ভারতের কন্নড় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অন্যতম সুপারস্টার পুনিত রাজকুমার মারা গেছেন গত শুক্রবার। হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে দুপুর ১২টায় মাত্র ৪৬ বছর বয়সে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েন এ তারকা। মৃত্যুর পরই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে পুনিতকে ঘিরে নানা খরব। এ দেশে কন্নড় ইন্ডাস্ট্রির দর্শক খুব বেশি না থাকায় পুনিত ততটা জনপ্রিয়তা পাননি, যতটা পেয়েছেন আশপাশের ইন্ডাস্ট্রির প্রভাস, আল্লু অর্জুন, দুলকার সালমানরা। মৃত্যুর পর পুনিতের বিষয়ে যা জানা যাচ্ছে তাতে শুধু কন্নড় বা ভারত না, পুনিত আমাদের দেশের তারকাদের জন্যও শিক্ষণীয় এক হিরো।

মাত্র ৪৬ বছর বয়সেই প্রিয় তারকার এমন বিদায় মানতে পারেনি বেঙ্গালুরু তথা পুরো কর্ণাটক রাজ্যের মানুষ। রাজপথে নামা ঢল ঠেকাতেই পুলিশকে জারি করতে হয় রেড অ্যালার্ট। হয়তো ভক্তদের এমন আবেগের প্রকাশ অন্য সিনে-তারকাও পেতে পারতেন। কিন্তু পুনিত শুধু রুপালি পর্দায়ই নন, বরং জীবন নামের আরো বড় এক পর্দায় দৃষ্টান্ত রেখে যাওয়া এক নায়ক ছিলেন। পুনিতের বাবাও কাজ করেছেন সমাজের জন্য। পুনিত ধরে রেখেছিলেন সেই ধারা।

ঠিক কী পরিমাণ দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন পুনিত, সে সংখ্যা নিয়ে মতবিভেদ থাকলেও তার দানশীলতা ও সামাজিক অবদানের জন্য ভক্তরা তাকে শ্রদ্ধার চোখে দেখেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার ভক্তরা তার অবদানগুলোর নানা পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছেন। জানা যায়, তিনি নিজে প্রতিষ্ঠা করেন ৪৫টি দাতব্য স্কুল, ২৬টি অনাথ আশ্রম, ১৬টি বৃদ্ধাশ্রম ও ১৯টি গরুর খামার। কেবল নিজের অর্থায়নেই তিনি বহন করে চলছিলেন ১ হাজার ৮০০ শিক্ষার্থীর লেখাপড়ার দায়িত্ব। নিজের শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ চোখও দান করে গেছেন মৃত্যুর আগেই।

আর তাই ভালোবেসে কর্ণাটকের মানুষ পুনিতকে ‘আপ্পু’ বলে সম্বোধন করে। ২০০২ সালে ‘আপ্পু’ নামে একটি রোমান্টিক-অ্যাকশন সিনেমায় নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন পুনিত। সিনেমাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এরপর পুনিতের নামই হয়ে যায় আপ্পু। কন্নড় চলচ্চিত্রে কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব রাজকুমারের ছোট ছেলে পুনিত। রাজকুমার ভারতীয় ছবির ইতিহাসে অন্যতম সেরা অভিনেতাদের একজন। পুনিত তার মা-বাবার কনিষ্ঠ ছেলে। এ তারকার অকালে চলে যাওয়া কিছুতেই যেন মেনে নিতে পারছেন না তার ভক্তরা। প্রিয় অভিনেতার চিরবিদায় সহ্য করতে না পেরে জীবন দিতেও দ্বিধা করেননি এক ভক্ত। সুপারস্টারের মৃত্যু খবর শুনেই আত্মহত্যা করেছেন ওই ভক্ত। আরেক ভক্ত আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। এছাড়া হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন আরো দুজন। দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে, পুনিতের মৃত্যুর কথা শুনেই কন্নড়ের মারুরু গ্রামের ৩০ বছর বয়সী এক কৃষক হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তান রেখে গেছেন। মুনিয়াপ্পা নামে পুনিতের ওই অন্ধভক্ত টেলিভিশনে অভিনেতার মৃত্যুর খবর শুনেই বুকে ব্যথায় লুটিয়ে পড়েন। এরপর তাকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। একইভাবে বেলগাঁওয়ে পরশুরাম নামে আরেক ভক্ত টেলিভিশনে অভিনেতার মৃত্যুর খবর শুনে হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

এছাড়া পুনীত মারা যাওয়ায় রাহুল নামে তার আরেক ভক্ত গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তিনি আত্মহত্যা করার আগে নিজের ঘরে অভিনেতার ছবি ফুল দিয়ে সাজিয়ে সম্মানও জানিয়েছেন। অনেকে নিজেকে আঘাত করে জখম করেছেন বলেও জানা যায়।

শিশু অভিনেতা হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন পুনিত রাজকুমার। ১২টি সিনেমায় শিশুশিল্পী হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। পেয়েছেন ভারতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ২৯টি সিনেমায় অভিনয় করছেন তিনি।

সিনেমায় গানও গাইতেন পুনিত। সেই গানের জন্য পাওয়া পারিশ্রমিকের বড় একটা অংশ তিনি দান করেছেন দাতব্য কাজে। এমনকি নিজের চোখজোড়াও তিনি মৃত্যুর পর দান করে গেলেন। পুনিতের এসব অবদান ভক্তরা স্মরণ করছেন শ্রদ্ধাভরে। আপ্পু, আকাশ, আরাসু, মিলনা, ভামসি, জ্যাকি, পরমাত্মা, পাওয়ারের মতো সুপারহিট কন্নড় ছবি দর্শকদের উপহার দিয়েছেন তিনি।