অভিনয়ের ধারা বদলে গেছে। বদলে গেছে অভিনেতাদের পরিচিতিও। একটা সময় ছিল, অভিনেতাদের নায়ক ও খলনায়ক হিসেবে আলাদা করা হতো। এখন আমরা দেখি নায়ক হিসেবে পরিচিতরাও খল চরিত্রে অভিনয় করেন। কিন্তু বলিউডে একসময় নায়করা কখনো খল চরিত্রে অভিনয় করার সাহস করতেন না। অন্যদিকে খল চরিত্রে যারা অভিনয় করতেন দর্শকরা মনে করত এরা বাস্তবেও খল। কোনো কোনো ‘‌ভিলেন’ তো এমন ছিলেন যে এদের পর্দায় দেখে দর্শক রীতিমতো ভীত হতো। প্রাণ ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। বহু সিনেমায় অভিনয় করা প্রাণ বলিউডের খলনায়কের সংজ্ঞা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু তারও প্রাথমিক জীবনে ছিল বড় একটি সংগ্রাম। অন্তত ২০টি সিনেমায় অভিনয় করার পরও তার জীবনে সচ্ছলতা আসেনি। আর্থিক দুর্দশা এমন অবস্থায় পৌঁছেছিল যে তিনি স্ত্রীর গহনা বিক্রি করতে বাধ্য হন।

প্রাণ কৃষাণ শিখন্দ নামের এ অভিনেতার জন্ম ১৯২০ সালে, দিল্লিতে। এরপর কিছুকাল লাহোরে ছিলেন তিনি। সিনেমার জগতে তার পদার্পণ ১৯৪০ সালে। ২০০৭ সাল পর্যন্ত অভিনয় করেছেন তিনি। সিনেমার সংখ্যা প্রায় ৪০০টি। একটা সময় থেকে প্রাণকে এক নামে চিনত সিনেমার দর্শকরা। কিন্তু প্রথম জীবনে আর্থিক সফলতা আসেনি তার। চল্লিশের দশকে তিনি লাহোর থেকে মুম্বাইয়ে যান। সিনেমায় অভিনয় করছিলেন নিয়মিত। জনপ্রিয়তাও পেয়েছিলেন। কিন্তু মুম্বাইয়ের বাণিজ্যিক অঙ্গন তাকে আপন করেনি তখনো। রেডিফের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এ নিয়ে কথা বলেছিলেন প্রাণ। তিনি বলেন, ‘‌বিশটার মতো সিনেমায় অভিনয় করার পর আমার মনে হয়েছিল হিন্দি সিনেমা আমাকে আপন করে নেবে। কিন্তু আমি ভুল ভেবেছিলাম। এখানে (বলিউডে) এসে আমাকে অনেক ধাক্কা খেতে হয়েছে। ছয় মাস আমি কোনো সিনেমায় ডাক পাইনি। খরচ চালানোর জন্য স্ত্রীর গহনা পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে।’

লাহোরে থাকাকালীন ‘‌ইয়ামলা জাট’ সিনেমায় অভিষেক হয় প্রাণের। সেখানে আরো সিনেমায় অভিনয় করেন। সিনেমাগুলো হিট হয়েছিল। দেশভাগের পর ভারতে এসে প্রথমে ইন্দোরে বাস করতেন তিনি। এরপর মুম্বাই আসেন সিনেমার টানে। লাহোর ছাড়ার প্রসঙ্গে প্রাণ বলেন, ‘‌১৯৪৭ সালে লাহোরে দাঙ্গা শুরু হলে আমি আমার স্ত্রী ও এক বছর বয়সী মেয়েকে ইন্দোরে তার (স্ত্রীর) বোনের কাছে পাঠিয়ে দিই। আমার ছেলের জন্ম ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট। আমার স্ত্রী বলেছিল ছেলের জন্মের আগে আমাকে ইন্দোরে যেতে হবে। এর মধ্যেই অল ইন্ডিয়া রেডিওতে দাঙ্গার বাড়াবাড়ি বিষয়ে জানানো হয়। আমার আর লাহোর ফেরা হয়নি।’

মুম্বাইতে (সেকালের বোম্বে) ১৯৪৮ সালে প্রথম সিনেমার কাজ পান প্রাণ। বোম্বে টকিজের সিনেমাটির নাম ছিল জিদ্দি। এরপর গৃহস্থি, অপরাধী, পুতলি সিনেমাগুলো হিট করে। তখন আর্থিক সচ্ছলতা আসতে শুরু করে প্রাণের। তিনি বলেন, ‘‌এভিএমের সঙ্গে বাহার সিনেমার জন্য চুক্তি হওয়ার পর থেকে অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে। সোহরাব মোদী আমাকে শিস মহলে অভিনয়ের সুযোগ দিলেন। তারপর বেশির ভাগ সিনেমাই ভালো করেছে। আর আমার পারিশ্রমিকও বেড়েছে।’

খল চরিত্রে প্রাণের সেরা সিনেমার নামের কোনো অভাব নেই। জঞ্জির, ডন, অমর আকবর অ্যান্থনি, ববি প্রভৃতি বহু সিনেমার সঙ্গে জুড়ে আছে তার নাম। অভিনয়ের জন্য প্রাণ পেয়েছেন দাদাসাহেব ফালকে। পদ্মভূষণেও সম্মানিত হয়েছেন। আর শোনা যায় ‘‌ভিলেন’ হিসেবে তিনি এতই ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন যে অন্তত দুই যুগ বলিউডের দর্শকরা তাদের সন্তানের নাম ‘‌প্রাণ’ রাখেননি।

সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস