আট থেকে আশি—সবার পছন্দ ফেলুদা। তাকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণ শুরু করেন খোদ সত্যজিৎ রায়। এরপর বেশির ভাগ চলচ্চিত্রই নির্মাণ করেছেন তার ছেলে সন্দীপ রায়। ফেলুদার চলচ্চিত্রের এ অংশ গুরুত্বপূর্ণ। সে বিষয়েই সাহিত্যের গোয়েন্দাদের নিয়ে ধারাবাহিক আয়োজনের আজ চতুর্থ পর্ব

বাংলা সাহিত্যের গোয়েন্দা চরিত্রদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় কে? এমন প্রশ্ন করলে এক কথায় সবাই বলবেন—ফেলুদা। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ জনপ্রিয় এবং বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ম্যাচিউর গোয়েন্দা জনপ্রিয়তার শুরুতেই শীর্ষে ফেলুদা। ব্যোমকেশের বর্তমান জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ একের পর এক সিনেমা হওয়া, কিন্তু ফেলুদার জনপ্রিয়তা ছিল ‘কনসিস্ট্যান্ট’। ১৯৬৫ সালে সন্দেশ পত্রিকায় প্রথম গল্পটি প্রকাশ হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত আট থেকে আশি সবার কাছেই তিনি জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য। চলচ্চিত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

12

ফেলুদাকে নিয়ে প্রথম চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করলেন চরিত্রেরই স্রষ্টা সত্যজিৎ রায়। তার প্রথম সিনেমা মুক্তি পায় ১৯৫৫ সালে- ‘পথের পাঁচালী’—তা সবারই জানা। এরপর ১০ বছরে তিনি আরো সিনেমা নির্মাণ করেন এবং সে সময়ই পরিচয় হয় সন্তোষ দত্তর সঙ্গে। সত্যজিৎ রায় তার গোয়েন্দা চরিত্রকে তৈরি করেছিলেন তুলনামূলক কম বয়সীদের জন্য। ফেলুদার সহকারী তাই কিশোর, ফেলুদা তাকে ডাকেনও তোপসে বলে (তপেশরঞ্জন মিত্র নামটা ভারিক্কি)। সত্যজিৎ রায় তার গোয়েন্দা গল্পে কমিক রিলিফ দিতেই তৈরি করেছিলেন লালমোহন গাঙ্গুলিকে। প্রথমে তার কল্পনায় ছিল মাথাভর্তি চুলওয়ালা সুদর্শন এক লেখক। কিন্তু সন্তোষ দত্তর সঙ্গে পরিচয় ও তার কমিক টাইমিং দেখে লালমোহন গাঙ্গুলিকেই নতুন করে তৈরি করেছিলেন সত্যজিৎ। আর সিনেমায়ও তিনিই ছিলেন জটায়ুর চরিত্রে।

১৯৭৪ সালে মুক্তি পায় ফেলুদার প্রথম সিনেমা—‘সোনার কেল্লা’। এতে ফেলুদা চরিত্রে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও তোপসে চরিত্রে ছিলেন সিদ্ধার্থ চট্টোপাধ্যায়। সোনার কেল্লাকে ধরা হয় সত্যজিতের ফেলুদা গল্পের অন্যতম সেরা আর সেটিকেই তিনি চলচ্চিত্রে রূপ দেন। রাজস্থানের পটভূমিতে এ সিনেমার গল্প। কলকাতার সিনেমায় এ রকম আউটডোর শুটিং ও রঙিন সিনেমা দর্শককে টেনেছিল। তবে এর মধ্য দিয়ে ফেলুদা, তোপসে ও জটায়ুর চেহারা এবং চরিত্রও দর্শকের মনে গেঁথে যায়। এখনো অনেকে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কেই ফেলুদা হিসেবে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন। পরবর্তী সময়ে সব্যসাচী চক্রবর্তী এ চরিত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে ফেললেও সৌমিত্র আলাদা মনোযোগ পান।

13

একই কাস্ট নিয়ে সত্যজিৎ রায় ১৯৭৯ সালে নির্মাণ করেন জয়বাবা ফেলুনাথ। এ সিনেমায় মগনলাল মেঘরাজ চরিত্রে ছিলেন উৎপল দত্ত। ফেলুদার মরিয়ার্টি বলা যায় তাকে। ফেলুদা ও মগনলালের দ্বৈরথ আজও দর্শক রিপিট করে দেখেন। এতে একদিকে যেমন আছে অভিনেতাদের গুণ তেমনি আছে গল্পের গুণ এবং তার চেয়েও বেশি আছে পরিচালকের গুণ।

সন্তোষ দত্ত মারা যান ১৯৮৮ সালে। সত্যজিৎ রায় একাধিক কারণে দুটির বেশি ফেলুদা নির্মাণ করেননি। সন্তোষ দত্তর মৃত্যু তার মধ্যে একটি। তিনি এ চরিত্রে আর কাউকে নিতে চাননি। সত্যজিৎ বেঁচে থাকতেই অবশ্য তার ছেলে সন্দীপ রায়ের হাত ধরে আসে ‘বাক্স রহস্য’। সিনেমার চিত্রনাট্যে সত্যজিতের ছাপ স্পষ্ট। যদিও এটিকে অনেকে সিনেমা বলতে চান না। মূলত নব্বইয়ের দশকে পশ্চিমবঙ্গের ইন্ডাস্ট্রির পড়তি দশায় কম বাজেটে নির্মাণ করা হয়েছিল বাক্স রহস্য। এর মধ্য দিয়েই সব্যসাচী চক্রবর্তী আবির্ভূত হন ফেলুদা রূপে। তোপসের চরিত্রে ছিলেন শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় এবং জটায়ুর চরিত্রে রবি ঘোষ। এরপর দীর্ঘদিন দর্শকের মনে ফেলুদা আর সব্যসাচী চক্রবর্তী প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিল।

14

নব্বইয়ের দশকে সব্যসাচী চক্রবর্তী হয়ে উঠেছিলেন সবার প্রিয় ফেলুদা। সে সময় এখনকার মতো বাজেট ছিল না। টেলিভিশন ড্রামার মতো করেই সন্দীপ রায় বানিয়েছিলেন ফেলুদার সিরিজ। এখনকার মতো দীর্ঘও নয়, কখনো টেলিফিল্ম আকারে কখনো ড্রামা আকারে তিনি নির্মাণ করেছিলেন ‘গোঁসাইপুর সরগরম’, ‘শেয়াল দেবতা রহস্য’, ‘বোসপুকুরে খুনখারাপি’, ‘জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা’, ‘ঘুরঘুটিয়ার ঘটনা’, ‘অম্বর সেন অন্তর্ধান রহস্য’ ও ‘ডা. মুনসীর ডায়রি’। ফেলুদা চরিত্রে অভিনয় করেছেন সব্যসাচী, তোপসের চরিত্রে শাশ্বত ও জটায়ুর চরিত্রে যথাক্রমে রবি ঘোষ, অনুপ কুমার ও বিভু ভট্টাচার্য। এদিকে কাছাকাছি সময়ে বিভাস চক্রবর্তী ‘ঘুরঘুটিয়ার ঘটনা’ ও ‘গোলকধাম রহস্য’ নির্মাণ করেছিলেন। এগুলো তেমন আলোচনায় আসেনি।

সন্দীপ রায়ের পরিচালনায় এ ড্রামাগুলো সাদামাটা, কিন্তু ফেলুদার ব্যক্তিত্ব, ক্যারিশমা ও ফেলুদা-তোপসে-জটায়ুর রসায়ন উপস্থিত বলে এখনো দর্শকের কাছে জনপ্রিয়। মূলধারার সিনেমা হিসেবে বিবেচনা না করলেও এই সময়ে নির্মিত ‘যত কাণ্ড কাঠমান্ডুতে’ ও ‘গোলাপী মুক্তা রহস্য’ কাহিনীবিন্যাস ও দৈর্ঘ্যে সিনেমার মতোই। এ দুটিতে মগনলাল মেঘরাজ চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোগন আগাসে। উৎপল দত্তের দুর্দান্ত অভিনয়ের পরও এ চরিত্রে মগনলালের প্রতি যথেষ্ট জাস্টিস করেছেন মোহন।

সত্যজিৎপুত্র হওয়ার কারণেই হয়তো সন্দীপ রায় একচ্ছত্রভাবে ফেলুদা নির্মাণ করে গেছেন। থিয়েটারে মুক্তি ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনায় তার পরিচালিত প্রথম ফেলুদা চলচ্চিত্র ‘বোম্বাইয়ের বোম্বেটে’ ২০০৩ সালে মুক্তি পায়। প্ররমব্রত চট্টোপাধ্যায় অভিনয় করেন তোপসে চরিত্রে এবং কালে কালে তিনিও একজন ফেলুদা হয়ে উঠবেন। সে অন্য আলাপ। সিনেমাটিতে বলিউডের আশীষ বিদ্যার্থী অভিনয় করেছিলেন খল চরিত্রে। এরপর একে একে এসেছে ‘কৈলাসে কেলেঙ্কারি’ (২০০৭), ‘টিনটোরেটোর যীশু’ (২০০৮), ‘গোরস্থানে সাবধান’ (২০১০), ‘রয়েল বেঙ্গল রহস্য’ (২০১১)। এ পর্যন্ত সব্যসাচী চক্রবর্তী ফেলুদা চরিত্রে, বিভু ভট্টাচার্য জটায়ু ও প্রথম তিনটি সিনেমায় তোপসে ছিলেন পরমব্রত (যিনি কালে কালে নিজেও ফেলুদা হবেন) ও পরের দুটিতে তোপসে ছিলেন সাহেব চট্টোপাধ্যায়।

সব্যসাচীর বয়স বেড়ে যাচ্ছিল। প্রয়োজন ছিল নতুন ফেলুদা। ২০১৪ সালে আবীর চ্যাটার্জিকে নিয়ে সন্দীপ নির্মাণ করেন বাদশাহী আংটি। কিন্তু আবীর ততদিনে ব্যোমকেশ হিসেবে জনপ্রিয়। তাই দর্শক তাকে ফেলুদা হিসেবে নিল না। ২০১৬ সালে সব্যসাচীকে নিয়ে ফেলুদার দুটি গল্প থেকে সন্দীপ তৈরি করেন ‘ডবল ফেলুদা’। দর্শক হারানো ফেলুদাকে ফিরে পেয়েছিল এ সিনেমায়। তবে সন্দীপ আবার ফেলুদা বদলান ২০২২ সালে। তার নতুন ফেলুদা ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত।

এই ছিল ফেলুদা সিনেমার কালক্রমিক বিবরণ। তবে এর মধ্যে থাকে আরো কিছু বিশ্লেষণের অবকাশ। এছাড়া ফেলুদা নিয়ে বাংলাদেশেও কাজ হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে তৈরি হয়েছে সিরিজ। ফেলুদাকেও কম চটকানো হয়নি সব মিলিয়ে। বিবর্তিত হয়েছে এর চরিত্রও। তবে সে আলাপ আগামী মঙ্গলবার।