অনিশ্চয়তা। তীরে ভিড়বে কি তরী? শেষ অবধি তরী তীরে গিয়ে ডোবেনি। বহু যুদ্ধের নায়ক মাহমুদউল্লাহ ছোট্ট অথচ দারুণ কার্যকর ইনিংস খেলে মান বাঁচিয়েছেন বাংলাদেশের। ৮ উইকেট হারিয়ে ১৯তম ওভারে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় টাইগার বাহিনী।
বলা যায়, সহজ ম্যাচটা কঠিন করে জিতেছে বাংলাদেশ। হৃদয় যখন সাজঘরে ফিরছেন তখন জয় পেতে ৫০ বলে ৩৪ রান দরকার টাইগারদের। হাতে তখনো ৬ উইকেট। সেই পরিস্থিতিতে যেকোনো দলের জন্যই কাজটা সহজ। কিন্তু বাংলাদেশ পরীক্ষা দিয়ে তবেই জিতল। শেষ ২৪ বলে দরকার ছিল ১৭ রান, বাকি ৫ উইকেট। ১৫তম ওভারে লিটন, ১৭তম ওভারে সাকিব, ১৮তম ওভারে রিশাদ ও তাসকিন সাজঘরে ফিরে গেলে ভীষণ চাপের পড়ে বাংলাদেশ। যদিও সেই চাপের মুহূর্তে দক্ষ নাবিকের মতোই তরীকে তীরে নিয়ে যান অভিজ্ঞ মাহমুদউল্লাহ। ১৩ বলে ১৬ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে জিতিয়েছেন দেশকে। সব শঙ্কা উড়িয়ে লংকানদের ২ উইকেটে হারিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করেছে টাইগাররা।
জিতলেও আক্ষেপ থেকে গেল বাংলাদেশ দলনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর। ম্যাচ শেষে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি তারা ভালো বোলিং করেছে। তবে এ উইকেটে আমাদের আরো সহজে জেতা উচিত ছিল।’
এর আগে প্রথমে ব্যাটিং করা শ্রীলংকাকে বল হাতে নাজেহাল করেছেন রিশাদ, মুস্তাফিজ ও তাসকিনরা। নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে রিশাদ ও মুস্তাফিজ নিয়েছেন তিনটি করে উইকেট। জোড়া উইকেট নেন তাসকিন। লংকানদের হয়ে সর্বোচ্চ ৪৭ রান করেছেন ওপেনার পাথুম নিশাঙ্কা। বোলাররাই বাংলাদেশের জয়ের ভিত গড়ে দেন।
আগামীকাল রাতে নিউইয়র্কে দক্ষিণ আফ্রিকার মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচে শ্রীলংকাকে হারিয়েছে প্রোটিয়ারা। ‘ডি’ গ্রুপে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ আফ্রিকা দুই দলেরই ঝুলিতে দুই পয়েন্ট এবং দুটি দলই হারায় শ্রীলংকাকে। লংকানরা বুধবার ফ্লোরিডায় খেলবে নেপালের বিপক্ষে।










