রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনা যখন একে অন্যের মুখোমুখি হয়, পুরো ফুটবল দুনিয়ার চোখ থাকে কেবল এই একটা ম্যাচের দিকেই। আজ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে অনুষ্ঠিতব্য এই মহারণও তার ব্যতিক্রম হবে না। লা লিগার ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন বার্সেলোনা বর্তমানে টেবিলের শীর্ষে থাকা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের চেয়ে মাত্র ২ পয়েন্ট পিছিয়ে। ফলে এ ম্যাচ কেবল শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই নয়, লিগ টেবিলের শীর্ষস্থান দখলেরও লড়াই।
লস ব্লাঙ্কোসদের হয়ে পাঁচ বছর খেলার সময় লা লিগা এবং উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতা কিংবদন্তি মিডফিল্ডার জাবি আলোনসো কোচ হিসেবে ডাগআউটে বসে পেতে যাচ্ছেন তার প্রথম ক্ল্যাসিকোর অভিজ্ঞতা। ফর্মে থাকা তারকা স্ট্রাইকার কিলিয়ান এমবাপ্পেকে নিয়ে মাদ্রিদ শিবিরও প্রস্তুত।
বার্সা বস হ্যানসি ফ্লিক গত মৌসুমে মাদ্রিদের বিপক্ষে চারটি ম্যাচেই জয়ী হয়ে ‘ক্লিন সুইপ’ করেছিলেন। গতবারের জয়ের অন্যতম তারকা তরুণ প্রতিভা লামিন ইয়ামাল এবারো মাদ্রিদে ম্যাচজয়ী ভূমিকা নিতে পারেন। ইনজুরিতে রাফিনিয়া ও লেভানডোভস্কির খেলা অনিশ্চিত হওয়ায় ইয়ামালের ভূমিকা কিছুটা বাড়বে।
ঐতিহাসিকভাবে ১৯৩০-এর দশক থেকে বেশির ভাগ সময়ই বার্সেলোনার চেয়ে হেড টু হেড পরিসংখ্যানে এগিয়ে ছিল রিয়াল মাদ্রিদ। কিন্তু গত ২০ বছরে সেই ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। বিশেষ করে পেপ গার্দিওলার কোচিং যুগে বার্সেলোনার উত্থানে রিয়াল মাদ্রিদ প্রায়ই বাধ্য হয় অসহায় আত্মসমর্পণে। ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ১৪টি ম্যাচে মাদ্রিদ মাত্র একটিতে জয় পেয়েছিল। এ সময়েই গার্দিওলার দল ৬-২ এবং ৫-০ গোলে পায় ঐতিহাসিক জয়। এমনকি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালেও মেসির বার্সেলোনা মাদ্রিদকে স্রেফ উড়িয়ে দেয়।
এরপর গত মৌসুমে ফ্লিকের অধীনে বার্সেলোনার টানা চারটি জয় মাদ্রিদকে অল টাইম হেড টু হেড পরিসংখ্যানে স্পর্শ করার খুব কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। আজ জিতলেই বার্সা ইতিহাস ছুঁয়ে ফেলবে।
গত মৌসুমে বার্সেলোনা মাদ্রিদকে শাসন করেছে অপ্রতিরোধ্যভাবে। ফ্লিকের বার্সা আক্রমণে ছিল দুর্দান্ত, চারটি ম্যাচে করেছিল ১৬ গোল। লিগ ও স্প্যানিশ সুপার কাপের ফাইনালে জয়ের পাশাপাশি লিগের দুটি ম্যাচই জেতে ব্লগ্রানারা। চারটি রোমাঞ্চকর ম্যাচ শেষে গোলের ব্যবধান ছিল বার্সার পক্ষে ১৬-৭। ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো টানা পাঁচটি ক্ল্যাসিকো জেতার লক্ষ্য নিয়ে এবার মাঠে নামছে বার্সা। এর আগে গার্দিওলার ‘প্রায় অজেয়’ বার্সা ২০০৮-১০ সালে এ রেকর্ড করেছিল।
তবে এ মৌসুমে মাদ্রিদের ফর্ম বেশ ভালো। আলোনসোর অধীনে দলটি হাই-প্রেসিং ফুটবল খেলছে। রক্ষণভাগও আরো সুসংগঠিত। সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হলো কিলিয়ান এমবাপ্পের বিধ্বংসী ফর্ম; এই মৌসুমে খেলা ১১টি ম্যাচে তার গোল ১০টি। আরদা গুলারও সৃজনশীল মিডফিল্ডার হিসেবে নজর কেড়েছেন। এমবাপ্পের সঙ্গে তার রসায়নেও এসেছে ৫ গোল। এর সঙ্গে জুড বেলিংহামের ফর্মে ফেরা আলোনসোর দলের জন্য নিঃসন্দেহে সুখবর।
লা লিগায় নয় ম্যাচের মধ্যে আটটিতে জয় পেলেও অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের কাছে ৫-২ গোলের বড় হার দলের জন্য উদ্বেগের কারণ। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে আকস্মিকভাবে দেখা যাচ্ছে রিয়ালের থরহরি কম্পমান দশা! মাদ্রিদ ডার্বি ও পিএসজির বিপক্ষে ক্লাব বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে দলের মধ্যে যেন একধরনের ভয় দেখা গেছে, যা মোটেও রিয়ালসুলভ নয়।
ইনজুরি কাটিয়ে রাইটব্যাক ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার-আরনল্ড ও দানি কারভাহাল ক্ল্যাসিকোয় ফেরার চেষ্টা করছেন। সেন্টারব্যাক ডেভিড আলাবাকে বিশ্রাম দেয়া হলেও ডিন হুইজেন ও এডার মিলিতাওকে পাওয়া যাবে। তবে ড্যানি সেবায়োস ফিট নন।
উল্টোদিকে বার্সার অবস্থা যে গত মৌসুমের মতো নেই তা ফ্লিক স্বীকার করেছেন। খেলোয়াড়দের বাজে পজিশনিং এবং প্রেসিংয়ের তীব্রতা কমে যাওয়াকে দলের অবনতির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন এই জার্মান কোচ। তবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে দুই জয় ও এক হার নিয়ে বার্সা যে খুব খারাপ অবস্থায় আছে তা নয়। আবার লিগেও মাদ্রিদের চেয়ে মাত্র দুই পয়েন্ট পিছিয়ে।
ইনজুরির কারণে রাফিনিয়া, লামিন ইয়ামাল, ফারমিন লোপেজ, গাভি, হোয়ান গার্সিয়া, দানি ওলমো ও রবার্ট লেভানদভস্কি এ মৌসুমে কিছুটা সময় বাইরে ছিলেন। এ ম্যাচে বার্সা পাচ্ছে না হোয়ান গার্সিয়া, মার্ক-আন্দ্রে টের স্টেগেন, গাভি, ওলমো ও লেভানদভস্কিকে। হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে ভোগা রাফিনিয়াও খুব সম্ভবত বাইরেই থাকবেন। ইয়ামাল ও লোপেজ ফিরেছেন। মিডউইকে অলিম্পিয়াকোসের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে নিজের ফর্মের ঝলকও দেখিয়েছেন ফারমিন। ফেরান তোরেসও প্রস্তুত।
তবে বার্সার ডিফেন্স লাইন কতটা প্রস্তুত তা নিয়ে প্রশ্ন না থেকেই পারে না। এমবাপ্পে-ভিনিসিয়ুসরা হয়তো বেশ কয়েকবারই বার্সার হাই ব্যাকলাইনের ছিদ্র খুঁজে বের করবেন। পাউ কুবারসি-এরিক গার্সিয়ারা কীভাবে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করবেন সেটাই হয়তো ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। গত মৌসুমে বার্সার রক্ষণের অতন্দ্র প্রহরী ইনিগো মার্তিনেজ ক্লাব ছেড়ে যাওয়ার পর বার্সার রক্ষণ এবার বারবারই যে বেহুলার বাসরঘরে পরিণত হচ্ছে!
খণ্ডযুদ্ধ আরো আছে। গত মৌসুমে বেনফিকার বিপক্ষে দুটি ম্যাচে বার্সা জিতলেও স্প্যানিশ লেফটব্যাক আলভারো ক্যারারাস ছিলেন ইয়ামালকে সামলানো সেরা খেলোয়াড়দের মধ্যে একজন। ব্যক্তিগত দ্বৈরথে চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসেন ইয়ামাল। লা লিগায় প্রতি ৯০ মিনিটে সফল ড্রিবলের সংখ্যায় ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের মধ্যে তিনি সবার ওপরে। আর এবার ক্যারারাস মাদ্রিদ শিবিরে।
রাফিনিয়া, লেভা ও ওলমোর অনুপস্থিতিতে বার্সার জয়ের আশা অনেকটাই নির্ভর করবে বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামালের পারফরম্যান্সের ওপর। বার্সাকে ব্যাকফুটে পেয়ে পাশার দান উল্টে দেয়ার এমন মওকা আলোনসো ছাতছাড়া করতে চাইবেনই না।










