ফুটবলের এ মহাযজ্ঞ নিয়ে উন্মাদনা এখন তুঙ্গে। বাছাইপর্বের শেষ দিকে এসে অঘটনের শিকার হয়ে বিশ্বকাপ থেকে টানা তৃতীয়বারের মতো বাদ পড়েছে চারবারের বিশ্বকাপজয়ী ইতালি। সব মিলিয়ে ঘটনাবহুল এবারের বিশ্বকাপে গ্রুপ ম্যাচ ও ফাইনালের টিকিটের দাম বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। ফাইনালে টিকিটের সর্বোচ্চ দাম ১৩ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। এমনকি রিসেল প্লাটফর্মে দাম হাঁকানো হচ্ছে কোটি টাকারও বেশি!
এবারের ফিফা বিশ্বকাপের টিকিটের দাম নিয়ে আগে থেকেই সমালোচনা ছিল, বিতর্ক ছিল। এবার কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই জন্য টিকিটের নতুন ও আরো দামি ক্যাটাগরি যুক্ত করলেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনো।
আগামী ১৩ জুন বাংলাদেশ সময় সকাল ৭টায় ক্যালিফোর্নিয়ার ইঙ্গেলউডে নিজেদের প্রথম ম্যাচে লাতিন দল প্যারাগুয়ের মুখোমুখি হবে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বকাপ শুরু হয়ে যাবে তারও একদিন আগে। ১১ জুন বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় মেক্সিকো সিটিতে স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচ দিয়ে পর্দা উঠবে ২৩তম ফিফা বিশ্বকাপ আসরের।
যুক্তরাষ্ট্র-প্যারাগুয়ে ম্যাচে একেবারে সামনের আসনে বসে খেলা দেখতে চাইলে যে টিকিট লাগবে সেই ‘ফ্রন্ট ক্যাটাগরি-১’ আসনের জন্য টিকিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার ১০৫ ডলার, যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৫ লাখ ৪ হাজার টাকা। গত সপ্তাহে ফিফা ম্যাচটির জন্য ‘ফ্রন্ট ক্যাটাগরি-১’ টিকিটের সর্বোচ্চ মূল্য নির্ধারণ করেছিল ২ হাজার ৭৩৫ ডলার (প্রায় ৩ লাখ ৩৫ হাজার টাকা)। গত শুক্রবার পর্যন্ত শুধু এ ক্যাটাগরির টিকিটই অবশিষ্ট ছিল। ১৯ জুন সিয়াটলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ও ২৫ জুন ইঙ্গেলউডে তুরস্কের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য দুটি ম্যাচের কোনো টিকিট অবিক্রীত নেই।
১১ জুন মেক্সিকো সিটিতে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে শুধু ২ হাজার ৯৮৫ ডলার মূল্যের টিকিট অবশিষ্ট আছে, যার মূল্য ডিসেম্বরে ছিল ২ হাজার ৩৫৫ ডলার। ১২ জুন টরন্টোয় কানাডা ও বসনিয়া হার্জেগোভিনার ম্যাচে ২ হাজার ২৪০ ডলার মূল্যের টিকিট অবশিষ্ট রয়েছে, যার মূল্য আগে ছিল ২ হাজার ১৭০ ডলার।
এছাড়া ফিফা কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই নিজেদের বিক্রয় ওয়েবসাইটে ‘ফ্রন্ট ক্যাটাগরি-২’ নামে টিকিটের একটি নতুন স্তর যুক্ত করেছে, যার দাম ১ হাজার ৯৪০ থেকে ২ হাজার ৩৩০ ডলার (২ লাখ ৩৮ হাজার থেকে ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা) নির্ধারণ করেছে।
টিকিটের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে ফিফা গণমাধ্যমে কোনো মন্তব্য করেনি। বিশ্ব ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা টরন্টোতে ১২ জুন বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে কানাডার উদ্বোধনী ম্যাচের জন্য ‘ফ্রন্ট ক্যাটাগরি-১’-এর ৩ হাজার ৩৬০ ডলার (৪ লাখ ১২ হাজার) পর্যন্ত মূল্যে আসন যুক্ত করেছে। শেষ ১৬ রাউন্ডের কিছু টিকিটের দামও হঠাৎ করেই বাড়ানো হয়েছে। ফিলাডেলফিয়ায় কিছু টিকিটের দাম ধরা হয়েছে ৯০৫ ডলার (১ লাখ ১১ হাজার টাকা)।
গত সপ্তাহে টিকিট বিক্রি পুনরায় শুরুর সময় বিশ্বকাপ ফাইনালের সর্বোচ্চ দর্শনী মূল্য বাড়িয়ে ১০ হাজার ৯৯০ ডলার (প্রায় ১৩ লাখ ৪৯ হাজার টাকা) করেছে ফিফা। অথচ গত ডিসেম্বরে টুর্নামেন্টের ড্রয়ের পর এ দর ছিল ৮ হাজার ৬৮০ ডলার (প্রায় ১০ লাখ ৬৬ হাজার টাকা)।
নিউজার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ১৯ জুলাইয়ের ফাইনালের জন্য ক্যাটাগরি-২ টিকিটের দাম ছিল ৭ হাজার ৩৮০ ডলার (৯ লাখ ৬ হাজার টাকা), যা আগের ৫ হাজার ৫৭৫ ডলার (৬ লাখ ৮৪ হাজার টাকা) থেকে বেড়েছে। ক্যাটাগরি-৩-এর দাম ছিল ৫ হাজার ৭৮৫ ডলার (৭ লাখ ১০ হাজার টাকা), যা আগের ৪ হাজার ১৮৫ ডলার (৫ লাখ ১৩ হাজার টাকা) থেকে বাড়ানো হয়েছে।
এবারই প্রথম বিশ্বকাপ খেলবে সর্বোচ্চ ৪৮টি দেশ। স্বাগতিক তিনটিসহ ৪৮ দেশ এরই মধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে। ১২ গ্রুপে দেশগুলোকে ভাগ করা হয়েছে। প্রতি গ্রুপে রয়েছে চারটি করে দল। তিন দেশে মোট ম্যাচ হবে ১০৪টি। ফিফা সভাপতি ইনফ্যান্তিনো একাধিকবার দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, সব ম্যাচের টিকিট বিক্রি হয়ে যাবে। তিনি এটাও বলছিলেন, যত টিকিটের আবেদন এসেছে তা ‘১০০০ বছরের বিশ্বকাপের সমান’। তার কথায়, ‘এটা অনন্য। এটা অবিশ্বাস্য।’
চাদিহা বেশি বলেই হয়তো দাম বাড়াচ্ছে ফিফা। টিকিটের দাম অত্যধিক বেশি হওয়ায় সমর্থকদের তোপের মুখে পড়ে গত ডিসেম্বর মাসে ‘সাপোর্টারস-টায়ার’ ক্যাটাগরির টিকিট যুক্ত করে ফিফা। এ টিকিটের সুবিধা পাবেন কেবল অংশগ্রহণকারী ৪৮টি দেশের সমর্থকরা এবং প্রতি ম্যাচ ও ফাইনালে ৬০ ডলার করে কিছু টিকিট রাখা হয়েছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে টিকিটের প্রকৃত মূল্যকাঠামো বোঝা বেশ কঠিন। কারণ তিন দেশের এ আসরে ফিফা কখনই পূর্ণাঙ্গ মূল্যতালিকা প্রকাশ করেনি। তারা বরং ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ পদ্ধতি অনুসরণ করছে, যেখানে টিকিটের চাহিদা অনুযায়ী সময়ভেদে দাম পরিবর্তিত হয়। টিকিটের এমন আকাশচুম্বী দামের কারণে গত বছরের শেষ দিকে অনেকেই একে ফুটবলভক্তদের সঙ্গে ‘চরম বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে বলেছিলেন। বুধবার প্রথমবারের মতো টিকিটের উন্মুক্ত বিক্রি শুরু হওয়ার পর চড়া দামের বিষয়টি আবারো সামনে চলে আসে।
এর বাইরে ফিফার অফিশিয়াল ‘রিসেল’ বা পুনর্বিক্রয়ের প্লাটফর্মটিও আবারো উন্মুক্ত করা হয়েছে গত বৃহস্পতিবার। মেক্সিকোর আইন অনুযায়ী, সেখানে মূল দামের চেয়ে বেশি দামে টিকিট পুনরায় বিক্রয় করা নিষিদ্ধ। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় নিষিদ্ধ নয়। ধারণা করা হচ্ছিল, ওই দুই দেশে ম্যাচগুলোর টিকিটের দাম রিসেলে চড়া হবে। ফিফার এ প্লাটফর্মে যে কেউ টিকিট কেনার পর তা নিজের ইচ্ছামতো দামে বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত করতে পারেন। তবে এগুলো মূলত বিক্রেতাদের চাওয়া দাম, যা নিশ্চিত করে না যে টিকিটগুলো ওই দামেই বিক্রি হচ্ছে।
প্লাটফর্মটি চালু হওয়ার পর পরই বিবিসি স্পোর্ট দেখেছে, ফাইনাল ম্যাচের সবচেয়ে দামি টিকিটের দাম চাওয়া হচ্ছে ৮২ হাজার ৭৮০ ডলার (প্রায় ১ কোটি ১ লাখ ৫৪ হাজার টাকা)। এমনকি সবচেয়ে সস্তা টিকিটের দাম ২৭ হাজার ডলার (প্রায় ৩৩ লাখ টাকা)! রিসেলে যে মূল্যে বিক্রি হবে তার ওপর ফিফা ক্রেতা ও বিক্রেতা—উভয় পক্ষ থেকেই ১৫ শতাংশ ফি কেটে রাখবে।
সবশেষে বিশ্বকাপে খেলার টিকিট কেটেছে বসনিয়া হার্জেগোভিনা, ডিআর কঙ্গো, চেক রিপাবলিক, ইরাক, সুইডেন ও তুরস্ক। শেষ মুহূর্তে বিদায় নিয়েছে ইতালি, পোল্যান্ড, ডেনমার্ক, জ্যামাইকা ও বলিভিয়া। এসব দেশের সমর্থকরা আগে থেকে টিকিট কিনে রাখলেও এখন তাদের দল না খেলায় তা বিক্রি করে দেবেন।










