যেকোনো সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির প্রাণ এর দর্শক। বলিউডের ক্ষেত্রে একথা আরো বাস্তব। প্রতিষ্ঠার ১০০ বছর পর, আজ পর্যন্ত দর্শকই বলিউডের অণুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। আর ব্যবসা তথা ইন্ডাস্ট্রির চালিকাশক্তির জোগানও এ দর্শক দিয়েছে, যার মাধ্যম নির্মিত হয়েছে অসংখ্য সিনেমা হল বা থিয়েটার। কিন্তু কভিড-১৯ মহামারী আসার কারণে একটা লম্বা সময় ধরে সিনেমা-থিয়েটার এবং আধুনিক মাল্টিপ্লেক্স বন্ধ রাখতে হয়েছিল। ২০২১ সালের তৃতীয়ার্ধে এসে ধীরে ধীরে থিয়েটার খুলতে শুরু করে। কিন্তু ততদিনে আধুনিক এ সময়ে দর্শককে ঘর থেকে সিনেমার সঙ্গে জুড়েছিল ওটিটি প্লাটফর্ম। ভারতের নিজস্ব ও বৈশ্বিক, উভয় ধারার ওটিটিই মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এ বছর রীতিমতো ওটিটি ও থিয়েটারের সহাবস্থানের মধ্য দিয়ে গেছে।

মহামারীর কারণে সিনেমার শুটিং ব্যাহত হলেও নানা কৌশলে সিনেমার কাজ শেষ করে মুক্তি দেয়া হয়েছে। ২০২১ সালে গত বছরের তুলনায় বেশিসংখ্যক সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। এর মধ্যে মূলধারার বাইরের সিনেমা যেমন রয়েছে, তেমনি মূলধারার বেশ বড় বাজেটের সিনেমাও ছিল। যে সিনেমাগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তার মধ্যে শেরশাহ, মিমি, ভুজ: দ্য প্রাইড অব ইন্ডিয়া ও সর্দার উধাম-এর মতো সিনেমা অনলাইন প্লাটফর্মে মুক্তি পেয়েছে। অন্যদিকে রোহিত শেঠির বড় বাজেটের সিনেমা সূর্যবংশী মুক্তি পেয়েছে র্িথয়েটারে। রোহিত রীতিমতো থিয়েটার পুনরায় চালু হওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছিলেন। এছাড়া মুম্বাই সাগা, বেল-বটম, অন্তিম: দ্য ফাইনাল ট্রুথ, ৮৩ মুক্তি পেয়েছে থিয়েটারে। অর্থাৎ, দেখা যাচ্ছে দুই ধারাতেই সিনেমা মুক্তি পাচ্ছে এবং থিয়েটার ও ওটিটি এক রকম সহাবস্থান করছে।

থিয়েটার এবং ওটিটির পার্থক্য অনেক। অনেকে থিয়েটারে গিয়ে হইহল্লা করে সিনেমা দেখতে পছন্দ করেন। অনেকে আবার ঘরে বসে নিরিবিলিতে দেখেন। বছর তিনেক আগেও অনেকে ব্যস্ততার কারণে থিয়েটারে গিয়ে একটা সিনেমা দেখতে পারেননি। কিন্তু এখন নিজের সময়মতো ইচ্ছানুসারে দেখা সম্ভব। অন্যদিকে ওটিটি একটি বৈশ্বিক প্লাটফর্ম। উদাহরণস্বরূপ, কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের একজন দর্শক চাইলেও মুক্তির পরপর বৈধ উপায়ে বলিউডের সিনেমা দেখতে পারত না। কিন্তু এখন যদি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পায়, পৃথিবীর যেকেনো স্থান থেকে ‘ফার্স্ট ডে, ফার্স্ট শো’ দেখা সম্ভব।

অনেকে অবশ্য ওটিটিকে থিয়েটারের জন্য ক্ষতিকর মনে করেন। এখনো বহু প্রযোজক, পরিচালক থিয়েটারেই সিনেমা মুক্তি দিতে চান। যেমন রোহিত শেঠির নানা ওটিটি প্রস্তাব দিলেও তিনি থিয়েটারেই সূর্যবংশী মুক্তি দিয়েছেন। কিন্তু অজয় দেবগণ তার ভুজ: দ্য প্রাইড অব ইন্ডিয়া মুক্তি দিয়েছেন ডিজনি+হটস্টার প্লাটফর্মে। হুমা কোরেশী অভিনীত আর্মি অব দ্য ডেড ওটিটিতে এলেও বেলবটম থিয়েটারে মুক্তি পেয়েছে। ইমরান হাশমি, অমিতাভ বচ্চন অভিনীত চেহরে থিয়েটারে মুক্তি পেয়েছে। এ সিনেমার প্রযোজক আনন্দ পণ্ডিত বলেন, ‘এখন বৈশ্বিক দর্শকের কাছে পৌঁছার সুযোগ নির্মাতা, প্রযোজকদের রয়েছে। একজন প্রযোজক হিসেবে আমার দৃষ্টিতে দর্শককে আরো ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার মাধ্যম হিসেবে ওটিটিকে দেখছি।’

তবে এখানে সহাবস্থানটা অবশ্যই জরুরি। কেননা বহুদিন ধরে বলিউড এবং সিনেমা হল, থিয়েটার পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এর আধুনিকতম সংস্করণ হিসেবে বছর দশেক ধরে চলছে মাল্টিপ্লেক্স। এটিও রীতিমতো একটি বড় ‘ইন্ডাস্ট্রি’, যার রসদ মূলত বলিউড সিনেমা ও দর্শক। দ্রুত সবাই ওটিটির দিকে ঝুঁকে পড়লে এ খাত ভেঙে পড়বে। হুমা কোরেশীর মতে, ‘এ বছর শতভাগ ব্যালেন্স ছিল। আমরা সবাই যেমন বড় পর্দায় সিনেমা দেখতে চাই, তেমনি ঘরে বসেও দেখতে চাই। আমার মনে হয় এভাবেই এগিয়ে যেতে হবে। এটাই ভবিষ্যৎ।’

কেবল বলিউড সিনেমা নয়। নানা ওয়েব সিরিজ দিয়ে ওটিটি দর্শক মাত করে রেখেছে। বলিউডের মূলধারার অভিনেতা-অভিনেত্রীরাও ওটিটিতে কাজ করতে আগ্রহী। যেমন শাহরুখ খান নেটফ্লিক্সে বার্ড অব ব্লাড প্রযোজনা করেছেন, অজয় মুক্তি দিয়েছেন সিনেমা। মূলত সময়ের সঙ্গে তারা মানিয়ে নিচ্ছেন। তবে এখনো থিয়েটারকে ছাড়ার সময় আসেনি তা সবাই মানেন। তাই এখন সময় একত্রে চলার।

 

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস