আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে সফলভাবে শেষ হয় কাতার বিশ্বকাপ আসর। তবে সমাপনীতে কনফেত্তির ছড়াছড়ি আর আলোর ঝলকানি সবকিছু কি আড়াল করতে পারবে? এ আসর সফল করার পেছনে রয়েছে লাখো শ্রমিকের ঘাম। কয়েক হাজার শ্রমিকের জীবনপ্রদীপও নিভে গেছে স্টেডিয়াম আর অবকাঠামো তৈরির সময় প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করতে গিয়ে। যদিও মারা যাওয়া অভিবাসী শ্রমিকের পরিবারগুলো সঠিক ক্ষতিপূরণ পায়নি। তারা যাতে ক্ষতিপূরণ পান ফিফার কাছে সেই দাবি তোলা হবে জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনগুলোর আসন্ন বৈঠকে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বুধবার জানায়, ১৬ মার্চ আফ্রিকার দেশ রুয়ান্ডায় হতে যাওয়া ফিফা কংগ্রেসে বিষয়টি উত্থাপন করবেন নরওয়ে ফুটবল ফেডারেশনের কর্মকর্তারা। বিশ্বকাপের পর এটিই হবে ফিফার শীর্ষ কোনো বৈঠক, যাতে দুশরও বেশি ফেডারেশন অংশ নেবে।
ফিফার কাছে নরওয়ের প্রস্তাব হলো, প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করার ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়ায় ফিফাকে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।
অ্যামনেস্টির অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিচার বিভাগের প্রধান স্টিভ ককবার্ন এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘যেসব শ্রমিক টুর্নামেন্টটিকে সফল করার পেছনে কাজ করেছেন তাদের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফ্যান্তিনোর সামনে এটা দারুণ এক সুযোগ।’
২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ইংলিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশটিতে অন্তত ৬ হাজার ৫০০ অভিবাসী শ্রমিক মৃত্যুবরণ করেছেন। তারা ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলংকার নাগরিক। তার মানে, প্রতি সপ্তাহে এ পাঁচ দেশের অন্তত ১২ জন শ্রমিক মারা গেছেন।
ওই সময় ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলংকা থেকে পাওয়া তথ্য বলছিল, ২০১১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৫ হাজার ৯২৭ জন শ্রমিক মারা গেছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশের এক হাজারেরও বেশি শ্রমিক কাতারে কাজ করার সময় মারা গেছেন। কাতারের পাকিস্তান দূতাবাস জানায়, ২০১০ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৮২৪ জন পাকিস্তানি শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে।
তবে শ্রমিক মৃত্যুর সঠিক সংখ্যাটি এর চেয়েও অনেক বড়। কারণ ফিলিপাইন ও কেনিয়ার মতো অনেক দেশের সংখ্যাগুলো এখানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। আবার ২০২০ সালের শেষ মাসগুলোর হিসাবও আসেনি এখানে। ২০২১ ও ২০২২ সালের মৃত্যুর সংখ্যাটিও যোগ হয়নি।
ভারতের ৪৩ বছর বয়সী মধু বোলাপল্লি তার স্ত্রী লতা ও ১৩ বছরের পুত্র রাজেশকে দেশে রেখে ২০১৩ সালে কাতার যান ভাগ্যান্বেষণে। ২০১৯ সালের এক রাতে তার রুমমেট ফিরে এসে তাকে মেঝেতে মৃত দেখতে পান। আরো হাজারো ব্যাখ্যাতীত মৃত্যুর মতোই এটিকেও হৃদরোগে মৃত্যু হিসেবে দেখানো হয়।
ছয় বছর কাজ করার পরও তার নিয়োগদাতার কাছ থেকে মাত্র ১ লাখ ১৪ হাজার রুপি (১ হাজার ১২০ পাউন্ড) ক্ষতিপূরণ ও অপরিশোধিত বেতন পান বোলাপল্লির স্ত্রী ও সন্তান। রাজেশ অবশ্য জানে না, তার বাবার মৃত্যু কেন হলো। সে জানায়, ‘তার (বোলাপল্লি) কোনো স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা ছিল না। তার মধ্যে খারাপ কিছু কখনো দেখিনি।’
অভিযোগ রয়েছে, এভাবেই শত শত মৃত্যুকে ‘স্বাভাবিক’ বলে চালিয়ে দিয়েছে কাতারি প্রশাসন।
এদিকে, প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজন সফল করতে মধ্যপ্রাচ্যের গ্যাস ও তেলসমৃদ্ধ দেশ কাতার স্টেডিয়াম ও অবকাঠামো নির্মাণে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার খরচ করেছে। এ কর্মযজ্ঞে অংশ নেন দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের অন্তত ২০ লাখ শ্রমিক। ৩০ লাখ জনসংখ্যার দেশটিতে অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যাই ২০ লাখ! তারা স্টেডিয়াম, হোটেল, রাস্তা ও মেট্রো লাইন নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ সব প্রকল্পে কাজ করেছেন।
ককবার্ন বলেছেন, ‘কাতার বিশ্বকাপের বিভিন্ন অবকাঠামোতে কাজ করার সময় বেতন চুরি, অবৈধ নিয়োগ ফি, আহত, এমনকি মৃত্যুর শিকার হয়েছেন শ্রমিকরা। তবে কতজন শ্রমিক মারা গেছেন তার সঠিক সংখ্যা পাওয়া কঠিন, কারণ এ নিয়ে কাতার সরকারের পক্ষ থেকে কোনো তদন্ত করা হয়নি।’
ইউরোপের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোর মধ্যে নরওয়ে সবার আগে নিহত শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে। তারা ফিফার কাছে প্রস্তাব দিয়েছে, যেন ক্ষতিপূরণ প্রদানে একটি তহবিল গঠন করা হয়। কাতার সরকার অবশ্য এমন একটি প্রস্তাবকে নাকচ করে দিয়েছে।
ইনফ্যান্তিনো দাবি করছিলেন, পরিবর্তনের একটি অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে বিশ্বকাপ এবং সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রে কাতারকে তিনি এ অঞ্চলের নেতা হিসেবে অভিহিত করেন। বিশ্বকাপ শুরুর আগ মুহূর্তে কাতারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি সামনে এনে ইউরোপিয়ান ব্লক যখন বিশ্বকাপের রাজস্ব থেকে একটি ‘লিগ্যাসি ফান্ড’ তৈরির দাবি তোলে, তখন এর তীব্র সমালোচনা করেন ফিফা প্রেসিডেন্ট।
অবশ্য কাতার সরকারের তরফ থেকে একটি তহবিল তৈরি করা হয়েছে, যা থেকে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করা হয়। যদিও নরওয়েজিয়ান ফু্টবল ফেডারেশন বলছে, যেসব শ্রমিক কাতার ছেড়ে গেছে তাদের সঙ্গে যেমন যোগাযোগ করা যাচ্ছে না, তেমনি যেসব শ্রমিক মারা গেছেন তাদের পরিবারকেও সাহায্য করা যাচ্ছে না, কেননা মৃত্যুর কারণ তদন্ত করেনি কাতার সরকার, তাই সঠিক হিসাবও নেই কারো কাছে।
এ বিষয়টি নিয়েই ফিফার কাছে নরওয়ের সুস্পষ্ট প্রস্তাব দেয়া আছে। তাতে বলা আছে, ২০২২ সালের বিশ্বকাপ কর্মযজ্ঞে যেসব শ্রমিক আহত কিংবা নিহত হয়েছে, তাদের বিষয়ে তদন্ত করা হোক, আর যদি সেটা না পারা যায় তবে কীভাবে এর ক্ষতিপূরণ দেয়া যায়, সেই ব্যবস্থা যেন গ্রহণ করা হয়। ফিফাকে বলা হবে, কাতার বিশ্বকাপ তো বটেই, ভবিষ্যতে এটি যত টুর্নামেন্ট আয়োজন করবে তার সবগুলোতে যেন মানবাধিকার সুরক্ষার নীতিটা বাস্তবায়ন করা হয়, সেসঙ্গে ক্ষতিপূরণ প্রদানের সুব্যবস্থাও থাকে।
নরওয়ে প্রস্তুতি নিয়েই যাচ্ছে কিগালির কংগ্রেসে। তবে ব্যস্ত সূচিতে ঠাসা এ কংগ্রেসে তারা দাবি জোরালো করতে কতটা সময় পাবে, সেটিই প্রশ্ন।
রুয়ান্ডার এ বৈঠকে ফিফা প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হতে পারেন ইনফ্যান্তিনো এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এই বৈঠকে ফিফার আর্থিক হিসাব উত্থাপন করা হবে। ২০২২ বিশ্বকাপের কারণে এ মুহূর্তে ফিফার রিজার্ভ বেড়ে ৪০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এপি ও গার্ডিয়ান।










