চোল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারের গল্প। সুন্দর চোল যখন অতি বৃদ্ধ সে সময় যুবরাজ ঘোষিত হন আদিত্য কারিকালান। কিন্তু ‘ক্রোধী’ এ যুবরাজের প্রতি সাম্রাজ্যের অনেক রাজপুরুষের সমর্থন ছিল না। তারা মধুরান্তককে চোল সিংহাসনে বসাতে চেয়েছিল। এর একটি কারণ আদিত্যর ক্রোধী স্বভাব। অন্যদিকে মধুরান্তক (ইতিহাসে উত্তম চোল নামে পরিচিত) ছিলেন কোমল স্বভাবের। উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ছিলেন আদিত্যর ছোট ভাই আরুলমোয়ি। পোনিয়িন সেলভান নামে তিনিই পরিচিত। আদিত্য নিজে সিংহাসন চাইতেন না, কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে চোল সাম্রাজ্যকে ছেড়ে দেয়ারও পক্ষপাতী ছিলেন না। তিনি চাইলেন আরুলমোয়িকে সিংহাসনে বসাবেন। কিন্তু এর পেছনে ছিল আরেকটি ষড়যন্ত্র। বিশেষত কল্কি কৃষ্ণমূতির পাঁচ খণ্ডের ‘পোনিয়িন সেলভান’ বলে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মূলে ছিলেন নন্দিনী নামের এক নারী।
প্রথম পর্বে গল্প শেষ হয়েছিল একটি রহস্য দিয়ে। দ্বিতীয় পর্বে সে রহস্য উন্মোচন করেন মণি রত্নম। দর্শক দেখেছে চোল সাম্রাজ্য ও আদিত্যর প্রতি নন্দিনীর তীব্র ঘৃণা। পাহুভুর বা পাহাড়ি রাজ্যের রাণী নন্দিনী একসময় ছিলেন আদিত্যর প্রেয়সী। তাদের বিচ্ছেদের পর থেকেই নন্দিনী ও আদিত্য পরস্পরের প্রতি কুপিত। আদিত্যর ঘৃণার মধ্যে ছিল প্রেম, কিন্তু নন্দিনী কেবল ঘৃণাই করে আদিত্যকে। এর পেছনে ছিল একটা ভুল বোঝাবুঝি, যার সঙ্গে সুন্দর চোলের অতীতও যুক্ত। এত সব বিষয় একটু একটু করে ভেঙে দেখানো হয় সিনেমায়। মূল ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকেন রাজকুমারী কুন্দ, পার্বতী রাজা, বীর পাণ্ডিয়ান, ভালভারিয়ার ভানদিয়াদেব প্রমুখ। তবে শত্রুতার বীজ বোনা হয়েছিল বীর পাণ্ডিয়ানের হাতে। সে কথা দর্শক জানতে পারে একদম শেষে।
পোনিয়িন সেলভানের মতো ইতিহাস আশ্রয়ী একটি সিনেমার মূল বিষয় থাকে এর কাহিনী ও চরিত্রগুলোর প্রকাশের মধ্যে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সময়কে উপস্থাপন। যে গল্প মণি রত্নম বলেছেন, পোনিয়িন সেলভানে তার প্রকাশের কোনো খামতি নেই। চোল রাজ্যকে তিনি উপস্থাপন করেছেন। সে সময়ের মানুষ, তাদের আবাস, স্থাপত্য ও রীতিনীতির উপস্থাপনও ঠিকঠাক করেছেন মণি রত্নম। এসব বিষয়ে তেমন কোনো সমালোচনার সুযোগ নেই। চোল রাজ্যের উপস্থাপনায় পুরো রাজ্যের কয়েকটি দৃশ্য তৈরি হয়েছে সিজিআইয়ের মাধ্যমে। এর বাইরে ইনডোর শুটিংয়ে প্রপসের ব্যবহার সময়কে উপস্থাপন করেছে। পোশাক, নারীদের গহনা ও পুরুষদের ব্যবহৃত নানা অস্ত্রেও সময়কে ধরা যায়। কিন্তু এ সিনেমার একটি বড় ব্যর্থতা এর নামে।
কল্কি কৃষ্ণমূর্তির উপন্যাস ছিল পাঁচ খণ্ডের। চোল সাম্রাজ্য নিয়ে এতে তিনি বিস্তারিত লিখেছিলেন। চোল রাজ্যের অবস্থা, এর চারপাশে চলমান রাজনীতি নিয়ে তার প্রকাশের স্থান ছিল বিস্তৃত। কিন্তু মণি রত্নমের দুটো সিনেমার মোট দৈর্ঘ্য ৫ ঘণ্টার কিছু বেশি। এর মধ্যে বিস্তারে সব দেখানো সম্ভব নয়। তিনি একটি খণ্ডাংশ নিয়েছিলেন, যেখানে নন্দিনী চেষ্টা করে চোল সাম্রাজ্যকে ভাঙতে। এখানেই সমস্যা দাঁড়ায়। পোনিয়িন সেলভান নাম হওয়ায় দর্শক স্বাভাবিকভাবেই পোনিয়িন সেলভান অর্থাৎ আরুলমোয়ির গল্পটা জানতে চাইবে। প্রথম পর্বে মনে হয়েছিল আদিত্য ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গিয়ে দ্বিতীয় পর্বে প্রধান হয়ে উঠবে পোনিয়িন সেলভান। কিন্তু দ্বিতীয় পর্বের শেষে আমরা দেখি আরুলমোয়ি তার যৌবরাজ্য মধুরান্তককে দিয়ে দেয়। অর্থাৎ রাজরাজ চোলের (ক্ষমতা লাভের পর আরুলমোয়ির নাম) গল্পটা এলই না।
সময়কে তার সব অনুষঙ্গ দিয়ে উপস্থাপন করলেও সিনেমাকে মহাকাব্য করে তুলতে পারেননি মণি রত্নম। এ ধরনের সিনেমায় একটি চরিত্র প্রধান হয়ে ওঠে। মনি রত্নমের পোনিয়িন সেলভানে তা নেই। চোল সাম্রাজ্য. আদিত্য কারিকালানের মতো যুদ্ধবাজ, আরুলমোয়ির মতো কুশলী যুবরাজ ও তাদের বিপক্ষে থাকা শক্তির মধ্যে কয়েকটি বড় যুদ্ধ দেখানো এমন একটি সিনেমার জন্য জরুরি ছিল। মণি সেদিকে হাঁটলেন না। যুদ্ধদৃশ্য আছে, কোরিওগ্রাফিও ভালো। কিন্তু শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি তৈরি করে না। এর বাইরে মন্দাকিনীতে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার সুযোগ থাকলেও তিনি করেননি। নন্দিনীর শেষটাই যেন হঠাৎ হলো, কোনো পরিণতি নেই। উপন্যাসে কল্কি কৃষ্ণমূর্তি আবেগমথিত সমাপ্তি দিয়েছিলেন। যারা বই পড়েছেন, তারা সন্তুষ্ট হতে পারছেন না। অন্যদিকে মণি রত্নম কদম্বুরের রাজকন্যা মণিমেঘালাইকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেছেন। ভানিদিয়াদেবের ওপর আদিত্যকে হত্যার অভিযোগ উঠলে মণিমেঘালাই সে দায় নিজের ওপর নিয়েছিলেন। আদিত্য হত্যার ঘটনাটিও বই থেকে ভিন্ন।
কল্কির বইটিও ফিকশন, ইতিহাস নয়। তবে যেহেতু মণি বলেছেন সিনেমাটি বই অবলম্বনে, তাই পাঠকরা এখানে প্রশ্ন তুলতেই পারে। তাতে সিনেমার খুব বেশি ক্ষতি হয়নি অবশ্য। ভারতে ও ভারতের বাইরে ভালো ব্যবসা করছে সিনেমাটি। কিন্তু পোনিয়িন সেলভান যে প্রতীতি তৈরি করে তার নামে ও নির্মাণে, সিনেমা শেষ হলে সে আবেশ আর থাকে না। মনে হচ্ছিল অসাধারণ একটা ঘটনার সাধারণ কোনো গল্প ও তার চিত্রায়ণ শেষ হলো। একটা অপ্রাপ্তি নিয়ে শেষ হয় সিনেমাটি। কিছু অতীতের বাহুবলী কিংবা দূর অতীতের যোধা আকবার যে তৃপ্তি দিয়েছিল, তা দিতে পারেনি মণি রত্নমের পোনিয়িন সেলভান। নির্মাণ ও অভিনয়ে ভালো হয়েও মহাকাব্যিক সিনেমা হতে ব্যর্থ পোনিয়িন সেলভান।










